ঢাকা : বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • রোহিঙ্গা ইস্যুতে ট্রাম্পের কাছে সহায়তা চাওয়ার কোনো মানে নেই : হাসিনা          দু-এক দিনের মধ্যে চালের দাম কমবে : বাণিজ্যমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের প্রতি আন্তরিকতার কমতি নেই : ওবায়দুল কাদের          রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ত্যাগ করলে অবৈধ বলে গণ্য হবেন : আইজিপি          রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ নৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে : রুশনারা আলী
printer
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ১৭:৫২:৪৩আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ১০:১৭:২২
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিই আমাদের মূল লক্ষ্য : পবন চৌধুরী

 
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব পবন চৌধুরী বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এর নির্বাহী চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, ২০১০ অনুসারে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা। জনাব পবন চৌধুরী গত ৩০ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে বেজা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত বৌদ্ধ পরিবারে ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বিধু ভূষণ চৌধুরী এবং মায়ের নাম প্রতিভা চৌধুরী।

জনাব পবন চৌধুরী ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ১৯৮৬ সালের ২১ জানুয়ারি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে সহকারী কমিশনার হিসাবে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু করেন। কর্মজীবনের শুরুতেই দীর্ঘদিন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ডেপুটি সেক্রেটারি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পুনরায় ২০০৫ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর (ফাইন্যান্স) নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৯৯ সালের আগস্ট থেকে ২০০৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি এবং ২০০৭ সালের জুলাই থেকে ২০১০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের কাউন্সিলর ও মিনিস্টার (পলিটিক্যাল)/সিডিএ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। জনাব পবন চৌধুরী বেজা’র দায়িত্বভার গ্রহণের আগে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডিরেক্টর জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ডেভেলপার ও বিনিয়োগকারীদের জন্য পৃথক প্রণোদনা প্যাকেজ, ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রণয়নসহ সুদূরপ্রসারী কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়ে বেজার কার্যক্রমকে দ্রুত এগিয়ে নেয়ার জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের মাধ্যমে দেশে আগামী ১৫ বছরে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা যাতে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে এই ব্রত নিয়ে জনাব পবন চৌধুরীর নেতৃত্বে বেজা কাজ করে চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে বেজা সারা দেশে ৩৭টি (গভর্ণিং বোর্ড কর্তৃক চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত ২২টি এবং Primary Site Selection Committee কর্তৃক প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ১৫টি) অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে ৪টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় ডেভেলপার নিয়োগে pre-qualification লাইসেন্স বা প্রাক-যোগ্যতাপত্র ইস্যু করেছে এবং দেশের প্রথম PPP (Public Private Partnership) মডেলে মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ডেভেলপার নিয়োগ করেছে। সম্প্রতি জনাব পবন চৌধুরী টাইমওয়াচ প্রতিনিধিকে বেজা’র অগ্রসরমান কার্যক্রম বিষয়ে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো। বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন টাইমওয়াচ সম্পাদক এ কে নাহিদ
টাইমওয়াচ : প্রথমেই আপনার কাছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের শুরুর প্রেক্ষাপট, কর্মপরিধি এবং বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইছি।
পবন চৌধুরী : বাংলাদেশ একটি জনবহুল রাষ্ট্র। এই দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রসারিত করার জন্য বিভিন্ন সুযোগের সৃষ্টি করতে হয়। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরকার ইপিজেড স্থাপন করেছে। দেশের ইপিজেডগুলোতে শুধুমাত্র সীমিত আকারে বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে। তাই সরকার ইপিজেডের সীমাবদ্ধতা কাটানো এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিই আমাদের মূল লক্ষ্য : পবন চৌধুরী
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বেসরকারি ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রথম বেসরকারি ইপিজেড হিসাবে দেশে চট্টগ্রামে কোরিয়ান ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়াতে প্রাইভেট ইপিজেড করার জন্য একটি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে কিন্তু এটি বাস্তবায়িত হয়নি। কোরিয়ান ইপিজেডে বিনিয়োগ হচ্ছে, শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান হচ্ছে। এর ফলে আমরা অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করছি। কিন্তু এর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা গেছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য শিল্পনীতিতে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশই ইপিজেড মডেল থেকে সরে গিয়ে ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা করছে এবং সফলতা পাচ্ছে। আমাদেরকেও ঠিক তেমনিভাবে ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিতে হবে। আর এই লক্ষ্যে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে চলেছে। ইকোনোমিক জোন আইনটি প্রণীত হওয়ার পর দেশে আর কোনো ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হবে না, এটি শিল্পনীতিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে। এ শিল্পনীতির আলোকে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার আরেকটি আইন ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করে। বর্তমানে এর আলোকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
টাইমওয়াচ : দেশে ইপিজেড অ্যাক্ট থাকার পরেও ইকোনোমিক জোন অ্যাক্ট প্রতিষ্ঠিত হলো। ইকোনোমিক জোন অ্যাক্টের আলোকেতো দেশে ইপিজেড রয়েছে, তাহলে এখন ইকোনোমিক জোন অ্যাক্টের আলোকে বেজা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে আপনি মনে করেন কী?
পবন চৌধুরী : ইপিজেড অ্যাক্টের বিধান অনুসারে সরকার ইপিজেড প্রতিষ্ঠা, ব্যবস্থাপনা এবং অপারেট করছে। অর্থাৎ ইপিজেড প্রতিষ্ঠা একটি সম্পূর্ণরূপে সরকারি উদ্যোগ। বলা চলে, এটি সরকারের প্রতিষ্ঠান। যেমন বিসিকের সারা দেশে ৭৭/৭৮টি শিল্প নগরী রয়েছে। বেপজা’র শিল্প নগরী সম্পূর্ণরূপে সরকারের মালিকানাধীন এবং সরকারি সংস্থা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। আমি মনে করি, ব্যবসা-বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ যত কম হবে, তত ভালো। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যে নয়, ক্ষমতার ক্ষেত্রেও ডেলিগেশন যত বেশি হয় কাজ তত বেশি সাবলীল হবে; সেটি সরকারের হোক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের হোক। আমেরিকার একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, “least governance is the best governance”. এখানে সরকার কেন শুধু ব্যবসা করবে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টর লিড রোল প্লে করবে। সরকার এতে সাপোর্টিভ রোল প্লে করবে এবং বিজনেসকে ভধপরষরঃধঃব করবে। এ কারণে ইপিজেড অ্যাক্ট এবং প্রাইভেট ইপিজেড অ্যাক্ট থাকা সত্ত্বেও আরেকটি নতুন আইন হয়েছে। ইকোনোমিক জোন করার জন্য সরকার ৪টি মডেল রেখেছে। একটি হবে- প্রাইভেট ইকোনোমিক জোন। যেমন, কারো জমি আছে। তিনি মনে করছেন, ইকোনোমিক জোন করলে লাভবান হওয়া যাবে। এটি ব্যক্তি মালিক পরিচালনা করবে। সরকার শুধু লাইসেন্স দিবে। আর ডেভেলপ করার জন্য যে বিধিমালা রয়েছে, সেগুলো ব্যক্তি মালিককে পালন করতে হবে। নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হবে। এখানে যারা ইনভেস্ট করবে তারা সেসব সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে, তা হবে লং টার্ম বিজনেস। কারণ একটি ইন্ডাস্ট্রি করলে অল্প সময়ে কেউ ব্যবসা বন্ধ করেন না। বিনিয়োগকারীরা শতবর্ষ ধরে অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসা করবে। যেমন আদমজী জুট মিল, চিটাগাং স্টিল মিল এখন বন্ধ। এজন্য ইকোনোমিক জোন করা হয়েছে। জোন থেকে একটি বিজনেস চলে গেলে আরেকটি বিজনেস আসবে। এটিই হচ্ছে প্রাইভেট ইকোনোমিক জোন মডেল। দ্বিতীয়টি হচ্ছে- পাবলিক প্রাইভেট ইকোনোমিক জোন। অর্থাৎ জমির মালিকানা সরকারের থাকবে। এতে সরকার এবং বেসরকারি অংশীদারত্বে ইকোনোমিক জোন হবে। আরেকটি মডেল হলো স্পেশাল ইকোনমিক জোন যেখানে শুধু গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যাল কিংবা টুরিজ্যমের জন্য জোন। অর্থাৎ স্পেশালাইজড কোনো সেক্টরের জন্য জোন করা। বিজিএমইএ স্পেশালাইজড একটি জোন করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে। এ বিষয়ে চায়নিজ একটি কোম্পানির সঙ্গে বিজিএমইএ চুক্তি করেছে। সরকার নীতিগতভাবে বিশ্বাস করে যে, ব্যবসায়ীদেরই ব্যবসা করা উচিত এবং সরকার তাদেরকে সহায়তা করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারের উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা থাকে। কিন্তু এই পদ্ধতি থেকে সরকার দূরে থাকতে চায়। সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ইপিজেডসমূহে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষতমাত্রায় অগ্রগতি হয়নি। এজন্য বেজাতে সরকারি জোনসহ চারটি জোনের মডেল রাখা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত বছর যখন জাপান, চীনসহ কয়েকটি দেশেদেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিই আমাদের মূল লক্ষ্য : পবন চৌধুরী
গিয়েছিলেন, তখন ওই সব দেশের সরকার এবং সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা আমাদের দেশে ইকোনোমিক জোন করার জন্য খুব আগ্রহ প্রকাশ করে। এজন্য সরকার আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আমরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা ইকোনোমিক জোন দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। যেমন- জাপান জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে ইকোনোমিক জোন করবে। চট্টগ্রামের আনোয়ারাতে চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। এখানে চায়নিজ বিনোয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে পারবে। ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ওই সময় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এবং বাগেরহাটের মংলায় জোন করার জন্য ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে । ইপিজেড প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ হয়নি। গত ৩৪ বছরে দেশে মাত্র ৮টি ইপিজেড এবং একটি প্রাইভেট ইপিজেড হয়েছে। ভারত যখন ২০০৫ সালে ঝঊত অপঃ করে তখন একসঙ্গে ২শ’র উপরে লাইসেন্স দিয়েছে। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামও তাই করেছে। যার ফলে সেখানে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে। যেখানে ২০১৪ সালে ভিয়েতনামের রপ্তানি ১৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, সেখানে আমরা ৩০/৩১ বিলিয়ন ডলারে ঘুরছি।
টাইমওয়াচ : আপনার দৃষ্টিতে, বিনিয়োগ না বাড়ার কারণ কী?
পবন চৌধুরী : বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিনিয়োগ বিকাশের জন্য উপযুক্ত জমি, উন্নত অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় utility services দিতে হবে। দিতে হবে প্রতিযোগিতামূলক প্রণোদনা প্যাকেজ। সরকারের প্রশাসনযন্ত্র বিনিয়োগ সহায়ক হতে হবে। দেশে অন্তত একটি গভীর সমুদ্র বন্দর থাকাও এ ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। এ সব ক্ষেত্রে আমাদের অনেক উন্নতি সাধনের অবকাশ রয়েছে। যেমন- স্যামসাং বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশে ৫শ’ একরের মত জমি চেয়েছিল। তাদের অফারটি নিতে পারলে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগে আকর্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতার ইমেজ অনেক উচ্চ পর্যায়ে যেত। আমরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারিনি। আমরা তাদেরকে জমি দিতে পারিনি। এর থেকে উত্তরণের জন্য আমরা (বেজা) শুরু থেকেই চেষ্টা করছি। যেখানে ৮টি ইপিজেডের জন্য প্রায় ২ হাজার ৩শ’ একর জায়গা রয়েছে সেখানে গত কয়েক মাসের মধ্যে আমরা ইকোনোমিক জোন করার জন্য ৮ হাজার একর জমি নিয়েছি। আশা করছি, আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রায় ২০ হাজার একর জমির মালিকানা অর্জন করবে; যা দেশে শিল্প স্থাপন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিই আমাদের মূল লক্ষ্য : পবন চৌধুরী
টাইমওয়াচ : ইকোনোমিক জোন আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে কী ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে আপনি মনে করেন?
পবন চৌধুরী : আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে- আগামী ১৫ বছরে দেশে ১০০টি ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা করা। জমির জন্য শিল্প হচ্ছে না; এই অভিযোগ যাতে কেউ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করা। আমরা ল্যান্ড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করব। এ পর্যন্ত আমরা ৮ হাজার একর জমি নিয়েছি এবং অচিরেই তা ২০ হাজার একরের ওপরে চলে যাবে। একই সঙ্গে আমরা জমি ডেভেলপ করছি। আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা আছে। তা-না হলে আরও অনেক অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব হত। ইতোমধ্যে আমরা মংলাতে একটি পাবলিক প্রাইভেট ইকোনোমিক জোনের লাইসেন্স, এ কে খান এন্ড কোঃ লিঃ কে নরসিংদীতে, আবদুল মোনেম লিঃ কে মুন্সীগঞ্জে, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজকে নারায়নগঞ্জে ২টি প্রাইভেট ইকোনোমিক জোনসহ মোট ৫টি লাইসেন্স দিয়েছি। লাইসেন্স প্রদানকৃত জোনগুলোর ডেভেলপমেন্টের কাজ শুরু হয়ে গেছে। কিছুদিনের মধ্যে আরো একটি প্রাইভেট ইকোনোমিক জোনের লাইসেন্স দেয়া হবে। অচিরেই আরও দুইটি পাবলিক প্রাইভেট ইকোনোমিক জোন লাইসেন্স ইস্যু করা হবে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা আগামী এক বছরের মধ্যে ১০টি জোন প্রতিষ্ঠা করব এবং এর পরের বছর কমপক্ষে আরো ১০টি জোন প্রতিষ্ঠা করব।
টাইমওয়াচ : এই সকল জোনে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাগণ কীভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছেন বা হতে পারবেন? দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত বিশেষ কোনো বিনিয়োগের সাড়া পেয়েছেন কী?
পবন চৌধুরী : বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। একটি জোন প্রাথমিকভাবে সিলেক্ট হওয়ার পরে বিনিয়োগকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এখানে শিল্প করলে আর্থিকভাবে লাভ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিই আমাদের মূল লক্ষ্য : পবন চৌধুরী
করতে হবে। লাভ না হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকবে না। প্রথমে জমি নিতে হবে। এরপর Initial Sight Assessment I Feasibility Study করতে হবে। এতে প্রায় ১ বছরের মতো সময় লাগে। এরপর ল্যান্ড ডেভেলপ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও একটি বছর চলে যাবে। প্রাইভেট ইকোনমিক জোনের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কিছুটা দ্রুত করা সম্ভব। সরকারি জমি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় পাবলিক প্রাইভেট অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় বরাদ্দ করা হয়। লাইসেন্স দেওয়াসহ সব প্রক্রিয়া শেষ হতে দু’বছর পর্যন্ত সময় লাগে। তবে আমরা সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আমাদের দেশে বিনিয়োগের জন্য অনেক দেশ থেকে প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু জায়গা না পাওয়ার কারণে বিগত দিনে তারা ফিরে গেছে। আমরা যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি তাতে বিদেশিরা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারবে। এতে বেশ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
টাইমওয়াচ : অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো থেকে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা কী ধরনের সুবিধা পাবেন?
পবন চৌধুরী : ইকোনোমিক জোনগুলোতে অনেক বেশি প্রণোদনা বা ইনসেনটিভ দেওয়া হবে। ইপিজেডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ৯০ ভাগ বিদেশে রপ্তানি করতে হয়। ১০ ভাগ দেশে বিক্রির অনুমতি আছে। কিন্তু এখানে ১০০ ভাগই দেশের মধ্যে বিক্রয় করা যাবে। এখানে দুইটি এরিয়া রয়েছে। একটি ডোমেস্টিক প্রসেসিং এরিয়া আরেকটি এক্সপোর্ট প্রসেসিং এরিয়া। এক্সপোর্ট প্রসেসিং এরিয়াতে যারা বিনিয়োগ করবে তারা ৮০ ভাগ বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে এবং ২০ ভাগ দেশে বিক্রয় করতে পারবে। আর ডোমেস্টিক প্রসেসিং এরিয়াতে স্থাপিত শিল্প তাদের পণ্যের ১০০ ভাগই দেশে বিক্রয় করতে পারবে। আবার সে চাইলে বিদেশেও রপ্তানি করতে পারবে। এই সুবিধা অন্য কোনো ইপিজেডে কল্পনাও করা যায় না।
টাইমওয়াচ : অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহের কোন কোন প্রকল্পগুলো দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবে বলে আপনারা আশাবাদী?
পবন চৌধুরী : এ পর্যন্ত আমরা ৫টি লাইসেন্স দিয়েছি। এগুলোর উন্নয়নের কাজ চলছে। এরপর মৌলভীবাজারের শেরপুরে এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল ডেভেলপ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মিরসরাইয়ে আমাদের ৫ হাজার একর জমি আছে।
টাইমওয়াচ : ২০২১ সালের মধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশের স্বপ্ন দেখছি। এক্ষেত্রে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গতানুগতিক কী ভূমিকা রাখবে বলে আপনি মনে করছেন?
পবন চৌধুরী : আমরা গতানুগতিক পথে চলতে চাই না। আমরা আমাদের লক্ষ্য দ্রুত অর্জন করতে চাই। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশ ষড়বিৎ সরফফষব ইনকাম গ্রুপে প্রবেশ করেছে। এটার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা প্রক্রিয়া করতে দুই বছর সময় লেগে যাবে। তখন আমাদের পার-ক্যাপিটা ইনকাম আরও বাড়বে। আমি মনে করি, এখন থেকে দুই বছর পরে পরিপূর্ণভাবে ইকোনোমিক জোনগুলো উৎপাদন শুরু করবে; তখন বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যাবে।দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিই আমাদের মূল লক্ষ্য : পবন চৌধুরী
টাইমওয়াচ : দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে আপনার সুচিন্তিত মতামত কী?
পবন চৌধুরী : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে বিনিয়োগকারীরা কার্যকর ওয়ান স্টপ সার্ভিস এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ পাবে।
টাইমওয়াচ : এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ; আমরা এক অনুসন্ধানে দেখেছি, বাংলাদেশের অনেক উদ্যোগ সরকার এবং বিরোধীদলের মতাদর্শের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে বা বন্ধ হয়ে যায়। এ ধারাবাহিকতায় বেজা’র প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন?
পবন চৌধুরী : এখানে আমার কোনো করণীয় নেই। বেজা’র কোনো করণীয় নেই। এটা একটা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে চমৎকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজমান। আর এটা বিনিয়োগের জন্য সহায়ক। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তনের কোনো প্রভাব পড়বে না। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসুক তারা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন সাধন করবে। আজকে মানবপাচারের শিকার হয়ে অকালে বাংলাদেশের মানুষ প্রাণ দিচ্ছে। এটি রোধ করার একটাই উপায় হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসুক-আশা করি, তারা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন করবে।
টাইমওয়াচ : বেজা’র চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি এ কার্যক্রম কোন পর্যন্ত দেখে যেতে চান। অদূর ভবিষ্যতে কীভাবে দেখতে চান?
পবন চৌধুরী : আমি অর্থনৈতিক জোনগুলোর সর্বোচ্চ সাফল্য কামনা করি। ইকোনোমিক জোনগুলো যেন প্রকৃতই বিনিয়োগকারীদের জন্য সব ধরণের সুবিধা দিতে পারে, বেজা সেই ব্যবস্থা করবে। বেজা’র ওয়ান স্টপ সার্ভিস যেন মডেল ওয়ান স্টপ সার্ভিস হয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেন কোনো অভিযোগ করতে না পারে। আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হবো- আমাদের ইকোনোমিক জোনগুলো বাস্তবায়নে যদি সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সহযোগিতা অব্যাহত থাকে এবং জোনগুলোতে ব্যবসায়ীদের জন্য আদর্শ পরিবেশ বজায় থাকে। শুধুই অর্থনৈতিক জোন নয়, বাংলাদেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ অনেক উন্নত হোক আমি এই আশাবাদ ব্যক্ত করি এবং বেজা এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করুক।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাক্ষাৎকার পাতার আরো খবর

Developed by orangebd