ঢাকা : বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • রোহিঙ্গা ইস্যুতে ট্রাম্পের কাছে সহায়তা চাওয়ার কোনো মানে নেই : হাসিনা          দু-এক দিনের মধ্যে চালের দাম কমবে : বাণিজ্যমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের প্রতি আন্তরিকতার কমতি নেই : ওবায়দুল কাদের          রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ত্যাগ করলে অবৈধ বলে গণ্য হবেন : আইজিপি          রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ নৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে : রুশনারা আলী
printer
প্রকাশ : ৩১ মে, ২০১৫ ১৮:২৮:৩৩
যতদিন বাচুম ততদিন পতাকা বেচুম
সালেক খোকন


 

এ শহরে হরেক রকম মানুষের আনাগোনা। নানা মানুষের নানা মত।  ক্যামেরা নিয়ে বের হয়েছি এসব মানুষের সান্নিধ্যের আশায়।  মিরপুর থেকে শাহবাগ আসতেই  বাসের মধ্যে হট্টগোল। গেইট লগ সিটিং বাস। অথচ বাস ভর্তি লোক দাঁড়ানো। তবুও ভাড়া দিতে হবে সিটিংয়ের। এ নিয়ে এক যাত্রীর সঙ্গে কন্টাকদারের কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। কিন্তু অন্য যাত্রীরা প্রায় নিশ্চুপ থাকে। এটিই নগরের নিত্যদিনের চিত্র।
জানালার ওপাশে এক হকার। নেন ভাই, ‘দুই টাকায় দুনিয়া’। পত্রিকা কিনে বাসের মধ্যেই দুনিয়া খুলে বসে কয়েকজন। পাতায় পাতায় বড় বড় শিরোনাম। অতঃপর বাসের মধ্যেই শুরু হয় ‘টক- শো’।
ভ্যাপসা গরমে প্রচন্ড জ্যাম পেরিয়ে নেমে পড়ি প্রেসক্লাবে। প্রেসক্লাব হয়ে যাব টিএসসির দিকে। শরীর তখন ক্লান্ত ও ঘর্মাক্ত। শিক্ষা ভবনের পাশ দিয়ে এগোচ্ছি। হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল সবুজের পতাকা। একটি নয়, একই সঙ্গে কয়েকটি। পতপত করে উড়ছে বাতাসে। আমার ক্লান্ত দেহে তখন টানটান ভাব।
পতাকাগুলো বয়ে বেরাচ্ছে এক বৃদ্ধ। মুখে সাদা দাঁড়ি। চোখের দৃষ্টিতে যেন ইতিহাস লুকানো। কাঁধে একটি ঝোলা ব্যাগ। পান খাওয়া মুখে হাসি খেলে যায়। আমিও ক্যামেরায় ছবি তুলতে থাকি।
তিনি পতাকা বিক্রি করছেন ৪১ বছর ধরে; শুনেই তার প্রতি আমার আগ্রহ হয় আকাশচুম্বি। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কথার পিঠে কথা চলে। লোকটির নাম মজিবুর ডালি। বয়স সত্তর। বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হলদিয়া গ্রামে। সবার কাছে তিনি খোকন বিক্রমপুরী। বললেন, এইডার একটা ইতিহাস আছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব ৬১ জেলা ঘোষণা করেন। লৌহজং তহন ছিল বিক্রমপুরের মইধ্যে। অন্যদের লগে আমিও বঙ্গবন্ধুর বাসায় যাইয়া কইলাম- স্যার আমগো বিক্রমপুররে জেলা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু আমার ডাক নাম জাইনা কইলেন- যাও তুমি হইলা খোকন বিক্রমপুরী । খোকন আমার ডাক নাম। সে থেকে সবাই এ নামে ডাকে।
পতাকা বিক্রির শুরুর দিককার কথা জানতে চাইলে বলেন, আমি তখন দর্জির কাজ করতাম আজিমপুরে। ২রা মার্চ ১৯৭১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করল আ স ম আব্দুর রব। সঙ্গে ছিলেন শাহজাহান সিরাজ, নুরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন। ওই মিটিংয়ে আমিও গেছিলাম। এরপর থেইকা  ৫০ টাকা পুঁজি নিয়া পতাকা বানাইয়া বিক্রি করি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মোহাম্মদপুর রাজিয়া সুলতানা রোডের কোলনী টেইলার্সে কাজ করতো মজিবুর। বিহারীরা তখন বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করছে। চারপাশে আল বদর, আল শামসের লোকেরা। দিনের বেলায় অন্য কাজ আর রাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মজিবুর বানাতো মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের পতাকা।
তার ভাষায়, অনেক ভয় লাগত, যখন কাপড় কিনতে যাইতাম। লাল-সবুজ আর হলুদ কাপড়ডা কিনতে গেলেই লোকেরা মুখের দিকে চাইয়া থাকতো। বুকের ভেতরডা ধুপধুপ করত। তিনি বলেন, গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই আসত পতাকা নিতে। কর্ণেল হায়দারের নাম করে আসতো তারা।
পাতাকা নিয়ে তিনি সারাদেশ ঘুরে বেড়ান। তার ভাষায় বাংলাদেশ হলো- ককসবাজার থাইকা পাটগ্রাম পর্যন্ত।
এক ছেলে সিংগাপুর, এক ছেলে ডুবাই আর মেয়েডারে বিয়া দিছি শশুড়বাড়ি থাকে। এভাবেই জানালেন পরিবারের কথা। বুকের ভেতর জমানো কষ্টের কথা বললেন কান্না জড়ানো কণ্ঠে- বড় ছেলে বিয়া করছে মতছাড়া। ও ভিন্ন থাকে। বাপ পরিচয় দেয় না। নাতীন আছে, কিন্তু এহনও দেহি নাই। ছেলে আমারে কছম দিসে- নাতীনরে ধরলে আল্লাহর কাছে ঠেকা থাকমু। তাই আমিও যাই না।
কষ্টের মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে। মজিবুরকে স্বাভাবিক করতে আলাপ তুলি পতাকার দাম আর লাভ নিয়ে। তিনি বলেন, পাঁচ ফুটটা ৮০/৯০ টাকা, আড়াই ফুটটা ৩০/৩৫ টাকা আর পনের বাই নয়টা বেচি ২৫ টাকায়। সব সময় একরেট। কোনো দিন হাজার টাকা বেচি, কোনোদিন খালি হাতে ফিরি। পতাকা বেচতে আনন্দ লাগে।
বাংলাদেশের পতাকার অসম্মান দেখলে মন খারাপ হয় মজিবুরের। তার ভাষায়, কত রক্তের বিনিময়ে আমরা পতাকা পাইছি। কোনো দিবসে এই পতাকা বাসা-বাড়িতে উড়াইয়া রাখে কিন্তু পরে কেউ আর পতাকা নামায় না। অথচ সূর্যাস্তের সাথে সাথে তো পতাকা নামানো নিয়ম। নাইলে পতাকার অসম্মান হয়। এগুলা দেখলে মনডা খারাপ লাগে।
খেলার সময় যখন হাজার হাজার বাংলাদেশের পতাকা উড়ে, ছাত্ররা যখন পতাকা কিনে তখন অন্যরকম আনন্দ দোল খায় মজিবুরের মনে। সবদেশের পতাকা বানালেও তিনি বানান না পাকিস্তানের পতাকা। তিনি বলেন, একাত্তরের কথা মনে হইয়া যায়। মন থাইকা পারি না।
প্রতিদিন সন্ধ্যার পরেই গ্রামে ফিরে যান মজিবুর। শুক্র ও শনিতে ঘরে বসেই বাংলাদেশের পতাকা বানান। সহধর্মিনী  কাপড় কেটে আর পতাকা ভাজ করে সাহায্য করেন তাকে। এভাবে পতাকা ঘিরেই চলে মজিবুরের সুখ-দুঃখ।
পতাকা বিক্রির টাকায় সংসার চলে না তার। তখন ছোট ছেলের পাঠানো টাকাই হয় ভরসা। তবুও মজিবুর বাংলাদেশের পতাকা বিক্রি করেই কাটিয়ে দিতে চায় বাকীটা জীবন। দেশের প্রতি মজিবুরের এ এক অন্যরকম ভালবাসা। অন্য ব্যবসা করেন না কেন? শেষের এমন প্রশ্নে মলিন মুখে মজিবুর উত্তরে বলেন- ছাড়তে পারিনা কাকা, বুকটা ফাইটা যায়। যতদিন বাচুম ততদিন পতাকা বেচুম।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাক্ষাৎকার পাতার আরো খবর

Developed by orangebd