ঢাকা : শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১০:৩০:২৮আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১০:৩০:৩৪
সুষ্ঠু নির্বাচন তো সবাই চায়
মো. ফজলুল হক মাস্টার
মো. ফজলুল হক মাস্টার


 


নির্বাচন রাজনীতিকদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের হাতিয়ার এবং ক্ষমতা পাবারও সোপান। একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চর্চার ধরন কেমন এবং নাগরিকদের চরিত্র কেমন, এমনকি রাষ্ট্রচরিত্রের মাপকাঠিও এটি। নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয় আর সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়ীরাই যে গণতন্ত্র চর্চায় ব্রতী হয়ে ওঠে, নজির এরকম খুব একটা নেই। গণতন্ত্র শাসকদলের আচার-আচরণ এবং নীতি-আদর্শের ওপর নির্ভর করে। ভোটের অধিকার রক্ষায় নাগরিকদের সংগ্রামের দীর্ঘ ঐতিহ্যে ভরপুর আবার শাসকদল কর্তৃক গণতন্ত্র ধ্বংস হবার ইতিহাস কদর্যে ভরা।
সুষ্ঠু ভোট সম্ভব হয় না ক্ষমতা দখলের তীব্র নেশার কারণে। শাসকদল চায় ক্ষমতায় টিকে থাকতে আর বিরোধীদল চায় ক্ষমতায় যেতে। ছবিসহ ভোটার আইডিকার্ড থাকা সত্ত্বেও নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষা হবে নাÑ এটা কতটা নির্লজ্জ আচরণ তা কি বর্ণনাতীত নয়? এই যে নির্লজ্জতা এটাই হলো একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের চারিত্রিক ত্রুটি যা গণতন্ত্রের জন্য অন্তরায় এবং সভ্যতারও। আর যখন দেখি আইনের লোকেরা, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা কারো পক্ষে ভোট করতে মরিয়া হয়ে লেগে যায় এটা হলো প্রশাসনিক চরিত্রের নগ্নতা। ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ভোটকেন্দ্রে ভোট হয়নি। ভোট বাক্স ছিল জনগণের হাতে কিন্তু ফলাফল ঘোষিত হয়েছে রাষ্ট্র পরিচালকদের নির্দেশে। এটা হলো আদর্শ বিচ্যুৎ বিএনপির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব।
২০০১ সালে অক্টোবরের নির্বাচনের প্রাক্কালে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান প্রশাসনকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের ওপর প্রকাশ্যে নির্যাতন করেছে। মূলত এটা করেছে আওয়ামী ঘরানার ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর হীনমানসে। এ নিয়ে তিনি দেশে-বিদেশে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এম এ আজিজ ভুয়া ভোটার তালিকা তৈরি করে মূলত জোটশাসকদের ক্ষমতায় বসাতে পাঁয়তারা করেছিলেন। এটা হলো প্রশাসনিক নগ্নতা, যা রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়। প্রশাসনিক নগ্নতা যতটা দৃশ্যমান হয়েছে তার সিংহভাগই বিএনপির সৃষ্টি। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ধ্বংসের দায়ও বিএনপির। সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজ উদ্দীনকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান করা বিএনপির একটি নির্লজ্জ পদক্ষেপ ছিল। নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনে আমরা প্রত্যক্ষ করলামÑ নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং জনগণ এমনকি রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। এভাবে সকলে মিলেমিশে ভোট সুরক্ষায় আন্তরিক হলে জনগণের ভোটের রায় কেউ পাল্টাতে পারবে না। আমরা ভোটারবিহীন কেন্দ্র দেখেছি। বাক্সবিহীন ভোটের ফলাফল ঘোষণা করতে দেখেছি; কিন্তু আমরা প্রতিবাদ গড়ে তুলিনি।
পরাজিত রাজবংশধরদের জবাই করে গায়ের চামড়ার ওপরে বসে ভোজ উৎসব করার ইতিহাস রয়েছে। পিতাকে বন্দি করে, ভ্রাতাদের হত্যা করে রাজ্য দখলের ইতিহাসও রয়েছে। ক্ষমতালাভের জন্য নিষ্ঠুর নির্মম ইতিহাস কি লিখে শেষ করা যাবে? যাবে না। মানুষ অসহায়ের মতো এসব নিষ্ঠুরতা মেনে নিলেও তাদের তীব্রভাবে ঘৃণা করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় যারা বিরোধিতা করেছিল, যারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত তাদের বিচারের রায়ে সাধারণ মানুষ কতটা খুশি তা কে না জানে? এই যে জামায়াত সন্ত্রাসী দল হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। তারা যে বোমারু তৈরি করে গড়ে তুলেছে ক্যাডার বাহিনী। এতে করে তারা যতটা ইমেজ সংকটে ভুগছে তার চেয়েও বেশি জনমন থেকে দূরে চলে গেছে। আর জঙ্গিরা হত্যা, গুম এবং ত্রাস সৃষ্টি করে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে দল ভারী করার যে প্রকল্প নিয়ে জনগণকে দলে টানতে চেয়েছিল তার পুরোটাই ভেস্তে গেছে বললে অবশ্যই ভুল হবার নয়।
গণতন্ত্র একটি প্রক্রিয়া যাতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের পবিত্র ক্ষমতা ব্যবহারের দায়িত্ব অন্যদের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু ক্ষমতা পেয়ে যারা এটা ভুলে যায় তাদের কি বলা উচিত? জনগণের দেওয়া পবিত্র ক্ষমতার অপব্যবহার করতে গিয়ে তারা নিজেদেরও সর্বনাশ ডেকে আনে। জনগণের পকেট ফুটো করে ক্ষমতাসীনরা রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে ওঠে। আবার জোঁকের মতো রক্ত ঝরে অনেক সময় তারাও ফুটা হয়ে যায়। তারেক জিয়া অর্থবিত্তে ফুলে উঠলেও এখন নির্বাসনে করুণ পরিণতি ভোগ করছেন। দুর্নীতিবাজ লুটেরা হিসেবেই তার খ্যাতি। বিএনপি এমনকি বিএনপির দলীয় প্রধান তার মা খালেদা জিয়া নিজেও দুর্নীতিবাজ সন্তানের হয়ে কথা বলতে লজ্জাবোধ করছেন না। আপসহীন নেত্রীও ভাবছেন দুর্নীতিবাজ সন্তান তারেককে নিয়ে কথা ওঠালে তারও ইমেজ সংকট ঘটতে পারে। ক্ষতি হতে পারে দলের। পরিণতির ভয়াবহতা কতটা ক্ষত সৃষ্টি করে এর চেয়ে বড় নজির কিছু কি থাকতে পারে? জনগণের রায় উপেক্ষা করার হীন মানসিকতা থেকে জোটশাসন আমলে জঙ্গিদের রাষ্ট্রীয় মদদে এগিয়ে যাবার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সুযোগ দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। রাজশাহীর বাগমারাতে জঙ্গিরা মাইকমেরে লোক জড়ো করে পুলিশের উপস্থিতিতে টার্গেটি প্রগতিশীল লোকদের প্রকাশ্যে হাতুড়ি, রড দিয়ে পিটিয়ে পঙ্গু করে দিয়েছে। মূল লক্ষ্য ছিল জঙ্গিদের দিয়ে ভোটকেন্দ্র দখল করে ক্ষমতায় টিকে থাকা। মূল লক্ষ্য আওয়ামীদের শেষ করে দেওয়া না হলে রাষ্ট্রশক্তি কেন জঙ্গিদের উল্লাসে চলার সুযোগ দেবে। বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া সংলাপ-উত্তর সময়ে বলেছিলেন, আওয়ামীদের একশ বছর ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হবে না। অক্টোবরের নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াত-বিএনপি নেতারা যুবলীগ, ছাত্রলীগের বাবা-মায়েদের কানে পৌঁছে দিয়েছিল যুবলীগ-ছাত্রলীগের বাবা-মায়েরা সন্তানহারা হয়ে যায়। কাজে কাজেই জঙ্গিদের বিএনপি কেন জামাই আদর করেছে তা নিয়ে অবশ্যই গবেষণার প্রয়োজন নেই। দেশে-বিদেশে কথা উঠেছে বিএনপি জামায়াত ছাড়–ক। বিএনপি তা শুনছে না। আদতে জামায়াত ও বিএনপি একই উদরের দুই ভাইÑ এটা প্রমাণিত সত্য। এটাও সত্য যে, দুটো দলই গণতন্ত্রবিরোধী। কিন্তু ক্ষমতা প্রাপ্তির মোহ প্রচ-। ক্ষমতার জন্য আগুন সন্তাসই বলুন আর জঙ্গি লালনই বলুন,  কোনোটা দল দুটোর জন্য অস্বাভাবিক নয়। যখন রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের কাজ চলছিল তখন বিএনপির প্রয়াত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশন হাত-পা বেঁধে সাঁতরাতে বলছে। এতে করেও বোঝা সহজ গণতন্ত্রের পথে পা রাখতে বিএনপি নারাজ।
গণতন্ত্র আজ গতিশীল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতাপূর্ণ শাসনের কারণেই নিজদলীয় মন্ত্রীরা-এমপিরা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং নিজেরাই নিজেদের ভুলগুলোর সমালোচনা করে চলেছেন, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি মাইলফলক দৃষ্টান্ত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা মাথায় নিয়েছে। কেননা শেখ হাসিনার সরকার বলছে না যে দেশে নিরপেক্ষ লোক নেই। তাছাড়া জনরায়ে বিশ্বাস রাখে বলেই বর্তমান সরকার প্রভুশক্তিদের তোয়াজ করছে না। বরং সাহসের সাথে বিদেশিদের দাঁতভাঙা জবাব দিচ্ছে। সরকার জনগণের নিকট দায়বদ্ধ থাকার কারণেই আজকে আমাদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসেবার, জনকল্যাণের এবং রাষ্ট্রের মঙ্গলের স্বার্থেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের এমপি পদে প্রার্থী হবার সুযোগ শেখ হাসিনা দেননি। দুর্নীতি যাতে গতিশীলতা না পায় সেজন্য অনেক বাঘা-বাঘা নেতাকে বর্তমানে মন্ত্রিত্ব দেননি। স্বাধীনতা-উত্তর দেশে রাজকোষ ধ্বংস করে রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়েছে। খুনিরা মন্ত্রিত্ব পেয়েছে। মন্ত্রিত্ব পেয়েছিল চিহ্নিত রাজাকাররাও। স্বাধীনতা-উত্তর দেশে ডন কোইক্সট সেজে গণতন্ত্রের নাম মুখে নিয়ে সাম্প্রদায়িক চেতনাকে চেতিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছে। বিধর্মীদের মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুর করা হচ্ছে। শুধু কি সুষ্ঠু ভোট হলেই এসব বিষয়ের সহজ সমাধান হয়ে যাবে? অসম্ভব।
সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে খাঁটি দেশপ্রেমিকদের উঠিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদের। অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে এবং গণতান্ত্রিক শক্তিকে বিজয়ী করার দায়িত্বও আমাদের। এখন রাষ্ট্র সচল। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাকা গতিশীল। আমরা যদি ভুল করি খেসারত আমাদেরই দিতে হবে। মুজিবের মৃত্যুর পর রাষ্ট্র পিছিয়ে গিয়েছিল। ক্ষতি হয়েছে আমাদের। ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রের, যা কল্পনাতীত। আমরা যেমন ভোটাধিকার চাই তেমনি ভোটের সঠিক ব্যবহারে প্রত্যয়ী হবার দায়িত্বও আমাদের।
লেখক : প্রধান শিক্ষক, নারিকেলী উচ্চ বিদ্যালয়, জামালপুর

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd