ঢাকা : মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে : সিইসি          নির্বাচনের তারিখ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই : সিইসি          দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ২৯ জুন, ২০১৫ ২৩:৫৩:৫৬
বাঁশ-বেত শিল্পে কমলগঞ্জে ১০ হাজার মানুষ
পিন্টু দেবনাথ, মৌলভীবাজার


 


মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় বাঁশ ও বেত শিল্পে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। বাঁশ-বেত দিয়ে নানা ধরনের পণ্য তৈরি ও বিক্রি করে শত শত পরিবারের জীবন-জীবিকা চলছে। নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে এ কাজে যোগ দেওয়ায় প্রতিটি পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে। বাঁশ-বেতের সঙ্গে তাঁদের নিবিড় সম্পর্ক। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই শুরু হয় বাঁশ কাটা, বেত তৈরি, নানা রকম পণ্য তৈরির কাজ। বাঁশ-বেতের তীক্ষè ফলায় কখনো কখনো ক্ষত হয় হাতের তালু। সেই ক্ষত একসময় শুকিয়ে যায়। আবার হয়। এই চক্রের মাঝে পড়ে আছেন হাজারো নারী-পুরুষ। স্বল্প পুঁজি নিয়ে এসব শিল্পে কাজ করে ঘরে বসে টাকা আয়ের পথ পেয়েছে তারা। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়নের ১৫-২০টি গ্রামের মানুষ বংশপরম্পরায় বাঁশ ও বেতের চাটাই, টুকরি, ডালা, কুলা, ঝাকা, ডরি, পারন, টাইল, উকা, খালুই ইত্যাদি তৈরি করে আসছেন। ইসলামপুর ইউনিয়নের গুলেরহাওর (টিলাগাঁও), কানাইদেশি, কাঁঠালকান্দি, ছয়ঘরি, জাবরগাঁও, রাজকান্দি ও আদমপুর ইউনিয়নের ভানুবিল, আধকানি, কাওয়ারগলা, খাপারবাজার, কোনাগাঁও, ছনগাঁও, চাঙ্গাইচাবি, জালালপুর সহ বিভিন্ন গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবার এই বাঁশ-বেতের সঙ্গে জড়িত। প্রায় ১০ হাজার মানুষের জীবিকা এই বাঁশ-বেতের ওপর নির্ভরশীল। সংসারের গতি সচল রাখতে নারীরাই এই কাজের ভার কাঁধে নিয়েছেন। পাহাড়ে একসময় বাঁশ-বেতের প্রাচুর্য ছিল। পুরুষেরা পাহাড় থেকে বাঁশ কেটে নিয়ে এসেছেন। তা থেকে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা বেত তৈরি ও পণ্য উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাঁদের চাওয়া-পাওয়া খুব বেশি না হওয়ায় তাতে কোনো সমস্যা হয়নি। কমলগঞ্জ উপজেলায় বাঁশ-বেত শিল্পীরা সম্ভাবনাময় এ পেশায় কাজ করলেও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা আর প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পেলে এ শিল্পের প্রসার বাড়বে।
বিশিষ্ট লোক গবেষক ও উন্নয়ন চিন্তক আহমদ সিরাজকে সাথে নিয়ে এই প্রতিবেদক কমলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে বাঁশ-বেত শিল্পীদের সাথে কথা বলেন। কিন্তু কী করে যেন তাঁদের চোখের সামনে পাহাড় বদলে গেছে। সেই সময়টি আর নেই। বাঁশ এখন তাঁদের কাছে দুর্লভ হয়ে উঠেছে। তাঁদের জীবিকার উপায় এখন হুমকিতে পড়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের দুঘর মৌজার উত্তর ভানুবিল (পুর্ব পল্লী) গ্রামের চিত্ত রঞ্জন বিশ্বাস (৫২), নিরঞ্জন বিশ্বাস (৪৮), আরতী রানী বিশ্বাস (৫৯), নির্মলা নমশুদ্র (৬৩), চম্পা রানী বিশ্বাস (২৯), নিরঙ্গ রানী বিশ্বাস (৪৬), নেপাল বিশ্বাস (৩৯), দিপ্তী সরকার (৩৪) ও কলেজ ছাত্রী স্মৃতি সরকার (২০) বলেন, চলমান চাহিদার ভিত্তিতে মৌসুম উপযোগী পণ্য বানানো হচ্ছে বেশি। গ্রামের বয়োবৃদ্ধরা ঘরে ও আঙিনায় বসে ডরি-পারন, ধুছইন, টুকরি ইত্যাদি তৈরি করে। বাড়ির ছোটরাও পড়ালেখার ফাঁকে এ কাজে সহায়তা করে। তারা জানান, আগের মত এখন বাঁশ পাওয়া যায় না। বাপ দাদার ব্যবসা ছাড়া অন্য আর কি কাজ করব। সরকারি সাহায্য পেলে এ শিল্পকে আরও বড় আকারে করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে অনেকের কর্ম সংস্থান হবে। বাঁশ বেতের তৈরী সামগ্রী বাজারে প্রচুর চাহিদা আছে। সরকার এগিয়ে আসলে এ শিল্পকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্তিদাতা হিসাবে দাড় করানো সম্ভব। বাঁশ-বেত দিয়ে সামগ্রী তৈরী করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে প্রতি মাসে পরিবার প্রতি ৭/৮ হাজার টাকা উপার্জন করে। তাতেই ওদের মোটা ভাত, মোটা কাপড়। নিজেরা কাজ করে ওরা বেজায় সুখি। তারা এ শিল্পকে বড় আকারে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে কোন রকমে চলছে তাদের ব্যবসা। সরকারি সাহায্য পেলে এখানে অনেক কর্ম সংস্থান হবে, ঘুচবে বেকার সমস্যা, ফিরে আসবে গ্রাম বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য। দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে। উত্তর ভানুবিল গ্রামের বেশির ভাগ লোকের নিজের জমি জমা নেই। অন্যের জায়গায় আশ্রিত হিসেবে বসবাস করে আসছেন। অনেকের শুধুমাত্র বসতভিটে টুকুই সম্ভল। এরপরও বাঁশ-বেতের কাজ করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। এ গ্রামের অনেক সন্তানই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে লেখাপড়া করছে। পাশাপাশি মা-বাবাকে বাঁশ-বেতের কাজে সাহায্য করছে। গ্রামে অনেকেরই বিদ্যুৎ নেই।
নারী উদ্যোক্তা সুমা বিশ্বাস জানান, উত্তর ভানুবিল গ্রামে প্রায় ৬০টি পরিবার বাঁশ-বেতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। উৎপাদিত পণ্যগুলো স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর দূর-দূরান্তে বিক্রি হয়ে থাকে। স্থানীয়ভাবে বেশ কিছু বেপারী এগুলো কিনে নেন। পাইকাররা এসব পণ্যে তাদের কাছ থেকে কিনে আদমপুর, ভানুগাছ, শমশেরনগর, মুন্সীবাজার, শ্রীমঙ্গলসহ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা হয়।
আধকানি গ্রামের কুতুবুন বেগম (৪০) বলেন, ‘আমরা টুকরি-ডালা বানাই। স্বামী বাঁশ এনে দেন। কিন্তু অখন বাঁশ পাওয়া কঠিন।’ কাঁঠালকান্দি গ্রামের মিনা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। কিন্তু টাকাপয়সা দিয়া কুলাই উঠতে পারছি না। টাকার জন্য বাঁশ-বেত কিনতে পারি না। অভাবে দিন যায় আমরার। বাচ্চাকাচ্চারেও পড়ালেখা করাইতাম পারি না। বছরের পর বছর ধরি আমরার অও (এই) একই রকম দিন যায়।’ জালালপুর গ্রামের আইরুন বেগম (৪৫) বলেন, ‘দশ বছর আগে স্বামী মারা গেছইন (গেছেন)। এর পর থাকি বেতর (বেতের) কাজ করি, ভাইর সংসারে থাকি কোনো রকম চলরাম (চলছি)। কিন্তু এতা দিয়া কোনোভাবে কোনো কিছু করার সামর্থ্য নাই (এসব দিয়ে কোনোভাবে কিছু করা যাচ্ছে না)। এ ছাড়া আর কিছু করারও উপায় নাই।’
বাঁশ-বেতের কারিগরেরা জানান, পৈতৃক পেশার হাল ধরে বিভিন্ন গ্রামের নারী-পুরুষ বাঁশ-বেতের পণ্য তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু এখন একদিকে বাঁশের সমস্যা, অন্যদিকে পুঁজির সমস্যা। যে মহাজন তাঁদের কাছ থেকে পণ্য নেন, তাঁর কাছ থেকে আগাম টাকা নিলে ১৫০ টাকার পণ্য ১০০ টাকায় দিতে হয়। বাঁশ-বেত কারিগর সমবায় সমিতির সংগঠক রিসান আহমদ বলেন, ‘এলাকার বাঁশ ও বেতের কারিগরেরা মূলধন না থাকার কারণে ঠিকমতো পণ্য বাজারে বিক্রি করতে পারে না। মহাজনদের কাছে তাদের তৈরি পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে তারা প্রকৃত লাভটা পায় না। এ ছাড়া বাঁশ ও বেতের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এই কারিগরদের কাছে টিকে থাকার ক্ষেত্রে এখন মূলধনই বড় বাধা হয়ে উঠেছে।’
বিশিষ্ট লোক গবেষক ও উন্নয়ন চিন্তক আহমদ সিরাজ এই কারিগরদের পেশার উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে কারিগরদের পুঁজি প্রদান, উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতের সুযোগ সৃষ্টি, পাহাড় থেকে বাঁশ-বেত সংগ্রহ ও প্রকৃত মূল্যপ্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি, সামাজিক বনায়নের সুযোগ প্রদান, বেতশিল্পের মান উন্নয়ন, আধুনিকায়ন ও নকশার প্রশিক্ষণ প্রদান, বিশেষ স্থানে কেন্দ্র স্থাপন, পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে সরকারি প্রচার, বাঁশ ও বেতশিল্পীদের হয়রানি না করার দাবি জানান।
এ ব্যাপারে মুঠোফোনে আলাপকালে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, অচিরেই আমি এসব এলাকা পরিদর্শন করে বাঁশ-বেত শিল্পের উন্নয়নে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা সহ এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করব।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd