ঢাকা : বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৫ ১১:১৪:০৪আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৫ ১০:৪৭:৪৪
আমরা মধ্যম আয়ের দেশ ও গরিবের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছি
মো. এমরানুল হক চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, উদ্দীপন


 

ক্যারিয়ারের শুরুতেই যে মানুষটি স্বপ্ন দেখেছিলেন গ্রামীণ অবকাঠামো তথা মানবসম্পদ উন্নয়নের, আজ বাস্তবে তাঁর সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে; তিনি আর কেউ নন এনজিও সেক্টরের সফল ব্যক্তিত্ব এমরানুল হক চৌধুরী। তিনি দেশের প্রথম সারির এনজিও উদ্দীপন-এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও। সম্প্রতি টাইমওয়াচ প্রতিনিধি এই সফল উদ্যোক্তার মুখোমুখি হলে তিনি এনজিও সেক্টরের বিভিন্ন সমস্যা-সম্ভাবনা প্রেক্ষিত বাস্তবতার উপর একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চিফ রিপোর্টার কাজল আরিফ
টাইমওয়াচ : উদ্দীপন-এর যাত্রা শুরুর প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইছি।
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : উদ্দীপন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন। এখানে বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম সংগঠিত হয়। তবে আমরা লক্ষ্য করছি যে, যাদের জন্য উন্নয়ন তাদের অংশগ্রহণ খুবই কম, তারা উন্নয়নের সঙ্গে থাকতে পারেনি। এ কারণে আমরা চাইছিলাম তাদেরকে উন্নয়নের সঙ্গে রাখলে উন্নয়ন আরও বেশি ত্বরান্বিত হবে। আর ত্বরান্বিত ছাড়াও তারা উন্নয়নটা গ্রহণ করবে বেশি। এতে উন্নয়ন আরো সঠিক হবে। তাই আমি মনে করি, তাদের উন্নয়নে কী প্রয়োজন, কী ধরনের কৌশল তারা উন্নয়নের জন্য নিতে চান, তাদের কী অংশগ্রহণ থাকবে, তারা কতটুকু কন্ট্রিবিউট করতে পারবে, তাদের আসলে কোন ধরনের উন্নয়ন দরকার- এ বিষয়গুলো উন্নয়নের প্ল্যানিং থেকে শুরু করে উন্নয়ন পর্ব শেষ করা পর্যন্ত রাখা আবশ্যক। জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে উন্নয়ন সঠিক হয়। এ ধারণা থেকেই আমরা গত শতাব্দীর ৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে একটি অর্গানাজেইশন করি, যেখানে জনগণ আমাদের কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে। আমরা এখানে এক্সামপল চেক করতে চেয়েছি। জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা উন্নয়ন করলে এর রূপ কী দাঁড়ায় এবং উন্নয়নের ফলাফল যাতে আরও ভালো হয়। এটা যে উন্নয়নের সংগঠন সরকার যেন এপ্রোচমেন্ট নিতে পারে। এটাই মূলত আমাদের মোটিভ ছিল। দ্বিতীয়ত ছিল পিছিয়ে পড়া অর্থাৎ গরিব জগগণকে ক্ষমতায়ন করা। এতে তারা সমাজে তাদের যোগ্য স্থান পাবে। তার যে মানব মর্যাদা, মানবাধিকার আছে ওই জায়গাটায় সে যেতে পারবে এবং মর্যাদায় যেতে হলে তার যে যোগ্যতা দরকার, তার যে সুযোগগুলো নেওয়া দরকার ওই জায়গাগুলোকে তাকে নিয়ে আসতে হবে। সুযোগগুলো তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে জনগণকে ক্ষমতায়নের জন্য যে কর্মকান্ড নেওয়া দরকার ওগুলো আমরা হাতে নিই। আমরা দূরবর্তী অঞ্চলে অর্থাৎ আগের উন্নয়নগুলো শহরকেন্দ্রিক যেমন- রিসোর্স সেন্টার বেইজড যেখানে বিদ্যুৎ আছে, রাস্তা-ঘাট আছে, এক্ষেত্রে আমরা চিন্তা করেছি একটু দূরবর্তী অঞ্চলে উন্নয়ন দরকার এবং তখনকার দিনে ’৯০/৮০-র দশকে গ্রামের উন্নয়নের যে হার ছিল তার থেকে শহরের উন্নয়ন বাড়ছিল। শহরের রাস্তা-ঘাট, বিদ্যুতায়ন, কর্মসংস্থান হচ্ছিল। যার ফলে অসংখ্য লোকজন গ্রাম থেকে শহরে আসা শুরু করে। তখন আমরা বলেছি, উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে গ্রাম হতে পারে। গ্রামকে সামনে রেখে আমরা উন্নয়ন কর্মকান্ড চালাতে পারি, সে জন্য আমরা গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকান্ড বিষয়টি মাথায় রেখে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে বড় বড় শহর থেকে অনেক দূরে আমাদের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করি। এটা হলো আমাদের শুরুর দিকের ভাবনা। ওই ভাবনার ফলশ্রুতিতে প্রথম দিকে আমরা গ্রামীণ মহিলাদেরকে একেবারে সমাজের নিম্নআমরা মধ্যম আয়ের দেশ ও গরিবের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছি</div><div style= " />
স্তরের মহিলা যার কোনো সমাজে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নেই, সে সমাজে শুধুমাত্র একজন স্ত্রী হিসেবে এবং মা হিসেবে থাকেন; তার পরিবারের যে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড তাতে তার কোনো ভূমিকা নেই। আমরা মনে করলাম, বাংলাদেশের অর্ধেক জনসংখ্যা মহিলা। মহিলাদের যদি উন্নয়নের কর্মকান্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত করা যায় তাহলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। বর্তমানের বাংলাদেশে যে উন্নয়ন এবং আমরা যে মধ্যম আয়ের দেশের স্বপ্ন দেখছি তার প্রধানতম কারণ হলো বাংলাদেশের মহিলাদের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করা। আর এজন্য বেসরকারি সংগঠনগুলো প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। গ্রামীণ মহিলাদেরকে কাজে অংশগ্রহণ করানো আমাদের সমাজের যে ব্যবস্থা সেখানে মহিলাদেরকে স্থান দেওয়ার সুযোগ ছিল না। বিশেষ করে আমাদের ধর্মীয় কিছু বাধা চলে আসছিল এবং এটা এত শক্তভাবে আবদ্ধ ছিল যে ভাঙাও কঠিন ছিল। আমাদের দু’টো চ্যালেঞ্জ ছিল। একটি গরিরের সাথে কাজ করা অন্যদিকে গরিব পরিবারের মহিলাদের সঙ্গে কাজ করা। এসবই চ্যালেঞ্জিং ছিল। আর চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েই আমরা গ্রামের মহিলাদের সহযোগিতা প্রদানের চেষ্টা করি। এই সংগঠন করার প্রথম দিকে আমাদেরকে খুব বেগ পেতে হয়েছে। মহিলাদের কাছে সরাসরি যাওয়া, তাদের সঙ্গে কাজ করা খুব কঠিন ছিল। এজন্য অবশ্য আমরা তাদের স্বামী বা বাবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কাজ করি। আমরা পরিবারের অভিভাবকদের বুঝিয়েছি যে, আপনার পরিবারের একজন মহিলা বছরে ন্যূনতম যদি ১ হাজার টাকা আয় করে তাহলে আপনার জন্য হেল্প হলো, এভাবে তাদেরকে বুঝিয়ে কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করিয়েছি, এভাবেই আমরা যাত্রা শুরু করি। পরবর্তীতে আমরা মহিলাদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। পাশাপাশি পরিবারের পুরুষদের এবং সমাজের নেতৃবৃন্দের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিই। আমরা টার্গেট নিয়েছি, এতে পুরুষরা এবং সমাজের নেতারা যেন মহিলাদের সহযোগিতা করে। আর এটা আমাদের জন্য খুবই কাজে দেয়। আজকে বাংলাদেশের উন্নয়নের দিকে তাকালে দেখা যাবে, মহিলাদের অংশগ্রহণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। দেশে গার্মেন্ট সেক্টর থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টরে মহিলাদের অবদান কোনো অংশে কম নয়। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, মহিলারা সব সেক্টরে অনেক কাজ করে। তারা লেখাপড়া শিখে দক্ষতা অর্জন করে কাজে আসছে। আর আমাদের দেশের মহিলাদের অরিজিনাল একটা দক্ষতা রয়েছে সেটি মানবিক গুণাবলী। মহিলাদের কাজ করার স্পৃহা আছে। এ স্পৃহাকে কাজে লাগিয়ে এবং তাদের যা সম্পদ আছে সেসব কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের মহিলারা পরিবারের উন্নয়নের জন্য সম্পৃক্ত হয়।
টাইমওয়াচ : আপনারা কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেন?
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : বাংলাদেশে আমরা মূলত দু’ধরনের কাজ করি। একটি হলো- মানবাধিকার বিষয়, এখানে আমরা গণতান্ত্রিক এ দেশের মানুষের যে অধিকারগুলো আছে- সেগুলো নিয়ে কাজ করি। বলতে পারেন আমরা কীভাবে কাজ করি। আমরা এ অধিকারগুলো সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করি। গ্রামে-গঞ্জে সব এলাকার মানুষ নিয়ে কাজ করি। বিভিন্ন গ্রামভিত্তিক, পাড়াভিত্তিক সভা করে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করি। এটার মধ্য দিয়ে জনগণকে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গ্রামভিত্তিক, পাড়াভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ করে কাজে সম্পৃক্ত করি। বাংলাদেশে বিভিন্ন অধিকারের আইন আছে যেমন- শিশু অধিকার আইন, নারী অধিকারের বিভিন্ন আইন, এসব নিয়ে আমরা সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনা করি। সরকারের সঙ্গে এক ধরনের অ্যাডভোকেসি করে সরকারের সাথে কাজ করি। যেখানে আইন নেই সেখানে সরকারকে আইন করার জন্য অনুপ্রাণিত করি। যেমন- আমরা সেই সিডাউন থেকে বর্তমানের বাল্যবিবাহ নিরোধক আইন যে হতে যাচ্ছে- এইসব জায়গায় অধিকারের সাথে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ ও গরিবের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছি</div><div style= " />
ইনভলবমেন্ট থেকে সরকারকে বুঝিয়েছি। আমরা মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করি। নারী অধিকার, শিশুদের অধিকার, সমাজের নির্যাতিতদের অধিকার, প্রতিবন্ধীদের অধিকার, আদিবাসীদের অধিকার এসব বিষয় নিয়ে একইভাবে কাজ করছি। একদিকে এসব বিষয়ে সরকারকে সচেতন করি, অন্যদিকে তাদের অধিকার বিষয়ে অধিকারহীনদের সহায়তা করি। পাশাপাশি সরকারকে পলিসি করার ব্যাপারে সহায়তা করি। আমরা বিশেষকরে গরিব মানুষের সাথে কাজ করি। গরিব মানুষকে আমরা কাজ করার জন্য পুঁজি দিই। ন্যাচারালি বাংলাদেশে কিন্তু এত মানুষকে চাকরি অথবা শ্রমের সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সে যদি নিজেই কাজের সাথে জড়িত হতে পারে, উৎপাদনের সঙ্গে যাতে যুক্ত হতে পারে এজন্য তাদেরকে সহায়তা করি। সে যদি বর্গাচাষী হয় বা পশুপালন করে আমরা তাদেরকে পুঁজি দিয়ে সহায়তা করি। যাতে তারা তাদের কাজে ভালো ফলন পায় এবং তা যেন সঠিক সময়ে পায়। এ ধরনের কাজ থেকে কৃষির সাথে অন্যান্য যে কাজ আছে যেমন- ফিসারিজ, লাইভ স্টক এসব বিষয়ে তাদেরকে আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। বিভিন্ন টেকনোলজি সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছি। কিভাবে উন্নত জাতের মাছ চাষ করা যায়, কিভাবে উন্নত জাতের ফলন হয় আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আরেকটি বিষয় হলো প্রকৃতির উপর যাতে কোনো বিরুদ্ধাচরণ না হয় সেদিকে আমরা লক্ষ্য করি। যেমন- পরিমিত সার ব্যবহার করা। আবার গ্রামীণ প্রোডাক্টগুলো বাজারজাত করায়ও আমরা সহায়তা করি। প্রোডাক্ট যাতে উন্নত হয় আবার সেটি যেন খুব সহজে বাজারজাত হয় প্রভৃতি বিষয় আমরা অবলোকন করি। এসব করার জন্য আমরা তাকে পুঁজি অর্থাৎ ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করি। বাংলাদেশে আমরা একটা সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করি। শিশুদের উন্নয়নের জন্য আমরা শিক্ষা কার্যক্রম, মায়েদের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কার্যক্রম পরিচালনা করি। গণতান্ত্রিক বিষয়, ভোটের বিষয়ে সচেতন করি। একটা অসচ্ছল বা গরিব পরিবার সমাজের মধ্যে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে সেসব বিষয় নিয়ে কাজ করি। সমাজের নি¤œবিত্ত পিছিয়ে পড়া লোকদের সামনের দিকে চলতে সহায়তা করি।
টাইমওয়াচ : দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে উদ্দীপন কী ধরনের অবদান রাখছে?
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : আমরা পরিবারকেন্দ্রিক ও মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন করি। এর জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা প্রদান করি। স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য পুঁজি সরবরাহ করি। পুঁজির ব্যবহার করে যে প্রোডাক্ট তারা তৈরি করছে সেটি বাজারজাতকরণে সহায়তা করি। গ্রামীণ অর্থনীতি হচ্ছে কৃষিভিত্তিক। আমাদের কাজ হচ্ছে কৃষির বিভিন্ন জায়গায় গরিব মানুষকে সহায়তা করা। সে যেন কৃষিতে সম্পৃক্ত হয়ে শ্রমিক হিসেবে না থেকে কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে যেন নিজেকে জড়িত করতে পারে। নিজের জমি না থাকলে সে যেন বর্গা জমি নিতে পারে সে জন্য পুঁজি দিয়ে সহায়তা করি। এই পুঁজি ব্যবহার করে প্রোডাক্ট যেন সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারে তার ব্যবস্থা করি। এছাড়া আমরা গ্রামের কয়েকটি বিষয় যেমন- মঙ্গা এলাকায় বছরের একটা সময়ে কোনো কাজ থাকে না। আমরা এগ্রিকালচারাল ইকোনোমির বাইরে এসে তাদেরকে পুঁজি সরবরাহ করি। সেখানে সে পুঁজি ব্যবহার করে কিছু আয় করতে পারে এবং মঙ্গার সময় যেন কষ্টে দিনাতিপাত না করে। মঙ্গার সময় বিশুদ্ধ পানির যে অভাব থাকে ওই পানির জন্য আমরা ডিপ টিউবওয়েল সরবরাহ করি। যেখানে স্যালো টিউবওয়েল দিয়ে পানি তোলা যাবে সেখানে স্যালো টিউবওয়েল সরবরাহ করি। এটা দিয়ে আবার ইরিগেশনেরও ব্যবস্থা করি। বসত ভিটায় মানুষ যাতে সবজি চাষ করতে পারে, উন্নতমানের গাভী পালন করতে পারে, হাঁস পালন করতে পারে প্রভৃতি বিষয়ে সহায়তা করি। তাদেরকে হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দিই। আমাদের ‘সমৃদ্ধি’ নামে একটা প্রোগ্রাম আছে। এখানে আমরা চাইছি একটা গ্রামকে টার্গেট করে ওই গ্রামের সবাইকে নিয়ে একটা প্ল্যানিং করা। ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণির মানুষ যেমন- শিক্ষিত, অশিক্ষিত, পুরষ-নারী, শিশু সবাইকে নিয়ে এ প্ল্যানিং করবো। সবাইকে নিয়ে গ্রামের সব রিসোর্সের তালিকা করবো। সেখানে স্কুল, রাস্তা-ঘাট আছে কিনা, উন্নয়নে বাধা কি কি আছে, ন্যাশনাল ক্লাইমেটিস আছে কিনা বিশ্লেষণ করবো। এগুলো ম্যাপিং করে ওখানে আমরা বের করবো সেসব জায়গায় কি কি অভাব আছে আর কি কি সম্পদ আছে। এসব সম্পদের সদ্ব্যবহার কিভাবে করা যায়, আর যেগুলোর অভাব আছে সেগুলোর পূরণ কিভাবে করা যায়। আবার কিছু সম্পদ পাওয়া যাবে ধনীদের আন ইউজ সম্পদ। সেক্ষেত্রে ধনীদের বুঝাবো যে, আপনার আন ইউজ সম্পদ পাশের বাড়ির অভাবী লোককে দিয়ে দেন, সেখানে আমরা পুঁজি দিব। অভাবী মানুষ কিছু আয় করুক। তার আয়ের অংশ থেকে প্রয়োজনে আপনি কিছু নিন। সেখানে রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন করবো। স্কুল-কলেজ ভাঙা থাকলে তার আমরা মধ্যম আয়ের দেশ ও গরিবের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছি</div><div style= " />
মেরামত করবো। টিউবওয়েল যেখানে নষ্ট হয়ে গেছে তার ব্যবস্থা করবো। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার না থাকলে ডাক্তারের ব্যবস্থা করবো। এ ধরনের প্রোগ্রাম আমরা হাতে নিয়েছি। জনগণের যা আছে তার সাথে বাইরে থেকে কিছু সহযোগিতা করলে ধাপে ধাপে তাদের উন্নয়ন হবে।
টাইমওয়াচ : উদ্দীপন বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এতে কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন কী?
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : দেশের উন্নয়নের প্রধান দায়িত্ব সরকারের। এক্ষেত্রে বেসরকারি সংগঠনগুলো যখন গ্রাম পর্যায়ে কাজ করতে যায় সেক্ষেত্রে বেসরকারি সংগঠনগুলোর সাথে সরকারের যদি ভালো যোগাযোগ না থাকে তাহলে এক ধরনের গ্যাপ সৃষ্টি হয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উন্নয়নের একটা পূর্বশর্ত। গণতন্ত্রের বিষয়ে যখন আমরা মানুষকে সচেতন করি তখন পলিটিক্যাল যারা আছেন তারা কিন্তু বিষয়গুলো অন্যভাবে দেখতে পারেন। কিন্তু পরে যখন সবাই আমাদের কার্যক্রম বুঝতে পারে তখন লোকজন আমাদের কাজের সঙ্গে নেতৃত্বে চলে আসে। আমি যে বিষয়টি বললাম এটাকে বাধা বলছি না। এটাকে বোঝার ভুল বলা যায়।
টাইমওয়াচ : দেশের বিভিন্ন এনজিও’র কর্মকান্ড নিয়ে বিভিন্ন মহলে নেতিবাচক আলোচনা সমালোচনা হয়ে থাকে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : সমালোচনা নেগেটিভ কোনো বিষয় নয়। এনজিওগুলো যদি মানুষের ভালো কাজে না আসে তাহলে এনজিওদের সমালোচনা হওয়া উচিত। তবে অনেকসময় ভুল বোঝবুঝি হয়। যেমন- সিডরের সময়ে যেদিন ঘূর্ণিঝড় হলো ওইদিনই সকালে আমাদের লোকজন গ্রামে গেছেন। খাবার পানি, চিড়া, ওষুধপত্র, খাবার নিয়ে গ্রামে গেছেন। সেই সময় আমরা ঢোল পিটিয়ে লোকজনদের কিস্তি দেওয়ার কথা বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু আমাদের লোকজন যখন ওখানে যায় তখন অনেকে তাদের ভুল বুঝেছে যে আমরা কিস্তি আনতে যাচ্ছি। এখানে সমালোচনা হতে পারে। সেখানে আমরা কিস্তি আনতে যাইনি বরং বিনা সুদে, বিনা সার্ভিস চার্জে পুঁজি, খাবার, ওষুধ সরবরাহ করেছি। এটাকে আমি সমস্যা বলছি না। আসলে এটা একটা গুড কমিউনিকেশনের অভাব।
টাইমওয়াচ : আপনার দৃষ্টিতে, দেশের এনজিও খাতে বর্তমানে কোনো রকমের সমস্যা রয়েছে কী? এক্ষেত্রে সরকারের সহায়তার ধরন কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : সরকার এনজিওদের জন্য নতুন অ্যাক্ট করতে যাচ্ছে। আমি মনে করি, এ আইনটি ভালো। তারপরও এ আইনের ড্রাফট নিয়ে মন্ত্রীদের সাথে আরও একটু আলোচনা করা দরকার। ট্রাস্ট ব্যুরো আছে, স্যোশাল অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ডিভিশন আছে, মাইক্রোক্রেডিট অথোরিটি আছে- এসব অথরিটি নিয়ে ব্যুরো অথবা মিনিস্ট্রির সাথে এনজিওদের যে ফোরামগুলো আছে তাদের যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। নেটওয়ার্ক জোরদার করা দরকার। সরকার যেমন উন্নয়নের জন্য দাবিদার ও দায়িত্ববানÑ তেমনিভাবে এনজিওগুলোও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই দুই জায়গায় যদি আরও সমন্বয় বেশি হয়, যোগাযোগ বেশি হয় তাহলে জনগণের উন্নয়নে আরও বেশি সহায়তা হবে। আরেকটি বিষয় হলো আমাদের ফান্ড দরকার। এ জাতীয় উন্নয়নের জন্য তহবিলের যোগান বাংলাদেশে এখন খুব কঠিন। বাইরে থেকে বিদেশি সংস্থাগুলো আগে যে সহায়তা দিতো এটা অঙ্কে কমেনি কিন্তু‘ প্রফেশনালি কমে গেছে। অঙ্কে ১৯৯০ সালের দিকে যেমন ছিল তার থেকে আরও বেড়েছে। তবে তহবিল পাওয়া একটু কঠিন হয়ে গেছে। এখানে ফান্ডের বিষয় এখন অনেক চ্যালেঞ্জ।আমরা মধ্যম আয়ের দেশ ও গরিবের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছি</div><div style= " />
টাইমওয়াচ : দেশে দারিদ্র্য বিমোচনে এনজিও’র ভূমিকা কতোটুকু?
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : বাংলাদেশে হিসাব আছে যে, জিডিপি গ্রোথ প্রায় ৬ এর বেশি। মাইক্রোক্রেডিটের ফলে আমাদের যে হিসাব তাতে ৬ পারসেন্টের যে গ্রোথ এটাকে একশ ধরলে একশ’র মধ্যে প্রায় ১৫ ভাগ মাইক্রোক্রেডিটের অবদান। জিডিপি গ্রোথে আমাদের বড় অবদান রয়েছে। অর্থাৎ জিডিপি গ্রোথে ১৫ ভাগ অবদান আমাদের। ৬ এর মধ্যে প্রায় ১ ভাগ অবদানই হচ্ছে এনজিগুলোর। মাইক্রোক্রেডিট যদি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকদের সহায়তা না করতো তাহলে কোনোমতে এ উন্নয়ন সম্ভব হতো না। আর দেশও উপকৃত হতো না। আমরা আজকে যে মধ্যম আয়ের দেশ বলছি এটা এনজিও ও মাইক্রোক্রেডিটের ফাইন্যান্স ছাড়া কোনো মতে সম্ভব ছিল না। কারণ প্রতি বছর সেলফ অ্যামপ্লয়মেন্টে প্রবেশ করে ১৯ লাখ লোক। এনজিও ছাড়া এত লোকের কর্মসংস্থান কিছুতে সম্ভব ছিল না বা হয় না। এগুলোতে এনজিওসমূহ বেশ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে এনজিওগুলোর বড় ধরনের ভূমিকা আছে। ১৯৯০ সালে আমাদের পোভার্টির হার ছিল প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। এটা ২০১০ এর দিকে হয় ৩১ ভাগ। ২০১৪ সালে পোভার্টির হার হয় ২৬। এখন দেশে দরিদ্র মানুষের উন্নয়ন হচ্ছে বলে দারিদ্র্যের হার কমছে। আজকে কারো ভাতের অভাব নেই। সবাই ভাতে কাপড়ে ভালোভাবে বাঁচতে পারছে। এখানে এনজিওদের অবদান রয়েছে অনেক। আমাদের একটা সুযোগ আছে যে, আমরা গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে উন্নয়ন করতে পারি। যেটা সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় না। কোনো ব্যাংকের পক্ষেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহায়তা করা সম্ভব নয়।
টাইমওয়াচ : অনেকেই বলেন, কিছু কিছু এনজিও কর্তৃক ক্ষুদ্র ঋণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরো অধিক দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ করে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের সাথে প্রায় ৩ কোটি পরিবার জড়িত। এর মধ্যে সরাসরি ২ কোটি পরিবার জড়িত। ক্ষুদ্র ঋণের সেক্টর থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা মাঠে দেওয়া আছে। ক্ষুদ্র ঋণের সেভিংস রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এত সংখ্যক পরিবার, এত হাজার কোটি টাকার বিষয় আবার তাদের সেভিংস রয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এটা কোনো দিনও হতো না যদি এই কর্মকান্ড তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হতো। ক্ষুদ্র ঋণের কারেন্ট আদায় হার প্রায় ৯৯.৫০। দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ প্রশ্ন আসলে গত ২০ বছর ধরে কিভাবে আমাদের কার্যক্রম সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আসলে এখানে এমনটি যারা ধারণা করে থাকেন তাদের তথ্যের অভাব আছে এবং দৃষ্টিভঙ্গির অভাব আছে। এটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
টাইমওয়াচ : আমরা জানি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অর্থনৈতিক অন্তর্ভূক্তিকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে নানামূখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা কি?
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : ক্ষুদ্রঋণ নিজেই অর্থনৈতিক অন্তর্ভূক্তির একটি বড় উপাদান এবং বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। কারণ ক্ষুদ্র ঋণের যারা গ্রাহক (ঈষরবহঃ) তারা কিন্তু মূল স্রোতধারার যে সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের দ্বারা সমর্থনপুষ্ট নয়। কারণ তারা ব্যাংক ঋণ গ্রহণের জন্য জামানত দেয়ার মতো পর্যাপ্ত সম্পদের অধিকারী নন এই কারণে তারা ঋণ পেতেও সমর্থ হন না। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলো এই ধরনের গরিব জনগণকে গ্রাহক হিসাবে চিহ্নিত ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করে কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। ক্ষুদ্রঋণ, সঞ্চয়, বীমা সহায়তা, রেমিট্যান্স, মোবাইল ব্যাংকিং, কৃষকের ১০ টাকার বাংক একাউন্ট, গরিব ছাত্র/ছাত্রী ও শিশুদের ব্যাংকিং সহায়তা- এ সকল কর্মকাণ্ডে সরাসরি সহযোগিতা করছে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চলের ৩ কোটি জনগোষ্ঠীকে সবধরনের সহায়তা দিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকার যদি একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী কৌশলগত নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করে সে ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ আমরা মধ্যম আয়ের দেশ ও গরিবের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছি</div><div style= " />
সংস্থাগুলোর কর্মকান্ড আরো গতিশীল ও সহজ হবে এবং আরো অধিক সংখ্যাক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্তিকরণ সহজতর হবে।
টাইমওয়াচ : দেশের এনজিও খাতের উন্নয়নে আপনার সুচিন্তিত মতামত প্রত্যাশা করছি।
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : আমি সরকারকে আগেও বলেছি যে, এনজিওদেরকে কিছু প্রেগমিটিভ দিতে হবে। এনজিওদের জন্য ফ্রেন্ডলি আইন করা উচিত। সহজে যেন এনজিওদের কাছে সরকার পৌঁছতে পারে এজন্য যোগাযোগের মাধ্যমগুলো আরও স্ট্রং করতে হবে। পলিটিক্যাল ব্যক্তিবর্গ যেন এনজিওকে সঙ্গে নেয়। এনজিওদের ক্ষমতায় যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। আমরা গরিবের ক্ষমতায়নের জন্য সহায়তা করি কিন্তু এনজিওরা কখনো ক্ষমতায় যাবে না।
টাইমওয়াচ : উদ্দীপন নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মো. এমরানুল হক চৌধুরী : রাইট বেইজড প্রোগ্রামগুলো আমরা আরো বাড়াতে চাই। জনগণকে সচেতন করা, জনগণকে মেমোরাইজ করা আমাদের বিশেষ লক্ষ্য। কিছুদিন আগে সিলেটে শিশু রাজনকে যেভাবে হত্যা করলো তা খুবই মর্মান্তিক বিষয়। হত্যাকারী মনে করেছিল সে নিস্তার পাবে। হত্যাকারীকে আইন ছাড়েনি। আইন সম্পর্কে সচেতনতার বিষয়গুলো আমরা আরো বেশি করে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবো।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাক্ষাৎকার পাতার আরো খবর

Developed by orangebd