ঢাকা : মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর, ২০১৪ ১৬:৫৫:২৭আপডেট : ১৯ নভেম্বর, ২০১৪ ১৬:৫৭:৫৬
একটি নীতিমালাই দেশীয় মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে
এ কে নাহিদ

 
যে কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন-অগ্রগতির পূর্বশর্ত হচ্ছে উন্নত পরিবহণ তথা ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহ পরিকল্পিত উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করে গতিশীল অর্থনীতি গড়ে তুলছে। কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে সুষ্ঠু পরিবহণ ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে আশার কথা, দেশের পরিবহণ সেক্টর উন্নয়নের ধারাহিকতায় এগিয়ে চলছে । ঘর থেকে বের হলেই এখন দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন আকৃতির ক্ষুদ্র-মাঝরি ও ভারি যানবাহনসহ দু’চাকা বিশিষ্ট যান। এ সকল যানের মধ্যে বেবিটেক্সি, টেম্পু বাস, ট্রেন মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, রিকশা উল্লেখযোগ্য। উল্লেখিত যানবাহনগুলো পরিবহণ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভুমিকা পালন করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়ন অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবও ফেলছে। তাই সরকারের সুষ্ঠু তদারকির সমন্বয়ে পরিবহণ সেক্টরে সঠিক নীতিমালা প্রণয়নের কার্যকর ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা একান্ত প্রয়েজন। লক্ষণীয়, দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পরিবহণ চাহিদা মেটাতে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ও স্বচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের বাহন হিসেবে মোটরসাইকেল-এর ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের মোটরসাইকেলের এ চাহিদার পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে দেশেই তৈরি হচ্ছে মোটরসাইকেল এবং দেশেই গড়ে উঠেছে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি। এক্ষেত্রে ওয়ালটন এবং রানার দীর্ঘদিন ধরে দেশে মোটরসাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। আর এ দু’টো কোম্পানির কল্যাণেই মূলত এ দেশে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। তবে যে কোনো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠার জন্য একটি সঠিক নীতিমালা প্রয়োজন; মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই দেশের মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রির ক্রমবিকাশের জন্যে এখন দীর্ঘমেয়াদি একটি নীতিমালা অতি জরুরি। মোটরসাইকেল একটি শ্রমঘন ইন্ডাস্ট্রি। একটি নীতিমালাই দেশীয় মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে

দেশে মোটর সাইকেল ইন্ডিাস্ট্রি গড়ে তোলা সম্ভব হলে বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্ম-সংস্থানের পথ সৃষ্টি হবে; পাশাপাশি এ ইন্ডাস্ট্রি ঘিরে গড়ে উঠবে ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি। বিশ্বের উন্নত অনেক দেশ মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থার পথ সুগম এবং মোটরসাইকেল রপ্তানির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করে তুলেছে। আশার কথা, আমাদের দেশেও মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। একই সাথে রপ্তানির পথও সুগম হচ্ছে। এখন শুধুই প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও একটি নীতিমালা।
মোটরসাইকেল যাত্রা শুরুর প্রেক্ষাপট
সভ্যতার অনন্য আবিষ্কার চাকা। এই চাকার সাথে কালক্রেমে ইঞ্জিন যুক্ত হয়ে বিভিন্ন ধরনের স্থলযানের বিবর্তন ঘটে। এসব যানবাহনের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত এবং সহজলভ্য মোটরসাইকেল। উন্নয়নশীল বিশ্বে স্বল্প ব্যয়ে বিভিন্ন দূরত্বে যাতায়াতের জন্য উল্লেকযোগ্য হারে মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয়। ক্ষেত্র বিশেষ পণ্য পরিবহনে মোটরসাইকেলের ব্যবহার হয়ে আসছে। মোটরসাইকেল বা মোটরবাইক হলো দু’চাকার ইঞ্জিন চালিত যান। দূরে কোথাও ভ্রমণ, খেলা এবং রেস ইত্যাদি বিভিন্ন কাজের উপর মোটরসাইকেলের নির্মাণশৈলী নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন নকশায় মোটরবাইক তৈরি করা হয়। পৃথিবীর বহু অঞ্চলে এখন পর্যন্ত যান্ত্রিক যে কোনো বাহনের চেয়ে মোটরসাইকেল অধিক সাশ্রয়ী এবং বহুল প্রচলিত যান। এক অনুসন্ধানে জানা যায়, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কোন এক অঙ্গরাজ্যেও এক দল আবিস্কারক ১৯০৫ সালে সর্ব প্রথম রাস্তায় চলাচল উপযোগী যান্ত্রিক দু’চাকার যান আবিষ্কার করেন। কোনো ধরনের বির্তকের উধের্ব না গিয়ে ধরে নেয়া যেতে পারে সেটিই ছিল পৃথিবীর প্রথম মোটরবাইক তৈরির সফল প্রচেষ্টাগুলোর একটি। যদিও আবিষ্কারকগণ তৎকালীন তাদের এ যানটির নাম দিয়েছিল ‘রাইডিং কার’ বা Reif wagen  যা-হোক যদি কেউ বাষ্প চালিত দু’চাকার এ যানটিকে মোটরবাইক বলে ধরে নেন; তাহলে প্রথম মোটরবইক আবিষ্কারের কৃতিত্ব নি:সন্দেহে আমেরিকানদের। উত্তর আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস-এর রকবেরির বাসিন্দা সিলভাস্টার হাওয়ার্ড কুপার- এর নির্মিত এমন একটি যান সর্বপ্রথম খেলা ও সার্কাসে প্রদর্শিত হয়। তার বেশ কয়েক বছর পর মোটরসাইকেল ক্রেতা-সাধারণের ব্যবহারের জন্য বাজারে আসে। মোটরসাইকেলের প্রথম দিককার ঐতিহাসিক দিনগুলোতে বাজারে ছাড়া হয় বাইসাইকেল পরবর্তীতে মোটর সংযোজন-এর উপযোগী নকশা অনুসরণ করে তা বাজারে ছাড়তে থাকে। এরপর ইঞ্জিনের শক্তি বাড়ার সাথে সাথে ও উৎপাদনকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে; ফলে ক্রমশ মোটরসাইকেলের নকশা সাধারণ সাইকেল থেকে অনেক বেশি আলাদা হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের অতীত-বর্তমান
ঠিক কবে প্রথম বাংলাদেশে মোটরসাইকেল আনা হয় সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু না জানা গেলেও বিভিন্ন নথিপত্র থেকে ধারণা করা যায়, ষাট-এর দশকের প্রথমদিকে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের আগমন ঘটে। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে এই যানের ব্যবহারের ব্যাপকতা পরিলক্ষিত হয়। ফলে ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে। এ সময় জাপানি বিভিন্ন ব্রান্ডের মোটরসাইকেল ক্রেতা-সাধারণের ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায়। একটি নীতিমালাই দেশীয় মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে
৯০ পরবর্তীকালে জাপানি এসব মোটরসাইকেলের আকাশ ছোয়া দামের কারণে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে কোরিয়া, চায়না, ইন্ডিয়া’র অপেক্ষাকৃত কম দামি মোটরসাইকেল ভোক্তার চাহিদা পূরণে অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। কম দামি এসব মোটরসাইকেল বিক্রয়োত্তর সেবা ও খুচরা যন্ত্রাংশের সহজ লভ্যতার কারণে এ সময় থেকে মোটরবাইক মধ্যবিত্তের বাহনে পরিণত হয়। ফলে এ দেশে আধুনিক উন্নত মানের মোটরসাইকেল ইন্ডস্ট্রি স্থাপনের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশে মোটরসাইকেল তৈরি হচ্ছে এবং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে।
অর্থনীতিতে মোটরসাইকেলের অবদান
বর্তমানে বাংলাদেশে ২টি মোটরসাইকেল যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, প্রায় ৭০টির মতো আমদানিকারক প্রায় ৮শ’ শো-রুম, প্রায় ৫ হাজার মোটরসাইকেল মেকানিক ওয়ার্কশপ এবং প্রায় ২ হাজার ৮শ’ খুচরা যন্ত্রাংশের দোকান রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ লাখ লোক মোটরসাইকেল ব্যবসার উপর নির্ভরশীল। দেশে মোটরসাইকেল ব্যবসায় বছরে প্রায় ৮শ’ কোটি টাকার বাজার রয়েছে। এ থেকেই অর্থনীতিতে মোটরসাইকেলের অবদান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। দেশে ব্যাপকভাবে মোটরসাইকেল উৎপাদন করা সম্ভব হলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব বহু গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। পরিবহণ সেক্টরের উন্নয়ন মানে দেশ ও জাতির উন্নয়ন। চায়না এবং ভিয়েতনাম মোটরসাইকেলের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা গতিশীল করে তুলেছে। মোটরসাইকেলের নানামুখী ব্যবহার বাংলদেশেও একান্ত জরুরি ও সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সর্বসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে।
মধ্যবিত্তের বাহন মোটরসাইকেল
বর্তমানে মধ্যবিত্তের বাহন বলতে আমরা মোটরসাইকেলকেই বুঝি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে ঠিকই কিন্ত পরিবহণণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা থেকেই গেছে। ফলে দূর-দূরান্তে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। অল্প খরচে, কম সময়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত পৌঁছার জন্যে এ যানটির প্রয়োজন দেখা দেয়। পণ্য পরিবহণেও এর ভুমিকা রয়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ তাদের নিজস্ব যান হিসেবে মোটরসাইকেলকে বেশি প্রাধাণ্য দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে মফস্বল শহর ও গ্রাম-গঞ্জে এ ব্যবহার অনেক বেশি হয়। কম মূল্য এবং চালাচলে সুবিধার জন্যে এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে।
মোটরসাইকেল এবং সবার জন্য পরিবহণ সেবা
বাংলাদেশের মতো ঘন বসতিপূর্ণ দেশের সব জনগণের জন্যে পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা খুব কঠিন কাজ। এক সাথে বেশি লোক বহনে সক্ষম যেমন- মনোরেল, আন্ডারগ্রাউন্ড রেল ইত্যাদির মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পরিবহণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার সমাধানে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। তবে ছোট শহরগুলোতে ব্যক্তিগত যান মোটরসাইকেল দিয়ে কিছুটা হলেও পরিবহণ সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব। শহর কিংবা গ্রামে বিভিন্ন দূরত্বে যাতায়াতে মোটরসাইকেল ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। একটি নীতিমালাই দেশীয় মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে
চায়না, ভিয়েতনাম, কোরিয়ায় এ ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বহু আগে। আমাদের দেশেও তার প্রয়োগ ঘটাতে উদ্যোগ নিতে হবে। আর তখনই সম্ভব হবে সবার জন্যে স্বল্প ব্যয়ে পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা।
স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য মোটরসাইকেল
নিন্ম আয়ের মানুষের আয়ের অধিকাংশ ব্যয় হয় পরিবহণে। এ ধরনের লোকদের জণ্যে নিজস্ব পরিবহণের কথা ভাবা হয়নি এ পর্যন্ত কিস্তিতে মোটর সাইকেল পাওয়া গেলেও উচ্চ সুদের কারণেও কিস্তি পরিশোধ জটিলতা দেখা দেয়ার এ ধরনের সুবিধা মধ্য বিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই স্বল্প আয়ের লোকদের জন্যে সহজ পদ্ধতিতে স্বল্প সুদে কিস্তিতে মোটরসাইকেল ক্রয়ের জন্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বস্তরের লোক যাতে মোটরসাইকেলের উৎপাদন কিংবা আমদানি ক্ষেত্রে ব্যয় হ্রাসের বিষয়টি সরকারের নজরে থাকতে হবে। তাহলেই মোটরসাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং স্বল্প আয়ের লোকসহ সর্বস্তরের লোক মোটরসাইকেল ক্রয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবে।
রেজিস্ট্রেশন এবং ট্যাক্স টোকেন বেষম্য
বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর চাইতে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল রেজিস্টেশন ফি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তাছাড়া ১০ বছরের ট্যাক্স টোকেন এককালীন আদায় করার কারণে ক্রেতার উপর বেশি চাপ পড়ে। রেজিস্ট্রেশন ও ১০ বছরের ট্যাক্স টোকেনের পরিমাণ মোটরসাইকেলের মূল্যের সাথে এককালীন যোগ হওয়ার কারণে ক্রেতা কমে বাজার সংকোচনের মতো ঘটনা ঘটায়। দেশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি মোটরসাইকেলের মূল্যেও ২০ শতাংশ হচ্ছে রেজিস্ট্রেশন খরচ। তার মানে কোনো ক্রেতা যদি ৯০ হাজার টাকা মূল্যে মোটরসাইকেল ক্রয় করেন তার সাথে ১৪ হাজার টাকা রেজিস্টেশন বাবদ যোগ হয় তাহলে মোট দাম ১ লাখ ৪ হাজার টাকা দাঁড়ায়; যা মোটের উপর খুবই বেশি। ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলংকার তুলনায় আমাদের রেজিস্ট্রেশন কস্ট অনেক বেশি। এ কারণে শতকরা ৭০ ভাগ মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন এর আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অন্যান্য দেশে রেজিস্টেশন ফি যেখানে ২ থেকে ৫ শতাংশ; সেখানে বাংলাদেশে এই হার মূল দামের ১৩ থেকে ১৭ শতাংশেরও বেশি। রেজিস্ট্রেশন চার্জ ক্রেতা সাধারণের সাধ্যে থাকলে এবং কেনার সময় ডিলার কর্তৃক রেজিস্ট্রেশন করার ব্যবস্থা করা হলে রেজিস্ট্রেশন করার প্রবণতা রোধসহ বহুগুণে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব হতো।
মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি উন্নয়নের সমস্যা ও সম্ভাবনা
পরিবহণ সেক্টরে মোটরসাইকেল এ দেশের পরিবহন সেক্টরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে। দেশের প্রায় সর্বস্তরের মানুষই এখন মোটরসাইকেল ব্যবহার করছে। অনেকটা সহনশীল মূল্যে কম খরচে এবং কোনো স্থানে দ্রুত পৌঁচ্ছে দিতে এই যানটির বিকল্প নেই। এক পরিসংখ্যাণে দেখা যায়, ২০০৪ সালে প্রায় ৬৬ হাজার, ২০০৫ সালে প্রায় ৮৭ হাজার এবং ২০০৬ সালে এ বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। মোটরসাইকেল বিক্রয় বৃদ্ধির ক্রমধারায় ২০১০ সালে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০১১ সালে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। অর্থাৎ প্রতি বছরই প্রায় ৩০ শতাংশ হারে মোটরসাইকেল বিক্রয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সহজেই অনুমেয় যে, দেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা উত্তরোত্তর বেড়েই চলছে এবং একটি বিশাল বাজার সৃষ্টি হয়েছে। বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এ দেশে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের পথ সৃষ্টি করছে; পাশাপাশি এই ইন্ডাস্ট্রি ঘিরে গড়ে উঠছে ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি। একই সাথে রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আশার কথা, দেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে মোটরসাইকেল উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্যে প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগও করেছে। ওই সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লে¬খযোগ্য হচ্ছে- রানার এবং ওয়ালটন। এ প্রতিষ্ঠান দু’টি দেশের মোটরসাইকেল উৎপাদনের সামগ্রিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদন করার লক্ষ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত ব্যাটারী, টায়ার, প্লাস্টিক ও রাবার সামগ্রী ব্যবহার করছে। মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি বিকাশের সাথে সাথে ব্র্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মোটরসাইকেল আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ইতিবাচক অবদান রেখে চলেছে। মোটরসাইকেল ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহলের ভাষ্যমতে, আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে এবং রপ্তানির মাধ্যমে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদী। একটি পূর্ণাঙ্গ মোটরসাইকেল তৈরিতে যে সমস্ত যন্ত্রাংশ প্রয়োজন তার সবগুলো তৈরি করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে দেশে মোটরসাইকেলের বাজার বৃদ্ধির সাথে সাথে যন্ত্রাংশ তৈরির জন্যে অনেক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছে। মোটরসাইকেল প্রস্তুতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো বৈদেশিক কারিগরি সহায়তায় দেশে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলছে। শ্রমিক সস্তা হওয়ার কারণে এ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে পারলে ভোক্তার কাছে কম দামে মোটরসাইকেল তুলে দেয়া সম্ভব হবে তারা আশাবদী। একটি নীতিমালাই দেশীয় মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে
এছাড়া মোটরসাইকেল কোম্পানি এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড, উত্তরা মোটরস, টিভিএস অটো, রুপসা ট্রেডিং, কর্ণফুলী ইন্ডাস্ট্রিজ, এইচএস এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন কোম্পানি এ দেশে মোটর সাইকেল সংযোজন ও বাজারজাত করছে। বর্তমানে প্রতিবছর দেশে প্রায় ৩ লাখ মোটর সাইকেলের চাহিদা রয়েছে। ভবিষ্যতে এ চাহিদা ৫ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ বর্ধিত চাহিদার সিংহভাগই মেটানো হতো আমদানির মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে মোট চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ ভারত, চায়না প্রায় ৪৪ শতাংশ, পাকিস্থান প্রায় ৫ শতাংশ, জাপানসহ অন্যান্য দেশে থেকে ১ শতাংশ আমদানি করা হতো। আশার কথা, মোটরসাইকেলের এ চাহিদার এখন অনেকাংশই এ দেশের উদ্যোক্তারা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন।
মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি উন্নয়নে করণীয়
১. শহর ও গ্রামে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে অযথা ভয়ভীতির কারণে মোটরসাইকেল ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে; তা দূর করা।
২. রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো এবং রেজিস্ট্রেশনহীন মোটরসাইকেল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি আদায়ের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা।
৩. মোটরসাইকেল আমদানি নিরুৎসাহিত করা।
৪. মোটরসাইকেল বিক্রির সময় বিক্রয় কর্মীর মাধ্যমে ক্রেতার কাছ থেকে ফি আদায় করে ৭ দিনের মধ্যে মোটরসাইকেলের নাম্বার প্রদানের ব্যবস্থা করা।
৫. ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং নির্ভর সারাদেশে মোটরসাইকেল চালানো বিষয়ক ঘোষণা মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করা।
৬. মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠার জন্য একটি সুচিন্তিত একীভূত দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রনয়ণের মাধ্যমে মোটরসাইকেল আমদানি- সংযোজন, উৎপাদন ও ফরোয়ার্ড -ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সহায়ক নীতিমালা তৈরি করা। সঠিক নীতিমালা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশে পূর্ণাঙ্গ মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠুক; এ প্রত্যাশা আমাদের।
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd