ঢাকা : শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১২:২৯:১৯
আজকের এ দিনে রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ
নাজমুল হক নাহিদ


 


প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন হয়ে আসছে মহান ‘একুশে ফেব্রুয়ারি‘ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার এই দিবসটি। ১৯৪৭ সালে ভারতের সাথে দেশ ভাগের পর ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান ভিন্ন হওয়ার পরও শুধু মাত্র ধর্মীয় সংখ্যা গরিষ্ঠতার উপর ভিত্তি করে পূর্ব পাকিস্তান দুটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান সংখ্যা লঘুর হওয়ার পরও সিভিল সার্ভিস, মিলিটারী ও গুরুত্বপূর্ণ সব রাষ্ট্রিয় পদে তাদের আধিপত্য বেশী ছিল। ক্রমে তারা নিজেদের শাসনকর্তা ও বাঙালীদের প্রজা ভাবতে শুরু করলেন। নব গঠিত রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তারা উর্দূ ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করতে থাকেন। এই পরিকল্পনার কথা জানতে পারে ঢাকায় তমদ্দুন মজলিশের সেক্রেটারী অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে এক প্রতিবাদ সভা ও রালি বের করা হয় এবং সভায বাংলাকে উর্দূও পাশাপাশি রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী করা হয়। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ এর ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।তার পর তাদের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে।

 

পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন আত্মকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের কারনে আবারও সোচ্চার হয়ে উঠে বাঙালী ফলে ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রিভাষার দাবীতে পুনরায় মিছিল করা হয়। এতে শেখ মুজিবর রহমান, কাজী গোলাম মাহাবুব, অলি আহাদ, শওকত আলী, সামসুল হক প্রমূখ গ্রেফতার হন। তারপর ২১শে মার্চ ১৯৪৮ সালে ঢাকার রেস র্কোস ময়দানে তৎকালিন গর্ভর্ণও জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দৃড় ভাষায় ঘোষনা করেন উর্দূ এবং উর্দূই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। আবারো সোচ্চার হয়ে ওঠে বাঙালী, এমন সিদ্ধান্ত কখনো মানবো না এই দাবী ওঠে সারাবাংলায়। এভাবে ৪ বছর অতিবাহিত হয় তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানীদের ষড়যন্ত্র থামেনা। ২৭ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সাল পাকিস্তানের নব নিযুক্ত গর্ভণর জেনারেল খাজানাজিমউদ্দিন ঢাকায় এসে পুনরায় ঘোষনা দেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষনা শোনার পর গর্জে ওঠে বাঙালী জাতি, প্রতিবাদে জ্বলে ওঠে সারাবাংলা। ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সাল ৮ ই ফাল্গুন ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ সকাল ৯টা হতে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে জড়ো হতে লাগে ছাত্র জনতা। পাকিস্তান সরকার ঐ দিন ১৪৪ ধারা জারি করেন। এক সময় সমাবেত ছাত্র জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের কওে এবং মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রফিক, জব্বার, ছালাম, ও বরকতসহ নাম না জানা অনেকে।

 

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মায়ের মুখের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এ দেশের দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক রাষ্ট্রভাষা বাংলা হিসেবে উর্দুকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে সেদিন এ দেশের দামাল ছেলেরা তাদের জীবনের বিনিময়ে ঢাকার রাজপথে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা করেছিল। বাংলাদেশ আজ সার্বভৌম একটি দেশ। আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে আছে সমৃদ্ধ এক ইতিহাস। যুগে যুগে নানা আন্দোলন, বিপ্লব-বিদ্রোহ আর মতাদর্শের বিকাশ হতে হতে আমরা এসে পৌঁছেছি আজকের বাংলায়। বাঙালির বীরত্ব আর সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের তাৎপয্যপূর্ণ অধ্যায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। মায়ের ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের সুমহান প্রেরণার পথ ধরে বাঙালি জাতি এগিয়ে এসেছে মুক্তির পথে-স্বাধীনতার পথে। বাঙালি জাতি তাদের গৌরবের মহিমায় জয় করে নেয় স্বাধীনতা। শত্রুর অসুরিক আচরণ, বিকট উল্লাস আর নৃশংসতা স্বল্পসময়ে পরাভ’ত করা সম্ভব হয়, এ দেশের মানুষের মনে কাব্যময় স্নিগ্ধতার সঙ্গে সাহসের ইষ্পাত দৃঢ়তা ছিল বলেই। মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালির প্রেরণার একমাত্র বাতিঘর ছিল অনাদি অতীতের সংগ্রাম আর ভাষার জন্য রক্তদানের ইতিহাস। বহিরাগত বর্ণনাতীত হাজারো নির্যাতন-নিপীড়ন, আক্রমন-ষড়যন্ত্র পেরিয়ে হাজারো বছর ধরে অভিন্ন সত্তায় আমরা বাঙালি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সেই আত্মিক সম্পর্কের বন্ধনগত উপলব্ধির মধ্যদিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্বপ্নের এই সোনার বাংলাদেশ। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি যারা মাতৃভাষার জন্য অকপটে নিজেদের বুকে গুলি তুলে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি এবং জীবন-পণ যুদ্ধ করে আমাদের জন্য এই মহান মাতৃভাষার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সেই সব স্মরণীয়-বরণীয় রফিক, বরকত, জব্বার, সালাম, শফিউরসহ নাম না জানা আরো অনেক ভাইয়ের এবং বাংলাভাষার সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী পরলোকগত ও এখনো জীবিত সকল নেতাকর্মীদের আত্মদানের কথা। আমরা বাঙালি জাতি তাদের কাছে চিরঋণী। তাই তো আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাত ফেরিতে এক সাথে গেয়ে ওঠি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? তাঁদের এই ঋণ তখনই শোধ হবে যে দিন বাংলাদেশ কে আমরা সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারবো। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১- এর ২৪ বছর মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করাসহ স্বাধীনতার জন্য অনেক বাধা-বিপত্তি, যন্ত্রণা সহ্য করেছে আমাদের ৩০ লাখ শহীদ, অসংখ্য মা-বাবা, ভাই-বোন, বুদ্ধিজীবী এমনকি হাজারো শিশু। তাদের এই অকল্পনীয় ত্যাগ স্বীকার শুধুমাত্র স্বাধীনতা আর মুক্ত ভাষায় কথা বলার জন্য। সন্মান নিয়ে নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাঙালি জাতির ঐতিহ্যেও প্রথম নিদর্শন। ভাষা আন্দলন থেকেই মুক্তিযুদ্ধ। আর এই ভাষার অধিকার এবং নায্য অধিকার আদায়ে বাঙালির সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে রক্তস্নাত হয়েছে বাংলার সবুজ-শ্যামল নিষ্পাপ ভ’মি। ‘আমি বাংলায় কথা কই, আমি বাংলার কথা কই/ আমি বাংলায় হাসি, বাংলায় ভাসি, বাংলায় জেগে রই/ বাংলা আমার তৃষœার জল, দৃপ্ত শেষে চুমুক/ আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ। আমরি বাংলা ভাষা, আমরা এ ভাষাতে মা কে ডাকি, এ ভাষাতেই স্বপ্ন আঁকি। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকারের জন্য এদেশের মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে ঢাকার রাজপথ। আর তাই ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য শুধু একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, আত্মপ্রকাশের মহাবিস্ফোরণও। সেই রাষ্ট্রভাষার পথ ধরেই সূচিত হয় স্বাধীনতার আন্দোলন। গনতন্ত্রই স্বাধীনতার কথা বলে। বাংলাদেশ গণতন্ত্র অধিকারের দেশ। এর মধ্যে রয়েছে, বাক-স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, শেখার বা জানার স্বাধীনতা, কর্ম ও পেশার স্বাধীনতা, বলার স্বাদীনতা, মানবীয় অধিকার ভোগের স্বাধীনতা। এমনকি গণতন্ত্রের মূল কথা হচ্ছে জনগনের স্বার্থ, জনগনের সেবা, জনগনের সরকার। জনগনের এই স্বার্থ ও সেবায় কোনো বৈষম্য থাকবে না। থাকবেনা কোথাও কোন নিপীড়ন-নির্যাতন। গনতন্ত্র মানুষের অধিকারের কথা বলে। এর মধ্যে রয়েছে- বেঁচে থাকার অধিকার, জীবন- সম্পদের নিরাপত্তা লাভের অধিকার, সম-মর্যাদা লাভের অথিকার, নিপীড়ন- নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভের অধিকার, ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার। যা আমরা এখন হারাতে বসেছি। বলা চলে, মায়ের ভাষার যে সংগ্রাম আমাদেরকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করিয়েছে, তাকে পূর্ণতা দানের কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক ও আত্মপ্রকাশের দিন।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd