ঢাকা : শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭ ১০:৪০:৫৫
সামাজিক বৈষম্য ও আমলা সমাজ
করীম রেজা


 


বিশ্বের সব দেশেই সামাজিক বৈষম্য বিদ্যমান। মোটাদাগে দুটি শ্রেণী, একদল সুবিধাভোগী আরেকটি সুবিধাবঞ্চিত। সুবিধা বঞ্চনার ভাগীদার একমাত্র জনগণ। সমাজের অগ্রসর জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রধানত ধনিক, বণিক, আমলা, দলীয় ও নির্দলীয় টাউট শ্রেণীর লোকজনের সংখ্যাই বেশি। ধনবান, ব্যবসায়ী এবং আমলাদের এক ধরনের অদৃশ্য বোঝাপড়ার কারণে তারাই সমাজের সব রকম সুবিধা এককভাবে ভোগ করে। ভোগের ভাগ-বাটোয়ারায় জনগণ প্রতারিত হয়। জনগণের এই দুর্দশার কথা সবাই জানে। রাজনৈতিক নেতারাও জানেন। তারপরও কোনো প্রতিকার কেউ করেন না বা করতে পারেন না।
সুবিধাভোগী শ্রেণীর মধ্যে বিনা পুঁজিতে লাভবান আমলা পক্ষ। ব্যবসায়ীরা সুবিধা আদায়ের জন্য বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগের একটা অংশ আমলার পকেটে যায় প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপটে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় জনগণের সুবিধার নামে আমলারা আইন প্রয়োগ করেন বা প্রয়োগ প্রক্রিয়া পালনের তত্ত্বাবধান করেন সাধারণভাবে সমাজে পরিচিত আমলা বা সরকারি কর্মকর্তাগণ।
রাষ্ট্রের আইন তৈরি করেন জনপ্রতিনিধিগণ। কিন্তু মুসাবিদাকারক হিসেবে সরকারি আমলা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। সাধারণভাবে একটি দেশের সকল আইনকানুন নিয়মবিধি দেশ তথা জনকল্যাণের ধারণা বিবেচনায় রেখে তৈরি করা হয়। নানারকম শর্তের আড়ালে ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষের জন্য তা জটিল হয়ে যায় বাস্তবে। ভুক্তভোগী হয় সাধারণ জনগণ। কিন্তু সুবিধা ভোগ করেন প্রধানত আমলাগণ। এই ভুলের খেসারত কখনই আমলাদের দিতে হয় না। না দেয়ার সুবিধাটিও আমলা শ্রেণী জেনে-বুঝেই করেন। আইনের বিধি বিধানের ফাঁকফোকর গলে তারা নিরাপদে থাকেন। ক্ষতি হয় দেশের, দশের, জনমানুষের।
নিকট অতীতে সিলেটের গ্যাস ক্ষেত্রের দুর্ঘটনার পর জানা যায় কতিপয় শর্ত ছিল দেশের স্বার্থবিরোধী। স্থানীয় মানুষ এখনো ভুক্তভোগী। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যারা চুক্তিপত্রের শর্তসমূহ বিচার করে ইতিবাচক বলে সরকারকে বুঝিয়েছিলেন, তাদের কেউ কোনো শাস্তির আওতায় এসেছেন বা ভোগ করছেন; তা কিন্তু আজও পরিষ্কার নয়। বিভাগীয় শায়েস্তার নামে তাদের অপরাধ আড়ালেই থাকে। গুরু পাপে লঘু দ-ের ব্যবস্থা হয় মাত্র।
সাম্প্রতিক অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানমর্যাদা নিয়ে  আমলাগণ ক্ষমতার যে দাপট দেখালেন, তা যেমনি লজ্জার তেমনি দুঃখের। এই বিধি-বিধান যাদের অতি উর্বর মস্তক থেকে বের হয়েছে তাদের পরিণতি সম্পর্কেও বিস্তারিত জানা যায় না। কথায় আছে- কাক কাকের মাংস খায় না। সরকারি কর্মকর্তাগণও স্বরচিত আচরণবিধির চাদরে স্বগোত্রীয় আমলাদের সর্বদা নিরাপদ রাখেন।
জনশ্রুতি আছে, কোনো এক আমলা বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে আমাদের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইউক্যালিপ্টাস গাছ নিয়ে আসেন। আজ যা মাটি, চাষবাস, পরিবেশ ও সর্বোপরি জনস্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আরেক আমলা নাকি বাঙালির মাছের অভাব পূরণের মহৎ আশায় রাক্ষুসে মাগুর মাছ আমদানি করেন। সেই মাগুর খালেবিলে নালায় যত্রতত্র ঘুরে ঘুরে সব রকমের ছোট মাছ দিয়ে পেট ভরছে। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে দেশের পুকুর জলাশয় নদীর অনেক প্রজাতির মূল্যবান ছোট মাছ। অতি সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে অভাবিত ঘটনার কথা পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। তারা বিদেশি কোম্পানির খরচে বিদেশ ঘুরে এসে, সেই একই ভ্রমণের খরচ সরকারি তহবিল থেকে তা পকেটস্থ করার জন্য চিঠির তারিখ এবং শর্ত বদল করেছে। তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে অনুমান করা কঠিন নয়। এইতো কিছুদিন আগে আরেক আমলা অবসরে যাওয়ার মাত্র একদিন আগে বিদেশ ঘুরে ফেরত আসেন।
আমলাদের আচরণবিধি এবং কার্যকারিতা ব্যাপক গবেষণার দাবি রাখে। প্রকল্প গ্রহণে তারা যতটা উৎসাহী তা যথাযথ বাস্তবায়নের তদারকিতে ততটাই উদাসীন। কারণ তাতে আখেরে তারা নানা উপায়ে লাভবান হয়ে থাকেন। নতুন করে প্রকল্প নির্ধারণ ও গ্রহণে সুবিধা তৈরি হয়। পত্রিকান্তরে এবং টিভি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা গেল, স্কুল ভবন নির্মাণে লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশের ব্যবহার। নি¤œ মানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের কারণে অতি অল্পদিনেই ভবন ভেঙে পড়ছে। ভেঙেপড়া দালানের ভেতর থেকেও বাঁশের আত্মপ্রকাশ। বিশ্বাস করা কঠিন যে এসব বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চ বেতনের উচ্চপদের সরকারি কর্তাব্যক্তিরা কিছুই জানেন না। প্রকল্প যথাসময়ে শেষ না করে সময় বাড়িয়ে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হয় অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট আমলা-কর্তাদের  পকেট ভারী হয়। মানুষের কষ্টের কথা, দুরবস্থার বিষয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। এক বাঁশ কত উপায়ে দেওয়া যায় তা বোধ করি বাঙালি আমলার চেয়ে কেউ বেশি বোঝে না। নানা প্রজাতির বাঁশের উদ্ভিদ জাদুঘরতো বাংলাদেশেই তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাত্র-গবেষকরাও আসছেন বাঁশ বিদ্যার বিস্তারিত জানতে। মানুষকে বাঁশ দেওয়ার কৌশলটুকু শিখে গেলে, বাঁশ দেওয়ার শাস্ত্রীয় একচ্ছত্র গৌরব হাতছাড়া হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। নিশ্চয়ই আমলা কর্তাগণ এ ব্যাপারে সচেতন।
যদি খোঁজ নেওয়া হয় তাহলে দেখা যাবে দেশের বিশেষ করে ঢাকা শহরের ধানম-ি, গুলশান, বনানী বা উত্তরার অধিকাংশ বাড়ি বা প্লটের মালিক নামে-বেনামে উচ্চ শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা। বিদেশে পড়াশুনা করতে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা খরচকারী অধিকাংশই আমলা পরিবারের সদস্য। ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরের যানজটের প্রধান কারন ব্যক্তিগত প্রাইভেট মোটরগাড়ি। পত্রিকান্তরের প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, রাস্তায় চলাচলকারী শতকরা ৭০ ভাগ গাড়িই প্রাইভেট মালিকানায়। তদন্ত করলে জানা যাবে, অধিকাংশ গাড়ির মালিক সরকারি আমলারা। কারো কারো পরিবারে আছে একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি। স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যবহারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন মডেলের গাড়ি। তাছাড়া গাড়ির সংখ্যা এতই বেশি যে, সারিবদ্ধ করে সাজালে তা মোট রাস্তার দৈর্ঘ্যরে চেয়ে অনেক বেশি লম্বা হয়ে যাবে। যারা গাড়ি আমদানি করার অনুমতি দিয়ে থাকেন তারা তা জেনেও না জানার অভিনয় করেন। তারপরও গাড়ি আমদানির অনুমতি দিয়ে রাষ্ট্র বা জনগণের পথ চলার কী সুবিধা তারা নিশ্চিত করলেন, তা মূর্খ জনতার মাথায় আসে না। যেহেতু আমলা শ্রেণী সমাজের একমাত্র উচ্চশিক্ষিত এবং জ্ঞানী। তার প্রমাণ তারা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মর্যাদা খাটো করে। অন্যকে সম্মান দিয়ে, খাটো না করে নিজে বড় বা উঁচু হতে পারে না, এটুকু তারা ভালোই বোঝেন।
মাঝেমধ্যে বিভিন্ন অধ্যাদেশ বা প্রণীত আইনের মধ্যে আমরা দুর্বলতা দেখতে পাই। যদিও অধিকাংশই জনচক্ষুর আড়ালে থাকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আইনের কথাই বলা যায়। বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের আপিল করার সমান অধিকারের বিষয়টি সেখানে ছিল না। জনতার আন্দোলনে সেই ভুল সংশোধিত হয়েছে। এতবড় অসঙ্গতি কারো নজরেই আসেনি, এটা একটু অসম্ভব যুক্তি বলে মনে হতেই পারে। তাহলে দায় কার? গত ১১ জানুয়ারির একটি পত্রিকার খবরে দেখা যায়, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের এমডির চাকরির মেয়াদ বাড়ল চতুর্থ বারের মতো। তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল, তদন্ত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন গোপন রেখেই তাকে আবার নিয়োগ দেওয়া হল।
পাঠ্যবইয়ের বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় চলছে। প্রচলিত নিয়ম বিধি অনুসরণ না করেই পাঠ্যবইয়ে নানা রকম পরিবর্তন করা হয়েছে। ১৬ জানুয়ারির পত্রিকান্তরের খবরে জানা যায়, সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের না জানিয়ে তা করা হয়েছে। এমনকি রচয়িতা, সংকলক কেউই কিছু জানেন না। নেওয়া হয়নি জাতীয় পাঠক্রম সমন্বয় কমিটির অনুমোদন। আবার অঙ্গুলি নির্দেশিত হয় সংশ্লিষ্ট আমলা বাহাদুরদের দিকে। সম্প্রতি এক সরকারি কর্তাবাহাদুর দুদকের হাতে বমাল ধরা পড়েছেন। বমাল বলতে একবারে নগদ টাকা, ঘুষের টাকা হাতে নিয়ে। অথচ সরকার বেতন বাড়িয়ে দিলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধার জন্য। এতে জনগণের কোনো সুবিধা হয়নি, জনগণের বেতন তো আর বাড়ল না। সাধারণের বাড়ল ভোগান্তি। আর সরকারি কর্তাদের বাড়ল খাই।
বিমানের কথা প্রায় প্রতিদিনই কোনো না প্রসঙ্গে আলোচিত হয়। বিদেশে যারা থাকেন, দেশের প্রতি তাদের একটি বিশেষ টান তৈরি হয়। দেশীয় সব বিষয়ের প্রতি তাদের অনুভূতি দেশের মানুষের থেকে আলাদা রকমের। তারা ছুটিতে দেশে আসার সময় বিমানেই আসতে চান। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বিমানের টিকিটের দাম সব সময়েই বেশি থাকে। তারপরও বুকিং পাওয়া যায় না। কিন্তু যারা শেষ পর্যন্ত বিমানে আসেন, তারা প্রায়ই যাত্রীর অভাব দেখতে পান। প্রচুর আসন খালি থাকে। অন্যান্য বিমান সংস্থা বা দেশেরই বেসরকারি বিমান কোম্পানিগুলো যেখানে লাভ করে, উন্নতি করে, সেখানে বাংলাদেশ বিমান কেবলই লোকসান দিচ্ছে। কেউ এর কোন কারণ জানে না, তা অবিশ্বাস করার মতো লোক অনেক পাওয়া যাবে।
আমরা আন্তর্জাতিক বিশ্বে মান-মর্যাদায় উন্নীত হচ্ছি। দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। বৈশ্বিক সূচক এখন বাংলাদেশকে ঊর্ধ্বমুখী দেখায় অনেক ক্ষেত্রে। নিশ্চয়ই এর পেছনে রয়েছে সরকারি আমলাদের বিরাট ভূমিকা। এইসব সৎ, কর্মনিষ্ঠ, নিবেদিতপ্রাণ আমলা না হলে বিশ্বে বাংলাদেশের মানমর্যাদা এতটা বৃদ্ধি পেত না।   যোগ্য, সৎ সরকারি মুষ্টিমেয় আমলাদের জন্যই এই রকম দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের নিরন্তর অসততার মধ্যেও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ওইসব অসৎ আমলার সংখ্যা যদি কমিয়ে আনা যেত বা কম হতো তাহলে বাংলাদেশ আরও অনেক আগেই এসব বিশ্বসূচক ছুঁয়ে ফেলত বা ছাড়িয়ে যেত। আমাদের সেইসব উচ্চ পদের কর্তাব্যক্তিরা কী একবার ভেবে দেখবেন। সবক্ষেত্রে ব্যক্তির লাভের চেয়ে সামষ্টিক লাভ শ্রেয়তর। তাতে ব্যক্তিগত লাভের সুযোগ বাড়ে বৈ কমে না। নীতিহীনতা, ন্যায়ভ্রষ্টতা বৈষম্য বাড়ায়। সততা, দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা সমাজের বৈষম্য ক্রমাগত নি¤œমুখী করে। সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে।
লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ।  karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd