ঢাকা : বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • ডিএসসিসির ৩,৬৩১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা          রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর          সংলাপের জন্য ভারতকে ৫ শর্ত দিল পাকিস্তান          এরশাদের শূন্য আসনে ভোট ৫ অক্টোবর          বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই : হাছান মাহমুদ
printer
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি, ২০১৫ ১২:৫৫:৩৭
যেতে চাই অনেক দূর : প্রীতি চক্রবর্তী


 

রাজধানীর মহাখালীতে আয়েশা মেমোরিয়াল স্পেশালাইজ্ড হসপিটাল (প্রা.) লিমিটেড-এ ১ জানুয়ারি টাইমওয়াচ টিম এবারের প্রচ্ছদ সাক্ষাৎকার গ্রহণের লক্ষ্যে হাজির হন। সেবা খাতে নিয়োজিত মহীয়সী নারী প্রীতি চক্রবর্তী’র নিজস্ব কার্যালয় এই হাসপাতালেই। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে। সন্ধ্যায় হাস্যোজ্জ্বল মহীয়সী এই নারী টাইমওয়াচ টিমের প্রথম প্রশ্নের জবাবেই বললেন, যেতে চাই অনেক দূর... এরপর যা বলেছেন; এখানে তা উপস্থাপন করা হলো।
টাইমওয়াচ : প্রতিটি মানুষের উপরে উঠে আসার পেছনে কোনো না কোনো সিঁড়ি থাকে। আজকের এই অবস্থানে উঠে আসার পেছনে আপনার সবচেয়ে কোন বিষয়টি মনে পড়ে?
প্রীতি চক্রবর্তী : আমি মনে করি, প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব উদ্যোগ থাকতে হয়। মানুষটি কোথায় যেতে চায়। কোথায় তার সার্থকতা। আর এ কারণে প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব উদ্যোগ থাকে। এই উদ্যোগ তৈরি হওয়ার পেছনে প্রতিটি মানুষের জন্য তার পরিবারের বিশেষ করে তার বাবা-মায়ের কিংবা পরিবারের অন্য অভিভাবকদের বড় ভূমিকা থাকে। আমি কোথায় যেতে চাই- এরকম একটি স্বপ্ন আমার পরিবারই আমার মধ্যে অবচেতনভাবে তৈরি করে। আর পরিবারই আমাকে সেভাবে তৈরি করেছে। আমার সাফল্যের পেছনে আমার বাবা-মা, ঠাকুরমা-দাদামনির বিশাল উদ্যোগ ছিল। স্বপ্ন ছিল- তাঁদের মেয়ে এই আমি একদিন অনেক পড়াশুনা করে সুশিক্ষিত হবো, সমাজের জন্য কিছু একটা করবো। আর আমি তাঁদের সেই স্বপ্নকে ধারণ করেছি এই পর্যন্ত। তবে আমি যেখানে যেতে চাই- এখনও তা অনেক দূর। অনেক দূরে আমাকে যেতে হবে। এজন্যে অনেক পথ আমাকে হাঁটতে হবে। বলা যায়, জীবনটা মাত্র শুরু।
টাইমওয়াচ : কী স্বপ্ন আপনি দেখেন, কতদূর যেতে চান?
প্রীতি চক্রবর্তী : স্বপ্ন আমার ছোট বেলা থেকে ছিল, আমি এমন কিছু হতে চাই যা আমাকে নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত করবে। এক সময় আমি শুধুমাত্র সমাজ নিয়ে ভাবতাম, সমাজের জন্য কিছু একটা করবো যা মানুষের উপকারে আসবে। কিন্তু এটা কিভাবে হবে সেই পথ সে সময়ে ততটা মসৃণ ছিল না। ছিল না সুস্পষ্ট। এখন আমি শুধু সমাজ নয়, দেশের জন্যও যেতে চাই অনেক দূর : প্রীতি চক্রবর্তী
কিছু একটা করতে চাই। আমি হেলথকেয়ার নিয়ে কাজ করি। এই হেলথ সেক্টরে কাজ করে আমি সেই জায়গাটাতে যেতে চাই, যেখানে একদিন বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে না গিয়ে বাংলাদেশ থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবেন। এটা আমার বড় স্বপ্ন। Healthier Healthcare- ছোট্ট একটি স্বপ্ন কিন্তু এর অর্থ বিশাল বড়। বর্তমানে বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা খাত নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক আছে। এসব সমাধান করার জন্য কাজ প্রত্যেককে করতে হবে। কিছুদিন আগে কয়েকজন সুধী লোকের সাথে আলোচনার সুযোগ হয়েছিল। ওই সময় বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত নিয়ে নানা কথা হয়। একটি প্রশ্ন উঠে আসে যে, বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত কী করছে? আসলে কী বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্য সেবায় কোনো অবদান নেই? ভেবে দেখুন তো- বেসরকারি খাতের ভূমিকা ছাড়া স্বাস্থ্য সেবা খাত ১২ বছরে বর্তমানে এই অবস্থানে কী আসতে পারতো ? জানি এই খাতে অনেক Communication Gap আছে। অনেক ভুল বোঝা-বুঝি আছে। কিছু খারাপ লোকজনও আছে। কিছু খারাপ প্র্যাকটিস আছে। তবে এটা সামান্য। আর এ ধরনের নেগেটিভ বিষয় সব সেক্টরেই আছে। অন্ন, বস্ত্রের পরেই চিকিৎসার স্থান। ব্যক্তি যদি সুস্থ না থাকে তাহলে সে দেশকে কিছুই দিতে পারবে না। উল্টো দেশের কাছ থেকে তাকে নিতে হবে। মানুষের স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য অনেক কাজ করার বিষয় রয়েছে। আমি খুব সাধারণ স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশের জনগণ একদিন চমৎকার সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী হবে। স্বাস্থ্য নিয়ে বাঁচবে, দীর্ঘায়ু হবে। আর  প্রয়োজনে মানুষ ঘরে বসে সুচিকিৎসা পাবেন।
টাইমওয়াচ : আপনার বক্তব্যে স্বাস্থ্য বিষয়ে সমস্যার কিছু পূর্বাভাস উঠে এসেছে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা প্রভৃতির মধ্যে কোন সেক্টরটি দিয়ে এ দেশের ডেভেলপমেন্ট জোরালোভাবে আনা যায়। এ ক্ষেত্রে আপনার সংশ্লিষ্ট সেক্টরে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে?
প্রীতি চক্রবর্তী : দুটো জিনিস প্রথমে দরকার। একটা হচ্ছে, শিক্ষা। আরেকটি হচ্ছে- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। শিক্ষা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যদি একটা দেশে থাকে এবং বেসরকারি খাত কাজ করার সুযোগ পায় তাহলে সেই দেশ এগিয়ে যেতে বাধ্য এবং এগিয়ে যাবেই। কোনোভাবেই ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। তবে এই দু’টো শব্দ খুব সহজ- কিন্তু কাজ করা খুবই কঠিন। স্বাস্থ্য খাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সরকারের পজিটিভ মনোভাব একান্ত প্রয়োজন। যেমন- বাংলাদেশে পোশাক নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে। বর্তমানে সরকার ৪টি সেক্টর নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছে। কিন্তু সেইভাবে স্বাস্থ্য খাত উঠে আসেনি। সরকারি খাতে বেশ কিছু অর্জন রয়েছে। এজন্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য খাতে বেশ কয়েকটি পুরস্কার লাভ করেছেন। কিন্তু স্পেশাল কেয়ারগুলোর ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অবদান খুব বেশি। অতীতে আমরা ‘আইসিইউ‘ বললে খুব ভয় পেতাম, ভাবতাম রোগী মৃত্যুর মুখোমুখি পৌঁছে গেছে। কিন্তু এই হাসপাতালে কাজ করে আমার অভিজ্ঞতা বলে যে, আমাদের হাসপাতালে আই সি ইউ থেকে শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশি লোক সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে যায়। যা ইতিপূর্বে এই দেশে সম্ভব হয়ে উঠতো না। যেতে চাই অনেক দূর : প্রীতি চক্রবর্তী
সব সেক্টরে বাধা বা সমস্যা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য খাতে একটু বেশি রয়েছে। এই খাতে ৪টি জিনিস দরকার বলে আমি মনে করি। যেমন ১. সচেতনতা। সরকারের নীতি নির্ধারকসহ দেশের জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা খাতের প্রতি Positive Attitude থাকতে হবে। ২. নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে আরও মজবুত এবং তাদের পরিধি আরও বিস্তৃত করা। ৩. স্বাস্থ্যখাতে সম্পৃক্ত সবার মানসিকতার পরিবর্তন। ৪. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। দেশের বাইরে থেকে চিকিৎসা করে আমরা আত্ম অহমিকা করি; এরও পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে কিছু চিকিৎসা বাংলাদেশে হয়ই না। এজন্য যথার্থ স্থান থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে। বাংলাদেশে সুচিকিৎসা না পেলে প্রয়োজনে দেশের বাইরে চিকিৎসা করাতে যেতে হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে উন্নত করতে হবে। আর এজন্য সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আস্থা কিভাবে নষ্ট হয় শুনুন। যেমন- আমার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন মহিলার সন্তান জন্মদানের পর অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলো ঢাকার কোনো বড় হাসপাতালে আসবে। আসার পথে রাস্তায় রুম ভাড়া করে ছোট ছোট হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। আর কিছু দালাল তৈরি হয়েছে। সেইসাথে বিভিন্ন নামে কিছু অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস তৈরি হয়েছে। ঢাকায় আসার পথে ড্রাইভাররা ওই রোগীকে কনভিন্সড করে ওইসব অখ্যাত হাসপাতালে ভর্তি করায়। এতে তারা সঠিক চিকিৎসা পায় না। কখনো ওই খানেই রোগী মারা যায়; অথবা সামান্য কিছু জীবনের অংশ নিয়ে বড় হাসপাতালগুলোতে ওঠে। তখন ওই রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়। তারপরও কখনো বাঁচে আবার কখনো বাঁচে না। আল্টিমেটলি ব্লেমটা কোথায় যায়? তখন রোগীর মাথায় আসে সব হাসপাতাল এবং সব ডাক্তাররাই কসাই। এক্ষেত্রে যদি সরাসরি সে আয়েশা মেমোরিয়াল বা অন্য কোনো ভাল মানের হাসপাতালে আসতো তাহলে তাঁর ভোগান্তিও কম হতো এবং বিভিন্ন হাসপাতালে টাকা খরচ না হয়ে একটি ভালো হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে কম টাকা ব্যয় হতো। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় তার জটিলতা কম ছিল। জরিপে এসেছে, চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য প্রতি বছর ২.৪ শতাংশ লোক গরীব হয়। এতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উপর মানুষের আস্থা কমে যায়।
টাইমওয়াচ : আমাদের দেশে প্রায় লোকে বলে থাকেন, হাসপাতালগুলোতে সার্ভিস চার্জ বেশি। ডাক্তারদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বেশি। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য আপনার পরামর্শ কী?যেতে চাই অনেক দূর : প্রীতি চক্রবর্তী
প্রীতি চক্রবর্তী : আমি আগেই বলেছি, এটা ওভার নাইট সমাধান হবে না। এটা এক দিনে, এক মাসে বা এক বছরে হবে না। কিন্তু এটা আমাদেরকে শুরু করতে হবে। শুরু করলে এখন থেকে ১০ বছর পর শিক্ষা বাড়বে, রোগী এবং এ্যাটেনডেন্টদের সচেতনতা বাড়বে। রেগুলেটরি বডির নিয়ন্ত্রণের পরিধি আরো বাড়বে। ছোট ছোট প্রতারণামূলক ক্লিনিকগুলো বন্ধ করতে হবে। দালাল শ্রেণীর লোকদের নির্মূল করতে হবে। সাধারণ লোকদের শিক্ষা বাড়বে, দালাল বা এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারদের কথায় কনভিন্সড হবে না।  হাসপাতাল স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার পূর্বে অবশ্যই দেখে নেওয়া উচিত তাঁদের নিজস্ব এ্যাম্বুলেন্স আছে কিনা।  নিজস্ব এ্যাম্বুলেন্স না থাকলে ঐসব হাসপাতাল স্থাপনের লাইসেন্স দেওয়া উচিত নয়।
টাইমওয়াচ : আপনি দীর্ঘদিন যাবৎ স্বাস্থ্য সেক্টরের সাথে জড়িত। আমাদের দেশে ১৬ কোটির বেশি লোক বসবাস করছে। এক্ষেত্রে সকলের জন্য  স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার  লক্ষে সরকারি-বেসরকারি সেবা কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে। এগুলোকে কী আপনি পর্যাপ্ত বলে মনে করছেন?
প্রীতি চক্রবর্তী : আমি ১০ বছর যাবৎ স্বাস্থ্য খাতে জড়িত রয়েছি। দেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী আমাদের পর্যাপ্ত হাসপাতাল নেই। এক্ষেত্রে সরকারের আরো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য ব্যক্তি খাতকে উৎসাহিত করতে হবে।  যেভাবে দেশের পোশাক খাতকে উৎসাহিত করা হয়েছে, আইটি সেক্টরকে উৎসাহিত করা হয়েছে, লেদার খাত নিয়ে নানা পরিকল্পনা করা হয়েছে- তেমনিভাবে স্বাস্থ্য খাতের ব্যক্তি খাতকে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করতে হবে। দুঃখের বিষয়, স্বাস্থ্য খাতকে কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনা হয় না। হাসপাতাল একটি শিল্প। অগ্রাধিকার খাত প্রাপ্ত শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু আমরা যে বিলগুলো দিই সেগুলো দিতে হয় কমার্শিয়াল রেটে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেটে নয়। আমি এটার জন্য কাজ করছি। তবে এখনও কোনো সুরাহা করতে পারিনি। স্বাস্থ্য খাতের বিল কেন আমাদের কমার্শিয়াল রেটে দিতে হয়। স্বাস্থ্য খাত একটি ইন্ডাস্ট্রি। আমি ডমেস্টিক রেট চাই না। আমি কোনো বিল মওকুফ চাই না। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেটে হাসপাতালের বিল দিতে চাই। হেলথ সেক্টরকে বেসরকারি খাত হিসেবে কোনো সুবিধা দেওয়া হয় না। এই খাতে ঋণ ফেরত দেওয়ার জন্য ১ পারসেন্টও সুদ কম নেওয়া হয় না।
টাইমওয়াচ : অনেকেই অভিযোগ করেন, আপনাদের মতো হাসপাতালে গেলে সেরকম সুবিধা পাওয়া যায় না। খরচ বেশি। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
প্রীতি চক্রবর্তী : ধরুন, বিদেশে একটি হাসপাতালে একটি পদে চাকরি করলে ৫০ হাজার  টাকা বেতন দেওয়া হয়। আর বাংলাদেশে সেই একই পোস্টে ১০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। ৫০ হাজার টাকা বেতন  নিলে সেই ওয়ার্কার অনেক মোটিভেটেড হয়ে কাজ করবে। কিন্তু ১০ হাজার টাকা বেতনে সেই মোটিভেশন আসবে না। তাহলে কেন বাংলাদেশ আর বিদেশের মধ্যে বেতন বৈষম্য। কারণ রোগীর কাছ থেকে ভাল সার্ভিস দেওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা চাইলে রোগী তা দিতে চাইবে না। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তারা ২ লাখ দিয়ে আসবে; একটা প্রশ্নও করবে না। এ বিষয়গুলো অবশ্যই ভাববার।
টাইমওয়াচ : এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ; সবকিছুর সাথে আমাদের রাজনৈতিক সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়। এদেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আপনি কী মনে করেন বর্তমানে ব্যবসাবান্ধব রাজনীতি রয়েছে?যেতে চাই অনেক দূর : প্রীতি চক্রবর্তী
প্রীতি চক্রবর্তী : যেহেতু হাসপাতাল সেক্টর একটি সেবা সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান, ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতায়ও সমন্বয় করে কাজ করতে হয়। আমি বলবো না যে, আমি শুধুমাত্র সমাজসেবা করার জন্য এখানে এসেছি তবে সমাজ সেবা প্রায়োগিকভাবেই হয়ে যায়। আমি মুখে বলি না সমাজ সেবা; কিন্তু করার সময় ঠিকই করি। আমাদের হাসপাতাল থেকে কখনও কোনো রোগীকে ফেরত দেওয়া হয় না। রোগীর কোনো আইডেন্টি না থাকলেও তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। ব্যবসাবান্ধব রাজনীতি কি-না; বিষয়টি  অনেকটা আপেক্ষিক। যারা রাজনীতি করেন তারাও মানুষ, যারা ব্যবসা করেন তারাও মানুষ। আমরা সবাই মানুষ। ফলে প্রত্যেকেরই চেষ্টা থাকতে হবে, প্রত্যেকেরই উদ্যোগ থাকতে হবে কিভাবে আপনি আমার সেক্টরের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। আপনারও সে উদ্যোগ থাকতে হবে কিভাবে আপনার সেক্টরের প্রতি আমাকে সহানুভূতিশীল করবেন। উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের চর্চা বলেন আর যাই বলেন না কেন- এটা আসতে সময় লাগে এবং লাগবে। সবাই বলে, আমাদের দেশে অনেক দুর্নীতি হয়। মূলত দুর্নীতি হয় না কোন দেশে? ছোটো দেশে ছোটো দুর্নীতি আর বড় দেশে বড় দুর্নীতি। আমি বলবো, আমাদের দেশ তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমার ইউএন মিশনে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানের বন্ধু-বান্ধবদের আমি প্রশ্ন করেছিলাম, তোমাদের কী এমন আছে যা আমাদের নেই। ওরা বলেছে, ওদের দেশে একেবারে আপ লেভেল ছাড়া অন্য লেভেলগুলিতে কোনো দুর্নীতি নেই। প্রত্যেকেই যার যার জায়গায় নিয়ম মেনে কাজ করে। ফলে ওদের দেশে উন্নয়ন অনেক দ্রুত গতিতে চলে এসেছে। এটা ওদের একদিনে হয়নি। নিশ্চয়ই আমরাও একদিন সেই জায়গাটায় পৌঁছাবো। আমিও আশা এবং বিশ্বাস করি, বাংলাদেশেও একদিন গণতান্ত্রিক রাজনীতি আসবে। খুব চমৎকার রাজনৈতিক চর্চা হবে। রাজনীতি ছাড়া দেশ চলবে না। দেশের  রাজনীতি হবে দেশের কল্যাণের জন্য।
টাইমওয়াচ : আপনি শুরুতেই বড় স্বপ্নের কথা বলেছেন। এই পর্যায়ে এসে আপনার কার কথা বেশি মনে পড়ছে?
প্রীতি চক্রবর্তী : আমার বাবা আমাকে নিয়ে অনেক বেশি স্বপ্ন দেখতেন আর বলতেন- আমি ছোটো-খাটো কিছু করার জন্য তোমাকে তৈরি করতে চাই না। আমার জন্ম ১৯৬২ সালে। আমাদের পরিবারে ভাইয়ের চেয়ে বোনের সংখ্যা বেশি ছিল। এটা এখন থেকে ৫২-৫৩ বছর আগের কথা। আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন। আমদের বাড়িতে নিয়ম ছিল যে, আমরা বাবা-মা-চাচাদের সাথে বাইরে গিয়ে থাকতে পারবো না। ম্যাট্রিক পরীক্ষা পর্যন্ত আমাদের ঠাকুর মা, দাদামনির সাথে থাকতে হবে। এরপর কলেজে পড়ার সময়ে বাবা-মায়ের সাথে যেতে পারবো। আমাদের এলাকা ওই সময়ে অনেক উন্নত ছিল। আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সরাইল এ। ওই সময়ে আমার ঠাকুর মা বলতেন, স্বপ্ন দেখতে শেখো, স্বপ্ন না দেখলে সাফল্য আসবে না। আমার ঠাকুর মা মাত্র মাইনর পাস ছিলেন। তিনি প্রাইমারি স্কুলের টিচার ছিলেন। ওই সময়ে এটা বিশাল কিছু। আমাদের অর্থ প্রাচুর্য কিছু ছিল না। ছিল শুধু বাড়িভর্তি পড়াশুনা। একটা বিষয় আমার খুব অবাক লাগে। আমার ঠাকুর মা বলতেন- আমার নাতনী এমন কিছু করবে, এমনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে, সবাই তাকে শ্রদ্ধা করবে। আমি ভাবি, কিভাবে তিনি ওই সময়ে এরকম একটা স্বপ্ন আমার মনের মধ্যে এঁকে দিয়েছেন। আমরা তখন স্কুলে ফার্স্ট প্রাইজ হিসেবে কলম পেতাম। আমার দাদামনি বলতেন, এই কলমটার দাম আমার কাছে অনেক বেশি। এভাবে একজন মানুষকে তার পরিবার থেকে তৈরি করে দেওয়ার বিষয় থাকে। পরিবারের মানুষেরও ভূমিকা থাকে।
টাইমওয়াচ : আপনার জীবনের প্রিয় ব্যক্তিত্ব?
প্রীতি চক্রবর্তী : আমি এত সাধারণ যে, একজনকে মডেল অর্থাৎ একজনের সব গুণাবলী অনুসরণ করা প্রায় অসম্ভব। এজন্য দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তির কতগুলো গুণাবলীকে অনুসরণ করে বাস্তবতার সাথে সমন্বয় করে এগিয়ে যাই। এজন্য আমি নির্দিষ্টভাবে কারো নাম বলতে পারছি না। আমার চোখের সামনে অনেক মডেল আছেন যাদেরকে আমি খুব ফিল করি। যেমন- মাদার তেরেসার সব গুণাবলী আমার ফলো করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাঁর স্বাস্থ্য সেবার বিষয়টি আমাকে খুবই মুগ্ধ করেছে। আমার মা এবং শাশুড়ির কিছু গুণাবলী আছেযেতে চাই অনেক দূর : প্রীতি চক্রবর্তী
যা আমার কাছে মনে হয়েছে ওইসব গুণাবলী যদি আমার থাকতো। আমি খুব বড় কিছু আশা করি না। খুব ছোটো ছোটো বিষয় আমাকে সামনের দিকে ধাবিত করে। প্রিয় ব্যক্তির কথা বলতে গেলে, প্রিয় ব্যক্তি হিসেবে শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় স্যামসন এইচ চৌধুরী’র নাম চলে আসে সর্বাগ্রে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন একজন শ্রদ্ধাভাজন লোকের সাথে কাজ করতে পেরে ধন্য। তিনি বলতেন, পড়াশুনা করবে প্রতি রাতে। আমার সংসারের ঝামেলার কথা তুললে তিনি বলতেন, ছেলে-পুলে ঘুমালে পড়তে বসবে। আমি খুবই গর্বিত যে, তাঁর মতো একজন ব্যক্তির সংস্পর্শে আমার জীবনটা শুরু হয়েছে। এজন্য আমার মনের মধ্যে স্বপ্নটাও সেরকম বড়। আমি যেতে চাই অনেক দূর। হয়তো তাঁর মতো যেতে পারবো না। তিনি সমাজের জন্য অনেক কিছু করে গেছেন। কয়েকজনকে মিলিয়েই আমার অনুপ্রেরণার মডেল। তাঁদের কাছ থেকে আমি যতটুকু শিখতে পেরেছি সেটাকে আমি আমার বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে চাই।
টাইমওয়াচ : আপনার ভবিষ্যতের কোন স্বপ্নটিকে লালন করে আপনি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন?
প্রীতি চক্রবর্তী : স্বাস্থ্য সেবায় আমি এমন কিছু করে যেতে চাই, একদিন বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশে থেকে সুচিকিৎসা পাবে। বাংলাদেশে গড়ে উঠবে Healthier Healthcare.
টাইমওয়াচ : আপনার প্রিয় বন্ধু?
প্রীতি চক্রবর্তী : প্রিয় বন্ধু হিসেবে এই মুহূর্তে তিন জনের নাম চলে আসে। একজন হচ্ছে আমার ছোট ভাই ডাঃ আশীষ। আর অন্যরা আমার কন্যা শ্রেয়া ও পুত্র শৌর্য্য। আমার খুব ভালো বন্ধু ওরা। আর আমার স্বামী সহযোগিতা করেন প্রচুর আমার প্রতিটি কাজে। তিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার- পেশায় শিক্ষক। আমি সবসময় কাজে ব্যস্ত থাকি। হাসপাতালে কাজ করতে করতে আমার রাত ৯-১০টা বেজে যায়। আমার কাজের ক্ষেত্রে আমার শ্বশুর বাড়ির বড় সহযোগিতা ছিল। এমনও হয়েছে যে, আমার শাশুড়ি আমার জন্য রান্না করে রেখেছেন। মাঝে মাঝে ভাবি, না ভাল করে সংসার করেছি না ভাল করে ব্যবসা করলাম। এখন ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে গেছে। এখন ওদেরকে সময় না দিলেও হয়। শুধু একটু মনিটরিং করলেই হয়।
টাইমওয়াচ : আপনি অন্য কি কি ব্যবসা করছেন?
প্রীতি চক্রবর্তী : বর্তমানে পুরোপুরি হেলথ সেক্টর নিয়ে কাজ করছি। যেমন- কিছুদিন আগে আমরা মেডিক্যাল কলেজ করলাম; এটা হেলথ-এরই একটা অংশ। আমাদের নার্সিং ইনিস্টিটিউটে সেকেন্ড ব্যাচ ভর্তি হচ্ছে। আন্ডার প্রিভিলেজড শিশুদের শিক্ষার সাথে আমি সংশ্লিষ্ট রয়েছি। শিশু শিক্ষা আমার বিজনেস নয়। এটি পুরোটাই আমাদের সিএসআর খাত। এক সময় আমি পার্টনারশীপে কসমেটিকস ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। বিজনেস গ্রোথের জন্য এবং সময় স্বল্পতার জন্য ঐ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি।  এখন পুরো সময় আমি হেলথ সেক্টরে দিচ্ছি।
টাইমওয়াচ : আগামী প্রজন্মের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী?
প্রীতি চক্রবর্তী : ‘ভালো মানুষ হয়ে ওঠেো’। একজন ভালো মানুষ পৃথিবীকে অনেক কিছু দিতে পারে।
টাইমওয়াচ : কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন?
প্রীতি চক্রবর্তী : যখন দেশের বাইরে যাই, তখন দেখি বাংলাদেশের নামটা কম্পিউটারের অনেক নিচের দিকে আসে। তখন মন খুব খারাপ হয়। বাংলাদেশের নাম পৃথিবীর শীর্ষ ১০টি নামের মধ্যে আসবে- এটাই স্বপ্ন দেখি। বাংলাদেশ এক দিন পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় একটি দেশে রূপান্তরিত হবে।
টাইমওয়াচ : এক্ষেত্রে আমাদের চলার পথ কেমন হওয়া উচিত?
প্রীতি চক্রবর্তী : ব্যক্তি স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে কেউ কাজ করতে পারে না। কিন্তু ব্যক্তি স্বার্থ যেন দেশের স্বার্থের উপরে উঠে না যায়; সেটি মাথায় রেখে কাজ করা উচিত।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাক্ষাৎকার পাতার আরো খবর

Developed by orangebd