ঢাকা : শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল, ২০১৭ ১৮:৪৬:৪৩
হাত পাখার গ্রাম খামাড়ীপাড়া
তোফায়েল হোসেন জাকির, গাইবান্ধা


 


হাতের কারুকার্য সুই-সুতার তৈরী হাতপাখার গ্রামের নাম হিসেবে খ্যাত খামাড়ীপাড়া। গাইবান্ধার জেলাধীন সাদুল্যাপুর উপজেলার জামালপুর ও রসুলপুর ইউনিয়নের বুজুরুক রসুলপুর এবং আরাজী ছান্দিয়াপুর গ্রাম সমন্বয়ে খমারপাড়া নামে পরিচিত। ওই দুই গ্রামের নারী-পুরুষ সুতা দিয়ে রং-বেরংয়ের বিভিন্ন ডিজাইনের হাতপাখা তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রায় ৩ শতাধিক পরিবারের মানুষ প্রতিদিন হাতপাখা তৈরী করে। তৈরী করা পাখা খুচরা ও পাইকারীভাবে বিক্রয় করে আর্থিক স্বাবলম্বী হয়ে অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। ওই গ্রামের করিম মিয়া জানান, এখানকার তৈরী করা পাখা ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
গতকাল সরজমিনে দেখা গেছে, সাদুল্যাপুর উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত রসুলপুর ইউনিয়নের আরাজি ছান্দিয়াপুর ও জামালপুর ইউনিয়নের বুজরুক রসুলপুর গ্রাম। ওই দুই গ্রামের খামাড়ীপাড়ায়  প্রায় ৩ শতাধিক পরিবারের শতকরা ৮০ ভাগ নারী-পুরুষ দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে সুতার তৈরী রং-বেরংয়ের বিভিন্ন ডিজাইনের হাতপাখা তৈরী করে আসছে। ওই দুই গ্রামের সমন্বয়ে এলাকার মানুষ গ্রামটির নাম (খামারপাড়া) অথবা পাখার গ্রাম নামেই চেনেন।  রশিদা বেগম নামের এক গৃহবধু জানান, এক সময় প্রচন্ড গরমে মানুষ যখন ওষ্ঠাগত ঠিক তখন নীজের প্রয়োজনে সুতা দিয়ে হাতপাখা তেরী করি। হাতপাখা তৈরীর সময় অন্য মহিলারা এসে দেখে তারাও বাড়িতে গিয়ে হাতপাখা তৈরী করতো। পরে আস্তে আস্তে আশপাশের পরিবারের মহিলারও সুতা কিনে বাড়িতে বসে হাতপাখা তৈরী করতে লাগে। সাংসারিক কাজের ফাঁকে ২ দিনে একটি পাখা তৈরী করা সম্ভব হতো। এক সপ্তাহ শ্রম দিয়ে ৩-৪ টি পাখা তৈরী হতো এবং তা নিয়েই স্বামী-সন্তান আশপাশের বাড়ি ও স্থানীয় মেলায় গিয়ে বিক্রি করতেন। এভাবে দিনদিন ওই গ্রামের নারীরা হাতপাখা তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
প্রতিদিনের তৈরী পাখা বিক্রি করে তারা আর্থিক লাভবান হওয়ায় গ্রামের নারী-পুরুষ অনেকেই বেছে নেন পাখা তৈরীর কাজ। পাকা তৈরীকারী আব্দুল আশাদুল প্রধান জানান, আগে সুতার তৈরী প্রতিটি পাখা ১৫-২০ টাকায় বিক্রি করে ৬/৭ টাকা লাভ পেতাম। কিন্তু বর্তমানে সুতা ও বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২৫ টাকা দরে বিক্রি করে ৩-৪ লাভ হয়। প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে গড়ে ৫০-৬০ টি পাখা বিক্রয় করা সম্ভাব হয়।
সরেজমিনে খামারপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি বাড়িতে আঙ্গিনার মধ্যে পাটি ও পিড়াতে বসে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে পাখা তৈরী করছেন। আবার অনেক বাড়িতে এক সাথে নারী-পুরুষরা দলগতভাবে আলাপ, হাসি-ঠাট্রার মাধ্যমে কেউ সুতা গোছানো, কেউ বাঁশ কাটা, চাক তৈরী আবার কেউ সুই দিয়ে সেলাই ও রং বেরংয়ের ডিজাইন তৈরী করছেন। গ্রামের প্রায় ৩ শতাধিক পরিবারের ৮০ ভাগ মানুষ পাখা তৈরীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
   
বর্তমানে চৈত্রের ওষ্ঠাগত গরম বৃদ্ধির কারনে তারা পাখা তৈরীতে দিনদিন আরো ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দুই গ্রামের নারী-পুরুষ মিলে প্রতিদিন এখন ১২ হাজার থেকে ১৫ শ’ পর্যন্ত পাখা তৈরী করে থাকেন। এসব তৈরীকৃত পাখা জেলার বিভিন্ন উপজেলার ব্যবসায়ীরা বাড়িতে এসে ক্রয় করেন। বিভিন্ন প্রকারের প্রতিটি পাখা তৈরী করতে বাজার থেকে ১২ টাকার সুতা, ২ টাকার বাঁশের হাতল, ২ টাকার সুতা মোড়ানোর কাপড় ও পারিশ্রমিকসহ প্রায় ২০ টাকা খরচ করতে হয়। পরে তৈরীকৃত পাখা বিভিন্ন গ্রামে, বাজার, দোকান ও মেলায় নিয়ে গিয়ে ২৩ টাকা থেকে ২৫ টাকায় বিক্রির করা হচ্ছে। এতে একটি পাখা বিক্রয় করলে লাভ হয় ৩ টাকা অথবা ৫ টাকা। প্রতিদিনের বিক্রি করা পাখার আয় থেকে তারা পরিবার নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। আবার যারা দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে পাখা তৈরী করে সংসার চালিয়েও আয় থেকে মেয়ের বিয়ে, বসতবাড়ি নির্মান, গরু-ছাগল ক্রয় করে সফলতার মুখ দেখছেন।
 
অনেকেই এই পাখা তৈরী করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ওই গ্রামের পাখা তৈরি কারক মাজেদা বেগম, ছোমেলা বেগম, রেহেনা ও খুকি বেগম আরো জানান, বছরের ৩ মাস পাখা তৈরির কাজ বন্ধ থাকে ঐ ৩ মাস সময় ধরে সুতা, বাঁশ, কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুদ করে রাখি। পরে বছরের ৯ মাসই তারা পাখা তৈরি করেও বিভিন্ন উপজেলার ব্যবসায়ীদের চাহিদা পুরন করতে অনেকটা হিমশিম খাই। পাখা তৈরী কারক আনোয়ারুল ইসলাম, ছালাম মিয়া ও এন্তাজ আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয়ভাবে সল্প সুদে ক্ষুদ্র ঋণের সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে এখানে বড় ধরনের পাখা তৈরীর কারখানা করা সম্ভব হবে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd