ঢাকা : রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • ডেঙ্গু এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে : কাদের          ঈদে হাসপাতালের হেল্প ডেস্ক খোলা রাখার নির্দেশ          নবম ওয়েজ বোর্ডের ওপর হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা           বন্দরসমূহের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর, ২০১৪ ১৬:১২:১৯আপডেট : ২৩ নভেম্বর, ২০১৪ ১৭:৪০:৩৮
দুর্নীতিকে 'না' বলুন : মো. বদিউজ্জামান
টাইমওয়াচ ডেস্ক


যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাবে, তিনি যত বড় প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এই দৃঢ় মনোবল নিয়ে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। হলমার্ক, ডেসটিনি, পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযানের পর ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এমপি ও সাবেক কয়েকজন মন্ত্রীকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে দুদক। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরো থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার দশ বছর পেরোল। ২১ নভেম্বর দুদকের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নানামুখী অভিযান নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন সংস্থার চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান। টাইমওয়াচ পাঠকদের জন্যে এখানে তা উপস্থাপন করা হলো।

প্রশ্ন : প্রচলিত অর্থে মানুষ মনে করে, সরকার যখন যেভাবে চায় দুদক তখন সেভাবেই কাজ করছে। দুদক কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে? কী কী বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন?
মো. বদিউজ্জামান : মানুষের এই ধারণাটি সঠিক নয়। দুদক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দুদক আইন-২০০৪-এ দুদককে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানে সরকারের কোনো প্রকার হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখা হয়নি। আমরাও সরকারের কোনো নির্দেশে কাজ করি না। কোনো বাধার সম্মুখীন হই না। আমাদের কাজে কেউ কোনো হস্তক্ষেপ করছে না। আমরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করছি।
প্রশ্ন : সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান দুদককে নখদন্তহীন ব্যাঘ্র বলেছিলেন। দুদক কি এখনও নখদন্তহীন ব্যাঘ্র?
মো. বদিউজ্জামান : দুদক নখদন্তহীন ব্যাঘ্র এই ধারণাটি পুরোপুরি সমর্থন করি না। দুদক নখদন্তবিশিষ্ট একটি সিংহ বলেই মনে করি। তবে যে সব মামলা আমরা তদন্ত করি সেগুলোর সফল সমাপ্তি ঘটে না অনেক ক্ষেত্রে। এর কারণও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা তথ্য সংগ্রহ করতে পারি না। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে যতটুকু সহায়তা দরকার তা পাওয়া যায় না। তখন মামলার গুরুত্ব, স্পিরিট কমে যায়। তদন্ত শেষে যখন বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয় তখন সাক্ষীদের সময়মতো আদালতে উপস্থিত করা যায় না। সে কারণে মামলাগুলো সফলভাবে শেষ হয় না। সম্ভবত দুদককে আইনিভাবে শক্তিশালী করার চিন্তা থেকে সাবেক চেয়ারম্যান দুদককে নখদন্তহীন ব্যাঘ্র বলেছিলেন। তবে আমরা সে সব সমস্যা দূর করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
প্রশ্ন : অনেক অভিযোগ ফাইলবন্দি অবস্থায় রয়েছে। সেগুলোর ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
মো. বদিউজ্জামান : আমাদের কাছে অনেক অভিযোগই আসে। সেগুলো যাচাই-বাছাই কমিটি দ্বারা পরীক্ষা করে শতকরা ৫-৭ শতাংশ অভিযোগ আমরা অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করি। ওইসব অভিযোগ অনুসন্ধানের পরও মামলা করার মতো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না। এর ফলে অভিযোগগুলো নথিভুক্ত করা হয়। তিনি আরও বলেন, বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরো থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রায় ১০ হাজার মামলা পেয়েছি। আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আগামী মাসের মধ্যে ওইসব মামলার তদন্ত শেষ হবে।
প্রশ্ন : প্রয়োজনীয় জনবল আছে কি?
মো. বদিউজ্জামান : জনবল আছে, তবে আরও দরকার। জনবল বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারের কাছে উত্থাপন করা হবে।
প্রশ্ন : দেশে আগের তুলনায় দুর্নীতি বেড়েছে, নাকি কমেছে_ মন্তব্য করুন।
মো. বদিউজ্জামান : দেশে বিভিন্ন সমস্যা যেমন বেড়েছে, সে অনুসারে দুর্নীতিও বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমরা দুর্নীতির অগ্রযাত্রাকে নস্যাৎ করতে সচেষ্ট রয়েছি। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির মাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধির সঠিক চিত্র দেওয়া সম্ভব না হলেও এতটুকু বলা যায় যে, দুদকের অভিযানের ফলে দুর্নীতিপরায়ণরা ভয়ে আছে। দুদক আগের জায়গায় নেই, ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
প্রশ্ন : দুর্নীতিপরায়ণদের দুদক ছাড় দিচ্ছে বলে নানা মহলে সমালোচনা হচ্ছে। আপনার মন্তব্য কী?
মো. বদিউজ্জামান : এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই। আমরা দুর্নীতিবাজ কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। অনেক সময় অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির লম্বা ফিরিস্তি তুলে ধরে অভিযোগ পেশ করা হয়। অনুসন্ধান শেষে দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া যায় না। যার ফলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারি না। যাতে নিরপরাধ কেউ অভিযুক্ত না হন সেদিকেও আমরা সজাগ থাকি।
প্রশ্ন : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় প্রার্থীদের রহস্যজনক সম্পদ বৃদ্ধির অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন। ছয় জনের অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনজনকেই ছাড় দিলেন। অনুসন্ধান যথাযথ হয়েছে বলে মনে করেন?
মো. বদিউজ্জামান : শুরু করেছিলাম ঠিকই। এ ক্ষেত্রে যাদের বিরুদ্ধে মামলা করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি তাদেরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি, নির্বাচনী হলফনামায় রহস্যজনক সম্পদ বৃদ্ধির তথ্যের যথাযথ অনুসন্ধান হয়েছে।
প্রশ্ন : বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি করতে সরকার দুদককে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আপনার বক্তব্য কী?
মো. বদিউজ্জামান : এটা সঠিক নয় যে, বিরোধী দলকে হয়রানি করার জন্য সরকার দুদককে ব্যবহার করছে। গত প্রায় পাঁচ বছরে দু'একটি ক্ষেত্র ছাড়া বিরোধী দলের কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা রুজু হয়নি। বরং ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এমপি, সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যা এর আগে হয়নি।
প্রশ্ন : স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দুদকের সীমাবদ্ধতা আছে কি?
মো. বদিউজ্জামান : না, আমাদের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। দুদক স্বাধীনভাবেই কাজ করছে। বর্তমান আইনে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন অভিযান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। দুদকের তফসিলভুক্ত মানি লন্ডারিং আইন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যাতে অন্য কোনো সংস্থার কাছে ন্যস্ত করা না হয় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি একান্তভাবে অনুরোধ করি।
প্রশ্ন : দুর্নীতি দমনে সরকারের সদিচ্ছা আছে বলে ফলাও করে বলা হচ্ছে। আপনি কী মনে করেন?
মো. বদিউজ্জামান : যতটুকু বলতে পারি সরকার আমাদের কাজে হস্তক্ষেপ করছে না। তাতে বোঝা যায়, দুর্নীতি দমনে সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা দরকার।
প্রশ্ন : উন্নয়নের প্রধান বাধা দুর্নীতি। সামাজিক ব্যাধিও বলা হচ্ছে। এই ব্যাধি দূর করতে পারছেন কি?
মো. বদিউজ্জামান : দুর্নীতি উন্নয়নের প্রধান বাধা এটা ঠিক। তবে এই ব্যাধি দূর করতে সমাজের সব শ্রেণীপেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ ও আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : শোনা যাচ্ছে বিদেশে পাচার করা বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পেয়েছেন। অর্থ ফেরত আনতে দুদকের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি কী?
মো. বদিউজ্জামান : বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে দুদক চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এসব অনুভূতিপ্রবণ তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। ইতিমধ্যে আমরা বিদেশ থেকে ২১ কোটি ৫৫ হাজার টাকা ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছি। অন্যান্য ক্ষেত্রে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে।
প্রশ্ন : আপনারা যে সময়ে পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের অভিযোগের ফাইনাল রিপোর্ট চূড়ান্ত করেছেন ঠিক সে সময়ে কানাডার আদালতে এর বিচার চলছে। কোন কারণে এফআরটি চূড়ান্ত করেছেন? কানাডার আদালতে দুর্নীতি প্রমাণিত হলে তখন আপনারা কী করবেন?
মো. বদিউজ্জামান : আদালতে আমলযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় আমরা পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্র অভিযোগ মামলার তদন্ত শেষ করেছি। শত চেষ্টা সত্ত্বেও আদালতে অভিযোগপত্র পেশ করার মতো তথ্য পাইনি। বিশ্বব্যাংক ও কানাডার বিচারিক আদালত থেকে এমন কোনো তথ্য পাইনি, যা দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারি। কানাডার আদালতে পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্র মামলায় দুর্নীতি প্রমাণিত হলে তখন আমরা অভিযোগটি পুনরায় পরীক্ষা করে দেখব।
প্রশ্ন : যে প্রতিষ্ঠানের জন্ম দুর্নীতি দমনের জন্য সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এ পর্যায়ে দুদক দুর্নীতি দমনে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে?
মো. বদিউজ্জামান : প্রতিষ্ঠানের কেউ দুর্নীতির সঙ্গে জড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা সচেষ্ট রয়েছি। ইতিমধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন : দুর্নীতির অভিযোগ থেকে পার পেতে অনেকে দুদকের কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করছেন বলে শোনা যায়। আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
মো. বদিউজ্জামান : এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন :দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কী কী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন।
মো. বদিউজ্জামান : দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলার সৎ ও আদর্শবান ব্যক্তিদের নিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের সক্রিয় সহযোগিতায় দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে পাঁচটি জেলাকে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করে নিবিড়ভাবে কাজ করা হচ্ছে। জেলাগুলো হলো_ ময়মনসিংহ, রংপুর, কুমিল্লা, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর। এ সব জেলায় গণশুনানির কাজও শুরু হয়েছে। জনগণ যাতে তাদের অভিযোগগুলো সরাসরি জানাতে পারে তার জন্য দুদক স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সহায়তায় গণশুনানির ব্যবস্থা করছে। ওই পাঁচ জেলায় প্রতিরোধ কার্যক্রম সফল হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলায়ও পাইলট প্রজেক্টের কাজ শুরু করা হবে।
প্রশ্ন : ২১ নভেম্বর দুদকের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে দেশবাসীর প্রতি আপনার আহ্বান কী?
মো. বদিউজ্জামান : নদুদকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আমি দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি, আপনারা সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্নীতি দমনে এগিয়ে আসুন। দুর্নীতিকে 'না' বলুন।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাক্ষাৎকার পাতার আরো খবর

Developed by orangebd