ঢাকা : মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২১

সংবাদ শিরোনাম :

  • পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতি প্রায় ৯১ ভাগ : সেতুমন্ত্রী          মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হোয়াইট হাউসে যে-ই আসুক বাংলাদেশের সমস্যা নেই : মোমেন           মাস্ক পরিধান সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রদান          গত ২৪ ঘন্টায় শনাক্ত ১৩২০ করোনা রোগী, মৃত্যুবরণ ১৮ জন          ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও পদ্মা ছাড়া সব নদ ও নদীর পানি কমছে           শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি ফের বাড়লো          ২০২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার হয়েছে ৫.২৪ শতাংশ : বিবিএস          ভ্যাট পরিশোধ করা যাবে অনলাইনে
printer
প্রকাশ : ২৮ জুন, ২০১৫ ১৫:৩১:২৯আপডেট : ২৮ জুন, ২০১৫ ১৫:৫৪:৩১
মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা দরকার

 
যে কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন-অগ্রগতির পূর্বশর্ত হচ্ছে উন্নত পরিবহন তথা ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহ পরিকল্পিত উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করে গতিশীল অর্থনীতি গড়ে তুলছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশে সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। অথচ সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠা প্রয়োজন ছিল এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কিংবা দেশের উন্নয়ন অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে ক্রমবর্ধমান হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে; বাড়েনি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে আশার কথা, নব্বই’র দশকে পরিবহন সেক্টরে কিছুটা হলেও পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে। ঘর থেকে বের হলেই দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন আকৃতির ক্ষুদ্র-মাঝারি ও ভারি যানবাহনসহ দু’চাকাবিশিষ্ট যান। এ সকল যানের মধ্যে বেবিটেক্সি, টেম্পু, বাস, ট্রেন মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, রিকশা উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত যানবাহনগুলো পরিবহন ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়ন অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবও ফেলছে। তাই সরকারের সুষ্ঠু তদারকির সমন্বয়ে পরিবহন সেক্টরে সঠিক নীতিমালা প্রনয়ণের কার্যকর ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। লক্ষ্যণীয়, দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পরিবহন চাহিদা মেটাতে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বচ্ছন্দে যাতায়াতের বাহন হিসেবে মোটরসাইকেলের ব্যবহার উত্তরোত্তর বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের মোটরসাইকেলের এ চাহিদার পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে দেশেই তৈরি হচ্ছে মোটরসাইকেল এবং দেশেই গড়ে উঠেছে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি। বর্তমানে ওয়ালটন, রানার, যমুনা, রোড মাস্টার, গ্রামীণ মোটরস দেশে মোটরসাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। আর  এসকল কোম্পানির কল্যাণেই মূলত এ দেশে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠছে। তবে যে কোনো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠার জন্য নীতিমালা প্রয়োজন; মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে দেশে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রির কোনো নীতিমালা নেই; বর্তমান সরকারের উচিত- দেশে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা তৈরি করা। এ নিয়েই টাইমওয়াচ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।

লিখেছেন এ কে নাহিদ
মোটরসাইকেল একটি শ্রমঘন শিল্প। দেশে মোটর সাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা সম্ভব হলে বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্ম-সংস্থানের পথ সুগম হবে; পাশাপাশি একে ঘিরে গড়ে উঠবে ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি। বিশ্বের উন্নত অনেক দেশ মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থার পথ সুগম এবং মোটরসাইকেল রপ্তানির মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা দরকার
মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করে তুলেছে। আশার কথা, আমাদের দেশেও মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। একই সাথে রপ্তানির পথও সুগম হচ্ছে। এখন শুধুই প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও যথাযথ তদারকি।
মোটরসাইকেলের যাত্রা শুরুর প্রেক্ষাপট
সভ্যতার অনন্য আবিষ্কার চাকা। এই চাকার সাথে কালক্রমে ইঞ্জিন যুক্ত হয়ে বিভিন্ন ধরনের স্থলযানের বিবর্তন ঘটে। এসব যানবাহনের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত এবং সহজলভ্য যান মোটরসাইকেল। উন্নয়নশীল বিশ্বে স্বল্প ব্যয়ে বিভিন্ন দূরত্বে যাতায়াতের জন্য উল্লেখযোগ্য হারে মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয়। ক্ষেত্র বিশেষ পণ্য পরিবহনে মোটরসাইকেলের ব্যবহার হয়ে আসছে।
মোটরসাইকেল বা মোটরবাইক হলো দু’চাকার ইঞ্জিন চালিত যান। দূরে কোথাও ভ্রমণ, খেলা এবং রেস ইত্যাদি বিভিন্ন কাজের ওপর মোটরসাইকেলের নির্মাণশৈলী নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন নকশায় মোটরবাইক তৈরি করা হয়। পৃথিবীর বহু অঞ্চলে এখন পর্যন্ত যান্ত্রিক যে কোনো বাহনের চেয়ে মোটরসাইকেল অধিক সাশ্রয়ী এবং বহুল প্রচলিত যান। এক অনুসন্ধানে জানা যায়, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কোন এক অঙ্গরাজ্যের এক দল আবিষ্কারক ১৯০৫ সালে সর্বপ্রথম রাস্তায় চলাচল উপযোগী যান্ত্রিক দু’চাকার যান আবিষ্কার করেন। কোনো ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে না গিয়ে ধরে নেয়া যেতে পারে সেটিই ছিল পৃথিবীর প্রথম মোটরবাইক তৈরির সফল প্রচেষ্টাগুলোর একটি। যদিও আবিষ্কারকরা তৎকালীন তাদের এ যানটির নাম দিয়েছিল ‘রাইডিং কার’ বা জবরভ ধিমবহ; যা-হোক যদি কেউ বাষ্প চালিত দু’চাকার এ যানটিকে মোটরবাইক বলে ধরে নেন; তাহলে প্রথম মোটরবাইক আবিষ্কারের কৃতিত্ব নি:সন্দেহে আমেরিকানদের। উত্তর আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের রকবেরির বাসিন্দা সিলভাস্টার হাওয়ার্ড কুপারের নির্মিত এমন একটি যান সর্বপ্রথম খেলা ও সার্কাসে প্রদর্শিত হয়। এর বেশ কয়েক বছর পর মোটরসাইকেল ক্রেতা-সাধারণের ব্যবহারের জন্য বাজারে আসে। মোটরসাইকেলের প্রথম দিককার ঐতিহাসিক দিনগুলোতে বাজারে ছাড়া হয় বাইসাইকেল পরবর্তীতে মোটর সংযোজনের উপযোগী নকশা অনুসরণ করে তা বাজারে ছাড়তে থাকে। এরপর ইঞ্জিনের শক্তি বাড়ার সাথে সাথে উৎপাদনকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে; এতে মোটরসাইকেলের নকশা সাধারণ সাইকেল থেকে অনেক বেশি আলাদা হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের অতীত-বর্তমান
ঠিক কবে প্রথম বাংলাদেশে মোটরসাইকেল আনা হয় সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু না জানা গেলেও বিভিন্ন নথিপত্র থেকে ধারণা করা যায়, ষাট-এর দশকের প্রথমদিকে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের আগমন ঘটে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এই যানের ব্যবহারের ব্যাপকতা পরিলক্ষিত হয়। ফলে ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে। এ সময় জাপানি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল ক্রেতা-সাধারণের ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায়। ৯০ পরবর্তীকালে জাপানি এসব মোটরসাইকেলের আকাশ ছোঁয়া দামের কারণে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে কোরিয়া, চায়না, ইন্ডিয়ার অপেক্ষাকৃত কম দামি মোটরসাইকেল ভোক্তার চাহিদা পূরণে অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। কম দামি মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা দরকার
এসব মোটরসাইকেল বিক্রয়োত্তর সেবা ও খুচরা যন্ত্রাংশের সহজ লভ্যতার কারণে এ সময় থেকে মোটরবাইক মধ্যবিত্তের বাহনে পরিণত হয়। ফলে এ দেশে আধুনিক উন্নত মানের মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি স্থাপনের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশে মোটরসাইকেল তৈরি হচ্ছে এবং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি যন্ত্রাংশ আমদানি করে দেশীয় শ্রমিকদের সহায়তায় সংযোজন করে স্থানীয় বাজারের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
অর্থনীতিতে মোটরসাইকেলের অবদান
বর্তমানে বাংলাদেশে ৫টি মোটরসাইকেল যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, প্রায় ৭০টির মতো আমদানিকারক, প্রায় ৮শ’ শো-রুম, প্রায় ৫ হাজার মোটরসাইকেল মেকানিক ওয়ার্কশপ এবং প্রায় ২ হাজার ৮শ’ খুচরা যন্ত্রাংশের দোকান রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ লাখ লোক মোটরসাইকেল ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। দেশে মোটরসাইকেল ব্যবসায় বছরে প্রায় ৮শ’ কোটি টাকার বাজার রয়েছে এবং বর্তমানে দেশে মোটরসাইকেল শিল্পে কয়েক শ’ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এ থেকেই অর্থনীতিতে মোটরসাইকেলের অবদান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। দেশে ব্যাপকভাবে মোটরসাইকেল উৎপাদন করা সম্ভব হলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব বহু গুণ বাড়ানো সম্ভব হবে। পরিবহন সেক্টরের উন্নয়ন মানে দেশ ও জাতির উন্নয়ন। চায়না ও ভিয়েতনাম মোটরসাইকেলের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা গতিশীল করে তুলেছে। মোটরসাইকেলের নানামুখী ব্যবহার বাংলাদেশের একান্ত জরুরি এবং সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সর্বসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে।
মধ্যবিত্তের বাহন মোটরসাইকেল
বর্তমানে মধ্যবিত্তের বাহন বলতে আমরা মোটরসাইকেলকেই বুঝি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু পরিবহন ব্যবস্থার অপ্রতুলতা থেকেই গেছে। ফলে দূর-দূরান্তে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বেড়েছে। অল্প খরচে, কম সময়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত পৌঁছার জন্যে এ যানটির প্রয়োজন দেখা দেয়। পণ্য পরিবহনেও এর ভূমিকা রয়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ তাদের নিজস্ব যান হিসেবে মোটরসাইকেলকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। মফস্বল শহর ও গ্রাম-গঞ্জে এর ব্যবহার অনেক বেশি হয়। কম মূল্য এবং চলাচলে সুবিধার জন্যে এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে।
মোটরসাইকেল: সবার জন্য পরিবহন সেবা
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের সব জনগণের জন্যে পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা খুব কঠিন কাজ। একসাথে বেশি লোক বহনে সক্ষম যেমন- মনোরেল, আন্ডারগ্রাউন্ড রেল ইত্যাদির মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পরিবহন ব্যবস্থার অপ্রতুলতার সমাধানে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। তবে ছোট শহরগুলোতে ব্যক্তিগত যান মোটরসাইকেল দিয়ে কিছুটা হলেও পরিবহন সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব। শহর কিংবা গ্রামে বিভিন্ন দূরত্বে যাতায়াতে মোটরসাইকেল ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। চায়না, ভিয়েতনাম, কোরিয়ায় এ ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বহু আগে। আমাদের দেশেও এর প্রয়োগ ঘটাতে উদ্যোগ নিতে হবে। আর তখনই সম্ভব হবে সবার জন্যে স্বল্প ব্যয়ে পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা।
স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য মোটরসাইকেল
নিম্নবিত্ত মানুষের আয়ের অধিকাংশ ব্যয় হয় পরিবহনে। এ ধরনের লোকদের জন্যে নিজস্ব পরিবহনের কথা ভাবা হয়নি এ পর্যন্ত। কিস্তিতে মোটরসাইকেল পাওয়া গেলেও উচ্চ সুদের কারণেও কিস্তি পরিশোধে জটিলতা দেখা দেয়ায় এ ধরনের সুবিধা মধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই স্বল্প আয়ের লোকদের জন্যে সহজ পদ্ধতিতে স্বল্প সুদে কিস্তিতে মোটরসাইকেল ক্রয়ের জন্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মোটরসাইকেলের উৎপাদন কিংবা আমদানি ক্ষেত্রে ব্যয় হ্রাসের বিষয়টি সরকারের নজরে থাকতে হবে। তাহলেই মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়বে এবং স্বল্প আয়ের লোকসহ সর্বস্তরের লোক মোটরসাইকেল ক্রয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবে।
রেজিস্ট্রেশন ও ট্যাক্স টোকেন বৈষম্য
বিশ্বের অন্য দেশগুলোর চাইতে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন ফি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তাছাড়া ১০ বছরের ট্যাক্স টোকেন এককালীন আদায় করার কারণে ক্রেতার ওপর বেশি চাপ পড়ে। রেজিস্ট্রেশন ও ১০ বছরের ট্যাক্স টোকেনের পরিমাণ মোটরসাইকেলের মূল্যের সাথে এককালীন যোগ হওয়ার কারণে ক্রেতা কমে বাজার সংকোচনের মতো ঘটনা ঘটায়। দেশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি মোটরসাইকেলের মূল্যে ২০ শতাংশ হচ্ছে রেজিস্ট্রেশন খরচ। তার মানে কোনো ক্রেতা যদি ৯০ হাজার টাকা মূল্যে মোটরসাইকেল ক্রয় করেন তার সাথে ১৪ হাজার টাকা রেজিস্ট্রেশন বাবদ যোগ হয় তাহলে মোট দাম ১ লাখ ৪ হাজার টাকা দাঁড়ায়; যা মোটের উপর খুবই বেশি। ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলংকার তুলনায় আমাদের রেজিস্ট্রেশন কস্ট অনেক বেশি। এ কারণে শতকরা ৭০ ভাগ মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অন্যান্য দেশে রেজিস্ট্রেশন ফি যেখানে ২ থেকে ৫ শতাংশ; সেখানে বাংলাদেশে এই হার মূল দামের ১৩ থেকে ১৭ শতাংশেরও বেশি। রেজিস্ট্রেশন চার্জ ক্রেতাসাধারণের সাধ্যে থাকলে এবং কেনার সময় ডিলার কর্তৃক রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হলে রেজিস্ট্রেশন না করার প্রবণতা রোধসহ বহুগুণে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব হতো।
মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি উন্নয়নের সমস্যা ও সম্ভাবনা
মোটরসাইকেল এ দেশের পরিবহন সেক্টরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে। দেশের প্রায় সর্বস্তরের মানুষই এখন মোটরসাইকেল ব্যবহার করছে। অনেকটা সহনশীল মূল্যে কম খরচে এবং কোনো স্থানে দ্রুত পৌঁছে দিতে এই যানটির বিকল্প নেই। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৪ সালে প্রায় ৬৬ হাজার, ২০০৫ সালে প্রায় ৮৭ হাজার এবং ২০০৬ সালে এ বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। মোটরসাইকেল বিক্রয় বৃদ্ধির ক্রমধারায় ২০১০ সালে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০১১ সালে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার, ২০১২ সালে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার, ২০১৩ সালে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার, ২০১৪ সালে প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। এই তথ্যের আলোকে দেখা যাচ্ছে যে, ২০১১ সাল থেকে মোটরসাইকেলের বিক্রয় কিছুটা নিম্মমুখী। রাজনৈতিক অস্থিররতার কারণে এমনটি হয়েছে বলে এই ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিমত। তবে প্রতি বছরই গড়ে ৩০ শতাংশ হারে মোটরসাইকেল বিক্রয় বাড়ছে। ফলে সহজেই অনুমেয় যে, দেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা উত্তরোত্তর বেড়েই চলছে এবং একটি বিশাল বাজার সৃষ্টি হয়েছে। বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এ দেশে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের পথ সৃষ্টি করছে; পাশাপাশি এই ইন্ডাস্ট্রি ঘিরে গড়ে উঠছে ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি। একই সাথে রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আশার কথা, দেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে মোটরসাইকেল উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগও করেছে। ওই সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লে¬খযোগ্য হচ্ছে- ওয়ালটন, রানার, যমুনা, রোড মাস্টার, গ্রামীণ মোটরস। এ সকল প্রতিষ্ঠান দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনের সামগ্রিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদন করার লক্ষ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা দরকার
মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত ব্যাটারি, টায়ার, প্লাস্টিক ও রাবার সামগ্রী ব্যবহার করছে। মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি বিকাশের সাথে সাথে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মোটরসাইকেল আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ইতিবাচক অবদান রেখে চলেছে। সরকারও এ সব ইন্ডাস্ট্রিকে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে মোটরসাইকেল আমদানি নিরুৎসাহিত করার জন্যে সিকেডি মোটর সাইকেলের উপর সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ আরোপ করেছে। পাশাপাশি রংবিহীন সিকেডি যন্ত্রাংশ আনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত- দেশে শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তাই বছরের পর বছর যারা মোটরসাইকেল আমদানি করছেন তাদের উচিত- স্থানীয়ভাবে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করা। জাপান এককভাবে মোটরসাইকেল তৈরি করছে। এখন চায়না এবং ইন্ডিয়া তৈরি করছে। লক্ষ্যণীয়, আমাদের দেশেও মোটর সাইকেলের উৎপাদন প্রক্রিয়ার কার্যক্রম চলছে। তাই দেশে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার জন্যে উৎপাদনকারীদের যতোটুকু সাহায্য প্রয়োজন সরকারের তা করা উচিত বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। তা অবশ্যই পূরণ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। মোটরসাইকেল ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহলের মতে, আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে এবং রপ্তানির মাধ্যমে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনের মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে মোটরসাইকেল পাওয়া যাবে- এ ধরনের সংবাদে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে বিপুল আশার সঞ্চার করছে। অথচ সরকারের সময়োপযোগী মোটরসাইকেল আমদানি নিরুৎসাহিত পদক্ষেপকে সহজে মেনে না নিয়ে সিকেডি মোটরসাইকেল আমদানিকারক ব্যক্তি-উদ্যোক্তাগণ বাজেটে শুল্ক হার কমানোর জন্যে প্রস্তাব করে। যা আদৌ ঠিক নয় বলে দেশের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী ব্যক্তি-উদ্যোক্তারা মনে করছেন। এতে দেশীয় মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই দেশীয় মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠার জন্য সরকার অধিক সক্রিয় হবে- এ প্রত্যাশা অভিজ্ঞ মহলের। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্য অল্প দামে মোটরসাইকেলের ব্যবস্থা করতে হলে আমাদের ব্যাপকভিত্তিতে উৎপাদনে যেতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদি কর্ম-পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বচ্ছ নীতিমালা। একটি পূর্ণাঙ্গ মোটরসাইকেল তৈরিতে যে সব যন্ত্রাংশ প্রয়োজন তার সব ক’টি তৈরি করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে দেশে মোটরসাইকেলের বাজার বৃদ্ধির সাথে সাথে যন্ত্রাংশ তৈরির জন্যে অনেক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছে। মোটরসাইকেল প্রস্তুতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো বৈদেশিক কারিগরি সহায়তায় দেশে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলছে। শ্রমিক সস্তা হওয়ার কারণে এই ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে পারলে ভোক্তার কাছে কম দামে মোটরসাইকেল তুলে দেয়া সম্ভব হবে। এছাড়া মোটরসাইকেল কোম্পানি এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড, উত্তরা মোটরস, টিভিএস অটো, রুপসা ট্রেডিং, কর্ণফুলী ইন্ডাস্ট্রিজ, এইচএস এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন কোম্পানি এ দেশে মোটরসাইকেল সংযোজন ও বাজারজাত করছে। বর্তমানে প্রতি বছর দেশে প্রায় ৩ লাখ মোটর সাইকেলের চাহিদা রয়েছে। ভবিষ্যতে এ চাহিদা ৫ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ বর্ধিত চাহিদার সিংহভাগই মেটানো হতো আমদানির মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে মোট চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ ভারত, চায়না প্রায় ৪৪ শতাংশ, পাকিস্তান প্রায় ৫ শতাংশ, জাপানসহ অন্যান্য দেশে থেকে ১ শতাংশ আমদানি করা হতো। আশার কথা, মোটরসাইকেলের এই চাহিদার এখন অনেকাংশই এই দেশের উদ্যোক্তারা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন।
মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি উন্নয়নে কিছু প্রস্তাবনা
১. শহর ও গ্রামে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে অযথা ভয়ভীতির কারণে মোটরসাইকেল ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে; তা দূর করা।
২. রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি আদায়ের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা।
৩. মোটরসাইকেল আমদানি নিরুৎসাহিত করা।
৪. মোটরসাইকেল বিক্রির সময় বিক্রয় কর্মীর মাধ্যমে ক্রেতার কাছ থেকে ফি আদায় করে ৭ দিনের মধ্যে মোটরসাইকেলের নাম্বার প্রদানের ব্যবস্থা করা।
৫. ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং সারাদেশে মোটরসাইকেল চালানো বিষয়ক ঘোষণা মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করা।
৬. মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠার জন্য একটি সুচিন্তিত একীভূত দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রণয়নের মাধ্যমে মোটরসাইকেল আমদানি- সংযোজন, উৎপাদন ও ফরোয়ার্ড-ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সহায়ক নীতিমালা তৈরি করা। সঠিক নীতিমালা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশে পূর্ণাঙ্গ মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠুক; এ প্রত্যাশা আমাদের।
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd