ঢাকা : বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • পানি না নামা পর্যন্ত বানভাসীদের খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে          ৫৭ ধারা সাংবাদিক হয়রানির জন্য নয় : প্রধানমন্ত্রী          পর্যটনের অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ : মেনন          তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করতে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে : শিক্ষামন্ত্রী          বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে : ত্রাণমন্ত্রী
printer
প্রকাশ : ২৩ জুন, ২০১৭ ২৩:৫৫:১৭
গ্রামীণ সমাজের হারিকেন-কূপিবাতি এখন অতীত স্মৃতি!
নওগাঁ সংবাদদাতা


 


বাতি নিয়ে লিখা এটি একটি গানের অন্তরা “ মনে প্রেমের বাত্তি জ্বলে বাতির নীচে অন্ধকার এ জীবনে চাইলাম যারে হইলোনা সে আমার....।” সত্যিই বাতির নীচে ঘোর অন্ধকার। আলোর পরে আঁধার আসবে এটাই বোঝানো হয়েছে গানে গানে।  গ্রামীণ সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যবহৃত আলোর বাহন ছিলো একমাত্র হারিকেন ও কূপিবাতি। তাও আবার হারিকেন সবার ঘরে ছিলো না। কারণ সাধ আছে সাধ্য নেই। এমন পরিস্থিতিও ছিলো এ সমাজের মানুষের ঘরে ঘরে। কিন্তু বর্তমানে এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতিটি ঘরের চিত্রটাই তেমনি পাল্টে গেছে দিব্যি। এখন আর কোন ঘরে কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হাজার বছরের ঐতিহ্যের বাহন সেই লণ্ঠন হারিকেন-কূপিবাতি নেই। এখন থেকে ২ দশক আগেও যেখানে বেশিরভাগ ঘরেই ব্যবহার হতো হারিকেন আর কূপিবাতি ২ দশক পরে এসে সেই রূপ এখন পুরোটাই পরিবর্তিত হয়েছে। তার সাথে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যের সেই লণ্ঠনগুলো। ২দ শক আগেও চিত্রটি ছিলো এমন যে সারাদিনের কর্মব্যস্ততা সেরে সাঁঝের বেলায় মহিলারা ব্যস্ত হয়ে পড়তো সন্ধ্যায় ঘরের আলো জ্বালানো নিয়ে। প্রতি সন্ধ্যায় হারিকেনের চিমনি খুলে, ধুয়ে মুছে সাফ করে ছিপি খুলে কেরোসিন তেল ঢেলে আবার চিপি লাগিয়ে রেশার মধ্যে দিয়াশলাই/ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে তা নির্দিষ্ট সীমারেখায় রেখে ঘরের মেঝে জ্বালিয়ে রাখত। ৫-৬ ইঞ্চি লম্বা ও কিছুটা ছড়াকারের মত একধরনের কাপড় রেশা হিসেবে ব্যবহার করা হতো এতে। এটার আলো কমানো ও বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট একটি গিয়ার ছিলো। হাতের সাহায্যে তা ঘুরিয়ে আলোর গতিবেগ কমানো ও বাড়ানো যেতো। রাতে ঘুমানোর সময় আলো কমিয়ে সারা রাত হারিকেন জ্বালিয়ে রাখা হতো।
এছাড়াও কূপিবাতি ছিলো কয়েক প্রকার। একনলা, দুইনলা, একতাক, দুই তাকের, পিতল ও সিলভারের। তবে সিলভার, টিন এবং মাটির তৈরী বাতির ব্যবহার ছিলো খুব বেশি। বাতির নলে আগুন জ্বালানোর জন্য রেশা হিসেবে ব্যবহার করা হতো ছেড়া কাপড়ের টুকরো কিংবা পাটের সুতলি। চিকন আর লম্বা করে ৫-৬ ইঞ্চির দৈর্ঘ্যের ওই রেশা বাতির নল দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতো। প্রতিদিন এর কিছু অংশ জ্বলে পুড়ে যেত। ফের পরেরদিন আবার একটু উপরের দিকে তুলে দিতো। একপর্যায়ে তা পুড়ে গেলে আবার নতুন করে লাগানো হতো। বাজার থেকে ২-৫টাকায় ওই বাতিগুলো কিনতে পাওয়া যেত। কিছুদিন পর নীচ দিয়ে ফুটো হয়ে তেল পড়ে যেত। ফের নতুন একটি বাতি বাজার থেকে কিনতে হতো। এটা ছিলো মহিলাদের সন্ধ্যাবেলার দৈনন্দিন কাজের বিশেষ একটি অংশ। এই বাতি দিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা  করতো। এছাড়াও রাতের সকল কাজ, যেমন রান্না-বাড়া, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, ধান মাড়ানোসহ সকল চাহিদা মেটানো হতো এই আলো দিয়ে।
রাতের বেলায় মহিলারা বেড়াতে গেলে প্রতিবেশী কিংবা আতœীয়ের বাড়ি তাদের সঙ্গী ছিলো একটি হারিকেন। একজন হারিকেন ধরে সামনে হাঁটতো অন্যরা সবাই পেছন পেছন হাঁটতো। এছাড়াও গ্রামীণ প্রতিটি দোকানে সন্ধ্যা-রাতের প্রদীপ হিসেবে হারিকেন ও কূপিবাতির কদর ছিলো খুব বেশি। দোকানিরা কিংবা পথচারীরা রাতের বেলায় হাঁটা চলা করা কিংবা বাড়ি ফেরার পথের একমাত্র সাথী ছিলো হারিকেন। লণ্ঠনের আলোয় আলোকিত ছিলো যে জনপদ তা আজ বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে। সেই লণ্ঠন গুলোর প্রয়োজন এখন পুরিয়ে যাওয়ায় এগুলো এখন আর খুব একটা চোখে পড়েনা। তবে এখনো নৌকা কিংবা জাহাজে এর কদর একটুও কমেনি। এখনো রাতের বেলা নদীর দিকে তাকালে দেখা যায় লণ্ঠনের মিটমিট আলো জ্বলছে। জাহাজের পেচনের অংশে ব্যাক লাইট হিসেবে এখনো হারিকেনের যথেষ্ট ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া রিক্সার পেছনে এখনো হারিকেনের ব্যবহার চোখে পড়ে।
বর্তমানে গ্রামীণ সমাজের প্রতিটি ঘরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছে। যেখানে ছিলোনা কোন বৈদ্যুতিক লাইট, পাখা, এয়ার কন্ডিশানসহ আরো অনেক কিছু। বর্তমানে বিদ্যুতায়নের ফলে সবকিছুর স্বাদ গ্রহণ করছে গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দারা। এখন দিনের বেলায়ও আলো জ্বালাতে হয়। এখন আর শুধু বিদ্যুতে সীমাবদ্ধ নেই ২৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার জন্য আইপিএস (ব্যাটারির সাহায্যে বিদ্যুৎ সঞ্চয়) ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউবা আবার সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। হাত পাখার বদলে বৈদ্যুতিক পাখা ও এয়ার কন্ডিশান ব্যবহার করা হচ্ছে।
মহাদেবপুর উপজেলার গোপালকৃষ্ণপুর গ্রামের মৃত আকবর আলী মন্ডলের পুত্র শাসছুজ্জামান সাজু বলেন, হারিকেন আর কূপিবাতি ছিলো আমাদের জন্য আলোক বার্তা। এই হারিকেন আর কূপিবাতি যদি না থাকতো ওই সময় মানুষ খুব কষ্ট করতো। ঘরের সকল আসবাবপত্রের চাইতে এই দুটো জিনিস ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয়, এগুলো ছিলো পরিবারের এক একটি সদস্যের মত। সারাদিন এগুলোর প্রয়োজন না হলেও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে এগুলোর কদর ছিলো খুব বেশি। কারো পরিবারে যদি তেলের একটু ঘাটতি থাকতো ওই পরিবারের রাতের সকল কাজ বন্ধ হয়ে যেতো। সন্ধ্যা ফুরালেই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত।
মানব কল্যানে প্রতিভার সন্ধ্যানে একুশে ফাউন্ডেশনের সদস্য, সাংবাদিক ও সার্ভেয়ার মাহবুবুজ্জামান সেতু বলেন, এই হারিকেন-কূপি বাতি ছিলো আমাদের সভ্যতার বাহন। রাতের বেলায় আমরা এর যথেষ্ট ব্যবহার করতাম, সন্ধ্যাবেলায় আমরা এটার আলোয় পড়াশুনা করতাম। তাছাড় কূপি বাতি পড়ার সময় খুব একটা ব্যবহার করা যেত না ধোঁয়া ও কালির জন্য। হারিকেনের চিমটি মোছার জন্য পালা করে একক দিনে একেক জনের উপর দায়িত্ব পড়তো। সব মিলিয়ে আমাদের কৃষ্টি সংস্কৃতির স্মৃতিময় ঐতিহ্য, আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি ওই সময়ের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে এই হারিকেন-কূপি বাতি এখন সময়ের আবর্তনের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন থেকে এগুলো স্মৃতির জাদুঘরে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমরা চাই জাদুঘরে খুব যতœ ও গুরুত্বের সাথে এগুলো সংরক্ষণ করা হোক। কারণ আধুনিকায়নের কাছে এগুলো এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। আগামী  প্রজন্মের জন্য এগুলো ইতিহাস হয়ে থাকবে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd