ঢাকা : সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • জাতীয় নির্বাচন ২৩ ডিসেম্বর          নির্বাচনের তারিখ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই : সিইসি          আ.লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার বুধবার থেকে নেবেন প্রধানমন্ত্রী          দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর, ২০১৪ ১৩:০৮:৪৪আপডেট : ০১ ডিসেম্বর, ২০১৪ ১৪:০৪:৫৩
বিজয়ের ৪৩ বছর আমাদের অর্জন
এ কে নাহিদ


অনেক ত্যাগ-তিতীক্ষা ও চড়াই-উৎতড়াই মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের বিজয়। আর এরই ধারবাহিকতায় অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখন্ড ও লাল-সবুজের পতাকা। আমাদের এ পতাকা রক্তে রঞ্জিত। তারপরও এ পতাকা হাতে নিয়ে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। এবার আমাদের বিজয়ের ৪৩ বছর। আমরা এখন স্ব-নির্ভর জাতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্ন দেখছি ২০২১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ ও মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে রয়েছে বেশ কিছু সমস্যা। আমরা আশাবাদী, এ সামান্য কিছু সমস্যা কাটিয়ে উঠে ঐক্যের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলে এই দেশ অবশ্যই এ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। পাশাপাশি এই দেশ স্ব-নির্ভর জাতি হিসেবে মাথা তুলে  দাঁড়াবে এবং মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবার নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করবে। আর এ নিয়েই টাইমওয়াচ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন। 

বিজয়ের ৪৩ বছর কিছু কথা
ডিসেম্বর মাস; আমাদের বিজয় মাস। এবার আমাদের বিজয়ের ৪৩ বছর পূর্ণ হবে। এই বিজয়ের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর সন্তানদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে দেশ ও জাতি। অনেক ত্যাগ-তিতীক্ষা, ধ্বংস ও সংগ্রামের মধ্যদিয়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে দেশ আজ মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীকার আদায়ের দৃঢ় মনোবল নিয়ে পশুশক্তিকে পরাজিত করে ঘোর অন্ধকার-অমানিশা কাটিয়ে বাংলার চিরসবুজ জমিনে রক্তে রাঙানো লাল-সবুজ পতাকার স্বীকৃতি লাভ করে ১৯৭১ সালের আজকের দিন ১৬ ডিসেম্বর। বিজয়ের ৪৩ বছর আমাদের অর্জন
উল্লেখ্য, ১৭৬১ সালের ২৩ জুন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে পলাশীর আম্রকাননে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দু’শ বছরের ব্রিটিশ বেনিয়া শাসনের অবসান হয় ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের মধ্যদিয়ে। স্বাধীন প্রিয় মুক্তিপালন বাঙালি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বিজয় অর্জনে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাঙালি পরাধীনতা থেকে দেশমাতৃকাকে রক্ষার উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র। আক্রমণকারী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নেমেছিল সশস্ত্র যুদ্ধে। একদিনের ঘোষণায় বা কারও হুমকি বা নির্দেশ কিংবা অনুরোধে বাঙালি জাতি জীবন বাজি রেখে মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। ’৪৭-এ অদ্ভুত দ্বিজাতিত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভক্তির পর থেকেই পাকিস্তনি শাসকদের নানা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাঙালির রক্ত সংগ্রামের চেতনার উন্মেষ ঘটতে থাকে। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ভাষার প্রশ্নে যে সংকট তৈরি হবে, এটি উপলব্ধি করেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিন দেশ বিভাগের আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। তখন দৈনিক আজাদ ১২ শ্রাবণ, ১৩৫৪ (১৯৪৭) সংখ্যায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতার নামান্তর হইবে।’ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তার প্রবন্ধ ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও ঢাকা’য় লিখেছেন, ‘বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ড. শহীদুল্লাহ্্ই প্রথম পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলার দাবি উচ্চারণ ও উত্থাপন করেছিলেন।’ ড. শহীদুল্লাহ্ চিন্তাধারার অনুসরণে বলাবাহুল্য, পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরপরই ভাষা-সম্পর্কিত প্রশ্নটি জোরদার হয়ে ওঠে এবং ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন হয়। মাতৃভাষার দাবিতে সেই ’৪৮ সাল থেকে শুরু করে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তদান, সংগ্রাম আন্দোলন, ’৫৪- এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জাতির রায়, ’৫৬ এর সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বীকৃতি আদায়, ’৬২ এর শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ’৬৬ এর ৬ দফার মধ্যদিয়ে বাঙালির মুক্তিসনদ ঘোষণা, ’৬৯ এর ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যূত্থানের মধ্যদিয়ে প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের বিদায়; এবং ’৭০ এ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় প্রভৃতির ধারাবাহিকতায় ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী সংগ্রামী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে মুক্তিপাগল বাঙালির কাঙ্ক্ষিত বিজয়।
বিজয়ের ৪৩ বছর প্রত্যাশা প্রাপ্তি
এবার আমরা বিজয়ের ৪৩ বছর উদযাপন করবো; এটি অবশ্যই আনন্দের বিষয়। মহাকালের বিচারে ৪৩ বছর নেহাত বড় সময় নয়। এটিও সত্য, কোন কোন জাতি এ সময়ের ব্যবধানে এগিয়েছে বহুদূর। আজ আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে-বিজয়ের চার দশকে আমরা কতটা এগিয়েছি, কী ছিল আমাদের লক্ষ্য ও প্রত্যাশা, পূরণ হয়েছে কতটা? কোথায় আমাদের ব্যর্থতা, কী এর কারণ? স্বাধীনতার অন্যতম লক্ষ্য যদি হয় ভৌগোলিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডের অধিকারী হওয়া-তাহলে সেটা অর্জিত হয়েছে। তবে শুধু এতটুকুই ছিল না মানুষের প্রত্যাশা। পরাধীনতার শৃংঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে দেশে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে- এ প্রত্যাশাও ছিল ব্যাপকভাবে। বিজয়ের পর দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেও তা হোঁচট খেয়েছে বারবার, বজায় থাকেনি এর ধারাবাহিকতা। ফলে প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়নি গণতন্ত্র। রাজনীতিতে ঐক্যমতের অভাব ও অসহিষ্ণুতাও এর বড় কারণ। অন্তত জাতীয় ইস্যুগুলোয় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্য থাকা প্রয়োজন তা কোন শাসনামলেই দেখা যায়নি। তাদের মধ্যে দেশের চেয়ে দলের স্বার্থই হয়ে ওঠে মুখ্য বিষয়। একইভাবে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে আগের সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ থমকে যায়। এটি দেশের অগ্রগতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিজয়ের ৪৩ বছর আমাদের অর্জন
পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়া, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বীর বাঙালি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিজয়ের ৪৩ বছরে এসে মানুষের মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা আলোচনার প্রশ্নে বিদ্ধ। আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আমাদের কারো অজানা নয়। গত ৪৩ বছরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে জেনারেল জিয়াউর রহমান, বিচারপতি আবদুস সাত্তার, জেনারেল এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনা করেছেন। কিন্তু এ কথা বলা অতুক্তি হবে না যে, জনগণের প্রত্যাশিত অগ্রগতি আজও অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু সরকার দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেয়ার নিমিত্তে রেশন প্রথা চালু রাখে, দেশ পুনর্গঠনের জন্য বৈদেশিক সাহায্য-সহযোগিতার কথা বিবেচনা করে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন এবং ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। বঙ্গবন্ধু সরকার মাত্র তিন বছর স্থায়ী ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে সপরিবারে প্রাণ হারান স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাস আমাদের এই সাক্ষ্য দেয় যে, ধনী-গরিব বৈষম্য ও ক্ষুধা সমাজকে অস্থির করে তোলে। জন্ম নেয় হিংসা-বিদ্বেষের। মহাত্মা গান্ধী যেমন বলেছেন, ধনী ও ক্ষুধা লাখো জনসাধারণের ভেতর যে পার্থক্য রয়েছে তা যতদিন থাকবে ততদিন অহিংস শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। প্রশ্ন আসে, ধনী-গরিব বৈষম্য দূর হয়েছে কতটুকু? বঙ্গবন্ধু পরবর্তী খোন্দকার মোশতাক, জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানা রকম কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। জনকল্যাণের জন্য বস্তুগত পরিবর্তনের চেয়ে অবস্থাগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের আড়ালে ধর্মভিত্তিক বা মৌলবাদী রাজনীতি করার সুযোগ দিলে প্রগতিশীল রাজনীতি ব্যাহত হলেও তার খাল কাটা কর্মসূচি দেশের কৃষি বিপ্লবে সাফল্য যুক্ত করেছিল। ১৯৮১ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান নিহত হলে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে জিয়াউর রহমান সরকারের দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের জেলে ঢুকানো এবং বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতেই ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ৯ বছর টিকেছিলেন জেনারেল এরশাদ। এরশাদের শাসনামলে লুটপাটের নানা অভিযোগ উত্থাপিত হলেও এ সময় বৈদেশিক সাহায্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। খালেদা জিয়া সরকারের আমলে (১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬) নারী শিক্ষা ও নারীর কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা যোগ হয়। এসময় পোশাক শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। তবে তার সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অয়িনম, দুর্নীতি, উন্নয়নমূলক কর্মকা- বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্র প্রকাশ করেছে। শেখ হাসিনার সরকার (১৯৯৬-২০০১) একটি বাড়ি একটি খামার, গুচ্ছগ্রাম প্রতিষ্ঠা, কৃষিতে ভর্তুকি, ছাত্রী উপবৃত্তি সম্প্রসারণ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, ভারতের সঙ্গে পানি চুক্তিতে ন্যায্য হিস্যা আদায়, পাহাড়ি বাঙালি শান্তি চুক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। তার সরকারের আমলকে অনেকেই সন্ত্রাসী তৎপরতার আমল বলে অভিহিত করে সেনা সমর্থিত ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার (২০০৭-০৮) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধ্বংসে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। দ্বিতীয় মেয়াদে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সংকল্প ব্যক্ত করে ২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার কথা জানাচ্ছে। বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার বয়ষ্ক ভাতা বৃদ্ধি, স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, শিল্প-কারখানা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নতুন নতুন বিদ্যুৎ প্লান্ট তৈরি করার মধ্যদিয়ে সমাজ ও ব্যক্তির জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা করছে।বিজয়ের ৪৩ বছর আমাদের অর্জন
বিজয়ের ৪৩ বছর আমাদের অর্জন
সামগ্রিকভাবে ৪৩ বছরের বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করতে গেলে বিগত সরকারগুলোর কর্মকা- পর্যালোচনায় বলা যায়, সাফল্যের প্রাপ্তি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। একটি রাষ্ট্র পরিবর্তনের জন্য আমরা লক্ষ্য করেছি ২৫ বছর যথেষ্ট। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম এখানে উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে। সাম্প্রতিককালে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি সন্তোষজনক নয়। সত্তরের দশকে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা বা স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু আশির দশক থেকে উদ্বেগজনক হারে কৃষি জমি কমে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদনে ঋণাত্মক অবস্থা তৈরি হয়েছে। আবাসন শিল্প ও কল-কারখানার প্রসার এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক ফসল উৎপাদন করা সত্ত্বেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আসেনি। বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি নির্ভর হওয়ায় মাঝে মধ্যেই খাদ্যদ্রব্য সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলোর শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ায় শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শিক্ষার হার যেখানে ২৫ শতাংশের নিচে ছিল, সেখানে বর্তমান শিক্ষার হার ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। আমরা মনে করি, এ সংখ্যা আরও বেড়ে ৯০ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল।
বিজয়ের ৪৩ বছরে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে বলা যায়, আমাদের নারীরা আজ ঘর থেকে বের হয়ে কর্মমুখী হয়েছেন। বিজয়ের ৪৩ বছর অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে না ওঠা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক বলতে হয়। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা গড়ে ওঠেনি। আবুল ফজল বলেছেন, সভ্যতা আর গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত পরমতসহিষ্ণুতা। তবে আশার কথা, স্বাধীনতা যুদ্ধের ধ্বংস্তুপ থেকে বাংলাদেশ আজ অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে । শিশু ও মাতৃ-মৃত্যুর হার যেমন কমেছে তেমনি গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী শিক্ষা, কর্মজীবী ও স্ব-নির্ভর নারী বেড়েছে। নারী এখন চার দেয়ালে বন্দি নেই। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও যথেষ্ট উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বিরাজমান। পাশাপাশি তথ্য-প্রযুক্তিতে দেশ অনেক অগ্রসর হয়েছে। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। কৃষিভিত্তিক এই দেশে আধুনিক নগরভিত্তিক কৃষি শিল্প এবং বাণিজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পোন্নয়নের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। বেসরকারি খাতে অসংখ্য শিল্পোদ্যোক্তার সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক খাত বিশেষ করে ব্যাংক-বীমাসহ অনেক কিছুতেই উন্নয়নের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আল্লাহ্তায়ালা প্রদত্ত অনেক প্রাকৃতিক সম্পদও আমাদের রয়েছে; যা অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় যে সম্পদ এই দেশে রয়েছে; তাহলো প্রায় ১৬ কোটির বিশাল জনগোষ্ঠী। এ জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করে দেশের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে দেয়া সম্ভব। তৈরি পোশাক শিল্প এ দেশের নারীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখছে। প্রবাসী আয়ও আমাদের জন্যে আর্শিবাদ স্বরূপ। এই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেও প্রবৃদ্ধিতে তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।বিজয়ের ৪৩ বছর আমাদের অর্জন
গার্মেন্ট শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থান করেছে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাও বেড়েছে। বিদেশের শ্রম বাজারেও রয়েছে বাংলাদেশের অসংখ্য শ্রমশক্তি এবং তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতির চাকা রাখছে গতিশীল। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উত্তরোত্তর বিকাশ ঘটছে। চায়নার মতো বাংলাদেশের ধোরাইখাল-জিনজিরার নকল পণ্য উৎপাদন অর্থনীতিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কৃষিভিত্তিক শিল্পও দ্রুত গতিতে বিকশিত হয়েছে। এছাড়া শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক, লেদার, টেক্সটাইল, পাট, বস্ত্র, ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারিং, লবণ, রিয়েল এস্টেট, মোটরসাইকেল, জাহাজ নির্মাণ, পর্যটনসহ বিভিন্ন শিল্প এই দেশে গড়ে উঠেছে। এ শিল্প দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। স্বাধীনতা পরবর্তী এ দেশে শুধু কৃষিনির্ভর অর্থনীতি পরিচালিত হয়েছে। বর্তমানে কৃষি তথা গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি বৃহৎ শিল্পও গড়ে উঠেছে; যা জাতীয় অর্থনীতির চাকাকে সক্রিয় রাখছে। বর্তমানে দেশে তথ্য-প্রযুক্তিরও জয়-জয়কার। দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ্যণীয়, দেশের উন্নয়নের অনেক নীতি-কৌশল ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। এ সংস্কৃতি থেকে সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সামগ্রিক সম্ভাবনাকে দলীয় কিংবা ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে ঐক্যের মাধ্যমে কাজ করলে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এ দেশ অবশ্যই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নত হয়ে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। বলা বাহুল্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের কিছু অগ্রগতি নিশ্চয়ই হয়েছে; তবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন পূরণ করতে আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার সংগ্রামে দল-মত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবে; এটিই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd