ঢাকা : মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে : সিইসি          নির্বাচনের তারিখ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই : সিইসি          দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ২৩ জুলাই, ২০১৫ ১২:০১:০৬আপডেট : ২৩ জুলাই, ২০১৫ ১২:০২:০৯
অবৈধ মানবপাচার, বৈধ জনশক্তি রপ্তানি

 
 

মানবপাচার বর্তমান সময়ের জন্য অতি ভয়ঙ্কর এবং সর্বাধিক আলোচিত। অতীতেও মান পাচার হয়েছে। তবে এর নেতিবাচক এবং ভয়ঙ্কর চিত্র অতীতে এতটা পরিলক্ষিত হয়নি। বর্তমানে মানবপাচার শুধু জানমালের ক্ষতির কারণ নয়; এর ভয়বহতার শিকার এখন দেশের বৈধ জনশক্তি রপ্তানি ব্যবসাও। তাই মানবপাচার দেশকে থেকে বন্ধ করা না গেলে বৈধ জনশক্তি রপ্তানিতে ধস নেমে আসবে। আর এ নিয়েই এবারের টাইমওয়াচ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন; লিখেছেন এ কে নাহিদ
কীভাবে হয় মানবপাচার!
মানবপাচার সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারে রয়েছে। তারা সংকেত শব্দের মাধ্যমে মানবপাচার করে। এদের মধ্যে মোহাম্মদ আলী থাকেন মালয়েশিয়া, সাদ্দাম থাইল্যান্ডে এবং মিয়ানমারে থাকে আরেকজন। এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া উপজেলার ১১ ইউনিয়নের তৃণমূল থেকে সমাজের বড় পর্যায়ের মানুষ এখন এই মানব পাচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। জানা গেছে, মানবপাচারের পেছনে রয়েছে স্থানীয় কতিপয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ মোড়ল শ্রেণির কতিপয় পেশাদার দুর্বৃত্ত। এসব মানবপাচারকারী দালালদের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, মোড়ল প্রকৃতির মানুষরা সরাসরি মদদ দিয়ে আসছেন। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় মানবপাচার হচ্ছে। আর এসব পাচারের সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়রসহ ৭৯ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তালিকায় খোদ টেকনাফ-উখিয়া আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি, টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র-১ ও এমপি বদির ভাই মৌলভী মুজিবুর রহমান ও টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, শাহপরীর দ্বীপ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সহসভাপতি মো. শরীফ হোসেন, এমপি বদির ভাগিনা সাহেদুর রহমান নিপু, বাহারছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মৌলভী আজিজ, টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি নূর মোহাম্মদ মেম্বার, এমপি বদির আত্মীয় সাবরাং ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আক্তার কামাল, এমপি বদির আত্মীয় শাহেদ কামালসহ অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক নেতার নাম রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার-পাঁচ বছর আগেও কক্সবাজার জেলার লোকজন পাচারকারীদের ২০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যেত। যাত্রাপথে ট্রলারসহ যেসব যাত্রী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে ধরা পড়ত তাদের মধ্যে ৭০-৮০ শতাংশ যাত্রীই মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গা। তখন মালয়েশিয়ায় সমুদ্রপথে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো ফিশিং ট্রলার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জালিয়াপালং ইউনিয়নের সোনারপাড়া থেকে মনখালী পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার উপকূলীয় সাগরপথ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারে জড়িত রয়েছে রোহিঙ্গাসহ ৩ শতাধিক স্থানীয় ও বহিরাগত দালাল। একই এলাকার ফয়েজ আহামদ সহ¯্র্রাধিক মানুষ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায় পাচার করেছেন। আর এর আয় থেকে তিনি উখিয়া সদর গার্লস স্কুলসংলগ্ন বটতলী এলাকায় কোটি টাকার জমি কিনেন। আরও কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করে বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেছেন। অপহরণকারী চক্রের মধ্যে রয়েছে লেঙ্গুরবিল এলাকার ডাকাত মোস্তানদরে নেতৃত্বে একটি গ্রুপ, কায়ুুকখালীপাড়া এলাকার চোরা সাইফুলের নেতৃত্বে অপর একটি গ্রুপ। এ ছাড়া গোদারবিল এলাকার সাদ্দাম, শামসু, তারেক, গফুর আলম বাইট্টা, আমির হোসেন অন্যতম। এদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে বাস স্টেশনকেন্দ্রিক অর্ধশতাধিক বেবিট্যাক্সি (সিএনজি) চালক। এরা ট্যাক্সিতে অপহৃতদের উঠিয়ে মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়। এসব সিন্ডিকেটের সদস্যরা টেকনাফে ছোট ছোট নৌকা দিয়ে মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের নিয়ে সাগরে থাকা বড় ট্রলারে উঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড আর মালয়েশিয়ায় সমন্বিতভাবে কাজ করছে আন্ত:দেশীয় সিন্ডিকেট। এক সময় শুধু কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দালালরা সিন্ডিকেটের হাতে কর্মীদের তুলে দিত। কিন্তু এখন গোটা বাংলাদেশ থেকে দালালরা পাচারের উদ্দেশ্যে যুবকদের সংগ্রহ করে কক্সবাজারের শাহপরীর দ্বীপসহ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে ট্রলারে করে লোক পাচার করে।
সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রথমে ওঁত পেতে থাকে টেকনাফ বাস স্টেশনে। এখানে নাইট কোচগুলো চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে ভোরে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই বেবিট্যাক্সি,  মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসে মালয়েশিয়াগামীদের অপহরণ করে নিয়ে যায় নির্দিষ্ট গন্তব্য। কোনো কোনো সময় অপহরণের শিকার হচ্ছেন বেড়াতে আসা অপরিচিত সাধারণ মানুষজন। সিন্ডিকেটের সদস্যরা একটি অপরিচিত মুখ দেখলেই তাকে তুলে নিয়ে যায়। দালালরা তাদের হাত-পা বেঁধে তুলে দেয় মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে। পরে থাইল্যান্ড পৌঁছার পর পরিবারকে মুক্তিপণ দিয়ে উদ্ধার করতে হয় তাদের। কিছুদিন আগে টেকনাফে মোবাইল ফোন টাওয়ারের কাজ করতে আসা বাংলালিংকের এক প্রকৌশলীকে সাবরাং এলাকা থেকে অপহরণ করে মালয়েশিয়ার ট্রলারে উঠিয়ে দেয়।অবৈধ মানবপাচার, বৈধ জনশক্তি রপ্তানি
এলাকাবাসী সূত্রে জনা গেছে, টেকনাফ থেকে দেশজুড়ে ২০টি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মানবপাচার পরিচালিত হয়ে আসছে। সারা দেশে রয়েছে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কে যুক্ত রয়েছে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের গডফাদাররা। এসব দালাল সিন্ডিকেট কক্সবাজার-টেকনাফ-উখিয়া-মহেষখালী-চকরিয়া-চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ১০টি মানবপাচার ঘাট আলাদাভাবে পরিচালনা করে। প্রতিটি সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্কে কাজ করছে সহ¯্রাধিক দালাল। কাটাবুনিয়া, কচুবুনিয়া ও হারিয়াখালী এলাকার মানবপাচারকারীরা সাধারণত কাটাবুনিয়া ঘাট ব্যবহার করে। দুর্গম এলাকা ও যাতায়াত সমস্যার কারণে এই অঞ্চলে সহজেই পৌঁছতে পারে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এই ঘাট দিয়েই প্রতি মাসে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানবপাচার হয়।
পাচার হয়ে বন্দিদশায়
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৭৭ জন প্রবাসী বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দী রয়েছেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি এসব নাগরিককে সেসব দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করেছে। যদিও বাস্তবে ৪২টি দেশেই অন্তত ৮ হাজার বাংলাদেশি বন্দী রয়েছেন। এ হিসাবের বাইরে শুধু ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কারাগারেই বন্দী আছেন পাঁচ সহ¯্র্রাধিক বাংলাদেশি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীর তথ্যানুযায়ী মালয়েশিয়ায় ২ হাজার ১৩১ জন, সৌদি আরবে ৪৬৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ হাজার ৫১ জন, কুয়েতে ৭৫ জন, বাহরাইনে ১৩ জন, ইরাকে ১২০ জন, দক্ষিণ কোরিয়ার ৫ জন, তুরস্কে ১৪ জন, লেবাননে ১০৪ জন, জাপানে ১৩ জন, মালদ্বীপে ৪০ জন, ওমানে ৫০১ জন, মিসরে ২০ জন, ইরানে ১৭ জন এবং বুলগেরিয়ায় ৬ জন বাংলাদেশি গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি বলেন, আটক এসব কর্মীকে আইনগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে মুক্ত করে দেশে ফেরত আনা হচ্ছে। এ ছাড়া পাসপোর্ট জটিলতা-সংক্রান্ত কর্মীদের আউট পাস প্রদানের মাধ্যমে দেশে ফেরত আনা হবে। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে বিভিন্ন দেশের কারাগারে বাংলাদেশি বন্দীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি বলে জানা গেছে। দুর্গম পথে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে আফ্রিকার দেশগুলোয় বন্দী হওয়া অনেকের তথ্যই পাওয়া যায় না। সেখানকার অনেক দেশে নিয়মতান্ত্রিক কারাগারের কাঠামোও নেই। সেখানে হয়তো কোনো ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয় গ্রেফতার হওয়া ভাগ্যান্বেষীদের।
বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ভারত। সেভ দ্য চিল্ড্রেনের জরিপ সূত্রে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে শুধু ভারতেই পাঁচ লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফের বরাত দিয়ে ইউএনডিপির ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে ৩ লাখ নারী ও শিশু পাচার করে ভারতে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানে পাচার হয়েছে ২ লাখ নারী ও শিশু। পাচার হওয়া এসব নারী ও শিশুর বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০০ নারী-শিশু পাচার হয়ে যাচ্ছে। এসব নারী-শিশু ৬০ ভাগ কিশোরীর বয়স ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার নারী ও শিশু ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে থাকে। সম্প্রতি সর্বোচ্চ মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে মানবপাচার প্রতিরোধে আইন করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও বন্ধ হয়নি মানবপাচার। জানা গেছে, দেশের ১৮টি রুট দিয়ে প্রতি বছর পাচারের শিকার বেশির ভাগ নারীর স্থান হয় ভারতের পতিতাপল্লীতে। ভারতীয় সমাজকল্যাণ বোর্ডের এক তথ্য থেকে জানা যায়, সেখানকার বিভিন্ন পতিতাপল্লীতে প্রায় ৫ লাখ পতিতাকর্মী রয়েছে, এর বেশির ভাগই বাংলাদেশি। বিয়ে, চাকরি এবং আর্থিক প্রলোভনে পড়েই এসব নারী পাচারের শিকার হয়ে থাকে। এদিকে পাচারের শিকার শিশুদের মরুভূমির উটের জকি হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টি নিয়ে কয়েক বছর আগেই বিশ্বজুড়ে হৈচৈ সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, পাচার হওয়া শিশুদের অনেককে হত্যার পর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করা হয়। খোদ রাজধানী ঢাকা মহানগরীতেই নারী ও শিশু পাচারকারী চক্রের গডফাদাররা দিব্যি বিলাসী জীবনযাপন করছে এবং দেশব্যাপী এই চক্রের নেটওয়ার্ক রয়েছে। আর সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের সঙ্গেও এদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া বিজিবি ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ থানার দৌলতদিয়ার চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম ওরফে নুরু মেম্বারকে নারী পাচারকারীদের অন্যতম গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রথমে প্রলোভন ও অপহরণ করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। পতিতাবৃত্তিতে নাম লেখানোর পর অধিক উপার্জনের প্রলোভন দিয়ে তাদের বেনাপোলসহ বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে পাচার করে দেওয়া হয়। নুরু মেম্বারের নেতৃত্ব গঠিত এ দলটির দৌলতদিয়া পতিতাপল্লীতে রয়েছে একক আধিপত্য। তালিকাভুক্ত মানব পাচারকারী হয়েও নুরু রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অপরজন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার জহিরুল ওরফে জিয়া। গডফাদার হিসেবে দিনাজপুর জেলার সীমান্ত এলাকায় মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। তার নেতৃত্বে বিরামপুরের কাটলা ও ঘাসুরিয়া সীমান্ত এলাকায় দালাল ও পাচারকারীরা বেশ সক্রিয়। গোয়েন্দা রিপোর্ট মতে, কক্সবাজারের একজন সংসদ সদস্যের নিকটাত্ময় মৌলভী মুজিবুর রহমানের নাম রয়েছে গডফাদারের তালিকায়। তিনি মালয়েশিয়ায় সমুদ্রপথে ট্রলারযোগে মানবপাচার করে আসছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানব পাচারকারীরা অত্যন্ত শক্তিশালী চক্র। তাদের সঙ্গে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। এ কাজের জন্য মাসিক বেতনে দালালও নিয়োগ দেওয়া রয়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় এসব দালাল সক্রিয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।অবৈধ মানবপাচার, বৈধ জনশক্তি রপ্তানি
বিপজ্জনক সীমান্ত পয়েন্ট
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ২২২ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৮৮ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা রয়েছে। পাচারকারীরা বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে নারী ও শিশুদের পাচার করে থাকে। উত্তরের দিনাজপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ১১টি রুট দিয়ে নারী ও শিশু পাচার হয়। ভারতে যাওয়ার জন্য যশোরের বেনাপোল ও সাতক্ষীরার কলারোয়া সীমান্ত পয়েন্ট সবচেয়ে সহজ রুট হিসেবে পরিচিত। বেনাপোল থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ শহর। এ শহরেই নিয়ে রাখা হয় পাচারহওয়াদের, পরে সুবিধামতো গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয়। উন্নত জীবনের আশায় পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারীই এখন বিদেশ গমনে ইচ্ছুক। তারা বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিতেই পড়ছেন দালালের খপ্পরে। যাওয়ার কথা এক দেশে কিন্তু পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্যদেশে। করার কথা কোনো মানসম্মত কাজ, কিন্তু ভাগ্যে তাদের জুটছে বাধ্য করানো অনৈতিক পেশা।
এদিকে গত ২০০৯-১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক নারী ও শিশু পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানুষ পাচারের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনি।
পতিতালয়ে বন্দি হচ্ছে নারী
হাসপাতালে চাকরির কথা বলে কাতারে নিয়ে বাংলাদেশের বেশকিছু নারীকে বিক্রি করা হয়েছে পতিতালয়ে। হাসপাতাল আদলের অন্ধকার কুঠুরিতে তাদের চলছে বন্দী জীবন। সেখানে বিভিন্ন দেশের পর্যটকের মনোরঞ্জন করাসহ দুর্বিষহ জীবনে আটকে পড়েছেন কয়েকশ বাংলাদেশি নারী। তাদের উদ্ধারের ব্যাপারে বাংলাদেশ দূতাবাসের কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। নারী পাচারকারী চক্রের কাছ থেকে কৌশলে ফিরে আসা এক নারী সবকিছু ফাঁস করে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে মামলা করেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু কাতার নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে কয়েকশ পতিতালয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশি তরুণী-যুবতীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। দুবাইয়ে কয়েকশ পতিতালয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পানশালা, ফ্ল্যাটসমূহে নারীবাণিজ্য ব্যাপকভাবে সচল রয়েছে। বাংলাদেশি নারীদের পাসপোর্ট আটকে রেখে তাদের পতিতালয়ে ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। দুবাইয়ের পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, শুধু দুবাইতেই অন্তত ৩০ হাজার বাংলাদেশি নারী ইচ্ছা-অনিচ্ছায় দেহবাণিজ্যে সম্পৃক্ত রয়েছে। এসব কর্মকা-ে দেশের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুণœ হচ্ছে, তেমনি পাচার হওয়া নারীদের অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। এদিকে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দিয়ে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে দেশের জনশক্তি। বাংলাদেশি অনেক শ্রমিক ‘আদম ব্যবসায়ী’দের মিথ্যা আশ্বাসে বিদেশ গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। বিদেশে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি, অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করা, অনিয়মিত বেতন প্রদান ও পাশবিক নির্যাতন করারও এন্তার অভিযোগ রয়েছে। অসহায় অনেক শ্রমিক দেশে ফিরে ন্যায়বিচার চেয়ে থানায় মামলা করছেন। মামলা করলেও পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দীর্ঘ সময় লাগছে। দীর্ঘসূত্রতার নানা কারণে ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। ফলে এক সময় মামলায় আগ্রহ হারিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ভুক্তভোগীরা।
পাচারকৃত নারীদের দুর্দশা
পতিতালয়ে বিক্রি করা ছাড়াও অন্য ধরনের যৌন ব্যবসায়ও পাচারকৃত নারী ও মেয়ে শিশুদের কাজে লাগানো হয়। যৌন পর্যটনের জন্য পাচারকৃত নারীকে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রি করা হয়। পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য এসব নারী ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অনেক সময় ধনী ব্যক্তিরা রক্ষিতা বা সেবাদাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাচার হয়ে যাওয়া নারীদের কিনে নেয়। সেখানে তাদের মুক্তভাবে চলাচল, মত প্রকাশ বা নিজের ব্যাপারে কথা বলারও কোনো অধিকার থাকে না। পাকিস্তানে পাচার হয়ে যাওয়া বেশির ভাগ নারীই শিকার হয় বাধ্যতামূলক শ্রমের। বিশেষ করে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের লোকেরা তাদের কিনে নিয়ে যায় এবং বিয়ে করে। এসব নারী তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম স্ত্রী হিসেবে শস্য উৎপাদন ও অন্যান্য কাজে শ্রম দিতে বাধ্য হয়। মানুষের বসবাসের অনুপযোগী মরুভূমি অঞ্চলে প্রখর রোদে ভেড়া চরানো, পানি টানা ইত্যাদি কষ্টদায়ক কাজ করতে বাধ্য হয়। অর্থনৈতিকভাবে তারা মোটেও লাভবান হয় না। ক্রয় করে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা হয় বলে সামাজিকভাবেও এরা নিগৃহীত হয়। প্রয়োজনবোধে স্বামী আবারও তাকে বিক্রি করে দিতে পারে। অনাকর্ষণীয় দেহ বা চেহারার অধিকারী পাচারকৃত মেয়েদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্রীতদাসী হিসেবে গৃহকার্যে ব্যবহারের জন্য ভারত-পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা কম মজুরিতে, ক্ষেত্রবিশেষে বিনা মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হয়। অনেক নারীকে অশ্লীল যৌন সিনেমায় জোরপূর্বক নিয়োগ করা হয়।
জনশক্তি রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব
জনশক্তি রপ্তানি ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে দেশে জনশক্তি রপ্তানিতে ধস শুরু হয়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ থেকে যেখানে জনশক্তি রপ্তানি হয় ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন, সেখানে ২০০৯ সালে কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জনে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে সবমিলিয়ে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪ জন। আর চলতি বছরের ১৭ মে পর্যন্ত দেশ থেকে এক লাখ ৫৩ হাজার ৬৬১ জন বিদেশে গেছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলেও প্রথমদিকে তারা শুধু নারীকর্মী নিতেই আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দেশে যে হারে বেকারত্ব রয়েছে সে তুলনায় অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান যেমন বাড়ছে না, তেমনি বিদেশি শ্রমবাজারও গত কয়েক বছর ধরে সম্প্রসারিত হচ্ছে না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মতো বাংলাদেশের বড় বিদেশি শ্রমবাজার ২০০৯ সাল থেকেই এক প্রকার বন্ধ। প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সাল থেকে সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হলেও এ হার অতি নগণ্য। মালয়েশিয়ায় যেতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজে ১৪ লাখ মানুষ রেজিস্ট্রেশন করলেও গত দুই বছরের বেশি সময়ে জি টু জি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় গেছে মাত্র সাড়ে ৭ হাজারের মতো লোক। অবৈধ মানবপাচার, বৈধ জনশক্তি রপ্তানি
যদিও ওই সময় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, জি টু জি পদ্ধতিতে এক লাখ কর্মী মালয়েশিয়ায় যাবে। বাকি লাখ লাখ মানুষ মালয়েশিয়া বা অন্য কোনো দেশে যাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে উদগ্রীব হয়ে আছেন। কিন্তু বৈধপথে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরি না হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে বিদেশে যাওয়ার হার সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ট্রলার-নৌকায় চড়ে যারা বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিচ্ছেন বা থাইল্যান্ডের জঙ্গল ও ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার উপকূলে যাদের ভাসতে দেখা যাচ্ছে, তারা মূলত মালয়েশিয়ার উদ্দেশেই দেশ ছেড়েছেন।
কালো তালিকাভুক্ত হতে পারে বাংলাদেশ!
থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতরা বলেছেন, সমুদ্রপথে মানবপাচারের কারণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষুণœ হয়েছে। মানবপাচার বন্ধ করা না গেলে বাংলাদেশকে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে।
তারা জানান, অনেক বাংলাদেশি নিজেদের রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন, যাতে দেশগুলোতে আশ্রয় পাওয়া যায়। যারা এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে উদ্ধার হয়েছেন তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সমুদ্রপথে মানবপাচার বন্ধ করতে মিয়ানমার সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের সমন্বয়ের তাগিদ দেন রাষ্ট্রদূতরা।
সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সমুদ্রপথে মানবপাচার নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে আয়োজিত এক আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠকে রাষ্ট্রদূতরা এসব কথা জানান। ‘মানবপাচার বন্ধে করণীয়’ ঠিক করতে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে যোগ দিতে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতরা ঢাকায় এসেছিলেন। বৈঠকে মানবপাচারের সাথে জড়িতদের বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মানবপাচারের মূল কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা। এর সমাধান হতে হবে। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হচ্ছে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বলেন, এভাবে বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো খুবই ক্ষুব্দ। এর মূল ঘাঁটি মিয়ানমারে। তাই এ রুট দিয়ে মানবপাচার বন্ধে সে দেশের সরকারের সাথে বাংলাদেশের সরকারের সমন্বয় প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় চার রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এ বৈঠক।
মানব ও অর্থপাচার রোধে আইন সংশোধনের উদ্যোগ
মানব ও অর্থপাচার রোধে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য মানব পাচারকে মানি লন্ডারিং অপরাধের আওতায় এনে বিদ্যমান মানি লন্ডারিং আইনের কয়েকটি ধারায় সংশোধনী আনা হচ্ছে। প্রথমে শুধু মানব পাচারকে প্রতারণা হিসেবে আমলে নিয়ে এর সঙ্গে যুক্তদের বিচারের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে এবং সার্বিকভাবে দেশ থেকে অর্থ পাচারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে সরকার। এ জন্য মানি লন্ডারিং আইনে সংশোধনী এনে বিভিন্ন সময় দেশ থেকে পাচারকৃৃত অর্থ ফেরত আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, এ দুই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনের কয়েকটি ধারায় সংশোধনী আনার কাজ হাতে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইতিমধ্যে এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, যা পর্যালোচনা করছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা। এ আইনের আওতায় সর্বোচ্চ সাজা বৃদ্ধির বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা মৃত্যুদ- করা হতে পারে। এ ছাড়া পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের বিধানও যুক্ত করা হচ্ছে মানি লন্ডারিং আইনে। এতে উভয় দেশের সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নিতে নিজ নিজ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কাজ করবে বলে জানা গেছে। সূত্রমতে, বিদেশে লোক পাঠানোর নামে কেউ চোরাই বা অবৈধ পথে মানুষ পাঠালে তা মানবপাচার হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু এসব ঘটনার সঙ্গে সরাসরি আর্থিক লেনদেন জড়িত এ জন্য মানবপাচার অপরাধের আওতায় বিচার করা হবে। এসব ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তি ও মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে এ ধরনের মামলার তদন্ত এবং বিচার সম্পর্কিত মানি লন্ডারিং আইনের কয়েকটি ধারায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রলালয় সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, মানবপাচার রোধ এবং এ ধরনের অপরাধের বিচার করতে সব ধরনের নিয়ম সহজ করা হচ্ছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা রোধ করতে বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করা হচ্ছে। আর এসব মামলার তদন্তসহ পুরো কার্যক্রম ছেড়ে দেওয়া হতে পারে পুলিশ বিভাগের হাতে। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির সভায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শিগগিরই বৈঠকে বসতে যাচ্ছে জাতীয় সমন্বয় কমিটি। এর আগে গত বছররের ২৩ নভেম্বর সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে এ সংক্রান্ত একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে মানি লন্ডারিং আইনের সংশোধনী প্রস্তুত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের ভয়ঙ্কর তথ্য ফাঁস হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে সরকার। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার বন্দিশিবির থেকে সহস্রাধিক বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের সবাই পাচারের শিকার। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংক, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, এনবিআর, সিএসইসি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সিএজি, আইন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে আইনের সংশোধনীর খসড়ায় মতামত দিতে বলা হয়েছে। খসড়াটি অবশ্য প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন,  মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইনের কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বারবার একই অপরাধ চালাচ্ছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোতে পরিবর্তন আনা হবে। এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও অপরাধ-সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তায় এবং বিধিমালা জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কনভেনশন ও রেজুলেশনের আলোকে প্রণীত হয়েছে। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বাংলাদেশ সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ জন্য গত বছর বাংলাদেশ মানি লন্ডারিং বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপের (এপিজি) সদস্য হয়েছে। বিশ্বের ১৮০টি দেশ এর সঙ্গে যুক্ত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে বললেন প্রধানমন্ত্রী
মানবপাচার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ সরকারের প্রণীত মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মানব পাচারের সর্বোচ্চ শাস্তি মত্যুদ- ও যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ-ে বিধানের উল্লেখ করেন তিনি। জাতীয় সংসদের ২৪ জুন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ নেতা  শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। ময়মনসিংহ-২ আসনের শরীফ আহমেদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবপাচার একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং মানব পাচারকারীরা আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মানবপাচার উদ্বেগজনক হারে বাড়ায় কোস্টগার্ডের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। কোস্টগার্ডের টহল বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সমুদ্র পথে বিদেশ গমনকালে ১ হাজার ৭৩৬ জনকে সাগর থেকে আটক করেছে। বিজিবি ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ নাগরিককে উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে নারী ১ হাজার ৯৪ জন, শিশু ৪০৬ জন। ২০১৪ সালে নারী উদ্ধার করা হয় ৮৫২ জন, শিশু ৩১৭ জন। এ ছাড়া ২০১৫ সালে নারী উদ্ধার করা হয় ২৪২ জন এবং শিশু উদ্ধার করা হয় ৪০৬ জন। এই সময়ে ২৭ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়। একই সময় মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ৪৪৮টি মামলা করা হয়েছে।
চাই সমাধান
মানবপাচার রোধে এখনই কার্যকর সমাধান না করতে পারলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অবশ্যই নষ্ট হবে। ইতোমধ্যেই তার প্রভাব পড়েছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব মানবপাচার রোধে সরকারকেই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পাচারকৃত পয়েন্টগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সমাধানের পথ বের করতে হবে। আর পাচারের সাথে জড়িত চিহ্নিত ব্যক্তিদের আইনের আওয়াত এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এ ধারাবাহিকতায় সর্ষেতে যেন ভূত না থাকে তার ব্যবস্থাও সরকারকেই করতে হবে এবং অধিক শক্তিশালী হতে হবে। পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd