ঢাকা : শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • মেক্সিকোতে ভূমিকম্প : নিহত ২৪৮          রোহিঙ্গাদের ব্যাপার ঐক্যবদ্ধ হতে ওআইসি’র প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান          দু-এক দিনের মধ্যে চালের দাম কমবে : বাণিজ্যমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের প্রতি আন্তরিকতার কমতি নেই : ওবায়দুল কাদের          রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ত্যাগ করলে অবৈধ বলে গণ্য হবেন : আইজিপি          রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ নৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে : রুশনারা আলী
printer
প্রকাশ : ০৬ মার্চ, ২০১৭ ১০:২০:০৬
মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা ৭ মার্চ
করীম রেজা


 


জয় বাংলা দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বজ্রনির্ঘোষে  লক্ষকণ্ঠে বাঙালি গর্জে উঠেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রত্যয়ে। আজ এই উত্তাল মার্চের ইতিহাসের ধারাজলে সিক্ত হয়ে জানতে ইচ্ছে হয়- ১৯৭৫ সালে মৃত্যুর সময়, ধানম-ির বাড়ির সিঁড়িতে নিথর হওয়ার আগেও কি বঙ্গবন্ধু নিভৃতে বলেছিলেন জয় বাংলা! হয়তো, কেননা বাংলার জয় ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন রচনার দিন ৭ মার্চ ১৯৭১।
৭ মার্চ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে, এমনকি বিশ্বের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দিন। বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা সে সময়ের রেসকোর্স ময়দানে একাত্তরের ৭ মার্চ বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু সর্বস্তরের লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে বজ্রকণ্ঠে একটি বক্তৃতা করেন। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার ওই ভাষণটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র হিসেবে আজ সবাই এক বাক্যে মেনে নিয়েছেন। তিনি সেদিন ভাষণটি দিয়েছিলেন মাত্র ১৯ মিনিটে। ওই ভাষণের বিষয়, শব্দ নির্বাচন, ভাষাভঙ্গি সবকিছু মিলিয়ে বাক-প্রক্ষেপণের পরিচর্যাটি ছিল যেন-বা বাঙালির মুক্তির কবিতা। ওই দিন ভাষণ দেয়ার সময় তাঁর দেহভঙ্গিমা ও ভাষা প্রয়োগের আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার না করলে প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন কঠিন।
মার্কিন সাময়িকী ‘নিউজ উইক’- ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে উল্লেখ করে। ওই সময় তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই কালজয়ী ভাষণকে একটি অমর কবিতার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। দেশে-বিদেশে গণযোগাযোগের উচ্চতর পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য এ ভাষণ বিশেষভাবে পাঠ্য।
বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের ওপর অনেক গবেষণা হয়েছে, ভবিষ্যতে আরো হবে। এ ভাষণে মোট ১১০৭টি শব্দ আছে। এতে কোনো রকম অর্থহীন বিরতি অর্থাৎ অ্যাঁ, আঁ, ইয়ে বা ইসে জাতীয় ধ্বনি নেই। তিনি প্রতি মিনিটে প্রায় ৫৮ থেকে ৬০টি শব্দ উচ্চারণ করেছেন। মনে রাখতে হবে, এটি কোনো লিখিত বক্তৃতা ছিল না। এমনকি এর জন্য তিনি কোনো নোট বা সূত্রও ব্যবহার করেননি।  কোনো পূর্বপ্রস্তুতিও নিতে হয়নি বা নেননি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর মুখ থেকে সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনের আকাক্সক্ষাই প্রকাশ পেয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে। ১১০৭টি শব্দে গাঁথা এই কবিতার মতো ভাষণটি তিনি মাত্র ১৯ মিনিটের মধ্যে জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন।
৭ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবন তথা নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, বঞ্চিত বিশ্বমানবের মুক্তি সংগ্রামের দিকনির্দেশনা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের নির্দেশে দুটি দেশের সৃষ্টি হয়। ভারত ও পাকিস্তান। আমরা বর্তমান বাংলাদেশিরা পাকিস্তানের  পূর্ব অংশ হিসেবে তথাকথিত স্বাধীনতা পাই। আমাদের পরিচয় তখনকার ইতিহাসে পূর্ব পাকিস্তানি নাগরিক। তখন থেকেই আমরা পাকিস্তানি শোষক শ্রেণীর অধীনে আরোপিত বৈষম্যের শিকার।
বাঙালি ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে নিজের স্বাজাত্য পরিচয় লাভ করে। সর্বপ্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। ৬ দফার পক্ষে জনমত সংগঠিত করেন। দিনে দিনে আন্দোলন জোরদার হয়। সমগ্র দেশের আনাচ-কানাচ ঘুরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত করেন স্বয়ং শেখ মুজিব। ১৯৬৯ সালে শুরু হয় প্রবল গণঅভ্যুত্থান। এশিয়ার লৌহমানবরূপে পরিচিত জেনারেল  আইয়ুব খানকে বিদায় নিতে হয় এই গণঅভ্যুত্থানের ফলে।
জাতির জনক, স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু মুক্ত স্বদেশ গড়ার পরিকল্পনা তৈরি করেন ১৯৬৬ সালে। ইতিহাসে তা ৬ দফা নামে বিখ্যাত। আওয়ামী লীগের প্রধান হিসেবে শেখ মুজিব ছয় দফা প্রণয়ন করেন। সমগ্র জাতির সমর্থন নিয়ে ছয় দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু ইয়াহিয়া সরকার বাঙালির স্বাধিকারের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু করে অসহযোগ আন্দোলন। মার্চ মাসের ১ তারিখে জেনারেল ইয়াহিয়ার সরকার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পরবর্তীকালে অনুষ্ঠিত গণহত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাক সরকার। গণহত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতির সময় দরকার ছিল পাক হানাদার বাহিনীর। পুরো দেশ থমথমে, কেউ জানে না কী হতে যাচ্ছে! বিভিন্ন গুজব, আলোচনা, প্রত্যাশা সব মিলিয়ে দেশবাসীর আন্দোলন কোন পথে অগ্রসর হবে তার কোনো দিশা পাচ্ছিল না। এমন অবস্থায় জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্যই বঙ্গবন্ধু সেদিন এই ভাষণ দিতে রমনার সবুজ মাঠে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর ভরাট কণ্ঠে লক্ষ জনতা কান পেতে শুনেছিলÑ ‘ভাইয়েরা আমার...’
যদিও মার্চের শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসন এক রকম আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল। তাই ৭ মার্চের এই ভাষণ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশেষ তাৎপর্যবাহী। এক কথায় ছিল বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তির মন্ত্র। খুব অল্প কথায়, ছোট ছোট বাক্যে তিনি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বর্ণনা করেন। পাকিস্তানি শোষক-শাসকদের শত্রুতামূলক আচরণের বিবরণ দেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাঙালির শ্রম-ঘামে অর্জিত পয়সায় কেনা অস্ত্র দিয়ে কেন দেশের সাধারণ নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করে হচ্ছে? ন্যায্য অধিকার দাবি করা কোনো অন্যায় অপরাধ নয়। কিন্তু পাকিস্তানিরা তা কানে তোলেনি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি চিরতরে স্তব্ধ করা।
রাষ্ট্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থনের কথা বিবেচনায় রেখে তাঁকে খুব সতর্কভাবে জনসভায় কথা বলতে হয়েছে। শুধু তাই নয় ছাত্রসমাজ, শ্রমিক, কৃষক, মুটে-মজুর সমস্ত দেশবাসীর দাবির চাপ ছিল, রাজনীতির ভাষায়  একটিমাত্র দাবিতে পরিণত হয়েছিল; স্বাধীনতার দাবি।  বহুমুখী চাপের মোকাবিলা করে জনসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁকে ভাবতে হয়েছে অনেক দিক। আন্তর্জাতিক মহল অপেক্ষায় ছিল মুজিব কী করেন তা দেখতে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বসে ছিল রেসকোর্স ময়দানে আক্রমণ করার জন্য। অন্যদিকে জনতার দাবি- আজ, এখানেই স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে বহুমুখী চাপ সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে তিনি বক্তৃতা করলেন। কোনো পক্ষই হতাশ হলো না। তিনি এমন কুশলতায় সব শব্দ নির্বাচন করলেন যাতে সব পক্ষই সন্তুষ্ট হলো। পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা বা জনসভা আক্রমণ করার মতো অজুহাত পেল না। বিশ্ববাসী দেখল একজন জননেতা একটি বিশাল জনসভায় ভাষণ দিলেন। এতে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কেউ কোনো অসুবিধা বা সমস্যার সূত্র তাঁর ভাষণে খুঁজে পেল না। অন্যকথায় জনগণ তাঁর কথার অন্তর্নিহিত অর্থ খুব পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারল। দেশবাসী বুঝে নিল আগামীতে কী পরিস্থিতি হবে এবং কীভাবে তা মোকাবিলা করতে হবে। এই জনসভায় তিনি  রাষ্ট্রনায়োকোচিতভাবে  নির্দেশ জারি করেন দেশবাসী এবং সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে। সারা দেশের মানুষ তাঁর নির্দেশমতো খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়। তাঁর নির্দেশ দেশের মানুষের মুক্তির পথের দিশা  তৈরি করে।  সুনির্বাচিত, সংক্ষিপ্ত শব্দ ব্যবহার করে তিনি শাসকদের সাবধান বাণী শোনান। অন্যদিকে দেশের জনগণ সেসব শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করে তাদের করণীয় সম্পর্কে বুঝতে পারে। সবদিক বিবেচনা করে দেখা যায় এই ভাষণ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা ও জনগণের মধ্যে আন্তরিক এবং অকৃত্রিম অভূতপূর্ব যোগসূত্র স্থাপন করে। যার কোনো আলাদাভাবে ভিন্ন ব্যাখ্যার দরকার হয়নি। এ জন্যে বাঙালির কোনোই অসুবিধা হয়নি তাঁর ভাষণের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে নিতে। তিনি বলেছেন ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’ এরপর মাত্র দুটি শব্দ উচ্চারণ করেনÑ ‘জয় বাংলা’। কেবল ছোট দুখানি শব্দ হলেও ওই দুটো শব্দের ক্ষমতা ছিল অকল্পনীয় শক্তিশালী। কেননা ওই জয়ধ্বনি ছিল মায়ের ভাষায় প্রাণের আকুতি ভরা উচ্চারণ। বাঙালি বুঝেছিল এবং বিশ্বাস করেছিল মুক্তি আসবে। তার জন্য যুদ্ধে নামতে হবে আর জয় তাদের অবশ্যই হবে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে তিনি ইঙ্গিতে দেশবাসীকে আগাম জানিয়ে দেন যখন তিনি দৃপ্ত, দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা তা বন্ধ করে দিবে। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’ বাঙালি কিন্তু ঠিকই বুঝে নিয়েছিল যে, এটিই তাঁর হুকুম, দেশ স্বাধীন করার জন্যÑ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বান। তিনি ছিলেন না তারপরও কিন্তু তিনিই ছিলেন নেতা হয়ে, দিকনির্দেশক হয়ে। নয় মাস তিনি পাকিস্তানি কারাগারে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন। প্রতিমুহূর্তে তাঁকে মৃত্যুভয় দেখানো হতো। কবর খুঁড়ে বলা হতো এ কবর তাঁর জন্যই। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি, আত্মসমর্পণ করেননি ভয়ের সঙ্গে, আপস করেননি লোভের সাথে। প্রকৃৃত নেতার মতো একটি দেশের প্রতীকের মতো সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করেছেন বীরের মতো। আমাদের পক্ষে আজকের দিনে কল্পনা করা কঠিন একটি মানুষের মনের জোর কত শক্ত হলে দিনরাত মৃত্যুর মাঝে বাস করতে পারেন। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি, কোনো লোভের কাছে আত্মবিকিয়ে দেননি। সেই তো হবে দেশের নেতা, দশের নেতা, জাতির নেতা, জাতির পিতা।
নিরস্ত্র অসামরিক জনগণ কীভাবে সশস্ত্র সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করবে, সেই চিন্তাও এই জননায়কের ভাষণে খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব। তোমরা আমাদের ভাই তোমরা ব্যারাকে থাকো- কেউ তোমাদের কিচ্ছু বলবে না। ... তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ আসলে বাঙালি তার অবিসংবাদিত নেতার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। যার যা কিছু ছিল তাই নিয়ে দেশরক্ষায় এগিয়ে  এসেছে। পত্রপত্রিকার পাতায় ছাপা হতো কোথাও কাঠের তৈরি নকল বন্দুক, কোথাও বাঁশের লাঠি ইত্যাদি হাতে যুবক-যুবতী, ছাত্র-ছাত্রী সামরিক কৌশলের মহড়া দিচ্ছে। সুশিক্ষিত আধুনিক সামরিক বাহিনীর তুলনায় এসব  ছিল ছেলেখেলা মাত্র। অনেকটা অভিনয়ের মতো, সামনে আসলে কী ঘটবে, কত গুণ ধ্বংস ক্ষমতা নিয়ে পরিবেশ পরিস্থিতি বিস্ফোরিত হবে, তা কেউ কল্পনা করতে পারেনি। এসব মহড়া ছিল নেহাত মনোবল সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের সরল উপায় খোঁজার চেষ্টা মাত্র।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস এই জননন্দিত জননায়ক পাকিস্তানি শাসকদের কারাগারে বন্দি ছিলেন। দেশের মুক্তিপাগল মানুষের মাঝে ছিলেন না। কিন্তু তারপরও তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে,  জনগণ ও প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার সবসময়ের ছায়াহীন সঙ্গী হয়ে। সশরীরে না থাকলেও তিনি ছিলেন বাঙালির অন্তরে, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণস্পন্দনে। ক্যাম্পে ক্যাম্পে, বধ্যভূমিতে প্রত্যেকটি কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে শক্তি হয়ে, প্রেরণা হয়ে মানুষের মনে-প্রাণেÑ বিশ্বাসে। এই ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতিটি শব্দ ছিল মুক্তির প্রেরণার অমিয় শক্তির এক-একটি বুলেট, শানিত বেয়নেট, গ্রেনেড।
গণআন্দোলনের সার্থক ভাবসূত্র প্রয়োগ করে ৪৫ বছর আগে শেখ মুজিব মুখে মুখে এই ভাষণ রচনা করেন। উপস্থিত জনতার সামনে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন একটি বক্তৃতা দেওয়ার কথা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। উইনস্টন চার্চিল অথবা মার্টিন লুথার কিংÑ তাঁদের ঐতিহাসিক ভাষণের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তুলনা করেছেন গবেষকরা। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সারা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা এই ৭ মার্চের ভাষণ। দৃপ্ত, জড়তাহীন বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত এ রকম ভাষণের তুলনা এই পৃথিবীতে বিরল। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর ১ নম্বর শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু সেদিন যে বিষয়টি সবচেয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে বিবেচনা করেছিলেন তা হলো, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এবং বিশ্ববাসীর সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি। এসবই হারাতে হতো যদি তিনি সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন সেদিনের রেসকোর্স ময়দানের জনসভায়। তাই তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুনির্বাচিত গূঢ়ার্থবোধক শব্দে ইঙ্গিতের মাধ্যমে জনগণের কাক্সিক্ষত ঘোষণাটি উচ্চারণ করেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
শেষ পর্যন্ত ৭ মার্চের ভাষণের ফল কী হলো? তিনি এদিনের ভাষণে বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, তবু এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ এ কথার মানেই হচ্ছে ৭ মার্চ না হলে আমরা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেতাম না। সুস্পষ্ট ইঙ্গিত না পেলে আমরা মানসিক প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হতাম। মনের শক্তি ছাড়া শুধু শারীরিক ও অস্ত্রের শক্তি দিয়ে জয়ী হওয়া যায় না। তাই আজকে আমরা স্বাধীন আর পাকিস্তানিরা বৃহৎ সামরিক শক্তি নিয়েও আমাদের কাছে পরাজিত হয়। তাই আজ আমাদের একটি নিজস্ব ভূখ- আছে, আছে পতাকা, রয়েছে নিজেদের মনের মতো জাতীয় সংগীত। সারা বিশ্ব আজ স্বীকার করে নিয়েছে যে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধজয়ের একমাত্র এবং একমাত্র মন্ত্র, জয়ের অমোঘ অস্ত্র, নিরন্তর যুদ্ধ বা সংগ্রামের, প্রেরণার অফুরন্ত ভা-ার।
শেখ মুজিব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মানব দরদি। মহান চারিত্রিক গুণের জন্যই তিনি সব সময় জনগণের পাশে ছিলেন। দেশের উন্নয়ন, জনগণের কল্যাণের জন্য জীবন বাজি রাখতে কখনো পিছু হটেননি। দীর্ঘদিন নানা অপচেষ্টার মাধ্যমে ইতিহাসের বিকৃতি করা হয়েছে। উন্নতির পথ ভুল ঠিকানায় নির্দেশ করা হয়েছে। তবুও জাতি পিছু হটেনি। অল্প সময়ে কঠোর পরিশ্রমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বলিষ্ঠ স্থান করে নিয়েছে। আজ অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে, মৃত্যুদ- কার্যকর করা হচ্ছে। দেশের অগ্রযাত্রায় সুবিধাবাদী দলীয় পরিচয়ধারী লোকজন নানা পর্যায়ে বাধার সৃষ্টি করবে বা করছে। তা শক্ত হাতে দমন করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে না। আমরা আগামী কয়েক বৎসরের মধ্যেই উন্নয়নের আরেকটি ধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হব বলে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আভাস দিচ্ছে।
শেষ কথাটি হচ্ছেÑ শেখ মুজিব না হলে বাংলাদেশ হতো না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্থপতি। দেশকে ‘সোনার বাংলা’য় রূপান্তরিত করার স্বপ্ন দেখেছেন। আমাদেরও স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাঁর সেই স্বপ্নদর্শন অসম্পূর্ণই রয়ে গেল মানুষ নামের ঘাতকের নির্মমতায়। দেশের স্বাধীনতার জন্য যে মৃত্যু ছিল তাঁর আরাধ্য, তা এলো অবশেষে তাঁর নিজ বাসগৃহে। আসলে মহামানবের কোনো দিন মৃত্যু হয় না। শেখ মুজিবও তাই অমর সমগ্র বিশ্বজগতে, ইতিহাসে, স্বধীনতাকামী জনতার অন্তরে, সংগ্রামে, আন্দোলনে, আকাক্সক্ষায়, বিশ্বাসে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশে, বাঙালির হৃদয়ে।
লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ, ইমেইল- karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd