ঢাকা : মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ ১৬:০৫:৪১
অসহায়দের ঠিকানা রাউজানের জেতবন বিহার
এম বেলাল উদ্দিন, রাউজান (চট্টগ্রাম)
রাউজানের জেতবন বিহার


 


শাস্ত্রে আছে মানুষ সৃষ্টির সেবা জীব। সৃষ্টিকর্তা মানব জাতিকে জ্ঞান বিবেক বুদ্ধি দিয়ে এই জগতে পাঠিয়েছেন ধর্মকর্মের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে। যারা নিজের ধর্ম কর্মের মাধ্যমে এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পেরেছে তারাই সমাজে পরিচিত হয়েছে সত্যিকার মানুষ হিসাবে। আর যেসব মানুষ জ্ঞান, বুদ্ধিকে অসৎ উদ্দেশ্যে কাজে লাগিয়ে সব সময় কুট কৌশলের আশ্রয় নিয়ে নিজের জীবন কাটাচ্ছে তারা মানুষ হয়ে জন্ম নিলেও সমাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে তারা পরিচিত হয়েছে মানুষ নামের নিকৃষ্ট প্রাণী হিসাবে। আদিকাল থেকে প্রতিটি মানব সন্তান জন্ম নেয়ার পর মা-বাবার আদর স্নেহে বেড়ে উঠে। প্রতিজন মা-বাবা চেষ্টা করে নিজের সন্তানকে নিজেদের সাধ সাধ্যে মধ্যে সবটুকু দিয়ে বড় করতে। সূখ অসুখ,অদর অনাদরে বড় হয়ে উঠা সন্তানদের প্রতি মা বাবার শুধু চাওয়া পাওয়া থাকে আমৃত্যু নিজের সন্তানকে কাছে পাওয়া। জন্ম দেয়ার পর থেকে সন্তানদের প্রতি মা-বাবার এই ত্যাগ এর কারণে প্রতিটি ধর্মে স্বীকৃত হয়েছে সৃষ্টিকর্তার পরই মা-বাবার স্থান। গুরুজনদের মতে সৃষ্টিকর্তার পর পূজনীয় যদি কেউ থাকেন তারা হচ্ছেন মা-বাবাই। প্রবাদ আছে মা-বাবার পায়ের নিচে ছেলে মেয়েদের বেহেস্ত। আমাদের এই সমাজে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই বিশ্বাসে বলিয়ান সন্তানরা মা-বাবাকে আমরণ স্থান দেয় নিজের হৃদয়ের মধ্যে, সবাই চেষ্টা করে নিজেদের সাধ সাধ্যের মধ্যে থেকে জন্মদাতা মা-বাবাকে আমরণ সেবা যত্ন করে চালিয়ে দিতে। এই সেবাদানের মাঝে গুরুজনদের কথায় পরকালে সেই বেহেস্তের ঠিকানাটি নিশ্চিত করতে।
দুভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, মা-বাবার প্রতি ছেলে মেয়েদের এই দেনা পাওয়ার হিসাবের ব্যতিক্রমী ঘটনাও রয়েছে আমাদের সমাজের সচ্ছল অসচ্ছল অনেক পরিবারে। এরকম সন্তানদের  মধ্যে অনেকেই স্ত্রী পুত্র আর নতুন সর্ম্পকীত আত্মীয় স্বজনের চাপে বেমালুম ভূলে যায় জন্মদাতা সেই মা-বাবার কথা। তারা মা-বাবার সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে একাকিত্ব জীবন যাপনে অভ্যস্থ হয়। বিচ্ছেদের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে এক সময় মা-বাবা সন্তানদের চিন্তায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তারা সন্তানদের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনের ব্যাকুলতায়। কোনো কোনো বাবা-মা দুরে সরে যাওয়া সন্তানদের একনজর দেখার জন্য আকুতি জানিয়েও ব্যর্থ হয়। এ রকম সন্তানদের কেউ কেউ সমাজের লোকলজ্জা ঢাকতে মাঝে মধ্যে মা বাবা’র জন্য টাকা কড়ি পাঠিয়ে মনের শান্তনা খুঁজে। তাদের অনেকেরই মা-বাবাকে শেষ বারের মত জীবিত দেখার সেই ভাগ্যটুকুও হয় না। সমাজে বিভিন্ন সময় দেখা যায় বিচ্ছেদে বেদনাগ্রস্থ মা-বাবারা সন্তান সমতুল্য অন্য কোনো মায়ের সন্তানকে দেখলে বুকের মধ্যে চেপে রেখে শান্তনা খুঁজে। মাতৃ গর্ভে ১০ মাস দশ দিন রেখে যে সন্তান জন্ম দিয়েছে সেই সন্তানের বিচ্ছেদে নিরবে চোখে পানি ফেলে। কোনো কোনো মা বাবা একাকিত্বের মাঝে রোগে শোকে এক সময় নিঃষঙ্গ অবস্থায় শেষ বিদায় নেয়। নিঃষঙ্গ হয়ে পড়া মা-বাবার দুঃখ কষ্ট যারা কাছ থেকে দেখেছেন, যারা বিচ্ছেদ যন্ত্রনায় কাতর মা বাবার বুকের যন্ত্রনা উপলব্দি করেছেন তারাও নিঃষঙ্গ মা-বাবার দুখে দুখিত হতে হয়। অসহায় অবস্থায় থাকা মা-বাবাকে শান্তনা দেয়ার ভাষা খুঁজে। আবার সমাজ সচেতন কেউ কেউ এগিয়ে আসে এরকম অবহেলিত জনক জননীর দুঃখ দুর্দশা লাঘরে চেষ্টায়। নিজেদের সাধ্যানুসারে চেষ্টা করে তারা মা-বাবা শব্দের পবিত্রতা রক্ষা ও জনক জননী শব্দের মর্যদা দিতে।
এ রকম অসহায় অবস্থায় থাকা মা-বাবাদের  পূনঃবাসনে এক যুগন্তকারী কাজ করেছেন রাউজানের এক ব্যক্তি। তার নাম অটু বড়ুয়া। ৩৮ বছর বয়সী এই ব্যক্তি সংসার কর্মে না জড়িয়ে জীবনে অর্জিত সব টাকা খরচ করেছে একটি বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠায়। এখানে রাখা হয়েছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত সব ব্যবস্থা। মনোরম পরিবেশে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন ভবনের নক্সায় প্রতিষ্ঠিত এই বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছে পৃথক পৃথক প্রার্থনা ও বিনোদনের ব্যবস্থা,রাখা হয়েছে আশ্রিত নারী পুরুষের জন্য শেষ বিদায়ের সকল প্রস্তুতি। ভবনের পার্শ্বে নির্মাণ করা হয়েছে মরদেহ দাহ করার জন্য ভিন্ন নক্সায় চুল্লিঘর। রাউজান উপজেলার পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের বৈদ্যপাড়ার কাছে মগদাই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের নাম দেয়া হয়ে জেতবন কমপ্লেক্স। প্রতিষ্ঠাতা অটু বড়ুয়া সম্পর্কে জানা যায় তিনি দুই হাজার সাল থেকে দক্ষিণ অফ্রিকায় প্রবাসে ছিলেন। সেখানে ব্যবসা বানিজ্য করে যতটুকু অর্থ অর্জন করেছে এসব অর্থ ব্যয় করছেন নিজ ধর্ম ও মানব সেবায়। জানা যায়, জেতবন কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি খরচ করেছেন প্রায় দেড় কোটি টাকা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায় মধ্যভিত্ত পরিবারের সন্তান অটু বড়য়ার পিতা উদায়ন বড়ুয়াও এখন সংসার ত্যাগী বৌদ্ধ গুরু। এখন তিনি একটি বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ। তার বর্তমান পরিচিতি শীলানন্দ থের। মানবিক কর্মে নিয়োজিত প্রবাসী অটু বড়ুয়া এই প্রতিনিধিকে বলেন সৃষ্টিকর্তার পর মা-বাবা’র স্থান। যেসব মা-বাবা সন্তানদের সেবা পায় না তাদের জন্য এই জেতবন কমপ্লেক্স। এখানে যারা আসবেন তাদের জন্য সব রকম সুযোগ সুবিধা রাখা আছে। ধর্মীয় সকল নিয়ম পালন করে মৃত্যুর পর শেষ বিদায় দেয়া হবে। জানা যায়, এই কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মবলম্বিদের জন্য ভাবনা কেন্দ্র, পাঠাগার, ৮ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ও একই ব্যবস্থায় থাকবেন ৩০ জন প্রবীণ নর নারী।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd