ঢাকা : বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • ডিএসসিসির ৩,৬৩১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা          রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর          সংলাপের জন্য ভারতকে ৫ শর্ত দিল পাকিস্তান          এরশাদের শূন্য আসনে ভোট ৫ অক্টোবর          বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই : হাছান মাহমুদ
printer
প্রকাশ : ২২ আগস্ট, ২০১৬ ১৫:০৪:৫০
জাফলংয়ের পিয়াইন নদীতে ১৩ বছরে ৩৯ জীবনাবসান
বদর উদ্দিন আহমদ


 


ভ্রমণ পিয়াসিদের দেশেরমধ্যে সব চাইতে আদর্শস্থান সিলেটের জাফলং। আর এই এলাকার অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে বিশেষ এক অকর্ষণ পিয়াইন নদী। যে নদীতে সাঁতার কাটতে না পারলে অপূর্ণ থেকে যায় অনেককিছু। পাহাড়, টিলা আর চা-বাগানসংলগ্ন সীমান্ত ঘেঁষা জাফলং প্রকৃতিকন্যা নামেও পরিচিত। সিলেট নগরী থেকে ৫৯ কিলোমিটার দূরে জাফলংয়ের অবস্থান। গোয়াইনঘাট উপজেলার অধীন জাফলংয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই এখানে আসেন নানা বয়সের দেশী-বিদেশী পর্যটক। ঈদ ও অন্যান্য ছুটির সময় জাফলংয়ে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়। এখানে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে স্বচ্ছ জলরাশির পিয়াইন নদী। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে এ নদী থেকে পাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট গর্তে বালু জমে চোরাবালির সৃষ্টি হওয়ায় এবং স্বচ্ছ জলধারায় গভীরতা কম দেখা যাওয়ায় কেউ কেউ পানিতে গোসল করতে নেমে তলিয়ে যান। পরে তাদের লাশ ভেসে ওঠে। ছোট নৌকায় ভ্রমণ করতে গিয়েও পিয়াইন নদীতে নৌকাডুবিতে ২০০৩ সাল থেকে এ পযন্ত ১৩ বছরে জাফলংয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছেন ৩৯ জন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের জাফলং পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলে সলিল সমাধি হলো আসিফ আহমদ (১৭) নামে এক পর্যটকের। নিখোঁজের দু’দিন পর গত রোববার (২১ আগস্ট) সকালে ১১টার নদী গর্ভ থেকে ভেসে উঠলো তার মরদেহ।
শুক্রবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে নদীতে সাঁতার কাটতে নেমে তিনি নিখোঁজ হন। এদিন তিনি বন্ধুদের সঙ্গে জাফলংয়ে বেড়াতে আসেন।
নিহত আসিফ আহমদ গাজীপুরের টঙ্গি সদর এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমানের ছেলে। রোববার সকালে বল্লাঘাট পিকনিক সেন্টারের অদূরে পিয়াইন নদীতে তার মরদেহ ভেসে উঠলে স্থানীয়রা উদ্ধার করে পুলিশকে খবর দেন।
গত ৩ আগস্ট বুধবার জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টে পিয়াইন নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে সিলেট ব্লু-বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র আশফাক সিদ্দিকী। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় তিন ঘণ্টা পর ওই এলাকা থেকে স্থানীয়রা তার লাশ উদ্ধার করেন। তিনি সিলেট নগরীর ঘাসিটুলা এলাকার মাহবুব সিদ্দিকীর ছেলে। নবম শ্রেণীর ছাত্র আশফাক তার আরো পাঁচ বন্ধু নিয়ে ৩ আগস্ট জাফলং বেড়াতে গিয়েছিল। দুপুরে পিয়াইন নদীতে সাঁতার কাটছিল তারা। একপর্যায়ে আশফাক নিখোঁজ হয়। এ ছাড়া গত বছরের ২২ জুলাই ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পিয়াইন নদীতে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারায় ঢাকার দুই কলেজছাত্র। আব্দুল্লাহ অন্তর (১৮) ও সোহাগ ঘোষ (১৭) নামে এই দুই তরুণ ঢাকার কবি নজরুল কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। সোহাগ ও অন্তরসহ ওই কলেজের ছয় ছাত্র জাফলং বেড়াতে এসেছিল। তারা ওই দিন বিকেলে জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টে পিয়াইন নদীতে গোসল করতে নামে। এ সময় আব্দুল্লাহ অন্তর ও সোহাগ ঘোষ ¯্রােতের টানে তলিয়ে যায়। দুই দিন পর একজন ও তিন দিন পর আরেক জনের লাশ পাওয়া যায়। এর আগের বছরও পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে জাফলংয়ে তিন দিনের ব্যবধানে নদীতে গোসল করতে নেমে ও নৌকাডুবিতে প্রাণ হারায় শিশুসহ ৭ জন। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ২ আগস্ট প্রাণ হারান নারায়ণগঞ্জের জসিম উদ্দিন। এর আগের দিন পিয়াইন নদীর শাখা বিছনাকান্দি নদীতে নৌকা ডুবে প্রাণ হারান সাজেদুল হক। এরও আগে ৩১ জুলাই পিয়াইন নদীতে নৌকা ডুবে মারা যান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাকিল (১০), মামুন (২২) ও সাদেক হোসেন (২০)। একই দিনে চোরাবালিতে হারিয়ে যান সিলেটের শাহি ঈদগাহ হোসনাবাদ এলাকার কামরুল (২০) এবং সাঁতার কাটতে গিয়ে মারা যান অজ্ঞাত এক যুবক। ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সাল পযন্ত এক দশকে পিয়াইন নদীতে ডুবে মারা গেছেন আরো ২৮ জন। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকার শনিরআখড়া এলাকার শুভ আহমদ, ২৫ অক্টোবর ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কলেজছাত্র ইমরান হোসেন এবং ৩০ মে মাদারীপুর সদর উপজেলার চলকিপুর গ্রামের মো. ইব্রাহীমসহ চারজন মারা যান। ২০১২ সালের ২২ আগস্ট ঢাকা জেলার ফাহাদ উদ্দিন, ৩০ আগস্ট মৌলভীবাজারের কুলাউড়া এলাকার হিমেল রাজ সঞ্জয়সহ দুইজন মারা যান। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার খিলগাঁও এলাকার তারেক আহমেদ, ২০ মে রফিকুল ইসলাম ও গৌরাঙ্গ কর্মকার, ২২ মে ঢাকার শাহরিয়ার আহমেদ রাব্বি, ২ জুলাই ঢাকার তেজগাঁও এলাকার শাহরিয়ার শফিক, ৩০ জুলাই জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ এলাকার মস্তাকিন তালুকদার, ১২ সেপ্টেম্বর ঝালকাঠি জেলার রুহুল আমিন খান রুমিসহ সাতজন মারা যান। ২০০৯ সালের ২৬ জানুয়ারি হবিগঞ্জ বানিপুর এলাকার ইউনুছ মিয়া, ৮ মে ঢাকার মিরপুরের ফারুক আহমদ, ২১ জুন নরসিংদী সদর এলাকার সজিব মিয়াসহ তিনজন মারা যান। ২০০৮ সালের ৯ নভেম্বর ঢাকার পল্লবী এলাকার দিলশাদ আহমেদ ও ২০০৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গোয়াইনঘাট উপজেলার মুসা মিয়া, ১৬ আগস্ট একই উপজেলার ফখরুল ইসলামসহ দুইজন মারা যান। ২০০৪ সালে ২ জন, ২০০৫ সালে ১ জন এবং ২০০৭ সালে ২ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়। ২০০৩ সালের ১৫ আগস্ট জাফলংয়ে পিয়াইন নদীতে সলিলসমাধি হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেজাউর রহমান ফয়সাল ও রাজন আহমদের।
গত রোববার (২১ আগস্ট) সকালে ১১টার নদী গর্ভ থেকে ভেসে উঠলো আরো একটি মরদেহ। গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেলোয়ার হোসেন বলেন, স্থানীয়দের খবরের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। আসিফ আহমদ (১৭) নামে এক পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় আনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রশাসনের নিষেজ্ঞা সত্বেও পর্যটকরা নদীতে সাঁতার কাটতে নেমে যান। যার পরিনামে অকালে হারিয়ে যায় এই সব তাঁজা প্রাণ। স্থানিয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়সাঁড়া ভাবে সাইনবোর্ড লাগিয়ে সতর্কবানী দিয়েছে নদীতে সাঁতার না কাটতে। তবে সচেতন মহল মনে করেন সতর্কবানীর সাইন বোর্ড এর পাশাপাশি পর্যটন পুলিশের প্রহারা থাকলে এধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই পেতে পারে। তাই অতিদ্রুত জাফলং এর পিয়াই নদীতে পর্যটন পুলিশের নজরদারিতে আনতে হবে। তাহলেই এই অনাঙ্কাখিত মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেতে পারে পর্যটকরা।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd