ঢাকা : সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ০৮ জুন, ২০১৫ ১০:৫৪:০৯
শরণার্থী শিবির স্থানান্তরে রোহিঙ্গাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
মঈনুল হাসান পলাশ, কক্সবাজার
কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের পাশে নিবন্ধনবিহীন রোহিঙ্গা পরিবারের শিশুরা


 


নোয়াখালীর চর হাতিয়া হোক আর নিজের জন্মভূমি মিয়ানমারে হোক যদি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া হয় সবখানেই যেতে প্রস্তুত রোহিঙ্গারা। তাদের ভাষ্য, “এখানে এসেছি অভাবের তাড়ণায় আর জাতিগত দাঙ্গায় পড়ে নিপীড়নের শিকার হয়ে। আমরাও তো মানুষ; আমাদের কি বেঁচে থাকার অধিকার নেই?”
কক্সবাজারে রয়েছে মিয়ানমারের ৫-৬ লাখ মুসলিম রোহিঙ্গা। এদের মধ্যে ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউএনএইচসিআরের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে রেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গা হিসেবে শরণার্থী ক্যাম্পের মাধ্যমে মৌলিক চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। আর অবৈধ অনুপ্রবেশের পর বাকি রোহিঙ্গারা অনিবন্ধিতভাবে জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছে।
জানা যায়, ১৯৭৮ সাল প্রথম সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে মুসলিম রোহিঙ্গারা। সেদেশে জাতিগত দাঙ্গা ও রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের কবলে পড়েই মূলত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় দফায় ব্যাপক হারে অনুপ্রবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিপর্যয়। চোরাচালান, ইয়াবাসহ বর্তমানে উপকূলকে মানবপাচারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষ পাচার হবার এই অপকর্মেও রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সচেতন মহল।
অন্যদিকে সীমান্ত পার্শ্ববর্তী টেকনাফে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে নতুন নতুন রোহিঙ্গা দল ভিড়ছে টেকনাফে।
এমন বাস্তবতার নিরিখে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের নোয়াখালী চরাঞ্চলস্থ হাতিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। ইতোমধ্যে নোয়াখালী ও কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করেছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ লোকেরা। শিগগিরই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত আভাস দেওয়া হবে বলে জানা যায়।
রোহিঙ্গাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে কুতুপালং ক্যাম্পের রোজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গা নুরুল আলম ও তার স্ত্রী রূপবান বলেন, তাদের পরিবারের ৮ জন সদস্যদের মধ্যে ৭জন নিবন্ধিত। তারা কুতুপালং ক্যাম্পের রেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গা হওয়ায় নির্ধারিত সুবিধা ভোগ করছেন। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প নোয়াখালীতে সরিয়ে নেওয়া হলে তাদের অনিশ্চয়তার কথা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এখানে আমাদের সাথে সবার একটা আত্মীয়তার মতো সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বার্মা থেকে অন্য আত্মীয়-স্বজন এলে দেখা হয়। কিন্তু নোয়াখালী নিয়ে গেলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে- এই আশংকা তাদের। তবে সরকারের সিদ্ধান্তে তারা যেতে প্রস্তুত বলে জানান।
নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিলে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের অনুভূতি জানতে চাইলে কুতুপালংয়ের অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা নুরুল আমিন মাঝি বলেন, যদি রেজিষ্ট্রার্ডদের নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে আনরেজিষ্ট্রার্ডদের কোনভাবে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি মিয়ানমারে যেতে আগ্রহী নন উল্লেখ করে বলেন, আমরা নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চাই না, আমরা এখানেই কোনভাবেই বেঁচে থাকতে চাই।
কুতুপালং ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমেদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এতোটাই বেড়ে গেছে যে ওদের চাপে স্থানীয়দের পর্যন্ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। অচিরেই যদি রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো না যায় তাহলে ওদের বংশবিস্তারে এখানকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠবে। তিনি আরও বলেন, মানবপাচার থেকে শুরু করে সবকিছুরই সূত্রপাত করেছিল মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা।
কক্সবাজারকে নিয়ে র‌্যাবের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিদায়ী বক্তব্যটা ছিলো ঠিক এই রকম- “আমি এই জেলায় দীর্ঘদিন কাজ করেছি, আমার যতটুক মনে হয়েছে কোনো দিনও এই অঞ্চল থেকে চোরাচালানসহ সমুদ্রকে ব্যবহার করে চলা অপকর্ম থামবে না।” তিনি এই জেলাতে একটা ইস্যু শেষ হলে নতুন ইস্যু সৃষ্টি হয় উল্লেখ করে বলেন, দেশি-বিদেশি বড় বড় মাফিয়াদের বিশেষ খেয়াল এই জেলাতেই পড়ে আছে। যে কারণে টাকার প্রলোভনে ফেলে রোহিঙ্গাদের দিয়ে সব ধরনের অপকর্ম করা হয়।
এদিকে সরকারের একটি সূত্রমতে, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় টেকনাফ ও উখিয়া এলাকায় সহজেই রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করে আর তাদের আত্মীয়স্বজনের সাথে যোগাযোগ করে এখানে ভিটে-বাড়ির ব্যবস্থা করে নেয়। যে কারণে সীমান্ত এলাকা হিসেবে কক্সবাজার থেকে ক্যাম্পগুলো অন্যত্র সরানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা চলছে। শিগগিরই কক্সবাজার থেকে রেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর চর হাতিয়ায় স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে সূত্রে প্রকাশ। এ বিষয়ে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলছে সরকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আর কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করতে যাবতীয় প্রক্রিয়ার ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে চিঠি চালাচালি চলছে বলেও জানা যায়।
রোহিঙ্গা সমস্যা ও এর সমাধানের ব্যাপারে কথা হলে টেকনাফ-উখিয়া আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. আলী বলেন, গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্যনুযায়ী শিগগিরই নয়াপাড়া ও কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প কক্সবাজারের অদূরে কোন চরাঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হবে। কক্সবাজারে আজ রোহিঙ্গাদের দাপটে সাধারণ মানুষের থাকা-চলা দায়। যদিও রোহিঙ্গাদের অবস্থান অনেক পাকাপোক্ত। তিনি সব সমস্যার মূলে রোহিঙ্গা উল্লেখ করে বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতা আছে বলেই রোহিঙ্গারা দিনে দিনে সংখ্যাগরিষ্ট হয়ে উঠছে। যে কারণে অচিরেই কক্সবাজার থেকে দূরবর্তী কোন স্থানে রেজিষ্টার্ড রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে কক্সবাজার থেকে নিবন্ধিত মানে রেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্প নোয়াখালীর হাতিয়ায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কথা হলে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, এই সংক্রান্ত কোনো দাপ্তরিক কাগজ আমার হাতে আসেনি। যদি আসে সকলের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো। তবে শরণার্থী ক্যাম্প সরানোর ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রক্রিয়াটি কতটুকু এগিয়েছে তা তিনি নিশ্চিত নন।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd