ঢাকা : শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি, ২০১৭ ২২:৪০:৪২
ফেব্রুয়ারির প্রথম দিবসে
করীম রেজা


 


১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭। ১৯ মাঘ ১৪২৩। বছরের ৩২তম দিবস। এ দিনে পৃথিবীর ইতিহাসে খ্রিস্টের জন্মের আগে থেকে শুরু করে অনেক ঘটনার বিবরণ আছে। গুগল খুঁজলেই তা জানা যায়। কিন্তু মাতৃভাষার মহান গৌরব বুকে ধারণ করে একটি জাতির পুরো মাসভরে বইয়ের মেলা শুরুর কথা কোথাও কেউ লিখে রাখেনি।

 

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস বাংলাদেশি বাংলাভাষী জনগণের রক্তমাখা বিষাদস্মৃতির মাস। ২১ তারিখে পাকিস্তানি শাসকের গুলিতে শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিক এবং আরো অনেকে। ভাষার দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নির্বিচারে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। তখন সেই ১৯৫৩ সাল থেকেই অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে পালন করার সংস্কৃতি চালু হয়। প্রভাতফেরির মাধ্যমে শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে সম্মান জানান হতো। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মিত হয়। ২১ তারিখে ফুলেল শ্রদ্ধা জানাতে জাতি সমবেত হয় শহীদ মিনারে।

 

শহীদ মিনার বাঙালি জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে শহীদ মিনার ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেই মিনার ভেঙে দেয়া হয়। সংগ্রামী চেতনার, আন্দোলনের সমস্ত শক্তির জোগানদাতা যেন শহীদ মিনার। গানে, কবিতায়, নাটকে, চিত্রে, আল্পনায় মাতৃভাষার গৌরব বন্দনা হয়। পরবর্তীকালে যুক্ত হয় বইমেলা। বইমেলা আয়োজনে বাংলা একাডেমি অংশগ্রহণ করলে তা জাতীয় চরিত্র ধারণ করে। আর এখন বইমেলা মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়।

 

বাংলাদেশিরা মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার এই মাসের শোকচেতনা শক্তিতে পরিবর্তন করেছে। আজ সারা ফেব্রুয়ারি মাস মাতৃভাষার শৃঙ্খলমুক্তির মাস। সব ভাষার সমান অধিকার সারা বিশ্বে আজ স্বীকৃত। শুধু বাংলাদেশে বইমেলাই নয়, ২১ ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বের দেশে দেশে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ‘২০১৭ সালে বহু ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তার করে টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ’ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ইউনেস্কো পালন করবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

 

২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। কানাডা প্রবাসী দুই বাংলাদেশি প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করে ইউনেস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। কাকতালীয়ভাবে ভাষাশহীদ রফিক এবং সালামের নামের সাথে তাদের নাম মিলে যায়। ১৯৯৯ সালে তারা একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ আবেদন করেন। কিন্তু প্রায় শেষ মুহূর্তে জানতে পারেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে এই সুপারিশ বা আবেদন ইউনেস্কোর সদর দফতরে পাঠাতে হবে। কিন্তু আমলানির্ভর ও সরকারি বিধি-বিধানের কারণে তা সময়মতো পাঠানো প্রায় অসম্ভব। এই সংকটকালে সেই সময়ে দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং কয়েকজন আমলা ও প্যারিস দূতাবাসের কূটনীতিকের রাতভর প্রচেষ্টায় দরকারি সব কাগজপত্র ফ্যাক্সের মাধ্যমে পাঠানো হয়। ইউনেস্কোর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তাও অকুণ্ঠ সহযোগিতা করেছেন। প্যারিসেও তিনি নির্ধারিত অফিস সময়ের অতিরিক্ত কাজ করেন শুধু প্রক্রিয়াটি যাতে সফল হয়। পরের দিনের নির্ধারিত ইউনেস্কার সভায় সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরবর্তী বছর ২০০০ হতে সারা বিশ্বে অত্যন্ত মর্যাদা ও গুরুত্ব দিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়।

 

বাংলাদেশের গৌরব করার মতো অনেক কিছু থাকলেও ভাষা আন্দোলন এক অতুলনীয় অমোচনীয় মর্যাদা দিয়েছে। জাতিতে জাতিতে শাসক, শোষক, স্বার্থান্বেষী বেনিয়াগোষ্ঠীর সৃষ্ট ভাষার মাধ্যমে যে বিভাজন, দূরত্ব তা একমাত্র মাতৃভাষার সঠিক শিক্ষা ও চর্চার দ্বারা অতিক্রম করা যায়। সরকারিভাবে বাংলাদেশে ভাষা চর্চা, সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য স্থাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা গবেষণা ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশে কমবেশি ৪০টির মতো ভাষা রয়েছে। সেসব ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণে আরো কার্যকর উদ্যাগ নিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, আগে চাই মাতৃভাষার দৃঢ় ভিত্তি, তারপর বিদেশি ভাষার গোড়াপত্তন।

 

এবারের বইমেলায় কমবেশি ৪০০ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ৬০০টির অধিক স্টল ও প্যাভেলিয়ন নিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করবে। প্রতিদিন মেলায় প্রকাশিত হবে নতুন নতুন বই। থাকবে পুরস্কার প্রদান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন মেলার বিশেষ আকর্ষণ। মেলা শুরুর প্রথম দিনেই অনুষ্ঠিত হবে আন্তর্জাতিক কবিতা পাঠের উৎসব। প্রধানমন্ত্রী মেলা উদ্বোধন করবেন। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননার একুশে পদক মেলা চলকালে ঘোষিত হবে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রকাশিত হবে বিশেষ সাহিত্য সংকলন। ১৯৫৩ সালে কবি হাসান হাফিজুর রহমান মহান শহীদদের স্মৃতি অমর করে রাখার জন্য একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করে যার সূচনা করেছিলেন। বাংলা একাডেমির মেলা প্রাঙ্গণে সংকলন প্রকাশকদের জন্য থাকে আলাদা স্টল। মেলার বিস্তৃতি এতটাই বেড়েছে যে বাংলা একাডেমির চত্বর ছাড়িয়ে তা আজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একাংশে জায়গা করে নিয়েছে। ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট পরিবর্তন আনতে হয়েছে।

 

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির মাধ্যমে বাঙালির স্বাজাত্য চেতনার এক দৃঢ় ভিত্তি তৈরি হয়। যদিও বাঙালির ভাষা আন্দোলনের শুরু আরো আগে থেকেই, সেই ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগেরও আগে ইতিহাসের আরম্ভ বিন্দু। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের অবশেষে তা স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৭১ সালে প্রথম ভাষাভিত্তিক একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় আজকের বাংলাদেশ।

 

ভাষার ঐক্যে আমাদের জাতিগত সত্তা। প্রাত্যহিক জীবনে ভাষাচর্চার আশানুরূপ প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই না। ঔপনিবেশিক মানসিকতার বেড়াজাল ভেঙে আমরা এখনো বেরিয়ে আসতে পারিনি বলে বিজ্ঞজনরা বলে থাকেন। ফলে ভাষার উন্নয়ন, প্রসার ও নির্মাণে আমরা নানাভাবে বিপর্যস্ত, পর্যুদস্ত। আমাদের মনে হয় এ সমস্যার শিকড় গভীরে নিহিত। তা খতিয়ে দেখতে হবে। সমস্যার মূলোৎপাটন অতি জরুরি।

 

সরকারি তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত স্কুল পাঠ্যবই নিয়ে যে তুলকালাম কা-, তা আমাদের আশঙ্কাই সত্য বলে প্রমাণ করে। উদো, বুধো নয়; আসল কলকাঠি কারা বা কে নাড়ছে তার পরিচয় প্রকাশ অতি আবশ্যক।

 

বিদেশি ভাষাপ্রীতি বা নির্ভরতা নয়, বাংলার সমান্তরালে প্রয়োজনীয় ভাষার চর্চা, অধ্যয়ন এবং প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ইংরেজি আজ কেজো বা কাজের ভাষা হয়ে উঠেছে। কোনো মাধ্যমকেই অবহেলা নয়, দরকারটুকু বিবেচনা করে সেই মতো উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে ভাষা নিয়ে অনেক দরদ প্রকাশ করি, কেতাবি বুলি প্রকাশ করি। তারপরের মাস থেকেই সব একপাশে সরিয়ে দেই। যেন তা দরকারের সময় বিশেষ উদ্দেশ্যে বলার জন্যই বলা। অন্তরের কোনো তাগিদ নেই, বলার কথায় বিশ্বাস নেই, নেই আস্থা। এতে করে বাংলা ভাষার বিকাশ তো হবেই না বরং আমাদের মানসিক দৈন্য দিনকে দিন বাড়তেই থাকবে। আমাদের আত্মমর্যাদার সূচক বিশ্বের দরবারে নি¤œগামী হবে।

 

শুধু সরকার নয়, এই কাজের দায়িত্ব আমাদের সবার, প্রত্যেক নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব সঠিক ভাষা চর্চা ও ব্যবহার। বাংরেজি বা বাংলিশ ভাষা জগাখিচুড়ি হিসেবেই চিরকাল চিহ্নিত হবে, কোনো ভাষার লালিত্য, গৌরব বা মর্যাদা পাবে না। যে ভাষায় কেবল কাজ চালানো যায়, আবেগ প্রকাশ করা যায় না, শিল্প-সাহিত্যে যার প্রয়োগ করা যায় না, আর যাই হোক তা কখনো ভাষা নয়। প্রমিত ভাষাই আসলে ভাষা। এই সত্য আমরা যত তাড়াতাড়ি এবং গভীরভাবে উপলব্ধি করব আমাদের দেশ ও জাতির ততই মঙ্গল। স্বোপার্জিত বাংলাদেশের উন্নতির ধারায় আরেকটি অন্তরায় তত দ্রুতই দূর হবে।  
লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ, karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd