ঢাকা : শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • মেক্সিকোতে ভূমিকম্প : নিহত ২৪৮          রোহিঙ্গাদের ব্যাপার ঐক্যবদ্ধ হতে ওআইসি’র প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান          দু-এক দিনের মধ্যে চালের দাম কমবে : বাণিজ্যমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের প্রতি আন্তরিকতার কমতি নেই : ওবায়দুল কাদের          রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ত্যাগ করলে অবৈধ বলে গণ্য হবেন : আইজিপি          রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ নৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে : রুশনারা আলী
printer
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১১:৩০:২৮
কাঁদো শীতলক্ষ্যা কাঁদো
করীম রেজা


 


এক সময়ে প্রাচ্যের ডান্ডি বলে নারায়ণগঞ্জ শহর প্রসিদ্ধ ছিল। শীতলক্ষ্যা নদী আর পাট ব্যবসার কারণেই এই বিশ্বখ্যাতি বা পরিচিতি। উপমহাদেশে নদী নিয়ে বিস্তর লোকজ গল্প উপাখ্যান রয়েছে। বিখ্যাত উপন্যাস, চলচ্চিত্রও আছে। আছে কিংবদন্তির মতো নানা উপকথা। নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশ গড়ে উঠেছে শীতলক্ষ্যার তীরে। নদী হিসেবে শীতলক্ষ্যার ভিন্ন ভিন্ন বিশেষত্ব ছিল। বিখ্যাত মসলিন কাপড়ের কথা আমরা জানি। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, মুঘল শাসন আমল, এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলের সময়েও একমাত্র শীতলক্ষ্যার পানি দ্বারাই কেবল মসলিন কাপড়ের সুতা তৈরি হতো। শীতলক্ষ্যা নদীর পানির এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যই এর একমাত্র কারণ। আজ তা অতীত গল্পকথা মাত্র। সে নদী নাই আর পানি তো আজ দূরের কথা।
শীতলক্ষ্যা নদী নিয়ে বেশ চমকপ্রদ গল্প রয়েছে; তা সংক্ষেপে প্রায় এরকম নদী মহলে সুন্দরীরূপে গুণে-মানে ঐশ্বর্যবতী শীতলক্ষ্যার খুব নামডাক। এই খবর পেয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ শীতলক্ষ্যাকে জয় করতে অভিযানে বের হলেন। অচিরেই রূপসী শীতলক্ষ্যার কাছেও ব্রহ্মপুত্রের অভিযানের এই সংবাদ পৌঁছে গেল। যুবতী শীতলক্ষ্যা কালিঝুলি মেখে এক বুড়ি সেজে ব্রহ্মপুত্রের মুখোমুখি হলেন। হতাশ ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যার প্রতি আকর্ষণ হারালেন। ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার মিলিত ধারাটিই পরে বুড়িগঙ্গা বলে পরিচিত হলো। রূপবতী শীতলক্ষ্যা অজেয় রইল।
ব্রহ্মপুত্র পরাজিত হলেও নারায়ণগঞ্জবাসী বিজয়ী হলো। শীতলক্ষ্যার রূপ হরণ করল প্রথমে ইংরেজরা; মসলিনের উৎপাদন চিরতরে বন্ধ করে। বাকিটুকু বর্তমান বাসিন্দারা। মসলিনের সুতা তৈরির জন্য যে বিশেষ রাসায়নিক উপাদান ছিল শীতলক্ষ্যার পানিতে আজ তা নেই। কিন্তু অন্যরকম রসায়নে শীতলক্ষ্যার পানি আজ ব্যবহারের অযোগ্য। নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে নানা রকম শিল্প-কারখানা। কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য  নদীতে এসে পড়ছে।  দুই পাড়ের বাসিন্দাদের বাড়িঘরের পরিত্যক্ত ময়লা, গৃহস্থালির তরল বর্জ্য সবই মিশ্রিত হচ্ছে নদীর জলস্রোতে। জলস্রোতও আগের মতো নেই। দুই পাড়েই ভূমি দখলদারের অবাধ লুণ্ঠনে নদী হয়েছে ক্ষীণকায়।
নারায়ণগঞ্জ শহরের দক্ষিণ প্রান্তে একসময় কয়লার ডিপো ছিল, যা কয়লাঘাট বলে সবাই চিনত, জানত। কয়লাঘাট দিয়ে নৌকা বা লঞ্চ যাতায়াতের সময় খুবই হুঁশিয়ার হয়ে চলতে হতো। প্রবল স্রোতে কয়লাঘাটে প্রচ- ঘূর্ণি বা আবর্তের সৃষ্টি হতো। আজ সে কয়লাঘাটও নেই, নেই সেই ঘূর্ণাবর্তও। সবই কেমন গালগল্প মাত্র শোনায়। ওই এলাকায় কয়েকটি সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন স্টেশন ছাড়াও বেশকিছু কারখানা স্থাপিত হয়েছে। সিমেন্টের  ফ্লাই অ্যাশ কুয়াশার মতো সারাক্ষণ নদীর বুক অন্ধকার করে রাখে, পানিতে মিশে গিয়ে তলদেশ ভরে তুলছে। জলধারা বলতে গেলে নেই-ই। সব মিলিয়ে পচা দুর্গন্ধময় পানি। নদীতে চলাচল বা পারাপারের সময় নাক চেপেও ওই দুর্গন্ধ চাপা দেওয়া কঠিন।
সম্প্রতি জানা গেল, সায়দাবাদ পানি শোধনাগারের ক্ষমতায় কুলোচ্ছে না; শীতলক্ষ্যার পানি শোধন করে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করা। শুধু শীতলক্ষ্যাই নয়, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ শহরের আশপাশের সব নদীর পানিই মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য। ওই সব নদীতে জলজ প্রাণি বা মাছ পাওয়া তো আজ স্বপ্নের মতো। অতি সামান্য যা পাওয়া যায় তা এক কথায় খাওয়ার উপযুক্ত নয়। সোনারগাঁর প্রত্যন্ত এলাকা দন্দি বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের একটি কৃশকায় ধারা আছে। আশ্চর্য হলেও সত্য, সেই ক্ষীণপ্রবাহের পানিও আজ নানা রকম রসায়নে দূষিত এবং ব্যবহার অনুপযোগী। শিল্পের বিশেষ করে ডাইং শিল্পের কারণেই তা হচ্ছে। ডাইং ইন্ডাস্ট্রি আবার আরএমজি বা গার্মেন্টস শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাংলাদেশ আজ সবদিকে প্রভূত উন্নতি করছে। কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘটছে পরিবেশের অবনতি। উন্নতি এবং অবনতির এই অতি উচ্চ বিনিময় হার বোধ করি আর আমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকছে না। ওয়াসা পরিকল্পনা করছে পদ্মা-যমুনা থেকে পানি সংগ্রহ করে এনে শোধন করে রাজধানীবাসীকে সরবরাহ করবে। ওয়াসা মোট চাহিদার প্রায় ৩০ ভাগ সরবরাহ করে আর ৭০ ভাগ আসে ভূগর্ভস্থ পানির উৎস থেকে। কয়েক বছর ধরে নদীদূষণ কমানো বা বন্ধের কথা শোনা গেলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। অবশ্য সুদূর পদ্মা থেকে পানি আনার প্রকল্প একটি মহৎ উদ্যোগ, সাধুবাদের দাবিদার অবশ্যই। এর থেকে সংশ্লিষ্ট অনেকের টুপাইসের একটা নতুন প্রবাহ যে চালু হতে পারে তাতে কারো সন্দেহ করা অনুচিত হবে বৈকি। নদীপ্রবাহ বন্ধ হলে বা মরে গেলেও নতুন আর্থিক সুযোগ অনেকের ভাগ্য দুয়ার খুলে দেবে।
আরেকটি আশঙ্কার দিক বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। আশপাশের যেসব নদীর পানি এখনও দূষিত হয়নি, সেগুলোতেও দূষণ ছড়িয়ে পড়ছেÑ এমন সংবাদ পত্রিকান্তরে ছাপা হয়েছে। বলা হয়, প্রতিকার নয় প্রতিরোধ বা প্রতিষেধই উত্তম ব্যবস্থা। রকেট বিজ্ঞানী না হয়েও বলা যায় শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী বা তুরাগ নদীর দূষিত পানি ধীর গতিতে হলেও মেঘনার মোহনার দিকেই প্রবাহিত হবে। প্রথমত জলধারা সমুদ্রাভিমুখী, দ্বিতীয়ত দূষিত পানি মোহনার দিকের পদ্মা-মেঘনার অদূষিত পানির তুলনায় বেশি ঘনত্বের। তাই পানি নিজস্ব নিয়মেই কম ঘনত্বের পানির দিকে ধাবিত হয়ে নিজের ঘনত্ব কমাতে ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা করবে। আফসোস আমাদের প-িতমন্য সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা অবস্থা চরমে পৌঁছার অপেক্ষায় থাকেন। এরপর তাত্ত্বিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন আর তা বাস্তবায়নের অবস্থায় নিতে নিতে রোগ সারানো কঠিনতম অবস্থায় চলে যায়। সুদূর পদ্মা-মেঘনার পানিও যে কর্তাদের মর্জিমতো আহরণযোগ্য থাকবে না এই খবর থেকে কারোই বুঝতে বাকি থাকল না। পানি বহন করে সমস্যার সমাধান অর্বাচীনের কল্পনা, নদীর পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনতে এখন যথাসর্বস্ব দিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে যার কোনও ভিন্ন বিকল্প নেই।  
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অনেক দিন আগে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন কাঁদো নদী কাঁদো। উপন্যাসের গল্পে দেখা যায়,  নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। চর জেগেছে। একটি জনপদ বিপন্ন হতে চলেছে। নদীপথ বন্ধ হলে ঐ অঞ্চলের বাসিন্দাদের  জীবনযাপনে বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি হবে। তাদের ভবিষ্যৎ দুঃখের কথা ভেবে নদীও কষ্ট পেয়েছিল। নদী নিজেই কাঁদত। নদীর কান্না শুনতে পায় প্রথম এক নারী এরপর ওই জনপদের সবাই। যদিও তারা তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমাদের মতো এত উন্নত ছিল না। তারপরও তারা কিন্তু নদীর ব্যথাভরা কান্নার আওয়াজ ঠিকই শুনতে পেয়েছিল। আমাদের  আছে কত কত উন্নত আধুনিক প্রযুক্তি, যার দ্বারা অতি সহজেই আমরা নদীর স্বাস্থ্যের কথা জানতে পারি। এমনকি আগামও বলতে পারি। কত দিন, মাস, বছর পর কার কী অবস্থা হবে বা হতে পারে, সব বলতে পারি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা নদীর কান্নাটুকু শুনতে পারলাম না।
নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল বা এর আশপাশে প্রচুর জেলে নৌকা দেখা যেত। জেলেরা মাছ ধরার পাশাপাশি জাল টেনে কয়লাও উঠাত। ছিল অনেক বেদের নৌকা, তারাও মাছ ধরত। দেশের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে নৌ-যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র ছিল নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর।  ছোট-বড় অনেক লঞ্চ এই টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যেত যাত্রী ও পণ্য নিয়ে। পণ্য বা যাত্রী পরিবহন আজ সবই প্রায় বন্ধ দু-একটি ছাড়া। বালুবাহী যন্ত্রচালিত নৌকার যথেচ্ছ ছড়াছড়ি বর্তমানে। নদীর কান্না কেউ শোনা তো দূরের কথা, পচা দুর্গন্ধযুক্ত কালো রঙের পানিও মনে হয় সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা দেখতে পায় না। পানের অযোগ্য তো বটেই, ধোয়া বা গোসল করাও অসম্ভব। নানা রকম চর্ম রোগ দেখা দেয়। ত্বকে ক্যান্সার হওয়ার মতো যথেষ্ট দূষিত পদার্থ রয়েছে এই পানিতে। চাষাবাদেও এই পানির ব্যবহার অত্যন্ত বিপজ্জনক। গোটা সামাজিক স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা দিন দিন বাড়ছেই।
ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ এবং নারায়ণগঞ্জের মেয়র মহোদয়গণের আশু কর্তব্য নদীর এই ভয়াবহ দূষণ দূর করা। নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক ও আর্থিক অগ্রগতির বিষয়টি। সড়ক, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাটের উন্নয়ন, যানজট দূর করা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, অধিক হারে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠা কোনো কাজেই আসবে না। কেননা নদীর দূষিত পানি খুব অল্পদিনের মধ্যেই সম্ভবত ভূনি¤œস্থ পানির সঙ্গে মিশ্রিত হবে। পরীক্ষা করলে হয়তো জানা যাবে ইতোমধ্যে তা ঘটেও গিয়ে থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মাটির গভীরের পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। ভূতলের পানি সেচ দিয়ে চাষাবাদও করা হচ্ছে। এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের স্বাস্থ্যসেবা  ব্যবস্থা অপ্রতুল। পানিবাহিত রোগে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে রোগ ছড়াতে থাকবে। আমাদের তখন কিছুই করার থাকবে না। তখন একটি অসুস্থ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনেক বেশি ভাবতে হবে। ভয়াবহ ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলা করার জন্য এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। যেকোনো মূল্যে সারা দেশের নদী দূষণ কমাতে হবে। নদীর পানি শোধন করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে  যেকোনো মূল্যে।  
আমরা সচেতন নাগরিক হিসেবে এখনই উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। কথায় আছে, সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশ ফোঁড়। মানুষ হিসেবে আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশেরই অংশ। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব সর্বাগ্রে। উটপাখির মতো মাথা গুঁজে থাকলে সে মাথা আর তোলার সুযোগ নাও হতে পারে। সবাই জানি, অন্ধ সেজে থাকলেও প্রলয় কিন্তু বন্ধ হবে না।
লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ, ই-মেইল : karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd