ঢাকা : শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পবিত্র আশুরা ১০ সেপ্টেম্বর          ডিএসসিসির ৩,৬৩১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা          রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর          সংলাপের জন্য ভারতকে ৫ শর্ত দিল পাকিস্তান          এরশাদের শূন্য আসনে ভোট ৫ অক্টোবর          বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই : হাছান মাহমুদ
printer
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি, ২০১৫ ১৪:০০:৪০
সমঝোতাই সমৃদ্ধির পথ দেখাবে
টাইমওয়াচ রিপোর্ট


 

২০১৫; অভিবাদন নতুন খ্রিস্টাব্দ। বিশ্বের বয়স আরো এক বছর বাড়লো। এক বছরের আনন্দ-বেদনা, আশা-নৈরাশ্য আর সাফল্য-ব্যর্থতার পটভূমির ওপর আমাদের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই প্রিয় বাংলাদেশ নতুন বছরে পর্বতদৃঢ় একতা ও মনোবলে সকল বিপর্যয়-দুঃসময়কে জয় করে সামনে এগিয়ে যাবে আগামী দিনগুলো- এই সংকল্প সবার। আলোড়ন আর তোলপাড় করা ঘটনাবহুল ২০১৪-এর অনেক ঘটনার রেশ নিয়েই মানুষ এগিয়ে যাবে। গত বছরে আনন্দ-বেদনা, প্রত্যাশা আর দুর্যোগের ঘনঘটা নিয়েই বাঙালির বছর ফুরোল। সূচনা হলো আরো একটি বর্ষযাত্রা ২০১৫।
কতকটা রাজনৈতিক হানাহানিতে শুরু হওয়া বিগত বছরটি তার পরিসমাপ্তি পর্বেও সেই ছায়াপাত রেখে গেলো। দশম সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চরম রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বছরটির। ২০১৪ সালের প্রথম দিনটি যখন শুরু হয়, তখন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছিলেন কার্যত গৃহবন্দী। এরই মধ্যে ৫ জানুয়ারিতে হলো সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। ওই নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে দেশজুড়ে চলে অভাবনীয় সহিংসতা। জনগণের জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবুও নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয় বিরোধী জোট। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন ১৫৩ এমপি। বিরোধী জোট এই নির্বাচনকে ভোটারবিহীন নির্বাচন বলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি করে। নির্বাচন শেষ হলেও নির্বাচন প্রতিরোধের নামে শুরু হওয়া তা-ব থামতে সময় লেগেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে আন্দোলনের পালে টান পড়ে।
এনিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে অস্বস্তি ছিল প্রধানমন্ত্রীর চীন, জাপান ও রাশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে তা অনেকটা দূর হয়েছে। চীন ও জাপানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে। দু’টি দেশই বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিদেশি পুঁজি খুব একটা আসেনি গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে। মধ্যম আয়ের একটি দেশ হিসেবে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ হয়নি এ বছর। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল কম, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চাল, ডাল, আটা, চিনি ইত্যাদির দাম ছিল মোটামুটি স্থিতিশীল। আগের বছর ঘটে যাওয়া রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর রপ্তানি খাতে যে স্থবিরতা দেখা দেয়, তা থেকে পুরোপুরি উত্তরণ ঘটেনি। বিদায়ী বছরে একটি সুখবর, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে রপ্তানিকারকের তালিকায় নিজের নাম সংযোজন করেছে। এ বছরই ১৮ জুলাই রাত ৯টায় সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৪১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। আবার এ বছরেরই ১ নভেম্বর সারাদেশে ব্ল্যাক আউটের দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। এই বিপর্যয়ই সারাদেশকে বিদ্যুৎহীন রাখে প্রায় ৯ ঘন্টা।
রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকার পরও গত অর্থবছর ৬ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন, মাথাপিছু আয় এক হাজার ১৯০ ডলারে উন্নীত ও মূল্যস্ফীতির নিম্নগতিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বছরই ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজ শুরু করার জন্য চলছে ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ।
২০১৪ সালে বেশ কয়েকটি হত্যাকা- বারবার আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে র‌্যাবের হাতে নারায়ণগঞ্জে ঘটে যাওয়া ৭ খুন নিয়ে আলোচনা হয়েছে সারা বছরই। রাজধানীর বিহারিপল্লীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগে ১০ জন এবং সুন্দরবনে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও বেশ আলোচিত হয়। ২০১৪ সালে কারা হেফাজতে মারা যান ৬০ জন। এছাড়া আটক ও গ্রেপ্তারের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে শারীরিক নির্যাতনে মারা যান ১৩ জন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও গুলিবিনিময়ে নিহত হন ১২৮ জন, ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭২ জন।
বছরটিকে দুর্ঘটনার বছরও বলা যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৬৫৮২ জন, ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫১৬২ জন। এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ২৭ ভাগ বেশি। দুঃস্বপ্নের নাম হয়ে থাকবে এমএল পিনাক-৬ ও এমভি মিরাজ-৪।সমঝোতাই সমৃদ্ধির পথ দেখাবে
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে যে ১৫টি রায় হয়েছে, তার মধ্যে এ বছর রায় হয়েছে ছয়টি। সবারই মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। আগের বছর কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হলেও এ বছর আরেক যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- আপিল বিভাগে বহাল থাকলেও রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ না হওয়ায় অপেক্ষমাণ আছে দণ্ড কার্যকর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙেছে। হজ, তাবলিগ জামাত নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। বাদ পড়লেন মন্ত্রিসভা থেকে, অপসারিত দল থেকে। আছেন জেলখানায়।
সারা দুনিয়া যখন নুতন ইংরেজি বছরকে বরণ করছে, ঠিক তখন বাংলাদেশে চলেছে স্বাধীনতাযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির আদেশের প্রতিবাদে হরতাল। ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজাহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফাঁসির রায় দেন। এর প্রতিবাদে দুই দিনের হরতালের ডাক দেয় জামায়াতে ইসলামী। এর আগে গাজীপুরে সমাবেশ করতে না দেওয়ার প্রতিবাদে ৩০ ডিসেম্বর সারা দেশে হরতাল পালন করেছে বিরোধী রাজনৈতিক জোট তথা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।

এদিকে, বছর শেষে দেশের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয় সরকার।
পাইপের ভেতরে আটকে থাকা সন্তানকে রেখে থানা পুলিশের ডাকে হাজির হওয়া শিশু জিহাদের বাবার মনের মতোই গুমোট, অসহায় আর অস্থিরতায় কেটে যাওয়া বছর ২০১৪ সালকে বিদায়।
রাজনৈতিক অশনি সঙ্কেত, অর্থনৈতিক মন্দা, পরিবেশ দূষণ, সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকারডুবি, বিলুপ্ত প্রায় ইরাবতী ডলফিনের মৃত্যু, শীতলক্ষ্যার পানিতে মাথায় আঘাত করে মেরে ফেলা সাতটি জীবন্ত মানুষের রক্তকান্না আর তাদের পরিবারের কষ্ট-আনন্দহীন দিনাতিপাতের সময়ে ক্ষমতাসীনদের আস্ফালন-রক্তচক্ষুঘিরে যে অনিশ্চয়তা সীমাহীন থেকে সীমাহীনতর হয়েছে, সে সময়েও আশা আছে। আমরা আশাহীন নই। বাংলাদেশের মানুষ কখনো হারেনি; হারতে পারে না।
বিদায় বছরে কিছু ভালো খবরও ছিল। মানুষ নিজের চেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর অন্যতম সেরা গবেষণাগার ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চে (সার্ন) বাংলাদেশের ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মীর মেহেদী ফারুক ১৪ জুন থেকে ১৪ আগস্ট ইন্টার্নশিপ করে দেশে ফিরেছেন। পর্বতারোহী বাংলাদেশি মেয়ে ওয়াশফিয়া ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলের অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ইয়ার ২০১৫ এর লড়াইয়ের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।
বছরের শেষ সূর্য ডুবলেও তিস্তায় পানি গড়ায়নি, গড়াবে বলে শোনা যাচ্ছে। প্রতিবেশী ভারতের মোদি সরকারের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের কাজ করে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে কবে নাগাদ সম্পর্ক সঠিক গতিতে চলবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের নানা মত থাকলেও; উদার হস্তে ভারতকে সহায়তা করে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। দেশটি শুরুর দিকে বলেছিল বাংলাভাষীদের পুশব্যাক করবে। বছরের শেষ দিকে বলেছে ভারত হবে হিন্দুদের।
ভারতের জন্য টেলিট্রানজিটের বিষয়টি চূড়ান্ত, বিদ্যুৎ নির্ভরতা রয়েছে তাদের ওপর। করিডোর আছে স্বল্প পরিসরে। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মামলার আসামি নূর হোসেনের বিনিময়ে উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ফেরত নেওয়ার আয়োজনও চূড়ান্ত, আসামে জঙ্গি হামলার সাথে বাংলাদেশের জঙ্গিরা জড়িত এবং সন্ত্রাসী-জঙ্গিদের তালিকা বিনিময়ের পর কাজ করছে দুই দেশ- এমন খবরও জানা।
ছিটমহল বিনিময়ের কথা জোরসে শোনা গেলেও আমরা হাল ছাড়িনি। মমতার মন গলেছে বলে খবরও এসেছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে সে আশা করা হলেও এখনো তার প্রতিফলন মেলেনি। মিয়ানমারের সাথে বান্দরবানের সীমান্ত সঙ্ঘাতে নিহত হয়েছেন বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী। চীনের কুনমিং পর্যন্ত সড়ক হবে বলে জানিয়েছে সরকার। সে জন্য সমঝোতাও হয়েছে। আকাশে উড়তে যাচ্ছে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট।
এ বছর আমরা হারিয়েছে জাতির বাতিঘরতুল্য প্রিয়জনদের অনেককে। তাঁদের মধ্যে আছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, দেশের প্রবীণতম কবি আবুল হোসেন, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিম, উপমহাদেশের কিংবদন্তী নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ফিরোজা বেগম, ইতিহাসবেত্তা অধ্যাপক এএফ সালাহ্উদ্দীন আহমদ, শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ভাষা আন্দোলনের পুরোধা আবদুল মতিন, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, বাউল সম্রাট আবদুল করিম শাহ, সাংবাদিক এবিএম মূসা, ইংরেজি দৈনিক দি ইনডিপেনডেন্টের সাবেক সম্পাদক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মাহবুবুল আলম, কণ্ঠশিল্পী বশীর আহমেদসহ আরও অনেককে।
এর মধ্যে রাজধানীতে শিশু জিহাদের সকরুণ মৃত্যু শোকাতুর করেছে পুরো জাতিকে।সমঝোতাই সমৃদ্ধির পথ দেখাবে
সুন্দরবনে অয়েল ট্যাংকার ডুবি কেবল খুলনা অঞ্চলই নয়, সারা দেশ এবং দেশের বাইরেও অন্যতম সর্বাধিক আলোচিত ঘটনা ছিলো। বিমান বন্দরগুলো পরিণত হয়েছিলো পুরোপুরি সোনার খনিতে।
দেশবাসী এবং বিশ্ববাসী সবাইকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম প্রমুখ। তারা বলেন, নতুন প্রতিবছর নতুন বার্তা নিয়ে আমাদের দ্বারে উপস্থিত হয়। পুরনো বছরের ব্যর্থতা, গ্লানি, হতাশাকে ঝেড়ে ফেলে নবউদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায় নববর্ষ।
নতুন বছরে শান্তি, সমঝোতা আর সংঘাতমুক্ত পরিস্থিতির স্বার্থে সব পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে বলে প্রত্যাশা তাঁদের।

নতুন বছর কেমন যাবে এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ এবং বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও বেসরকারি সংগঠন নিজেরা কর’র সমন্বয়ক খুশী কবির। তাঁরা বলেন, রাজনীতিতে সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ আগেও ছিল, বিদায়ী বছরের শেষেও রয়েছে; কিন্তু মানুষ আশা নিয়েই বেঁচে থাকে, নতুন করে স্বপ্ন দেখে। এই কারণে আগামী বছরে রাজনীতিতে সংঘর্ষের পরিবর্তে শান্তির সুবাতাস বইবে, অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে, মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে উৎকণ্ঠার অবসান হবে, রাজনৈতিক পক্ষ-প্রতিপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হবে।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিদায়ী বছরে সংঘাত, সংঘর্ষ, উৎকণ্ঠা ছিল ঠিকই। তবে প্রত্যাশা, নতুন বছরটি ভালো যাবে। ভালো হওয়ার জন্য প্রথমেই দরকার শুভবুদ্ধির রাজনীতি। যে রাজনীতি সংঘাতের সৃষ্টি করে না, মানুষকে অনিরাপদ করে না, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে না, অর্থনীতির চাকা থামিয়ে দেয় না, সমাজে বৈষম্য-বঞ্চনার সৃষ্টি করে না- সেই রাজনীতিই চাই। এর পরেই দরকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে প্রয়োজন অনুকূল বিনিয়োগ পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শ্রমজীবী মানুষের আয় ও জীবনমানের উন্নয়ন। নতুন বছরকে ভালোভাবে পার করার জন্য অবশ্যই এ বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া দরকার। তৃতীয় ধাপে আসে মানবাধিকার। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে, অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতরা যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন না করে, সে বিষয়ে নজর দিতে হবে। একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিকারহীন হলে তা আরও অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার জন্ম দেয়, যেটা পরে পুরো রাষ্ট্র কিংবা সমাজে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের বিবেচনায় রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে। সদ্য বিদায়ী বছরে শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। প্রায়ই বিভিন্ন ক্যাম্পাস নিয়ে নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়েছে- নতুন বছরে সেটা যেন না হয়। এর জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। ছাত্র সংসদ না থাকলে, ছাত্রদের মুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ না থাকলে পেশিশক্তির দাপটই মুখ্য হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, একজন শিশু জিহাদের মর্মান্তিক মৃত্যু রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব ও সেবার বিষয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে জনমনে। সে প্রশ্ন নিয়েই আরেকটি বছরে যাচ্ছি আমরা। সে প্রশ্নেরই সার্থক সমাধান হোক নতুন বছরে।
ড. আকবর আলি খান বলেন, বিদায়ী বছরে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল, নতুন বছরে তার উল্লেখযোগ্য কিংবা ইতিবাচক পরিবর্তন হবে, এটা তিনি মনে করেন না। কারণ, বছর শেষে রাজনীতিতে শুভ পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই। বছর শেষে বরং সংঘাতের নতুন করে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। রাজনীতিবিদরা না চাইলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ, উৎকণ্ঠামুক্ত হবে না। এ কারণে রাজনীতি কেমন যাবে, তা নিয়ে বড় প্রত্যাশার কিছু নেই। তবে ২০১৪ সালে স্থিতিশীলতার কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো ছিল। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পুরো অর্জন না হলেও সন্তোষজনক ছিল। আশা করা যায়, আগামী বছরেও অর্থনীতি আরও গতি পাবে। কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, দেশে বিদেশি কিংবা দেশি কোনো বিনিয়োগের জন্যই অনুকূল পরিস্থিতি নেই। এর কারণ হচ্ছে, বিনিয়োগের অবকাঠামো খুব দুর্বল। বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি পুরো অবকাঠামো উন্নততর করতে হবে। না হলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যাবে না। বিনিয়োগ না বাড়লে প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত সাফল্যও আসবে না। বিশেষ করে সুশাসনের যে অভাব দেশে রয়েছে, সেটা দূর করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত হলে নানা ধরনের অস্থিরতা, সংঘাত কিংবা অনিয়মের যেসব ঘটনা রয়েছে, সেগুলোও দূর হয়ে যাবে।সমঝোতাই সমৃদ্ধির পথ দেখাবে
অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আগামী বছর হোক শান্তির বছর। ২০১৪ সালে গণতান্ত্রিক রীতি ও মূল্যবোধের যে নাজুক অবস্থা ছিল, তার শুভ পরিবর্তন হোক নতুন বছরে। একটি বিষয় বুঝতে হবে, এ দেশটি আর শিশুরাষ্ট্র নয়; এ দেশ এখন পরিণত রাষ্ট্র। এ কারণে মানবিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক রীতি, শিষ্টাচার, পরমতসহিষ্ণুতার ব্যাপারে অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাদের এ বিষয়ে বেশি সচেতন থাকা দরকার। তিনি বলেন, রাজনীতিতে অস্থিরতা-উৎকণ্ঠা কেন, এটা কারও অজানা নয়। যে বিষয় সবাই জানে, তার সমাধানও কঠিন হওয়ার কথা নয়। সমস্যা হচ্ছে শ্রদ্ধাবোধ, আস্থা এবং পরমতসহিষ্ণুতার অভাব। এই অভাবগুলোর আবর্তেই রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। আশা করা যায়, নতুন বছরে সবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে, আস্থা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে; সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিও নির্ভর করে। রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন হলে অর্থনীতিও ভালো থাকবে। কারণ, স্থিতিশীল পরিস্থিতি থাকলে নতুন বিনিয়োগ হবে, মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সামাজিক নিরাপত্তাও বিঘিœত হয়। বিশেষ করে, গেল বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বেশি উৎকণ্ঠা ছিল। রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি গুম-খুনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রত্যাশা থাকবে, নতুন বছরে আর একজন ব্যক্তিও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হবে না। মানুষের বিভিন্ন পর্যায়ে যে কষ্ট আছে, তা মোচনেই রাষ্ট্র-সরকার উদ্যোগী হবে।
খুশী কবির বলেন, বিদায়ী বছরের শেষ এবং নতুন বছরের শুরুর দিনই হরতাল। এ অবস্থায় ভালো কিছুর আশা করা যায় না। দাবি আদায়ের কর্মসূচিতে যখন সহিংসতায় সাধারণ মানুষের জীবনহানি ঘটে, তখন সেটা গ্রহণযোগ্য হয় না। একজন নিরীহ স্কুলশিক্ষিকা রাজপথে জীবন দিলেন, একজন মা সন্তানসহ অগ্নিদগ্ধ হলেন কেন? এর জবাব কে দেবে? এ প্রশ্ন নিয়েই তো নতুন বছর শুরু হচ্ছে। এ প্রশ্ন সামনে রাখলে নতুন বছর কেমন বলে মনে হতে পারে?
তিনি বলেন, সরকারে যারা আছেন, তাদেরও সমালোচনা সহ্য করতে হবে। সহিংসতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে হবে। গণতন্ত্রের কথা শুধু মুখে নয়, কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন করতে হবে। হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারে ভুল সিদ্ধান্তের বলি যেন সাধারণ মানুষ না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সংঘাত নয়, নতুন বছর যেন সমঝোতার হয়।
খুশী কবির বলেন, নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি। সর্বশেষ একজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্র্তৃৃক ১৪ বছরের কিশোরী ধর্ষিত হওয়ার খবর পেয়েছেন। দায়িত্বশীল, জনপ্রতিনিধিরা যখন এ ধরনের অপরাধ করেন, তখন আশঙ্কা বাড়ে, আস্থার সংকট তীব্র হয়। দেখা যায়, প্রভাবশালীরা অপরাধ করে বারবার পার পেয়ে যায়। অপরাধীদের দায়মুক্তির ভয়ঙ্কর এক সংস্কৃতির জন্ম হচ্ছে। এর ফলে সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতিও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। নতুন বছরে সে পরিস্থিতির উন্নয়ন দেখা যাবে, এটাই প্রত্যাশা।
খুশী কবির বলেন, বিদায়ী বছরের শেষ মুহূর্তে এসে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। অথচ শ্রমজীবী মানুষ, নিম্ন আয়ের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেই। এ ধরনের অবস্থা সামাজিক বৈষম্য বাড়ায় এবং অর্থনীতিতেও খারাপ প্রভাব ফেলে।সমঝোতাই সমৃদ্ধির পথ দেখাবে
দশ দিগন্ত আলো করে ভোরে হলুদ সরষেক্ষেতের হলুদ আভায় নতুন বছর ২০১৫’র শুরু। বদলে যাচ্ছে সময়, প্রযুক্তির স্পর্শ বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে মানুষের এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এর ভেতরও সরকার দলীয়দের সীমাহীন অনিয়ম, আর অবিচারের কাছে নিশ্চল নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে গেছে সময়। দুঃসহ দুঃসময় যেন কাটে না। আসছে বছরে সব সামলে উঠে এগিয়ে যাবে প্রিয় স্বদেশ আর স্বদেশের মানুষ সে প্রত্যাশা সবার।
নতুন বছরে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে সবাইর সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ।
আসছে বছরটি সীমান্ত হত্যামুক্ত হোক; এমনটি চাইতেই পারেন বাংলাদেশের মানুষ।
কবি আল মাহমুদের কথায়Ñ আমরা আশায় বাঁচি। স্বপ্নে বাঁচি। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। কবিদের কাজ মানুষকে স্বপ্ন দেখানো। নিশ্চয় একদিন আমরা জিতব। সাধারণ মানুষ জিতবে।
কবি আল মাহমুদের মতো আমরাও ভাবছি-আমরা জিতব, মানুষ হারে না। হারতে পারে না।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd