ঢাকা : বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • ডেঙ্গু এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে : কাদের          ঈদে হাসপাতালের হেল্প ডেস্ক খোলা রাখার নির্দেশ          নবম ওয়েজ বোর্ডের ওপর হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা           বন্দরসমূহের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৭:৪৬:০১
আজও কাঁদছে বেনাপোল, স্মৃতি ভুলতে পারেনি কেউ!
এম এ রহিম, বেনাপোল


 


সেদিনের স্মৃতি নিয়ে আজও কাঁদছে বেনাপোলের মানুষ। স্মৃতি ভুলতে পারেনি কেউ! নির্বাক ও বাকরুদ্ধ নিহতের স্বজনরা।
অকালেই ঝরে গেছে প্রস্ফুটিত ৯টি গোলাপ; আছে শুধু তাদের স্মৃতি। সেদিনের দগদগে ক্ষত শুকায়নি আজও। মুজিবনগরে বনভোজন শেষে বাড়িতে ফেরাকালে ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যশোরের চৌগাছা ঝাউডাঙ্গায় এক পুকুরের পাশে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষার্থী। সন্তানহারা স্বজনরা সহ এলাকাবাসির আহাযারিতে  সেদিন বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পুরো বেনাপোলে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহপাঠী শিক্ষক ও পরিবারের সদস্যদের আহাজারি থামেনি আজও। তাদের স্বরনে বেনাপোল সরকারি প্রাইমারী স্কুলের সামনে নির্মিত হয়েছে স্মৃতি স্তম্ভ। সকালে বেনাপোল পৌরসভার আয়োজনে অনুষ্টিত হবে শোকর‌্যালি,দোয়া ও আলোচনা সভা।  
সেদিনের স্মৃতি আজও তাড়া করে সহপাঠি ও পরিবারের সদস্যদের। দুর্বিষহ স্মৃতি ভুলতে পারেনি কেউ। বেনাপোলবাসী কাঁদছে আজও। নিহতদের স্মরণে ১৫ ফেব্রুয়ারি বেনাপোল পৌর শোক দিবস পালিত হচ্ছে। উন্মোচিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। তবে নিহত পরিবারের সদস্যরা কেমন আছে খোঁজখবর নিয়েছে কি কেউ! অনেক পরিবারের সদস্যরা জানেনা তাদের সন্তানদের জন্য দোয়া ও শোক র‌্যালির আয়োজন করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। রাতে ঘুমাতে যেয়ে ও  স্কুাল এলেই বন্ধুদের স্মৃতি মনে পড়ে; মন বসে না লেখাপড়ায় বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।
রুনা ও মিথিলা তারা দু বোন মাকে হারিয়েছে ৩ বছর আগেই। বাবা নেই তাদের নানার বাড়িতে থেকে সাধ করেই ৭১ স্মৃতিবিজড়িত মুজিবনগরে সহপাঠিদের সাথে বনভোজনে যায় তারা। নানীকে বলেছিল- নানী তোমার ঘট থেকে আমাদের টাকা দাও আমরা ভ্রমণে যাব। এদিন সেজেছিল নতুন সাজে। তারা ফিরেনি আর। ফিরেছে সাদা সাজে। আর ফিরবে না কোনদিন। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় মিথিলা আঁখি, মাসুমা সুমাইয়া, সাব্বির ঝর্না, শান্ত, একরামুল ও ইয়ানুর। একে একে শিশু শিক্ষার্থীদের নিহতের রাতে খবর পোঁছে বেনাপোলে। মুহূর্তেই বাঁধভাঙা আহাজারিতে বেনাপোলের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। অশ্রুবন্যায় ভেসে যায় বেনাপোল ছাড়িয়ে সমগ্র দেশ। বেনাপোলে ছুটে আসেন প্রাথমিক গণশিক্ষামন্ত্রীসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সেদিনের স্মৃতি আজও তাড়া করে বেনাপোল বাসীকে।
আজ নিহতদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ¢। পৌরসভার আয়োজনে পালিত হবে শোকদিবস। নিহতের পরিবারকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। স্কুলটি দ্বিতল ভবনে উন্নত করা হয়েছে, সরকারিকরণ করা হয়েছে ছোটআঁচড়া গ্রামের প্রাইমারি স্কুলটি। তার পরও পরিবারের দাবি ফিরে পাবে কি তাদের সন্তানদের। আর কোন দিনও ফিরবে সোনামনিরা। সাধ ছিলে আদরের ছেলে ইজ্ঞিনিয়ার হবে। পিতামাতার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে না কোনদিন। শিক্ষক, শিক্ষাথী ও সহপাঠিরা সেদিনের কথা স্বরণ করতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে তারা। তবে পৌর মেয়রের সার্বিক সহযোগিতা ও পরিবারের প্রতি আন্তরিকতরা প্রশংসা করে নিহত পরিবারের সদস্যরা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত স্কুল শিক্ষিকা ফতেমা খাতুন বলেন,৭১ স্মৃতিবিজড়িত মুজিবনগরে সহপাঠী ও শিক্ষার্থীদের সাথে বনভোজনে যান তিনি। তার চোখে সামনেই একে একে ঝরে পড়ে ছোটআঁচড়া গ্রামের ৭টি তাজা গোলাপ; পরে হাসপাতালে মারা যায় আরো দুইটি শিশু।। এ দৃশ্য দেখার নয়। ভুলার নয় তাদের স্মৃতি বলেই হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলেন তিনি।
বেনাপোল প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. মোজাফ্ফর হোসেন এন্টুনী বলেন, তাদের স্মৃতিতে স্মৃতি সৌধ হয়েছে। স্কুল দ্বিতল ভবন হয়েছে; তবে আর কোনদিনও ফিরে পাব না সেই মেধাবী শিক্ষার্থীদের।
পৌর কাউন্সিলর আলহাজ্ব মিজানুর রহমান জানান, শিক্ষার্থীদের কথা বলতেই আবেগ-আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, মরে যাওয়া শিশুদের কথা বলার নয়; বলা যায় না। অকালেই ঝরে গেলো ৯টি তাজা গোলাপ।
নিহত মিথিলা ও সুমাইয়ার সহপাঠী শিক্ষার্থী ইতি খাতুন, মহুয়া আক্তার ও নাইসা বলেন, আজ আমরা স্কুলে আসতে পারি না। লেখাপড়ায় মন বসে না; শুধু মনে ভাসে তাদের স্মৃতি। বলতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন তারা। এসময় আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ে সবাই। তাদের চোখের ভাষা বন্ধুকে ছাড়তে চায় না কেউ।
নিহত ঝর্নার মা লিপি খাতুন বলেন, আর কোন দিন ফিরে পাবো না সোনামনিদের। আপনার তাদের জন্য দোয়া করবেন- বলেই চোখের পানিতে বুক ভেসে যায় তার। আর বলতে পারেননি কথা।
একরামুল ইসলামের ছোট মা জাহানার খাতুন ছলছল চোখে জানান, তাদের পরিবারে একটি মাত্র ছেলে। সে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন লাইটের বেটারি নিয়ে ইলেক্ট্রিক জিনিস বানাতো। জলতো আলো। আজ তাদের প্রদীপ নিভে গেছে। তাদের স্বপ্ন ছিল সে একদিন ইজ্ঞিনিয়ার হবে সে স্বপ্ন্ পূরণ হবে না কোনদিন।
আসাদুজ্জামান শান্তর বাবা লোকমান হোসেন বলেন, সরকার ও পৌর মেয়র সাহেব তাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। তবে সেদিনের দগদগে ক্ষত শুকায়নি আজও। আর কোন দিন পাবো না আদরের সন্তাকে। তারা আজই শুধুই স্মৃতি। বলতেই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুজল।
বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন জানান, বেনাপোলবাসী আজও কাঁদছে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের স্মৃতিতে। এ অপূরণীয় ক্ষতি ভোলার নয়। ভোলা যাবে না। পূরণ হবে না মেধাবীদের শূন্য আসন। মা ও বাবারা পাবে না আদরের লালিত সন্তানদের। আজ সরকার ও পৌরসভার পক্ষে তাদের সাহায্য ও স্মৃতি রক্ষায় স্মৃতিস্মম্ভ করা হয়েছে। তবে সেদিনের স্মৃতি ভুলেনি কেউ। আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি শহীদ শিক্ষার্থীদের স্মরণে শোকর্যালি হচ্ছে। হবে দোয়া ও স্মরণ সভা। তারা জান্নাতবাসী হোক কামনা এলাকাবাসির।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd