ঢাকা : বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • ডেঙ্গু এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে : কাদের          ঈদে হাসপাতালের হেল্প ডেস্ক খোলা রাখার নির্দেশ          নবম ওয়েজ বোর্ডের ওপর হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা           বন্দরসমূহের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর, ২০১৪ ২২:৪৭:৫৩আপডেট : ২৫ অক্টোবর, ২০১৪ ১১:৫১:০৯
ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে অনিয়ম-দুর্নীতি
এ কে নাহিদ

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পথে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় ৪৪ বছরে এসে আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের স্বপ্ন দেখছি। নানা শঙ্কা-সংকটের মধ্যেও এই অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা রেখেছে অর্থনীতির রক্ত প্রবাহ ব্যাংকিং খাত। সরকারি-বেসরকারি বিশেষায়িত ও বিদেশি ব্যাংকসহ লিজিং কোম্পানিগুলো মিলে দেশের শিল্পায়নে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিই হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুশাসনের অভাবে নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে এই খাতটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে চলেছে। সম্প্রতি ব্যাংকিং খাতে আগের তুলনায় সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর জন্য দায়ী মূলত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্বল মনিটরিং সর্বোপরি দেশ প্রেমের অভাব। ফলে দেশের ব্যাংকিং খাত ‘অনিয়ম-দুর্নীতি’ নামক একটি নেতিবাচক শব্দজালে আবদ্ধ হয়েছে। এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য মোটেও কাম্য নয়। এ নিয়েই এবারের টাইমওয়াচ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন;
লিখেছেন এ কে নাহিদ
অর্থনীতির রক্ত প্রবাহ ব্যাংকিং খাতে সম্প্রতিক কালে যেসব ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা যদি এখনই প্রতিরোধ করা না  হয়; তাহলে এ খাতের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে এবং দেশের অর্থনীতির ভিত দৃঢ় হতে পারবে না। এ বার্তা একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অবশ্যই অশনি সংকেত। এক্ষেত্রে এই খাতের সর্বাগ্রে যে প্রসঙ্গটি উঠে আসে তাহলো পুরাতন ক্যান্সার ঋণখেলাপি।
পুরাতন ক্যান্সার ঋণখেলাপি

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত সিআইবি ডাটাবেজে সংরক্ষিত ঋণ তথ্য অনুসারে সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির মোট সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ১৬২ জন। তিনি আরো জানান, খেলাপি ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তদারকির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি পৃথক টাস্কফোর্স সেল গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থ ঋণ আদালতসহ অন্যান্য আদালতে দায়েরকৃত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। আদালতের বাইরেও বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে আদায় করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা অফিসগুলো নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রমকে আরো জোরদার করার জন্য ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিমাসে সভার আয়োজন করছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, দেশে এতো অধিক সংখ্যক ঋণখেলাপি কীভাবে তৈরি হচ্ছে! এর পেছনে অবশ্যই দুর্নীতি জড়িত। দুর্নীতি ব্যাংকিং খাতকে পুরাতন ক্যান্সারে পরিণত করছে। তাই শুধু কাগজ-কলমে ও কথায় নয়; ঋণখেলাপি বন্ধে এর কারণ অনুসন্ধান করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ।
দুর্নীতিতে একে অপরের দোষারোপ নয় প্রয়োজন সমাধান
সরকার মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় অনিয়ম-দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে দায়ী করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেছেন, সরকারের ব্যাংকগুলোয় এর আগেও রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালক নিয়োগ হয়েছে। এম সাইফুর রহমান, কিবরিয়া সাহেবও পরিচালক নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু তাদের আমলে এত বড় বড় অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি। মুহিত সাহেব যাদের নিয়োগ দিয়েছেন তারাই অনিয়ম করেছেন। এ জন্য অর্থমন্ত্রীকে দোষী করা যায়। তিনি ব্যাংকের জন্য দক্ষ লোক খুঁজতে ব্যর্থ হয়েছেন। অযোগ্য, দুর্বল লোকদের এনে ব্যাংকের পরিচালক, চেয়ারম্যান বানিয়ে দিয়েছেন। যে কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোর এ দুরবস্থা। বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে করপোরেটাইজড করার সিদ্ধান্তও ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই ব্যাংকার। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের ওই ধারণাটাই ভ্রান্ত ছিল। এর ফলে এমডি, ডিএমডির বেতন বেড়েছে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি; কিন্তু ব্যাংকের দক্ষতা বাড়েনি। তিনি আরো বলেন, ২০০৮ সালে সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক করপোরেটাইজড করার মূল উদ্দেশ্য ছিল- এগুলোর শেয়ার অল্প অল্প করে পুঁজিবাজারে ছেড়ে দেয়া। কিন্তু গত ছয় বছরে এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার যেহেতু এটি করেনি তাই বলা যায় বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে ব্যাংক করপোরেটাইজড করে আসলে কোনো লাভ হয়নি বরং দুর্নীতি-অনিয়ম আরো বেড়েছে। সরকার ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে অনিয়ম-দুর্নীতি
চাইলে এখনো ব্যাংকগুলোর শেয়ার পুঁজিবাজারে ছেড়ে দিতে পারে এমন মন্তব্য করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই ডেপুটি গভর্নর বলেন, এর ফলে ব্যাংকে জনগণের মালিকানা সৃষ্টি হবে। এতে জবাবদিহিতার একটা জায়গা তৈরি হবে। সরকার নিয়োজিত পরিচালকরাও যা ইচ্ছে তা করতে পারবেন না। সরকারের ব্যাংকগুলোকে রাহুর গ্রাস থেকে মুক্ত করতে আরো কিছু পরামর্শ দিয়েছেন ইব্রাহীম খালেদ। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় সার্চ কমিটির মাধ্যমে পরিচালক নিয়োগের সুপারিশ করে তিনি বলেন, যেহেতু ব্যাংকগুলোর মালিক সরকার তাই সরকারই পরিচালক নিয়োগ দেবে। তবে পরিচালক নিয়োগ করার জন্য দক্ষ, অভিজ্ঞ ও প্রবীণ লোকদের নিয়ে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। ওই সার্চ কমিটি ব্যাংকের পরিচালক হতে পারে এমন লোকদের তালিকা দেবে সরকারের হাতে। পরে সরকার তাদের মধ্য থেকে পরিচালক নিয়োগ দিতে পারে। এটি হলে একদিকে যেমন বিতর্ক কমবে, তেমনি দক্ষ ও অভিজ্ঞ পরিচালকরা সরকারের ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা বাড়াতে কাজ করতে পারবেন। পরিচালকের পাশাপাশি এমডি ও ডিএমডি নিয়োগেও সার্চ কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়ে এই ব্যাংকার বলেন, এসব পদে কর্মকর্তা নিয়োগেও সরকার ভুল করছে। তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনার শীর্ষ এ দুটি পদেও দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক দরকার। কেবল চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকেই এসব পদে কর্মকর্তা নিয়োগ না করে সরকারের উচিত হবে বাজার থেকে এ পদগুলোর জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ লোক বেছে নেয়া। সরকারি ব্যাংক বাঁচানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল যাদের হাতে সেই পরিচালকরাই এখন লুটে খাচ্ছেন ব্যাংকের হাড়-অস্থিমজ্জাটুকুও। কেউ ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে জামানত ছাড়াই দিয়ে দিচ্ছেন কোটি কোটি টাকার ঋণ। আবার কেউ সমাজসেবার নামে ব্যাংকের টাকায় দান-খয়রাত করছেন উদার হাতে। কেউ অনৈতিকভাবে শ্রেণিকৃত ঋণ অশ্রেণিকৃত করছেন। আবার কেউ ইচ্ছা মাফিক ঋণের জামানত পরিবর্তনের সুযোগ করে দিচ্ছেন। রাহুর গ্রাসে পড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি এখন সেই গ্রাম্য প্রবাদের মতো- ‘বেড়া এখন নিজেই খেত খাচ্ছে’। ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া এ ধরনের ভয়াবহ অনিয়মের ওপর সরকারের নজরদারি দুর্বল হলেও সূক্ষ্ম নজর রাখছে দাতা সংস্থাগুলো।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফ সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে বেসিক ব্যাংকসহ সরকার মালিকানাধীন অন্য ব্যাংকগুলোর সবিস্তার তথ্য চেয়েছে। সংস্থাটি যেসব তথ্য চেয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকসহ সব ব্যাংকের তিন বছরের খেলাপি ঋণের তথ্য; সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ও ব্যালেন্স শীট ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ে কী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তার তথ্য; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার (২০১৩) মেনে কী পরিমাণ শ্রেণিকৃত ঋণ পুন:তফসিল সুবিধা দেয়া হয়েছে তার তথ্য; বেসিক ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমওইউর তথ্য; সরকারি ব্যাংকগুলোর দক্ষতা বাড়াতে আসছে ডিসেম্বর মেয়াদে কী উদ্যোগ বা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তার তথ্য এবং ব্যাংকগুলোর সংস্কারে নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিপরীতে সর্বশেষ অগ্রগতির তথ্য চেয়েছে দাতা সংস্থাটি।
জানা গেছে, দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধে বছর ছয়েক আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল পরিচালনা পর্ষদের হাতে। দেয়া হয়েছিল অসীম ক্ষমতা। বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসন কায়েম করা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা আর আর্থিক কাঠামো শক্তিশালী করাই হবে তাদের কাজ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ কর্মকা-ে বিশ্বব্যাংকের প্রশ্রয়ও ছিল। ছিল আর্থিক সহায়তাও। কিন্তু ব্যাংক পরিচালনায় সীমাহীন ক্ষমতা পেয়ে সরকার নিয়োজিত পরিচালকরা শুরু করলেন একের পর এক খবরদারি। এ খবরদারি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দৈনন্দিন কার্যক্রমের ওপরও ছড়ি ঘোরাচ্ছেন রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব পরিচালক।
সূত্র জানায়, দুর্নীতি ও অনিয়মের হাত থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংককে একযোগে করপোরেটাইজড করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ২০০৮ সালে করা এ সংক্রান্ত ভেন্ডর এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে ওই ব্যাংকগুলো লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে এমডি, ডিএমডিদের বেতন এক লাফে বেড়ে ৫/৬ লাখ টাকায় উঠে যায়। আর দায়-দায়িত্ব চলে যায় পরিচালকদের হাতে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর মালিকানা পুঁজিবাজারে শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে এ পরিবর্তন আনা হয় তা-ই পূরণ হয়নি। বরং করপোরেটাইজড হওয়ার আগে যেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের দুর্নীতি সীমিত ছিল লাখ থেকে কোটি টাকার অঙ্কে, এখন তা শত কোটি থেকে হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি যার সর্বশেষ উদাহরণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর আর্থিক সূচক ভালো করার জন্য এগুলোকে করপোরেটাইজড করা হয়েছে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। এরপর বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মান বাড়াতে বেশি বেতনে এমডি ও ডিএমডি নিয়োগ করা হয়েছে। আগে ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত সরকার নিলেও করপোরেট করার কারণে এখন ব্যাংকগুলোর সব সিদ্ধান্ত এর পরিচালনা পর্ষদের ওপর ছাড়া হয়েছে। কিন্তু এতসব উদ্যোগের পরও এসব ব্যাংক রাহু গ্রাস থেকে বেরোতে পারছে না। বরং কোনো কোনো ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি এত খারাপ যে, তাদের বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখতে হচ্ছে; করা হয়েছে বিশেষ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)। পরিস্থিতির উন্নতিতে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকদের কর্মকা- এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর অনিয়ম সম্পর্কে অবহিত করে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে প্রতিবেদনও পাঠানো হয়েছে। এতে বলা আছে, সরকারি ব্যাংকগুলোর হিসাব বইয়ে বিপুল পরিমাণ ঋণের সন্ধান পাওয়া গেছে যার কোনো হদিস নেই। এ ছাড়া ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, ব্যবসায়িক লেনদেন ও পর্যাপ্ত জামানত না নিয়েই ঋণ অনুমোদন ও ঋণ নবায়ন করার মতো অনিয়ম হয়েছে। কিছু অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাও জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ঋণ অনুমোদন বিষয়ে শাখা এবং প্রধান কার্যালয়ের ঋণ কমিটির সুস্পষ্ট নেতিবাচক মন্তব্য থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদ তা আমলে না নিয়ে অনুমোদন করেছে। এসব টাকা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নগদ উত্তোলন করা হয়েছে, যা খুবই সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ঋণ নির্বাচন ও বিতরণ না করার পরিপ্রেক্ষিতে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিরূপ শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে এমনটি উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক আরো বলছে, গত কয়েক বছর যথাযথ ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই বিপুল পরিমাণ ঋণ মঞ্জুর ও নবায়ন সুবিধা দেয়া হলেও ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ কার্যকরভাবে ব্যাংকের এ ধরনের দায়-সম্পদ ও ঝুঁকি পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো খোঁজ রাখে না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে। আমরা ব্যবস্থাও নিচ্ছি। তবে এসব ব্যাংকের মালিক যেহেতু সরকার আর তারাই পরিচালক নিয়োগ করে, তাই পরিচালকদের অনিয়মের বিষয়গুলো আমরা কেবল সরকারকেই অবহিত করতে পারি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ নতুন নয়, দীর্ঘদিন থেকেই অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে তাদের বিরুদ্ধে। হলমার্কের মতো ভয়াবহ কেলেঙ্কারির পরও এ ব্যাপারে সরকারের টনক নড়েনি। সে কারণেই দুর্নীতি বেড়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরও কঠোর হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। দুর্নীতির পাশাপাশি অনিয়মও বাড়ছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এরই আলোকে বলা যেতে পারে, একে অপরের দোষারোপ না করে এ খাতের বিশেষজ্ঞ টিম নিয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
অনিয়ম নতুন কিছু নয় সরিষাতেই ভূত
দেশের ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির খবর নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগে বিভিন্ন ব্যাংকের ১৮৪ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদের মধ্যে ১৮ জন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা রয়েছেন। এছাড়া আরো দু’জনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংক ও বেসরকারির মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি জায়গা। সারা বিশ্বেই এই খাতে কিছু কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে থাকে। এখানেও এ ধরনের দু’একটা ঘটনা ঘটেছে। ব্যাংকারদের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং গ্রাহক হয়রানি প্রমাণিত হলে যদি এই ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করা যায় তাহলে ব্যাংকাররা অনেক সতর্ক হবে। আর এতে এ খাতে অনিয়ম অনেক কমে আসবে। গভর্নর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সেবার মান বাড়ানোরও পরামর্শ দেন।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট ২০১১ সালে বিভাগটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে মোট ১০ হাজার ৯৯০টি গ্রাহকের অভিযোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৮০৫টি অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে গ্রাহকদের কাছ থেকে মোট অভিযোগ পাওয়া গেছে ৪ হাজার ৪৭৬টি। এর মধ্যে ৪ হাজার ২৯১টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিমাণ ৫৫.৫২ শতাংশ। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে ২৫.৯৭ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ ৬.৮৯ শতাংশ, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ৪.০৯ শতাংশ অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাওয়া গেছে ৭.৫৩ শতাংশ অভিযোগ। গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি অভিযোগের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের তিন ব্যাংক। সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২৯১টি, জনতার বিরুদ্ধে ১৮৬টি ও অগ্রণী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৮৫টি লিখিত অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। এ ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৫২ জন গ্রাহক হয়রানি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন। এরপরই রয়েছে প্রাইম ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৪৬টি, ব্র্যাক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৪৫টি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১২৯টি, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৮৫টি ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৭৭টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া বিশেষায়িত খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে ১২৭টি। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিরুদ্ধে।
এ ধরণের অনিয়ম প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, আমরা আশা করবো- সব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক সেবা সম্পর্কিত গাইড লাইন অনুযায়ী চলবে। ব্যাংকগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে গুড কমপ্লায়েন্স, গুড সার্ভিস, গুড বিজনেস দেবে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংককেও সুপারভিশন, রেজুলেশন, মনিটরিং, পলিসি শক্তিশালী করতে হবে।
প্রশ্নবিদ্ধ সিএসআর প্রয়োজন স্বচ্ছতা
সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্র মালিকানাধীন চার ব্যাংকের ‘সিএসআর’ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। এই ব্যাংকগুলো হলো- জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)। করপোরেট সোস্যাল রেসপনসিবিলিটির (সিএসআর বা সামাজিক দায়বদ্ধতা) আওতায় এই ব্যাংকগুলো কোনো নিয়ম-নীতি না মেনেই বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। অর্থ ব্যয়ের পেছনে কাজ করেছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। এমনকি পিকনিক, মসজিদ নির্মাণ, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামেও সিএসআর অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং বিভাগ এই চার ব্যাংকের সিএসআর কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। ব্যাংকিং বিভাগের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে- লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কয়েকটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সিএসআরের আওতায় ব্যাপকভাবে অর্থ ব্যয় করছে। এতে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে এবং সার্বিকভাবে ব্যাংকের প্রভিশনিংয়ের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে। এমতাবস্থায়, পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডকে সিএসআরের আওতায় অর্থ ব্যয় বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।
সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকেও সিএসআর অর্থ নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে বেশ ক’টি বেসরকারি ব্যাংক তাদের সিএসআর তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী পাঠিয়ে দিয়েছে। অন্য দিকে আগামীতে সিএসআর নীতিমালায় সিএসআর বিষয়ে আরো কঠোর শর্ত আরোপের সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে- নীতিমালায় এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, সিএসআর অর্থ জঙ্গি ও সন্ত্রাসে অর্থায়নে ব্যবহার করা হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে সিএসআর নীতিমালায় একটি শর্ত সংযোজনের জন্য বলা হয়েছে। এই শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সিএসআর খাতে ব্যয়িত অর্থ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসে অর্থায়নে ব্যবহৃত হবে না তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে কোনো প্রকার সন্দেহ থাকলে অর্থ ব্যয় থেকে বিরত থাকবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দু’টি প্রথম সারির বেসরকারি ব্যাংকের সিএসআর তথ্য পর্যালোচনায় ব্যাপক অনিময় খুঁজে পাওয়া গেছে। একটি ব্যাংক রাজধানীর অভিজাত একটি ক্লাবে সিএসআর অর্থ প্রদান করেছে। অন্য ব্যাংকটি বিভিন্ন সংগঠনের পিকনিক ও ক্লাবের ভবন নির্মাণে সিএসআর অর্থ দিয়েছে। এই অর্থ দেয়া হয়েছে একাধিকবার। শুধু তা-ই নয়, আলোচ্য ব্যাংকটি নাম না জানা কিছু সংগঠনকে এ খাত থেকে বিপুল অর্থও প্রদান করেছে। তাদের দেয়া কাগজপত্রেও ব্যাপক অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। বোঝা যাচ্ছে কিছু তথ্য গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলো সরকারকে চিন্তায় ফেলেছে। বিষয়গুলো দ্রুত খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট এক সূত্রে জানা গেছে, সিএসআর তথ্য স্বচ্ছভাবে লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও কয়েকটি ব্যাংক অসততার আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে অনেক তথ্য দেয়া হয়েছে যা অস্পষ্ট ও গোঁজামিলে ভরা। দেখা গেছে, একই খাতে বারবার সিএসআর খাত থেকে অর্থ দেয়া হয়েছে। প্রচুর কাগজপত্র থাকার কারণে এখানে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হবে বলে সূত্র জানায়। তাই বলা যায়, শুধু সিএসআর নয় ব্যাংকের যে কোনো ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা একান্ত প্রয়োজন।
ভুয়া এলসিতে লুটপাট বিপাকে ব্যাংক
ব্যাক টু ব্যাক ভুয়া এলসি (ঋণপত্র) খুলে এবং জাল কাগজপত্র মর্টগেজ দিয়ে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করছে একটি চক্র। ফলে শূন্য হয়ে যাচ্ছে ব্যাংক। শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র আমদানির নামে ভুয়া এলসি খুলে জালিয়াতির মাধ্যমে গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাত থেকে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। মর্টগেজ হিসেবে দেখানো পণ্য বা জমির ভুয়া দলিল দিয়ে এলসি খুলছে এ চক্রটি। মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এলসির কাগজপত্র তৈরি করে অন্য ব্যাংকে তা বিক্রি করে তুলে নিচ্ছে টাকা। এসব ঘটনায় খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একাধিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি চক্র সুকৌশলে ব্যাক টু ব্যাক এলসি খুলে নিজেরাই আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক সেজে ব্যাংকের টাকা লুটে নিচ্ছে। এ ছাড়া ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে তা ব্যাংকে মর্টগেজ দিয়ে ঋণের আবেদন করছে। পরবর্তী সময়ে জাল হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে এসব কাগজপত্র।
জানা গেছে, সম্প্রতি তৈরি পোশাক খাত ও জাহাজভাঙা শিল্পের প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানির জন্য খোলা বিপুলসংখ্যক ব্যাক টু ব্যাক এলসি ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সংঘবদ্ধ এ চক্রটি ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণও অনুমোদন করিয়ে তা আত্মসাৎ করছে। এ ধরনের ভয়াবহ জালিয়াত চক্রের সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংকের অসৎ কর্মকর্তাদেরও যোগসাজশ রয়েছে বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় বেশি ঘটছে। তবে বেসরকারি খাতের অন্তত অর্ধেক সংখ্যক ব্যাংকেও এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনার নজির রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে ভুয়া এলসি খুলে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বিশেষায়িত এবং ছোট ব্যাংকগুলোতেও এমন ঘটনা ঘটছে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এলসি নিয়ে নানা ধরনের কারসাজি হচ্ছে। ব্যাংকগুলোয় হাজার হাজার ব্যাক টু ব্যাক বেনামা এলসি খোলা হচ্ছে। সেগুলো অন্য ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে টাকা তুলে নিচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই সব এলসির সংশ্লিষ্ট কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে কোনো কোনো ব্যাংক কর্মকর্তারও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে এলসি খুলতে হবে। যেসব ব্যাংক ভুয়া এলসি খোলে, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ভুয়া মর্টগেজ দেখিয়ে এলসি খোলা হয়। পণ্য আমদানির নামে এসব এলসি একই ব্যক্তির নামে আরেক ব্যাংকে মর্টগেজ হিসেবে দিয়ে ঋণ নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মর্টগেজ গ্রহীতা ব্যাংক এলসি কিনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা দিয়ে টাকা উত্তোলন করতে গেলে তা ভুয়া প্রমাণিত হয়। আইন অনুসারে এলসির বিল দিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বাধ্য থাকে। পরে দেখা যায়, ওই সব এলসির কাগজপত্র সবই ভুয়া। হলমার্কের ঘটনার পর এমন কয়েক হাজার ভুয়া এলসির বিল রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক পরিশোধ করেছে। জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে সম্প্রতি দেশের একটি নামীদামি কোম্পানি অপরিশোধিত চিনি আমদানির মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। ইতিমধ্যে ওই কোম্পানির টাকা আরেক বেসরকারি ব্যাংকে বিল হিসেবে পরিশোধ করে দিয়েছে জনতা ব্যাংক। বিল পরিশোধের পর এখন দেখা গেছে, তারা কোনো চিনিই আমদানি করেনি। এমনকি মর্টগেজ হিসেবে দেখানো কোম্পানির ভিন্ন পণ্যেরও কোনো অস্তিত্ব নেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংক ও কোম্পানির বিরুদ্ধে এ ধরনের কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কিছু বিষয়ে তাৎক্ষণিক সত্যতাও পাওয়া গেছে। এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা উদ্বিগ্ন। এসব ঘটনা পরিদর্শনে ভুয়া প্রমাণিত হলে দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সীমিত জনবলের কারণে পরিদর্শন ও তদন্ত কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এ দু’টি গ্রুপও ভুয়া কোম্পানি সৃষ্টি করে এলসি খুলেছে এবং কোনো মালপত্র আমদানি না করেই আবার সেই এলসি নিষ্পত্তি দেখিয়ে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তুলে নিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংকে এ ধরনের আরও বহুসংখ্যক ঘটনা ধরা পড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব পরিদর্শনে এসব ভুয়া এলসির ঘটনা চিহ্নিত করতে পারলেও ব্যাংকের সুনাম নষ্ট হওয়ার ভয়ে তা প্রকাশ করছে না ব্যাংকগুলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জরিমানার ভয়ে এমন ভয়ঙ্কর তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককেও সরবরাহ করছে না সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। প্রতারক চক্রটি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির কথা বলে সবচেয়ে বেশি এলসি খুলছে। তৈরি ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে অনিয়ম-দুর্নীতি
পোশাক খাতের বিষয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সব সময় ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করে থাকে। এছাড়া এ খাতের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন তদারক সংস্থা এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকও যাচাই-বাছাইয়ে আগ্রহ দেখায় না। কারণ এতে ব্যবসায়ীরা অযথাই হয়রানির শিকার হতে পারেন বা রপ্তানি খাত বাধাগ্রস্ত হতে পারে এমন মানসিকতা কাজ করে। প্রতারক চক্রটি এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিরাপদে জালিয়াতি করছে বলে জানা গেছে। তবে এলসি নিষ্পত্তি হওয়ার পর ব্যাংকগুলো বুঝতে পারে যে এলসিগুলো ভুয়া। তখন আর কিছুই করার থাকে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গার্মেন্ট, ভোজ্য তেল, অপরিশোধিত চিনি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, কৃষি সরঞ্জামসহ নতুন নতুন খাতে আমদানির বিপরীতে এলসি খুলে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি জাহাজভাঙা শিল্পের নামেও বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিপরীতে ভুয়া এলসি খুলে জালিয়াতি করা হয়েছে। গত বছর এমন শতাধিক প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেশের বৃহৎ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এসব জালিয়াতি করেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগ প্রমাণ পেয়েছে। বৃহৎ তিন-চারটি গ্রুপের কয়েক হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করছে। অধিকতর তদন্তের জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) বিভিন্ন নথি পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি এসব জালিয়াতির সঙ্গে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকও জড়িয়ে পড়ছে। ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই ঘটেছে ভয়াবহ ধরনের জালিয়াতি। স্মরণকালের বৃহৎ জালিয়াতিকারী হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপ ছাড়াও গত বছর এবং চলতি বছরের শুরুতে হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের প্রায় এক ডজন কোম্পানির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়ার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১২ ও ২০১৩ সালে বৃহৎ আকারে এলসি জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ অভিযোগের পর ২০১৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে একই ধরনের বেনামে এলসি খুলে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এলসি জালিয়াতির সঙ্গে নতুন করে জড়িত হচ্ছে নতুন নতুন খাত। এর মধ্যে ভোগ্যপণ্য, খাদ্য ছাড়াও ব্যাক টু ব্যাক এলসির সঙ্গে জড়িত গার্মেন্ট, জাহাজভাঙা শিল্প প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি অখ্যাত তিনটি প্রতিষ্ঠান জালিয়াতি করে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। মার্চ মাসে কয়েকটি ব্যাংকের কাছ থেকেও বেশ ক’টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া অপরিশোধিত চিনি আমদানির নামে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে একটি চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া হলমার্ক, বিসমিল্লাহ ও আরও কয়েকটি অখ্যাত গ্রুপ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার এলসি জালিয়াতি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি ও পরিদর্শন বিভাগ যৌথভাবে এ ঘটনা তদন্ত করে দুদকের কাছে নথি পাঠিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। জড়িত প্রতিষ্ঠান সরকারি-বেসরকারি উভয় ব্যাংকের মাধ্যমেই জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। এর মধ্যে চার রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার এলসি জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে প্রথম সারির কয়েকটি ব্যাংকের নামও রয়েছে ওই তালিকায়। ২০১৩ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি জালিয়াতি রোধে ফরেন এলসি, ফরেন ব্যাক টু ব্যাক এলসি, ইপিজেড এলসি, ব্যাক টু ব্যাক লোকাল এলসি সংক্রান্ত সব ধরনের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাস বোর্ডের মাধ্যমে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে সরবরাহের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু ব্যাংকের শাখাগুলো অনেক সময়ই এলসির সম্পূর্ণ তথ্য না দিয়ে গোপন রাখে। এলসির যাবতীয় তথ্য না দিলে শাস্তির কথা বলা হলেও এখনো কোনো ব্যাংক শাস্তির মুখোমুখি হয়নি। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেয়ার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এছাড়া রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়ও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে সবার আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তিনি বলেন, হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকগুলো একটু নড়েচড়ে বসেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, ব্যাংকের দুর্বল মনিটরিং এর জন্য দায়ী। ফলে ব্যাংককেই এর সমাধানে দক্ষ লোকবল নিয়োগ করে মনিটরিং সেল অধিক জোরদার করতে হবে।
আমদানি-রপ্তানির নামে অর্থ পাচার
দেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন রয়েছে। ব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলে থাকেন যে, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাচার সম্ভব নয় । অথচ চট্টগ্রামে অগ্রণী ব্যাংকের আসাদগঞ্জ শাখা থেকে বিভিন্ন সময়ে আমদানি ও রপ্তানির নামে প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এই শাখার মাধ্যমে রপ্তানি করা বিভিন্ন পণ্যের টাকা দেশে আসেনি। পাশাপাশি আমদানির জন্য বিভিন্ন পণ্যের মূল্য ব্যাংক পরিশোধ করলেও এসব পণ্য দেশে আসেনি। এভাবে আমদানির নামে ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং রপ্তানির নামে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে অদ্যাবধি কোনো উদ্যোগ নেয়নি ব্যাংক। এমনকি আমদানি-রপ্তানি করা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কোনো তাগাদা দেয়া হয়নি। এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া এলটিআরের (লোন এগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্ট বা আমদানির জন্য সহজ শর্তের ঋণ) নামে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং গুদামে পণ্য বন্ধকের নামে প্রতারণা করে আরো ১ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে অগ্রণী ব্যাংকের আসাদগঞ্জ শাখায়। বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদন থেকে পাওয়া গেছে উল্লিখিত এসব তথ্য। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে প্রতিবেদনটি সম্প্রতি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। অডিট অধিদফতরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে থেকে জানা গেছে, অগ্রণী ব্যাংকের আসাদগঞ্জ শাখায় দীর্ঘদিনের পুরনো আমদানির এলসির (লেটার অব ক্রেডিট বা ঋণপত্র) বিপরীতে ১৭টি, স্ট্রান্ড রোড শাখার ১৫টি, রিয়াজ উদ্দিন বাজার শাখার ৭টি এবং ফিরিঙ্গিবাজার শাখার ২টি বিল অব এন্ট্রির কাগজপত্র শাখায় জমা হয়নি। এই ৪১টি এলসি বিলের অনুকূলে ১০ কোটি ৩১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা বিদেশে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বিলের অনুকূলে বিদেশ থেকে কোনো পণ্য দেশে আসেনি। চট্টগ্রামের ২৫টি কোম্পানি ওইসব আমদানির এলসি খুলেছিল। আসাদগঞ্জ শাখায় বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেন হয়। ফলে উল্লিখিত তিনটি শাখার আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত এলসির চূড়ান্ত কাজ আসাদগঞ্জ শাখার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, আমদানি বাবদ ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে গেলেও ৪১টি এলসির মালামাল দেশে পৌঁছার সপক্ষে বিল অব এন্ট্রি ও কাস্টমস সার্টিফাইড ইনভয়েস দীর্ঘদিনেও পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ২৫টি কোম্পানির বিল অব এন্ট্রিগুলো দীর্ঘদিনেও সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ায় ধরে নেয়া যায় দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে গেলেও এর বিনিময়ে পণ্য দেশে পৌঁছেনি বলে মন্তব্য করা হয় প্রতিবেদনে। অডিট প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অগ্রণী ব্যাংকের আসাদগঞ্জ শাখার মাধ্যমে চারটি প্রতিষ্ঠান ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি করলেও এসব পণ্য বিক্রির টাকা দেশে আসেনি। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে সাগরিকা টেক্সটাইল, ম্যানস অ্যাপারেলস, সিটি সুইটার এবং রেহান ইন্টারন্যাশনাল। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, মেয়াদোত্তীর্ণ রপ্তানি বিলের টাকা দীর্ঘদিনেও প্রত্যাবাসিত না হওয়ায় সরকার ২ লাখ ৭২ হাজার ৪০৮ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ১ কোটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ ব্যাপারে আসাদগঞ্জ শাখার ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ফারুকুল আলম বলেন, অডিট আপত্তির পর বিষয়টি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জানানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে যতটুকু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা অডিট বিভাগকে জানানো হয়েছে। এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। অডিট প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে চট্টগ্রামের শওকত ট্রেডিংকে ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৩৫ হাজার ৬৩৬ টাকা এলটিআর দেয়া হয়েছে। এই ঋণের টাকা দিয়ে শওকত ট্রেডিং বিদেশ থেকে পাম কর্নেল অলিন, পাম ফ্যাটি এসিড, টাপিওকা স্টার্চ ও সান্ডু সিট আমদানি করে। আমদানিকৃত পণ্য বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা পরিশোধের কথা। কিন্তু পণ্য বিক্রি করেও ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করা হয়নি। ব্যাংকের পক্ষ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এ বিষয়ে জবাব চাওয়া হলে ব্যাংকের পক্ষ থেকে অডিট অধিদফতরকে বলা হয়, গ্রাহককে ঋণের অর্থ পরিশোধের জন্য পুন:তফসিল করে দেয়া হয়। তবুও তারা টাকা পরিশোধ করেনি। এই গ্রাহকের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। অডিট প্রতিবেদন থেকে আরো জানা গেছে, ইস্তিয়াক ব্রাদার্স, হালিমা এন্টারপ্রাইজ, নীহার এন্টারপ্রাইজ, রিলায়েন্স ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের অনুকূলে ১ কোটি টাকার ঋণ দেয় ব্যাংকের ওই শাখা। ঋণের টাকা ছাড় করার পর ইস্তিয়াক ব্রাদার্সের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ায় ওই টাকা আদায় হয়নি। ঋণের শর্ত ছিল টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে জামানত বিক্রি করে আদায় করা হবে। কিন্তু ব্যাংক থেকে জামানত হিসেবে বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য কত তাও যাচাই করা হয়নি। ফলে ঋণের পরিমাণ এখন সোয়া কোটি টাকার ওপরে চলে গেছে। অডিট বিভাগ দেখতে পায়, দীর্ঘদিন ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারলেও ব্যাংক থেকে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বন্ধকি সম্পত্তির মূল্যও অনেক কম। অডিট বিভাগ থেকে জানতে চাওয়া হলে ব্যাংক বলেছে, ছয় মাসের মধ্যে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে ১ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হবে। ব্যাংকের দুর্বল মনিটরিং এ বিষয়টির জন্যও দায়ী বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন।
যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থায়ন বিশ্বাসেই সর্বনাশ
দেশের অনেক ব্যাংকই ব্যবসায়ীদের বিশ্বাসী ঋণ (এলটিআর) দিয়ে থাকে। আর এতেই সর্বনাশ হয়েছে। চট্টগ্রামের ব্যাংকগুলো বিশ্বাসী ঋণ দিয়ে আটকে গেছে। ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ এই সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভিন্ন খাতে নিয়ে গেছে। কয়েক বছর ধরে ঋণের নামে অর্থ তুলে নেয়ার জন্য ব্যবসায়ীরা এই বিশ্বাসী ঋণকেই (এলটিআর বা লোন অ্যাগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিট) বেছে নিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আমদানিপণ্য বাজারজাত করতে স্বল্প সময় বা ৯০ থেকে ১২০ দিনের জন্য নেয়া বিশ্বাসী ঋণের (এলটিআর) নয় হাজার ৩৫২ কোটি টাকা মেয়াদি ঋণে (পাঁচ বছরের) পরিণত হয়েছে। এই মেয়াদি ঋণের সিংহভাগ এখন খেলাপি। আর সব মিলিয়ে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের ব্যাংকগুলো এই বিশ্বাসী ঋণ দিয়েছে ৪৮ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। এর অধিকাংশ ঋণ গেছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে। সেখানকার অন্তত ২০টি ব্যাংকের জন্য এখন প্রধান সমস্যাই হচ্ছে এই ঋণ ফেরত না পাওয়া। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ না করে দেশ ছেড়েছেন বলে ব্যাংক ও অন্যান্য সূত্রে জানা গেছে। কয়েকটি কোম্পানি ব্যাংক ঋণের অর্থ বিদেশেও পাচার করেছে। অন্তত দু’জন ব্যবসায়ীর সন্ধান পাওয়া যায়, যারা বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। এরা হলেন ইয়াসির গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাহের হোসেন। ব্যাংকগুলোতে তার ৪৮১ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। আরেকজন ব্যবসায়ী হলেন গিয়াসউদ্দিন কুসুম। জাহাজভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত এই ব্যবসায়ীর কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা ৩০০ কোটি টাকার মতো। ব্যাংকগুলো এই ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকার মামলা করেছে। তবে দীর্ঘ ১০ মাস চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতের বিচারক না থাকায় মামলার কার্যক্রম আটকে ছিল। আগস্ট মাসে নতুন বিচারক যোগ দিয়েছেন। তাতেও খুব বেশি অর্থ আদায় করতে পারবে না ব্যাংকগুলো। কারণ অনেক ব্যবসায়ী এসব মামলার বিপরীতে উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করে স্থগিতাদেশ পেয়েছেন।
এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ঋণ ব্যবসায়ীরা নিয়েছিলেন আমদানি করা নিত্যপণ্য বাজারজাত করতে সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য। কিছু ক্ষেত্রে তা ছিল শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির ঋণ যা এক ধাপ উৎপাদন শেষে দেশের বাজারে বিক্রি করার কথা। কিন্তু বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যাংকগুলোও যাচাই-বাছাই বা ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ ছাড়াই এই বিপুল অর্থায়ন করে ফেঁসে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রগুলো বলছে, যে ১০-১৫ জন ব্যবসায়ী এই ঋণের বড় অংশ নিয়েছেন তারা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ও আমদানি পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রক। আবার সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা এই ঋণ পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য পুন:তফসিল করে নিয়েছেন। পাশাপাশি সুদ ও ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এমনকি নতুনভাবে সুদ হার কমানোও হয়েছে। অনেক ঋণ রাইট-অব বা অবলোপনও করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী এলটিআর ঋণ মেয়াদি ঋণে পরিণত হওয়া এবং তার সিংহভাগ খেলাপি হওয়ার এ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন,  বিশেষত চট্টগ্রামের কিছু ব্যবসায়ীর মধ্যে এই ঋণ কেন্দ্রভূত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষমতার বেশি ঋণ নিয়ে নিজেদের ও ব্যাংকের জন্য গলার কাঁটা হয়েছেন। উল্লেখ্য, এলটিআর ঋণের ধরনটি হচ্ছে- আমদানি করা পণ্য দেশে আসার পর ব্যবসায়ীর পক্ষে ব্যাংক বিদেশি ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করতে এই ঋণ সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে আমদানি করা মালামাল ব্যাংকের জিম্মায় থাকে না। ব্যবসায়ীকে বিশ্বাসে নিয়ে পুরো মালামাল তাদের জিম্মায় দিয়ে দেয়া হয়। অথচ দেখা গেছে, নির্দিষ্ট সময় শেষে ব্যবসায়ীরা এই টাকা ব্যাংকে ফেরত দেননি, আবার মালামালও গুদামে নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এলটিআর মেয়াদি ঋণে পরিণত হওয়ার প্রধান কারণ হলো বাজারে জিনিসপত্রের দামের ওঠানামা। সমীক্ষায় ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ মেয়াদি ঋণ সৃষ্টির কারণ মূল্য ওঠানামা, বিনিময় হারের কারণে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ দীর্ঘদিন ধরে পণ্য মজুত করা, ৪ দশমিক ৮ ভাগ ঋণ অন্য খাতে স্থানান্তর এবং বাকি ২২ দশমিক ১ শতাংশ ঋণ অন্যান্য কারণে মেয়াদি ঋণ সৃষ্টি হয়েছে বলে সমীক্ষায় বলা হয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এলটিআর হিসাবে দেয়া ৪৮ হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যাংক খাতে বাণিজ্যিক ঋণের ৩২ দশমিক ৮২ ভাগ। ওই সময় পর্যন্ত নয় হাজার ৩৫২ কোটি টাকা এলটিআর থেকে মেয়াদি ঋণ হয়েছে, যা মোট এলটিআরের ১৯ দশমিক ৩৬ ভাগ। এই অর্থ ব্যাংক খাতের মোট বকেয়া মেয়াদি ঋণের ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ এর জামানত অপর্যাপ্ত, ব্যাংকের গুদামে পণ্য নেই এবং বাজার দরে ওঠা নামা। আবার অসংখ্য ক্ষেত্রে আমদানিকারক বা গ্রাহক তাদের ঋণের টাকা অন্য খাতে নিয়ে গেছে। জমি কিনেছে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছে এবং নতুন ব্যবসায় খাটিয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ব্যাংকের শাখাগুলো প্রধান কার্যালয়ের বেঁধে দেয়া মুনাফা করতে গিয়ে আরেক ব্যাংকের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতা করেছে। তারা গুটিকয়েক বড় ব্যবসায়ী গ্রুপকে ঋণ দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশেই এই এলটিআর খুলেছে। আবার কিছু গ্রাহক তাদের একক গ্রাহক ঋণসীমার বেশি অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে নিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ব্যাংকগুলো অন্য ব্যাংকের ঋণের হিসাব রাখেনি। তাতে গ্রাহক এক ব্যাংক থেকে ঋণ করে আরেক ব্যাংকের ঋণ শোধ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী, বড় আমদানিকারকের বড় অংশই আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে রেখেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ তথ্য প্রতিবেদনে (সিআইবি) খেলাপি বলা হচ্ছে না। ফলে তারা আবার নতুন ঋণ সুবিধা নিতে পারছে। জিনিসপত্রের দাম ওঠানামায় এলটিআরের ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ ঋণ মেয়াদি ঋণে পরিণত হওয়ার তথ্য সরেজমিনে পাওয়া যায়নি। কারণ এতে কিছু অর্থ অন্তত ব্যাংকে ফেরত দেয়ার কথা। আসলে ব্যবসায়ীর গুদামে কোনো পণ্যই ছিল না। এই ঋণ দিয়ে বিপাকে থাকা চট্টগ্রামে জনতা ব্যাংকের সাধারণ বিমা শাখা; সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার কর্মকর্তারাও মনে করেন না যে, মূল্য পতনের কারণে এত বিপুল পরিমাণ এলটিআর মেয়াদি ঋণে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালক ও বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, ওই সময় দেশে পণ্য আসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য পতন হয়েছে, এটা ঠিক আছে। কিন্তু, গুদামে পণ্য নেই, ব্যাংকের টাকাও দেয়নি; ফলে বাজার দরের কারণে এটা হয়েছে মানা যায় না। ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে এটা বলা হলে মেনে নেয়া যেত। তাই মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে কোনো কাজ কিংবা ব্যাংকের বিশ্বাসী লোন দেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করা উচিত বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন।
নীলের দংশন
পাঁচ বছর পর অর্থমন্ত্রী স্বীকার করলেন, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে দলীয় বিবেচনায় লোক নিয়োগ করা ঠিক হয়নি। তাঁর ভাষায়, উই আর টোটালি ফেইলড।
রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০০৯ সালে এক দফা ও পরে ২০১২ সালে আরেক দফায় ৭০ জনকে নিয়োগ দিয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। রূপালী ব্যাংক ছাড়া বাকি সব ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে গত পাঁচ বছরে নিয়োগ দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগ সমর্থিত ‘নীল দল’ এর শিক্ষকদের। চেয়ারম্যানসহ ১৩ জনকে নিয়ে প্রতিটি পর্ষদ গঠিত। ব্যতিক্রম বাদ দিলে চার ব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), বেসিক ব্যাংক এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকে অন্তত সাত থেকে আটজন করে রাজনৈতিক নিয়োগ দেয় সরকার। যাদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে থানা পর্যায়ের বর্তমান ও সাবেক নেতা। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পর্ষদে দলীয় লোক নিয়োগের ফলাফল ও মূল্যায়ন সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যর্থতার কারণেই এ ধরনের নিয়োগ থেকে তিনি সরে আসছেন। অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংকের পর্ষদে এখন সাবেক আমলা বা সাবেক ব্যাংকারদের নিয়োগ দেয়া হবে।
সম্প্রতি অগ্রণী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেছেন আরাস্তু খান, বিডিবিএল ও বিকেবির চেয়ারম্যানের পদ খালি রয়েছে। রূপালী ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের দুই চেয়ারম্যানের মেয়াদ ডিসেম্বরে শূন্য হওয়ার কথা। জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদও শূন্য হওয়ার পর সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজ উদ্দীন আহমেদ চৌধুরীকে (এস এ চৌধুরী) ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের এমডি থাকার সময় এস এ চৌধুরী গ্রাহকের অর্থায়নে হেলিকপ্টারে করে রাজশাহী-নাটোর অঞ্চলে প্রকল্প পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন। তারপরও কেন তাকে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হচ্ছে সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, তখন আমি ভুল করেছিলেন। সোনালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক কোম্পানি হয়ে যাওয়ার পর ব্যাংকগুলোতে সরকার সরাসরি চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে পারে না। চেয়ারম্যান নিয়োগ হবে পর্ষদের মাধ্যমে। তাহলে অর্থ মন্ত্রণালয় কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা পারি। কারণ আমরা যে ব্যাংকের মালিক; এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে। জানা গেছে, নিয়ম না থাকলেও রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়। দীর্ঘদিন থেকে এটা রেওয়াজ হিসেবে চলে আসছে। বিভিন্ন ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য হিসেবে গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সহসম্পাদক নাগিবুল ইসলাম, মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক জান্নাত আরা, কক্সবাজারের আওয়ামী লীগ নেতা সাইমুম সরওয়ার, নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য খোন্দকার জাহাঙ্গীর কবির, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলরাম পোদ্দার, সুভাষ সিংহ রায়, শাহজাদা মহিউদ্দিন, জাকির আহমেদ, বুয়েট ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস সবুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাবেক ভিপি কে এম এন মঞ্জুরুল হককে নিয়োগ দেয়া হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে এ কথা জানা গেছে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য বা পরিচালক নিয়োগের ব্যাপারে সরকারের মনোভাব এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান নিয়োগের ব্যাপারে এবার আর শুধুই রাজনৈতিক বিবেচনা করা হচ্ছে না। তারই অংশ হিসেবে এস এ চৌধুরীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে সাবেক পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়সচিব মিহিরকান্তি মজুমদারকে। তার আগে বহুল আলোচিত-সমালোচিত বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর জায়গায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে বেসিক ব্যাংকেরই সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিকেবির চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদকে।
এদিকে রাষ্ট্র মালিকানাধীন কয়েকটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে তিন জনের মৌখিক পরীক্ষা নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রথমে মৌখিক পরীক্ষা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মজিদ খান। তারপর দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক মুজিব আহমেদ। সবশেষে মৌখিক পরীক্ষা দেন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আমিন উদ্দিন। এ ছাড়া দু’টি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে সদ্য বিদায়ী অর্থসচিব ফজলে কবির এবং সাবেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব (পরিবেশ সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়া) শফিকুর রহমান পাটোয়ারীর নাম রয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম বলেন, সুষ্ঠুভাবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনার জন্য যাকে যোগ্য মনে করা হবে, তিনিই নিয়োগ পাবেন চেয়ারম্যান পদে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ব্যাংকের চেয়ারম্যান সচিব হতে পারেন, শিক্ষকও হতে পারেন। তবে এই দুই পেশার চেয়েও সাবেক ব্যাংকারদের নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে পক্ষপাতী তিনি। ইব্রাহীম খালেদ বলেন, সচিব শুধু হলেই হবে না। যেমন মিহিরকান্তি মজুমদারকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। খুবই ভালো নির্বাচন। কারণ তার হাতেই পুরো কাজটি হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একজন সচিব ছিলেন যার সময়ে ব্যাংকে নিয়োগ নিয়ে প্রচুর অনিয়ম হয়েছে। সরকারের উচিত হবে সতর্কতার সঙ্গে এ ধরনের সচিবদের নিয়োগ দেয়া।
বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাইয়ের সময়ে তারই প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরিতে আবুল বারকাতের ভূমিকা ছিল। তিনি নিজেও এ কথা বলে থাকেন। দুই মেয়াদে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর তার মেয়াদও শেষ হয়েছে গত ৮ সেপ্টেম্বর। শেষ সময়ে এসে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) খাতে ব্যয় নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলে বিতর্ক সৃষ্টি করেন তিনি। প্রায় একই সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার বজলুল হক। পরে তাকে আরও দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত নীল দল থেকে নির্বাচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি। দুই মেয়াদে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর ৪ সেপ্টেম্বর তার মেয়াদ শেষ হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ভাগনিজামাই আহমদ আল কবির রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে প্রথমে তিন বছর ও পরে দুই বছরের জন্য নিয়োগ পান। এর আগে তিনি একটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালনা করতেন। রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান। তার আগে চেয়ারম্যান ছিলেন সোনালী ব্যাংকেরই সাবেক কর্মকর্তা কাজী বাহারুল ইসলাম। কাজী বাহারুল চেয়ারম্যান থাকাকালীনই দেশের ব্যাংক ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ‘হল-মার্ক কেলেঙ্কারি’ হয়েছে। বিডিবিএলের চেয়ারম্যান হিসেবে ২০১২ সালে নিয়োগ পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তি নারায়ণ ঘোষ। এর আগে একই ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন তিনি। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত নীল দলের নেতা। তাহলে লক্ষণীয় যে, দেশের শিক্ষক হয়েও অধিক উচ্চ আকাঙ্খায় ব্যাংকের মতো স্পর্শকাতর রক্ত প্রবাহে আঘাত করেছে। এটি মোটেও কাম্য নয়। তাই হলুদ-নীল যেটাই বলা হোক না কেনো; সততার কোনো বিকল্প নেই।
সমস্যা সমাধানে করণীয়
মানব দেহের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- রক্ত প্রবাহ সচল রাখা। দেহের রক্ত যদি সঠিকভাবে প্রবাহিত না হয়; তাহলে যে কোনো মানুষ হার্ট এ্যাটাক কিংবা ধুঁকে ধুঁকে মারা যান। আমাদের অর্থনীতির রক্ত প্রবাহ ব্যাংকিং খাতও যদি সঠিকভাবে প্রবাহিত না হতে পারে তাহলে অর্থনীতির হার্ট এ্যাটাক অনিবার্য। তাই এই খাতের সব সমস্যা সমাধানে এক কথায় বলা যেতে পারে- স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা তথা সুশাসন নিশ্চিত করা, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, মনিটরিং সেল জোরদার করা, দক্ষ ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন লোকবল নিয়োগ করা, সুদূরপ্রসারী কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করা সর্বোপরি দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়া।
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd