ঢাকা : বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১২:২৮:২৯
আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী কক্সবাজার
এহছানুল হক


 


বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। ১৭৯৯ সালে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স পরলোকগমন করলে তার নাম অনুসারে আধুনিক কক্সবাজারের নামকরণ করা হয়। কক্সবাজারের পুরাতন নাম পালংকি। এটি চট্টগ্রাম থেকে ১৫২ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ঢাকা থেকে ৪১৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।
কক্সবাজার দেশের স্বাস্থ্যকর স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে রয়েছে দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুচর, বৃহত্তম সামুদ্রিক মৎস্যবন্দর, সাবমেরিন ক্যাবল লেন্ডিং স্টেশন, প্রবাল দ্বীপ, পাহাড়ি দ্বীপ, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, চিংড়ি ঘের, রামু রাবার বাগান ও কুতুবদিয়া বাতিঘর। এছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি ও মৎস্য চাষের অভয়ারণ্য এ কক্সবাজার। এখানে উৎপাদিত চিংড়ি,  শুঁটকি, লবন চাষ ও  মহেশখালীর পান চাষ যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
পৃথিবীর বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, উপন্যাসিক, কবি-সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ অনেকে এ অঞ্চলে আগমন করেন। পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ তারকা হোটেল, ঝিনুক মার্কেট, বার্মিজ মার্কেট ইত্যাদি। নবম শতাব্দির গোড়ার দিকে ১৬১৬ সালে কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের বড় অংশ আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুঘল সম্রাট শাহ সুজা পাহাড়ি সড়ক দিয়ে আরাকান যাওয়ার পথে কক্সবাজারের নান্দনিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ক্যাম্প স্থাপনের নির্দেশ দেন। মুঘলদের পরে ত্রিপুরা, আরাকান, পর্তুগিজ এবং ব্রিটিশরা এই এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়। কক্সবাজার থানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৪ সালে এবং পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৬৯ সালে।
বর্তমান সরকার কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটননগরী করার লক্ষ্যে মহেশখালীতে তৈরি করছে দ্বিতীয় এলএনজি টার্মিনাল। সম্প্রতি নির্মাণ, মালিকানা ও পরিচালনার ভিত্তিতে নির্মিতব্য কেন্দ্রের প্রস্তাবটি বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান আইন ২০১) এর আওতায় আনা হয়েছে। সামিট কর্পোরেশন লিমিটেড কর্তৃক ৫০০ এমএমসিএফ ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় এলএনজি টার্মিনাল ‘ফ্লেমিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট’ স্থাপনের নেগোসিয়েশনের নীতিগত অনুমোদনের প্রস্তাবে কমিটির সম্মতি পাওয়া গেছে বলে অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন।
এছাড়া দেশের প্রথম সাবমেরিন নৌ-ঘাঁটি স্থাপন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নে। ৪৬৬ একর জমিতে শীঘ্রই হতে যাচ্ছে পেকুয়া মগনামা সাবমেরিন নৌ-ঘাঁটি। এটির জন্য অধিগ্রহণকৃত জমিতে নির্মাণকাজের সরঞ্জাম আনা হবে বলে নৌবাহিনীর প্রধান এডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহমেদ।
দেশের কয়েকটি জেলায় লবণ উৎপাদিত হলেও এর মধ্যে নব্বই ভাগেরও বেশি লবণ উৎপাদিত হয় কক্সবাজার জেলায়। বর্তমানে কক্সবাজারে দৈনিক প্রায় দেড়লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়ে থাকে।
গত মৌসুমে বিসিকের হিসাব মতে, ১৫ লাখ ৪৫ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়ে থাকে কক্সবাজার জেলায়। লবণ উৎপাদনে পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, রামু, উখিয়া টেকনাফ, চকরিয়াসহ প্রতিটি উপজেলায় প্রায় ৫ লক্ষাধিক চাষি কঠোর পরিশ্রম করে লবণচাষ করছেন। তাদের একমাত্র জীবিকা নির্বাহ লবণচাষে। লবণ ছাড়াও কক্সবাজারে প্রতিবছর প্রায় ৩০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত শুঁটকি দেশের সিমানা পেরিয়ে বিক্রি হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বিদেশের বাজারে বেশির ভাগ ইলিশ, কোরাল, লাক্ষ্যা, চাপা, হাঙ্গর, কামিলা, রূপচাঁন্দা, পোপা, মাইট্টা, ছুরি ইত্যাদি রপ্তানি হচ্ছে। সোনালি সম্ভাবনা হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি খাতটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রপ্তানিতে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজার জেলায় প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়।
বাংলাদেশ গত ৭ বছরে ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করেছে। এরমধ্যে কক্সবাজারের উৎপাদিত চিংড়ির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এ খাতের বিকল্প নেই। সাগর থেকে মা মাছ শিকার, ভাইরাস আক্রমণ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব ঠেকাতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিলে চিংড়ি রপ্তানি দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত হয়ে উঠবে।
আঞ্চলিক গানের মুকুটহীন সম্রাট শেফালী ঘোষের কণ্ঠে গাওয়া জনপ্রিয় গান-
‘যদি সুন্দর একখান মন পাইতাম
মহেশখালীর পানর কিলি তারে
বানাই খাওয়াইতাম...’
হাজার বছর আগে থেকে দক্ষিণ এশিয়ার আধিবাসীদের পান খাওয়ার অভ্যাস। ভারতবর্ষেও পান খাওয়ার প্রচলন ছিল। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রিয়তমা নূরজাহানের পান খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরবর্তীতে অন্দরমহলের অন্যদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী। এ দ্বীপের আধিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী পেশা ছিল পান চাষ। জীবিকার তাগিদে পাহাড়ি আধিবাসীরা পানচাষ করতেন। মহেশখালীর পানের বৈশিষ্ট হল এটি মিষ্টি ও সুস্বাধু। মাঘি, মহানালী, বেরাফুলী, বাংলা, সন্তোষী, মিঠা প্রভৃতি জাতের মধ্যে মহেশখালীর মিষ্টি পান উল্লেখযোগ্য। এ পান যুগ যুগ ধরে দেশের বাজার দখল করে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশের দুই তৃতীয়াংশ মিষ্টি পান মহেশখালীতে উৎপাদিত হয়।
পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের চাহিদা মেটাতে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে সবকটি প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১০ সালের ৬ জুলাই বহুল প্রতীক্ষিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেললাইন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়। পরের বছরের ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্প উদ্বোধন করেন। কিন্তু এ প্রকল্পের কাজ যে কচ্ছপ গতিতে চলছে তাতে নির্ধারিত মেয়াদে রেল প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে কিনা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া আমরা লক্ষ্য করেছি, প্রকল্পের ধীরগতির কারণে অনুমোদন দেওয়ার সময় যে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৮৯২ কোটি টাকা পরবর্তীতে তা কয়েকশগুণ বেড়ে যায়।  দোহাজারী হতে চকরিয়া-রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এবং রামু হতে ঘুনধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটারসহ মোট ১২৮ কিলোমিটার নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে। বর্তমান প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ঋণ দেবে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া হবে বাকি চার হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। ঠিক একই অবস্থা কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরও।
আমরা বিশ্বাস করি, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন নগরী হিসাবে গড়ে তুলতে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। এক্ষেত্রে সরকারের মহাপরিকল্পনা দৃশ্যমান। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার প্রয়োজন। এ ছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সরকারের মহৎ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন কক্সবাজার উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আমরা উদ্বেগের সাথে আরো একটি বিষয় লক্ষ্য করছি, তা হল ইমারত নির্মাণে কোন নিয়মনীতির তোয়ক্কা না করা। গত একদশক যাবৎ হঠাৎ কক্সবাজারে বিভিন্ন ডেভ্লাপমেন্ট কোম্পানি কক্সবাজারে প্রবেশ করে যততত্র ইমারত নির্মাণ শুরু করেছে। এ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোন মাথা ঘামায়নি। এতে কক্সবাজারের সামগ্রীক পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংগত কারণে কক্সবাজারে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া একান্ত জরুরি। আমরা মনে করি, দেশি-বিদেশি পর্যটকরা পর্যটনের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে পর্যটন খাতে সরকার ও সমগ্র জেলার মানুষের আয় বাড়বে। দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে পর্যটননগরী কক্সবাজার।
কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম যথাযথভাবে সমাপ্তকরণ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে চারলেনে উন্নীতকরণ, দোহাজারী-ঘুনধুম রেললাইনে কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন, কক্সবাজার পর্যটন এলাকায় পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধিসহ সার্বিক উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন হলে প্রকৃত অর্থে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে বলেই পর্যটকমহলের বিশ্বাস। সরকার ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে- এমন ধারণা সর্বস্তরের পর্যটকদের।
লেখক : সংবাদকর্মী

printer
সর্বশেষ সংবাদ
পর্যটন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd