ঢাকা : বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • রোহিঙ্গা ইস্যুতে ট্রাম্পের কাছে সহায়তা চাওয়ার কোনো মানে নেই : হাসিনা          দু-এক দিনের মধ্যে চালের দাম কমবে : বাণিজ্যমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের প্রতি আন্তরিকতার কমতি নেই : ওবায়দুল কাদের          রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ত্যাগ করলে অবৈধ বলে গণ্য হবেন : আইজিপি          রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ নৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে : রুশনারা আলী
printer
প্রকাশ : ১৯ জুলাই, ২০১৬ ১৫:১৩:৩২আপডেট : ১৯ জুলাই, ২০১৬ ১৫:৩৩:৪৩
ব্যাংক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি, চেয়ারম্যান, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)

 

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) একটি সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংক। রাজশাহী বিভাগের কৃষির অপার সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণরূপে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে এবং প্রাতিষ্ঠানিক উৎস হতে প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণ সরবরাহের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের রাজশাহী প্রশাসনিক বিভাগে অবস্থিত ২৫৩টি শাখা ও কার্যালয় অঙ্গীভূত করে এবং সমস্ত দায় ও সম্পদ গ্রহণ করে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ১৯৮৬ সালের ৫৮ নম্বর অধ্যাদেশবলে ১৯৮৭ সালের ১৫ মার্চ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান সরকার উক্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে গত ৩ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক আইন-২০১৪ জারি করার পর রাকাব এ আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ৩৭৮টি শাখার মাধ্যমে বর্তমানে রাজশাহী ও রংপুর প্রশাসনিক বিভাগে এই ব্যাংকের কার্যক্রম বিস্তৃত। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে এ অঞ্চলের কৃষক ও কৃষির সকল মৌলিক খাত ও উপখাতের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে রাকাব অর্থায়ন করে থাকে। এছাড়া কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, এসএমই, ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ঋণ বিতরণ ছাড়াও সকল প্রকার বাণিজ্যিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি ২০১০ সালের ২২ জুলাই হতে ২০১৩ সালের ২১ জুলাই পর্যন্ত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। রাকাবকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলিকে আরও তিন বছরের জন্য ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছেন। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই রাকাব-এর চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন শেষ হবে। ইতিমধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ড. এম শাহ্ নওয়াজ আলিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পূর্ণকালীন সম্মানিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি গত ১৭ জানুয়ারি ২০১৬ থেকে এ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তিনি অগ্রসরমান বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। ড. শাহ্ নওয়াজ দুই মেয়াদে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি তিনি রাকাব এ যোগদান থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর টাইমওয়াচকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চিফ রিপোর্টার কাজল আরিফ
টাইমওয়াচ : আপনি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে যোগদানের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি : সদাশয় সরকার আমাকে গত ২২-০৭-২০১০ হতে ২১-০৭-২০১৩ পর্যন্ত তিন বছরের জন্য রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) পরিচালনা ব্যাংক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পর আমি ব্যাংকের সার্বিক বিষয়াদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাপূর্বক মূল সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করে সেগুলো উত্তরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করি। এর ফলে আমার সময়কালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। সেগুলো হলো-
ব্যাংকে বাস্তবসম্মত এবং উপযুক্ত একটি জনবলকাঠামোর (অর্গানোগ্রাম) অভাবে পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে স্থবিরতা বিরাজ করছিল। বিষয়টি উপলব্ধি করে পর্ষদের পক্ষ থেকে একটি নতুন ও সম্প্রসারিত অর্গানোগ্রাম অর্থমন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কৃষকবান্ধব সরকার অতি স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ৫৯৮২ জন জনবল বিশিষ্ট একটি অর্গানোগ্রাম গত ২১ জুলাই ২০১১ তারিখে অনুমোদন করেন। এখানে উল্লেখ করতে চাই পূর্বের অর্গানোগ্রামের চেয়ে বর্তমান অর্গানোগ্রামে মোট ১৭৪৬ জন জনবল বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নতুন জনবলকাঠামো অনুমোদন, পদোন্নতি এবং নতুন জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে পর্ষদ এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনার অর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অতি সম্প্রতি আমরা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে রাকাব কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকুরী প্রবিধানমালা-২০১৪, পদোন্নতি নীতিমালা-২০১৫ অনুমোদন করতে সক্ষম হয়েছি। এর ফলে চলতি অর্থবছরে বিভিন্ন পদে ৩০১ জনকে নিয়োগ এবং ৬৬৭ জনকে পদোন্নতিসহ আমার কর্মকালে বিভিন্ন পদে ১৩১৭ জনকে নিয়োগ এবং ৩৩৪০ জনকে পদোন্নতি প্রদান   করা সম্ভব হয়েছে।   ব্যাংকের বিদ্যমান জনবল ঘাটতি পূরণে নতুন জনবল নিয়োগ এবং পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মীদেরকে দ্রুততম সময়ে এবং স্বচ্ছতার সাথে পদোন্নতি প্রদানের ফলে ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে তারা ব্যাপকভাবে ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে উজ্জীবিত হয়ে ব্যাংক কর্তৃক ধার্যকৃত সকল ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে এবং করে চলেছে। ফলে দীর্ঘ ১০ বছর পর গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ব্যাংক ৩ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও ধার্যকৃত সকল ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে রাকাব মুনাফার ধারা সুসংহত রাখতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস। এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, বিগত সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটার ফলে এ সেক্টর যেখানে ভাবমূর্তির সংকটে, আমাদের দক্ষ নেতৃত্ব এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে আমাদের ব্যাংকে সে সমস্ত ঘটনা ঘটেনি- এটা আমাদের একটি বড় অর্জন।
* ঋণ ও আমানতের ক্ষেত্রেও বেশকিছু উল্লেখযোগ্য নতুন কর্মসূচি প্রবর্তন করেছি। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আমার সময়কালে রাকাব সর্বপ্রথম ‘মুক্তিযোদ্ধা বিশেষ ঋণ কর্মসূচি’ চালু করে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী সুবিধাবঞ্চিত এবং অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে শস্য উৎপাদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা, জমি বন্ধক অবমুক্তকরণ এবং গৃহায়ণ খাতে ঋণ সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিশেষ ঋণ কর্মসূচি’ চালু করা হয়েছে। এ অঞ্চলের কৃষকদের সমস্যা লাঘবের জন্য কৃষি ঋণ বিতরণের অবিরাম প্রবাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩ বছর মেয়াদি একটি আবর্তনশীল শস্য ঋণসীমা পদ্ধতি প্রচলন করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় শুধুমাত্র সুদের টাকা আদায় সাপেক্ষে প্রথম বছরে আবেদন ও দলিলায়নের ভিত্তিতে ঋণটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী বছরের জন্য নবায়িত হবে। প্রতি বছরই সুদের সমুদয় টাকা আদায় সাপেক্ষে পরবর্তী বছরের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণটি নবায়নযোগ্য হবে।ব্যাংক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
* আমি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি যে, পূর্বে এ ব্যাংকে আমানত সংগ্রহের বিষয়ে কোন গুরুত্ব প্রদান করা হতো না। ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার উপর নির্ভরশীল ছিল। অথচ আমানত সংগ্রহ ব্যাংকের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মকাণ্ড। আমানত সংগ্রহে গুরুত্ব না থাকায় ব্যাংককে মাঝে-মধ্যেই তারল্য সংকটের সম্মুখীন হতে হচ্ছিল, যা আদৌ কাম্য নয়। পর্ষদের সভায় এ বিষয়ে বিশদ আলোচনান্তে সকল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আমানত সংগ্রহ কার্যক্রমকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যে ব্যাংকে বর্তমানে ১১টি বিশেষ আমানত স্কিম চলমান রয়েছে। ব্যাংক কর্তৃক যথাযথ এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে আমানত সংগ্রহের পরিমাণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি   পাচ্ছে।   আমার দায়িত্ব গ্রহণকালে ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯৩৯.০০ কোটি টাকা, যা এপ্রিল ২০১৬ তারিখে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮১৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এছাড়া ঋণ বিতরণ ছিল ১০১০.০০ কোটি টাকা, যা চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৬০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এপ্রিল/১৬ পর্যন্ত ১২৯০ কোটি টাকা, ঋণ আদায় ছিল ১১৯১ কোটি, যা চলতি অর্থবছরে ১৬০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এপ্রিল/১৬ পর্যন্ত ১৫৪৩ কোটি টাকা ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৩০৯ (৩৭%) টাকা, যা এপ্রিল/১৬ পর্যন্ত হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৭৫৫ কোটি টাকা (১৬%)। ঋণ স্থিতি ছিল ৩৫৫৯ কোটি টাকা, যা এপ্রিল/১৬ পর্যন্ত ঋণ স্থিতি ৪৭৭৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। চলতি অর্থবছর শেষে সকল ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হবে বলে আশা করা যায়।
* ব্যাংকের সম্মানিত গ্রাহকগণকে আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সাথে চুক্তির আওতায় মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে রাকাব-এর সকল শাখায় স্বল্পতম সময়ে অর্থ লেনদেন সুবিধা চালু করা হয়েছে। এতে করে কম খরচে ও দ্রুততার সাথে সুবিধাবঞ্চিত ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছানোর পাশাপাশি ব্যাংকের ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। অন্যদিকে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, আইএমই এবং এক্সপ্রেস মানি সার্ভিসেসের মাধ্যমে প্রবাসীরা তাদের স্বজনদের কাছে প্রেরিত টাকা ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় অতি দ্রুততম সময়ে উত্তোলন করতে পারছেন।
* যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করাসহ গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নের মাধ্যমে রাকাব-এর লাভজনকতার ধারাকে অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করেছে। এরই অংশ হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদি আইসিটি পরিকল্পনার আওতায় এ পর্যন্ত ২১৩টি শাখায় কম্পিউটারাইজেশন কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরের মধ্যে অবশিষ্ট শাখায় কম্পিউটারাইজেশন কাজ সম্পন্ন হবে বলে আমরা আশাবাদী।
* ২০১১ সালে রাকাব-এর নিজস্ব জায়গায় আমরা প্রধান কার্যালয় ভবনের উদ্বোধন করার পর থেকে উক্ত ভবনে প্রধান কার্যালয়ের যাবতীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রধান কার্যালয় ভবনের ৪র্থ ও ৫ম তলার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং আমরা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন লাভে সক্ষম হয়েছি। এর ফলে প্রধান কার্যালয় ভবনটিকে ১০ তলা ভবনে উন্নীত করা সম্ভব হবে এবং পর্যায়ক্রমে রাজশাহীস্থ ব্যাংকের সকল নিয়ন্ত্রণকারী কার্যালয় এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এ ভবনে স্থানান্তর করা হবে। এর ফলে ভাড়া বাবদ ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় হবে।
* দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনসাধারণের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি গ্রামীণ এলাকায় নতুন শাখা খোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করি। তারই ধারাবাহিকতায় আমার সময়কালে মোট ১২টি নতুন শাখা খোলার মাধ্যমে বর্তমানে ৩৭৮টি শাখার মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
* বর্তমান সময়কালে ব্যাংকিং খাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবা ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কার্যক্রমের আওতায় ১০ টাকার কৃষক হিসাব, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা দুস্থ মহিলা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীসহ সর্বমোট ১৮ লক্ষ টি ১০ টাকার হিসাব খোলার ব্যাংক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
মাধ্যমে তাদেরকে উক্ত কার্যক্রমের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক এ পর্যন্ত ৯৬ হাজারটি স্কুল ব্যাংকিং আমানত হিসাব খোলার মাধ্যমে প্রায় ৯.০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি মিলনায়তনে ‘স্কুল ব্যাংকিং কনফারেন্স ২০১৪-১৫’ উপলক্ষে আয়োজিত পর্যালোচনা ও স্বীকৃতি প্রদান অনুষ্ঠানে স্কুল ব্যাংকিং আমানত হিসাব খোলার ক্ষেত্রে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক প্রথম স্থান অধিকারের সম্মান অর্জন করায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মাননীয় গভর্নর ড. আতিউর রহমান সম্মাননা ক্রেস্ট ও প্রশংসাপত্র প্রদান করেন।
টাইমওয়াচ : দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে আপনার ব্যাংকের অবদান সম্পর্কে বলবেন কী?
প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি : বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। সেজন্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার করার লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবা বিস্তৃত করার নিমিত্তে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার জন্য রাকাব দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের
অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষক ও কৃষির সকল মৌলিক খাত ও উপখাতের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে অর্থায়ন করে যাচ্ছে। এ ছাড়া কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, এসএমই, ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ঋণ বিতরণ করছে। সরকারের বার্ষিক কৃষি ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা কর্মসূচিকে সফল করতে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৫০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৫৩৬ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০২%। চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সর্বমোট ১৬০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। বর্তমানে এ ব্যাংকের মোট ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৯ লক্ষ। এসব ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগের ফলে এ এলাকায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বিপুলসংখ্যক কৃষিভিত্তিক প্রকল্পে এ অঞ্চলের প্রচুর মানুষ কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
এরিয়া এ্যাপ্রোচ ভিত্তিতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যে নাটোর জেলার রাকাব চাপিলা শাখার আওতাধীন ২০টি গ্রামের ৯৫০ একর জমিবিশিষ্ট ৯১৫টি পুকুর সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত রাকাব মৎস্য পল্লী এলাকায় ১০২ জন মৎস্য উদ্যোক্তাকে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া জয়পুরহাট জেলার রাকাব জয়পুরহাট এবং রাকাব আক্কেলপুর শাখার আওতাধীন কয়েকটি গ্রাম সমন্বয়ে গঠিত রাকাব পোল্ট্রি ভিলেজ এলাকায় ৫৬টি পোল্ট্রি খামারের উদ্যোক্তাকে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, পরিকল্পনা ও সার্বিক সহায়তা এবং সেই সাথে রাকাব কর্র্তৃক কৃষকদেরকে যথাসময়ে প্রয়োজনমাফিক ঋণ প্রদানের কারণে এ অঞ্চলে কৃষি উন্নয়ন তথা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। জন্মলগ্ন থেকে এ ব্যাংক কৃষি উৎপাদনের ধারা সচল রাখতে কৃষককে সহায়তা দিয়ে আসছে। আমরা জানি যে, বর্তমানে জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৬ শতাংশ। আর এর সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য খাত বিবেচনায় নিলে জিডিপিতে কৃষির অবদান আরও বেশি হবে-একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সুতরাং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য এ ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
টাইমওয়াচ : বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে অলস অর্থ পড়ে রয়েছে। আমানতের সুদ হার কমছে, ঋণের সুদ হার আশানুরূপ কমছে না; এসব বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি : বর্তমানে ব্যাংকগুলোর কাছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত অর্থের মধ্যে একেবারে অলস পড়ে আছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি নির্ধারণী সুদহার দশমিক ৫০ শতাংশ কমিয়ে রেপোতে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং রিভার্স রেপোতে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এর ফলে চাহিদা না থাকায় কোনো ব্যাংক আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রেপোর মাধ্যমে টাকা গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আবার রিভার্স রেপোতে টাকা খাটাতে চাইলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৫ নভেম্বরের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিনিয়োগের চাহিদা কম হওয়ার কারণে অনেকে ব্যাংক বাধ্য হয়ে আমানতের গড় সুদ হারের (৫.৯২%) চেয়েও অনেক কম সুদে (২.৯৬%) সম্প্রতি চালু করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৭ দিন ও ১৪ দিন মেয়াদি বিল কিনছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বর্তমানে রাকাব-এর কোনো অলস তহবিল নেই। ব্যাংকের যে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল আছে তা সরকারের বার্ষিক কৃষি ঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য কৃষক ও উদ্যোক্তাদের মাঝে ঋণ আকারে বিতরণ করা হচ্ছে।ব্যাংক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
আমানতের সুদ হার কমছে, ঋণের সুদ হার আশানুরূপ কমছে না- আপনার এ কথার সাথে আমি একমত হতে পারছি না। মূলত ঋণের সুদ হার নির্ভর করে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহ খরচ, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রভিশন ব্যয়, মুনাফার মার্জিন প্রভৃতির ওপর। বর্তমানে ব্যাংকের বিভিন্ন সেবার চার্জ, ফি ইত্যাদি হ্রাস এবং ব্যাংক শাখা ব্যয়ে উচ্চ ব্যয় হার পরিহার ও যানবাহন ক্রয়ে খরচ সীমিত করার নীতি গ্রহণের ফলে ব্যাংকের সার্বিক তহবিল ব্যয় কমেছে। কিছুদিন পূর্বেও আমানতের সুদহার কমে আসলেও ঋণের সুদ হার তেমনভাবে না কমলেও এখন কমেছে এবং এর ফলে স্প্রেডও কমেছে। গত মার্চ মাসে ঋণের সুদ হার কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশে। ফলে ঋণ-আমানত অনুপাত কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশে। বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ শতাংশের নিচে স্প্রেড নামিয়ে আনার নির্দেশনা জারি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণের ক্ষেত্রে ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ হারে সুদ আদায় করেছে এবং আমানতের বিপরীতে সুদ প্রদান করেছে ৬ দশমিক ৭   শতাংশ।  স্প্রেড ছিল ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকের স্প্রেড ছিল সবচেয়ে কম অর্থাৎ মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। এক্ষেত্রে আমানতের বিপরীতে সুদ দেয়া হয়েছে ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং সুদ আদায় করা হয়েছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ হারে সুদ আদায় করেছে এবং আমানতের বিপরীতে সুদ দিয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
অতিরিক্ত তারল্য কমিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবেÑ
নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরকে ঋণ প্রদানে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিনিয়োগের জন্য সরকারকে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও অনেক উদ্যোক্তার মধ্যে এখনও এক ধরনের আস্থার সংকট রয়েছে। আবার অনেকে সব প্রস্তুতি নিয়ে কারখানা স্থাপনের পর সময়মতো বিদ্যুৎ, গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদনে যেতে পারছেন না। বিনিয়োগকারীদের এসব বাধা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
টাইমওয়াচ : আপনার ব্যাংকের চলমান বিনিয়োগ ও নতুন কর্ম-পরিকল্পনা সম্পর্কে বলবেন কী?
প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি : প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ ব্যাংক কৃষির বিভিন্ন খাতে মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬০% কৃষি ঋণ বিতরণ করে আসছে। বর্তমানে ব্যাংকের ৩৭৮টি শাখার মাধ্যমে দেশের এ অঞ্চলের কৃষক ও কৃষির সকল মৌলিক খাত ও উপখাতের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে রাকাব অর্থায়ন করে যাচ্ছে। এ ছাড়া কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, এসএমই, ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যাংক ঋণ বিতরণ করছে। কৃষি ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা কর্মসূচিকে সফল করতে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৫০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৫৩৬ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০২%। কৃষকদের বর্ধিত চাহিদার কথা বিবেচনা করে রাকাব চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯টি খাত যেমন- শস্য/ ফসল খাতে ৭৫০ কোটি, মৎস্য সম্পদ খাতে ২৫ কোটি, প্রাণী সম্পদ খাতে ৭৫ কোটি, খামার ও সেচ যন্ত্রপাতি খাতে ১০ কোটি, কৃষিভিত্তিক শিল্প/প্রকল্প খাতে ৪০ কোটি, এসএমই খাতে ১৩০ কোটি, চলমান ঋণ খাতে ৪০০ কোটি, দারিদ্র্য বিমোচন/ মাইক্রো ক্রেডিট খাতে ৪৫ কোটি এবং অন্যান্য খাতে ১৩৫ কোটি টাকা অর্থাৎ সর্বমোট ১৬০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে এবং এপ্রিল ২০১৬ পর্যন্ত ১২৯০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। অর্থবছর শেষে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করা যায়।
ভবিষ্যতে আরও যুগোপযোগী ও আকর্ষণীয় ঋণ কর্মসূচি এবং আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রবর্তনের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকে একটি শক্ত ভিত্তি প্রদান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থসংস্থান সুবিধা পরিহারের লক্ষ্যে কোর ডিপোজিট সংগ্রহের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ কার্যক্রমকে আরও জোরদার করার বিষয়টি চলমান রয়েছে। এছাড়া সকল শাখাকে কম্পিউটারাইজড করা,পর্যায়ক্রমে সকল শাখাকে অনলাইন কার্যক্রমের আওতায় আনা, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক জায়গায় এটিএম বুথ স্থাপনসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। সর্বোপরি রাকাবকে একটি লাভজনক ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
টাইমওয়াচ : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, এটিএম বুথ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন ঘটনায় ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এরই আলোকে আপনার ব্যাংকের আর্থিক নিরাপত্তাসহ দেশের ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা বিষয়ে আপনার মতামত কী?
প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি : সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, এটিএম বুথ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন ঘটনায় ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের এক ধরনের আস্থার প্রশ্ন তৈরি হয়েছে-একথা সত্য। তবে এখনও পর্যন্ত ব্যাংকের প্রতি গণমানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের স্থানটি অনেক ঊর্ধ্বে। ব্যাংকাররা দেশের অর্থনীতিকে সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। ব্যাংকিং পেশায় নৈতিকতার চর্চা তাই অত্যন্ত জরুরি। তারা যদি সততা ও স্বচ্ছতার সাথে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন তাহলে ব্যাংকিং ক্ষেত্রে কোনো অঘটন ঘটার আশঙ্কা থাকে না। আমার মতে, ব্যাংকিং খাত তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে যতটুকু এগিয়েছে সে তুলনায়   সাইবার   হুমকি  বা  তথ্য প্রযুক্তির ঝুঁকিটাকে ব্যাংক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
সেভাবে বিবেচনায় নেয়নি। ব্যাংকের সেবায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়েছে, সেই সঙ্গে জাল-জালিয়াতির সংখ্যাও বেড়েছে। সেজন্য প্রযুক্তি ব্যবহারে সতকর্তা অবলম্বন করতে হবে। ব্যাংকের নিজস্ব জনবলকে তথ্য প্রযুক্তিতে সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে চলেছে তার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে এগিয়ে যেতে হবে। সেইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। শক্তিশালী সার্ভার ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প সার্ভার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আইটি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইন্টারনেট ব্যবস্থায় এমনভাবে ফায়ারওয়াল তৈরি করতে হবে, যাতে সার্বিকভাবে এ ব্যবস্থা নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকে। এটিএম বুথের নিরাপত্তায় মেশিনে এ্যান্টি স্কিমিং ডিভাইস স্থাপন খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। সেক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ইএমভি কার্ড ব্যবহার সবচেয়ে ভালো বিকল্প হতে পারে।
আমি এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলতে চাই, বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে সংঘটিত সাইবার ক্রাইমের ঘটনাগুলোকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের ব্যাংকের জন্য আরও নিরাপদ ও ঝুঁকিবিহীন তথ্য প্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
টাইমওয়াচ : দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? দেশের ব্যাংকিং খাত উন্নয়নে আপনার অভিমত কী?
প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি : ব্যাংক দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ব্যাংকিং খাতকে ঘিরেই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। ব্যাংক ছাড়া কোনো দেশের উন্নয়ন কল্পনাই করা যায় না। সেজন্য দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুস্থ ধারায় পারিচালিত হওয়া প্রয়োজন। ব্যাংকিং সংক্রান্ত বিধি-বিধান ও দেশের প্রচলিত আইন-কানুন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সময়ে সময়ে জারিকৃত নির্দেশনা মোতাবেক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করলে কোনো ধরনের জাল-জালিয়াতি ঘটার সম্ভাবনা থাকে না। সেজন্য দেশের ব্যাংকিং খাত উন্নয়নের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে :
*    আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
*    ব্যাংকিং খাতে সুশাসন সুনিশ্চিত করতে হবে। আর সুশাসনের জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা।
*    ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
*    পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং তাদেরকে দক্ষ জনসম্পদ করে গড়ে তুলতে হবে।
*    গুণগতসম্পন্ন ঋণ বিতরণ করতে হবে।
*    গ্রাহক সেবার মান বাড়াতে হবে।
*    শ্রেণিকৃত ঋণ হ্রাস এবং নতুনভাবে ঋণ শ্রেণিকরণ রোধের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
টাইমওয়াচ : একটি ব্যাংককে অত্যাধুনিক মডেল ব্যাংক হিসেবে গড়ে তুলতে কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি : একটি ব্যাংককে মডেল ব্যাংক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সার্বিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন করতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন কম্পিউটারাইজড ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা। গ্রাহকদের চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে সার্বিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা, যুগোপযোগী নতুন নতুন সেবা প্রবর্তন এবং গ্রাহক সেবার মানের গুণগত উন্নয়ন সাধন করতে হবে। সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সঠিক ঋণ গ্রহীতা নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যাংকের পারফরমিং এ্যাসেট বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে। খেলাপি ঋণ প্রতিরোধের মাধ্যমে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কলা-কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি ব্যাংকের লাভজনকতা বজায় রাখতে সকলকে সচেষ্ট হতে হবে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাক্ষাৎকার পাতার আরো খবর

Developed by orangebd