ঢাকা : বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ২৬ জুন, ২০১৭ ০০:৪০:৪৬আপডেট : ০৯ জুলাই, ২০১৭ ১১:০০:৫০
উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে বাঙালির সার্বজনীন ঈদ উৎসব
হ্যাপি পুলক সারথি

 

বাঙালির জনজীবনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসহনীয় যানজট কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে শুরু করে অনেক চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনার একটি জাতির কাছে যদি সার্বজনীন কোনো মহামিলনের উৎসব থেকে থাকে, সেটি হচ্ছে ‘ঈদ’। ঈদকে কেন্দ্র করে বিশ্বজনীন মানব সভ্যতার মাঝে একটি অকল্পনীয় পরিবর্তন তৈরি হয়েছিল। ঈদকে উৎসব মুখর করার জন্য সেই পারস্য থেকে সুফি-সাধকগণ যখন এই উপমহাদেশে পা বাড়ান, তখন এই উপমাহাদেশে যে জনজীবন ছিল, তা শ্রেণী-গোত্র, বর্ণের নানভাবে বিভাজিত ছিল; শুধু তাই-নয় পৃথিবীর নানা দেশ থেকে ভাগ্যোন্নষনে পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ, মোঘল এই দেশে এসেছে। ভাগ্যোন্নষনে এসে তারা এ দেশে রাজত্ব করেছে। এক্ষেত্রে বাঙালি সর্বদাই প্রজা হিসেবে শোষিত হয়েছে। হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি জাতির সেই প্রজার জীবনে যদি কোনো একটি দিনকে বলা হয়, যে দিনটিতে একটি মোহনায় মিলিত হতে পেরেছিল সেটি হলো দু’টি ঈদ; একটি হলো ‘ঈদুল ফিতর’ আর অন্যটি হলো ‘ঈদুল আযহা’। আর এই দু’টি উৎসবের মাধ্যমে পারস্য থেকে সুফি-সাধকগণ সকল মানুষকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছিল। ইসলামের ইতিহাসেও দেখা যায় যে, ঈদ কখনো কোনো একটি গোত্র কিংবা সম্প্রদায়কেন্দ্রিক ছিল না। সাংস্কৃতিকভাবেই এই ঈদগুলোর প্রচলন হয়েছিল,অন্তত একটি দিনে রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব তথা সব মানুষ বুকের সাথে বুক মিলাবে, সবাই সবার হাসি মুখ দেখবে, সকলের রান্না ঘর ও খাবার টেবিল সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই সংস্কৃতিটি সুফি-সাধকগণ বিশেষ করে এই উপমহাদেশের সুফি-সাধক খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি প্রথম ঈদ উৎসবের সময় প্রায় ২ লক্ষ হরিজন সম্প্রদায় (যাদেরকে ভারতীয় সমাজে নিন্ম বর্ণ ও অত্যন্ত অস্পৃষ্য হিসেবে দেখতো) তাদেরকে এক সাথে একটি বিশাল মাঠের মধ্যে একই ধরনের খাবার সকলেই ভাগাভাগি করে খেয়েছিলেন এবং যে খাবারটি খেয়েছিলেন সেই খাবারটি ছিল আজকের দিনে আমরা যাকে আখনি বিরানি বলি। এই আখনি বিরানি পারস্যের খাদ্য ছিল; এটি প্রথম খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি নিজেই রান্না করেন। এই আখনি বিরানির সাথে ছাগলের মাংস এবং চাউলের সাথে এক ধরনের নারিকেলের তেল দিয়ে একটি উপাদেয় খাদ্য তৈরি করা হয়। সেই সময় কলা পাতার মধ্যে এই খাবার খাওয়া হয়েছিল। ঈদ উৎসবের জন্য এই উপমহাদেশে এটি একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে। আজকের বাঙালি প্রায় প্রতিটি উৎসবে এই খাবার খেয়ে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি তখন দেখিয়েছিলেন মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই, এটি ওই ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে সুফি-সাধকগণ এই উপমহাদেশে এই সার্বজনীন ঈদ উৎসবকে বাঙালির উৎসবে পরিণত করেন।
 
বাঙালির এই সার্বজনীন ঈদ উৎসবের আলোকে তৎকালীন সময়ের প্রাচীন ধর্মানুসারীরা বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করতে থাকে। তখন প্রাচীন ধর্মে বিশ্বাসী যে নানা উৎসবগুলো ছিল সেসব উৎসবগুলো ছিল শ্রেণীভিত্তিক; যেমন- প্রাচীন ধর্মানুসারী হিন্দু ধর্মোৎসব দূর্গাপূজা, কালীপূজা, গনেশ পূজা প্রভৃতি। এগুলো জমিদার সম্প্রদায়ের উৎসব ছিল। এসব উৎসবে তখন সকলের প্রবেশাধিকার ছিল না। সাধারণ জনগণ তখন পূজা ম পের বাইরে অবস্থান করতো এবং উৎসব দূর থেকে দেখতেন। ওই সব সাধারণ মানুষের কল্পনায় ছিল, আমাদের কী এই ধরনের উৎসব হতে পারে না? মূলত ঈদ উৎসবের সার্বজনীনতার মধ্য উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে বাঙালির সার্বজনীন ঈদ উৎসব
দিয়ে পরবর্তী সময়ে এটি বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ধর্ম হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি বোধ তৈরি করে। ধীরে ধীরে দূর্গাপূজা সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। সেটিও আমাদের বাঙালি উৎসব। কিন্তু সার্বজনীন উৎসবের পথিকৃৎ হলো ঈদ উৎসব। পরবর্তী সময়ে মোঘলরা যখন এদেশের ক্ষমতায় আসেন এবং মুসলিম শাসকরা যখন এই উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে রাজত্ব করেন তখন তারা ঈদকে কেন্দ্র করে দরবার খুলে দিতেন। ঈদ উপলক্ষে তারা বিভিন্ন ঘরে ঘরে তথ্য-তালাশ করতেন যে, কেউ না খেয়ে আছে কি-না? তখন রাজভোগ তৈরি করা হতো যেটি রাজারা খেতেন; সেই ভোগ প্রজাদের জন্য উন্মুক্ত করে খাওয়ার প্রচলন করা হয়। আজকে যেটি বাঙালির প্রধান শ্লোগান ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এটি মোঘলরা এই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেই ধারাবাহিকতায় যে অসম্প্রদায়িক চেতনার বীজ মন্ত্রটি উদিত হয়েছিল; সেই অসাম্প্রদায়িক বীজ মন্ত্রটি এই বাংলাকে ভীষণ রকম সাংস্কৃতিভাবে প্রবাহিত করে। বাঙালির ঈদ উৎসবের ওই ধারাবাহিকতায় তারা নবান্ন উৎসবে ফিরে যান। নবান্ন উৎসবটি মূলত কৃষকের উৎসব ছিল। সেই নবান্ন উৎসবকে ব্যাপক আকারে দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম শাসকরা ঈদ উৎসবের ফর্মুলাকে কাজে লাগান। উৎসবে ‘ধর্ম নয়, মানুষ প্রধান’ এই বিষয়টি উঠে আসে।
 
৬ দফার ভিত্তিতে যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালি জাতিসত্ত্বা এবং বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষের কৃষ্টি ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে জাতি নির্মাণের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং যে উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে সেই বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত নানা ঘাত-প্রতিঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনৈতিকতা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষের যন্ত্রণা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দুর্নীতি প্রভৃতির মধ্যে একমাত্র আশা-ভরসা তথা স্বপ্ন দেখার একটি মাত্র জায়গা সেটি হচ্ছে ঈদ। এই একটি উৎসবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ সবার জন্য গণভবন উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, সেই প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে। প্রধানমন্ত্রী যখন ঈদের শুভেচ্ছা পাঠান সেখানে কে ‘মোহাম্মদ’ আর কে ‘চক্রবর্তী’ সেটি দেখা হয় না। সরকার যাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তারা সকলেই প্রধানমন্ত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা পান। প্রধানমন্ত্রীর সাথে গণভবনে সকল সম্প্রদায়ের লোক সাক্ষাৎ করতে যান। এক সাথে খাওয়া-দাওয়া করেন। আজকের দিনে অনেক হতাশার মাঝেও যদি কোনো ঐক্যের, একক বাঙালি জাতিসত্ত্বা নতুন কোনো স্বপ্ন যাত্রার নাম দিতে হয় তাহলে ঈদ যতটা না ধর্মীয় ততটা তারচেয়ে বেশি একটি জাতিসত্ত্বার ঐক্যবদ্ধতার প্রাণ প্রণয়ন। আজ ঈদকে শুধুমাত্র একটি উৎসব হিসেব দেখলে হবে না। ঈদকে বাঙালির প্রধান জাতীয় উৎসব বলার পাশাপাশি আরো একটি বিষয়ে ভাবার রয়েছে, সেটি হচ্ছে ১৯৭১ সালের বাঙালি জাতি স্বপ্ন দেখে এই দেশকে স্বাধীন করেছে, সেই জাতির প্রধান শ্লোগান ছিলÑ তুমি কে? আমি কে? উত্তর ছিল, বাঙালি, বাঙালি। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। সেই বাঙালি আজো টিকে আছে উৎসবকে ঘিরে যেমনÑবৈশাখী উৎসব, ঈদ উৎসব, দূর্গা উৎসব, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন প্রভৃতি। যদি আমরা এই পাঁচটি উৎসবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা করি শুধু কাগজে কলমে ও ছুটি ঘোষণায় নয়, যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে একই সত্বায় পাঁচটি অনুষ্ঠান করতে পারি তাহলে উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে বাঙালির সার্বজনীন ঈদ উৎসব
ঈদে যে শক্তিটি আমরা পাই সেই শক্তির সাথে অন্য শক্তিগুলোও যুক্ত হবে। এই দেশের সিংহভাগ মুসলমানরা যখন দুর্গা উৎসবকে একইভাবে অনুধাবন করতে পারবে এবং রাষ্ট্র যখন একইভাবে সব সম্প্রদায়কে দূর্গা উৎসবে আহ্বান জানাবে শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়কেই নয়, পুরো দেশবাসীকে যেভাবে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো হয় ঠিক তেমনি করে। আমরা তখন সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক শব্দ দু’টি এই উৎসবকে ঘিরেই শেষ করে দিতে পারবো। ‘সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু, সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক, হিন্দু, বৌদ্ধ এসব আমাদেরকে বারবার ক্ষত-বিক্ষত করতে পারবে না এবং কোনো রকমের সমস্যা থাকবে না। ধর্মকে পুজিঁ করে সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে বারবার পিছনে ঠেলে দেয়। ধর্মকে শাসন-শোষণের কাজে ব্যবহার করে যে দুষ্ট চক্রটি বারবার ওঁৎ পেতে থাকে, তারা এ উৎসবগুলোর বন্যায় হারিয়ে যাবে। এজন্য পহেলা বৈশাখের উৎসবে মৌলবাদীরা ভীত হয়। এছাড়াও তারা তাজিয়া উৎসব, মহরমের উৎসবে ভীত হয়। এমন কী ঈদ উৎসবে তারা মেলা দেখলে ভীত হয়। কারণ তারা মানুষের মুক্তচর্চা, শ্রেণীহীন চর্চা অর্থ্যাৎ মানুষের ভিতর থেকে যদি হিংসা, হিংস্রতা চলে যায় তাহলে ধর্মকে কেন্দ্র করে মানুষের ভিতরে হিংস্রতার বীজ যদি ঢুকাতে না পারে তাহলে তো জিহাদী তৈরি করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি জঙ্গি তৈরি করা সম্ভব নয়। আর ক্ষমতা দখলের জন্যে মূলত এগুলো তৈরি করা হয়। সুতরাং সাম্প্রদায়িকতা কিংবা ধর্মভিত্তিক জাতি এই ধারণাটিকে অত্যন্ত সৌকর্ষময়ভাবে আমাদেরকে তাড়াতে হবে। ঈদ উৎসবের ঐতিহ্যকে বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে এক করে দিতে পারলে এবং একটি ঈদ নয় বাঙালির ঈদ হবে পাঁচটি; এই পাঁচটি ঈদকে যখন মানুষ উপভোগ করতে পারবে তখন একজন হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ কিংবা খ্রীষ্টান নিজেকে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ কিংবা খ্রীষ্টান মনে করবে না। সবাই নিজেকে বাঙালি মনে করবে। সবাই এই বাঙালির উৎসবে যুক্ত হবে, সবাই নতুন কাপড় পরিধান করবে। বৃহত্তর অংশ যখন ক্ষুদ্র অংশের উৎসবকে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়, রাষ্ট্র যখন সেটি প্রচার করে না তখন ক্ষুদ্র অংশগুলো একটি আলাদা প্রজাতিতে পরিণত হয়। আর যখন আলদা জাতিতে পরিণত হয় তখন একটি রাজনৈতিক সমীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
 
এই বাংলা দু’বার স্বাধীন হয়েছে। প্রথমবার ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক চেতনায় মুসলিম জাতিকে প্রাধান্য করে। পাকিস্তান এবং তার সাথে পূর্ব পাকিস্তান আমরা ধর্মভিত্তিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। এর কিছুকাল পরেই আমরা দেখলাম যে, পাঞ্জাবী জাতি বাঙালি জাতিকে আলাদাভাবে দেখছে। অথচ আমাদের ধর্ম এক। তখন বঙ্গবন্ধুর ভুল ভাঙ্গে। তিনি তখন বাঙালি জাতির জন্য ৬ দফা নিয়ে আবার নতুনভাবে সংগ্রামে লিপ্ত হন। এরই আলোকে ৭০’র নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ৭০’র নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ৬৭ শতাংশ ভোট পেয়ে নিরঙ্কুস সংখ্যা ঘরিষ্ঠতা লাভ করে আর মুসলিমলীগ ৩৩ শতাংশ ভোট পায়। এই ৬৭ শতাংশ ভোটের মধ্যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিল ৩৪ শতাংশ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় এবং যখন বাঙালি জাতিভিত্তিক একটি নতুন দেশ গঠনের নতুন সপ্ন দেখে তখন এই দেশের হিন্দু সম্প্রদায় বিশেষত সংখ্যালঘুরা পাকিস্তানীদের প্রধান আক্রমণের বিষয়বস্তু হয়। ওই সময়ে মূলত হিন্দু নিধন এবং তাদেরকে নানাভাবে দেশ ছাড়া করা মেজর টার্গেট নিয়ে সমস্ত অপারেশনগুলো হয়। ৩০ লক্ষ শহীদের মধ্যে ২৬ লক্ষই সংখ্যালঘুরা প্রাণ হারিয়েছিল। এই হিসাবটি আজও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় করেনি। না করার ফলে কী হয়েছে? ১৯৭১ সাল থেকে গত ৪৫ বছরে হিন্দু সম্প্রদায় দেশ ত্যাগ করতে করতে এখন তাদের সংখ্যা ১৩ শতাংশ। কাগজে-কলমে ১৩ শতাংশ হলেও প্রকৃত তথ্য হচ্ছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ।উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে বাঙালির সার্বজনীন ঈদ উৎসব
 
৭০’র নির্বাচনে আওয়ামীলীগে মেজরিটি ছিল ৬৭ শতাংশ। এর মধ্যে যে ৩৪ শতাংশ হিন্দু ছিল সেই ৩৪ শতাংশ হিন্দু থেকে যেতে যেতে এখন ১০ শতাংশ আছে। বাকি ৩৪ শতাংশ যারা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র চেয়েছিল তারা কিন্তু স্থির রয়েছে। আজও যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, সেই জাতীয় নির্বাচনে ওই ৬৭ শতাংশ থেকে যদি বাকি অংশকে বাদ দিলে আওয়ামী লীগের ভোটের ব্যাংক হচ্ছে ৪৩ শতাংশ। এই ৪৩ শতাংশের মধ্যে ৯ শতাংশ সংখ্যালঘুকে ধরা হলে আওয়ামীলীগের প্রকৃত ভোটের ব্যাংক হচ্ছে মূলত ৩১ শতাংশ। আর এই ৩১ শতাংশকে ধরে নিতে হবে বাঙালি জাতি সত্বার ভোটার। আর ওই ৩৪ শতাংশের বিশ্বাস নিয়ে যারা ছিল তারা কিন্তু সেক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ট অবস্থায় রয়ে যায়। সেই দিক বিবেচনায় দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু পুরো জাতিকে এই সাংস্কৃতিক ঐক্যবদ্ধতার জাতিগত ঐক্যবদ্ধতার জন্য যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজন ছিল, যে ঐতিহ্যগত বিপ্লবের দরকার ছিল, গ্রামে-গঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় যে পাঠশালা তৈরি করার কথা ছিল, যে কালচারাল একাডেমির মাধ্যমে মানুষের বোধের মধ্যে বাঙালি বোধকে দাঁড় করানোর বিষয় ছিল, সুফিবাদকে দেশব্যাপি ছড়িয়ে দেওয়ার মূল সংস্কৃতির যে গোড়া সেটিকে বিকশিত করার কথা ছিল, এসব ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত ৪৫ বছরে সেটি হয়নি। এই না হওয়ার মধ্য দিয়েই দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের দিকে। পদ্মাসেতুর ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড জাতিগতভাবে মেরুদন্ড শক্তভাবেও দাঁড়ালেও প্রশ্ন থেকে যায়, এই পদ্মাসেতু কিংবা ব্যাপক উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়েও আওয়ামীলীগ কী নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠা নিয়ে আসতে পারবে? এই উন্নয়ন কী মানুষের মন ভরিয়েছে? এখন মানুষের মন যদি ভরিয়েই থাকে আওয়ামীলীগকে যারা ভালোবাসে সেই ৩১ শতাংশই মন ভরিয়েছে। আর বাকি যে ৩৪ শতাংশ তারা প্রতিদিন নানা প্রকারান্তরের মাধ্যমে তাদের জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়েছে। তারা পদ্মাসেতুর ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা ধর্মীয় উন্মাদনা দিয়ে সরকারকে নানাভাবে একটি বিজাতীয় সংস্কৃতির বাহক হিসেবে দেশে প্রচার করেছে। আমাদের দেশে মাহফিলে (সাঈদী মার্কা) গ্রাম-গঞ্জে বাঙালি সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যার ফলে মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনায়, রক্তের ভিতরে ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতিটি যখন বার বার মুখ্য হয়ে ওঠে তখন ঈদের এই একদিনের হাসির পরের দিন আবার ফিরে যেতে হয়। তাই এই ঈদকে কেন্দ্র করে আমাদের ভাবতে হবে, এ দেশে একটি পদ্মা সেতু যতখানি গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাঙালির মননে ও বাংলার মানুষের চেতনার ভিতরে সার্বজনীন মনুষ্যত্ববোধের এই উৎসবগুলোকে গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে দেওয়া। ঈদকে কেন্দ্র করে নতুন ভাবে পালা গান, সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং উৎসবটিকে শুধুমাত্র একদিনের খাওয়া-দাওয়া আর কোলাকুলি, পাঞ্জাবি পরার উৎসবের বাইরে গিয়েও এই উৎসবকে ৭দিন ব্যাপি সারা দেশে বাউলদের মাধ্যমে ঈদের মর্মবাণী, মনুষত্বের মর্মবাণী নিয়ে ঈদমেলা তথা বাঙালি মেলার প্রচলন করতে হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন কিংবা ১৫ আগস্ট শোক দিবসে পালনের মতো এই ঈদকে ৭ দিন ব্যাপি নানা ধরনের সরকারি-বেসরকারি কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে বাধ্যতামূলক পালনের ব্যবস্থা করতে হবে। ঈদ পুনর্মিলনের নামে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বন্ধ করে ঈদকে মানুষের মনুষ্যত্বের জয়গানের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি অন্যতম সুযোগ।
 
ঈদকে কেন্দ্র করে এক সময়ে পালা গান হয়েছে। কবিয়ালদের যুদ্ধ হয়েছে। গ্রাম-গঞ্জে নানা গানের আসর বসেছে। আর আজকের ঈদ মানে বহুতল বিশিষ্ট শপিং কমপ্লেক্সে বিদেশি কাপড় কেনার প্রতিযোগিতা। বিদেশ থেকে কাপড় কিনে পরিধান করে সেটি অন্যের কাছে নিজের আভিজাত্য প্রকাশের মহিমা। এসবের মধ্য দিয়ে ঈদের মূল চরিত্রকে নানাভাবে হরণ করা হচ্ছে। ঈদের চরিত্র হওয়া উচিতÑসেদিন সবাই দেশি পাঞ্জাবি পড়বে। ঈদের উৎসবে পিঠা-পুলির আয়োজন হবে। চারিদিকে বাঙালির আদি সংস্কৃতির গান-বাজনার আসর হবে। যে মেলাগুলো গ্রাম-গঞ্জ থেকে হারিয়ে গেছে, যে মৃত্তিকা শিল্প হারিয়ে গেছে সেগুলো আবার ঈদ উৎসবের মাধ্যমে জাতীয়ভাবে ফিরিয়ে আনতে হবে। আবার যাত্রা পালা, কবি গান, মুর্শিদী গান ফিরিয়ে আনতে হবে। এই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশে উন্নয়নের পর উন্নয়ন হবে, ভিশন-২০২১ এগিয়ে যাবে, জিডিপি ৬ থেকে ৮ এ উন্নীত হবে। কিন্তু আমরা বাঙালিই যদি থাকতে না পারলাম, তাহলে সেই বাঙালি সেই অর্থনীতি আমাকেই আবার হত্যা করবে না তো? ঈদ উপলক্ষে এক সময় বুড়িগঙ্গায় নৌকা বাইচ হতো। বিগত ১০ বছর যাবৎ সেই নৌকা বাইচ দেখি না। প্রতিটি জেলায় সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক নৌকা বাইচ, কুস্তিসহ পহেলা বৈশাখ উৎসবের বিষয়গুলো এর সাথে যুক্ত করে আনা হবে, তখনই এই বাংলাদেশ যে বাঙালি জাতিসত্বার ভিতর যে স্বাধীন হয়েছিল সেই সত্বা ফিরে আসবে। আজ দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের ঈদের বৃহত্তম জামাত তথা দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম জামাত সোলাকিয়ায় মুসলমান হয়ে মুসলমানদের হত্যা করার জন্য সুইসাইড স্কোয়াডরা হানা দেয়। ঈদ উৎসব নিয়ে প্রচলিত ধারণার বাইরে আমরা সেই অতীতের ঈদের বাঙালির সার্বজনীনতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলাম সেই বৈষম্যহীন মাছে-ভাতের বাংলায় ফিরে উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে বাঙালির সার্বজনীন ঈদ উৎসব
আসার জন্য ভাবার এখনই সময়। সময় অতিক্রান্ত হলেও আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এখনো অতিক্রান্ত হয়নি। ঈদকে কেন্দ্র করে ৩ দিনের সরকারি বন্ধ দেওয়া হয়। শহরের রাস্তা-ঘাট সব ফাঁকা হয়ে যায়। সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যায়। সবকিছুই ঠিক রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রকে জাতির কাছে উৎসবের দিক-নির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে। উৎসব সর্বাঙ্গীন এবং সার্বজনীন। কিন্তু উৎসবের প্রেক্ষাপট, গতি ও আমেজ তৈরি করে দেওয়া রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি জাতিকে উৎসাহিত করে যে, আমরা ঈদে ‘নিজেদের বস্ত্র নিজেরা পরবো’। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে ৫টি উৎসবের মধ্য দিয়ে এ দেশে একটি অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধিত হবে। কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্য দিয়ে যখন উৎসবগুলোকে নেওয়া হবে তখন একেকটি উৎসবে বাঙালি যে প্রতিযোগিতামূলক খরচ করে সেই প্রতিযোগিতামূলক খরচটি যদি জাতীয়তাবোধের সাথে উৎসবকে যোগ করে দেওয়া যায়, তাহলে উৎসব শুধু আনন্দই নয় আনন্দের সাথে এ দেশের একটি প্রধান অর্থনৈতিক বিপননের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সেই অর্থনৈতিক বিপননের জায়াগায় রাষ্ট্র যদি একটি সার্বজনীন উৎসবকে সার্বজনীন বাঙালি আনায় করতে বাধ্যতামূলক করে তাহলে প্রকৃত বাঙালিতে ফিরে যেতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। প্রধানমন্ত্রী যদি ঢাকাইয়া জামদানি পড়েন তাহলে রূপগঞ্জের জামদানি পল্লী গড়ে উঠতে সময়ের ব্যাপার মাত্র।
 
ঈদ মনুষ্যত্বের জয়গানে মুখরিত সভ্যতার একটি আলোময় দিন। ঈদ কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের একক কোনো আনন্দের দিন নয়। আনন্দ যদি কিছু মানুষ নিজের করে নেয় আর বাকি মানুষ যদি তাকিয়ে থাকে সেই আনন্দ নিরানন্দের মতো। সেই আনন্দ বদ্ধ ঘরে একা টেলিভিশন দেখার মতো। কিন্তু ঈদ হয় আকাশে চাঁদ দেখে, চাঁদ দেখার মতো। ব্যক্তি যেই হোক না কেনো ধনী কিংবা দরিদ্র আকাশের দিকে যে চাঁদটি দেখা যায়, সেই চাঁদটি সবার জন্য সমান। ঠিক তেমনি ধনী, দরিদ্র, জাত, শ্রেণী সবকিছু নির্বিশেষে সারা পৃথিবীর মানুষ সেদিন আকাশের দিকে তাকাবে যেদিন চাঁদটিকে দেখে সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য যেমন একটি অবয়ব ঠিক তেমনি ঈদ সব মানুষের ভালোবাসার একটি অবয়ব। সেই ভালোবাসার অবয়বকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আজ মানুষ হিসেবে আমাদের। সেটিকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে একটি দেশের জাতীয়তাবাদ তৈরি করার জন্য যখন কার্যকর ভূমিকা রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা রাখতে পারবে তখনই তারা হয়ে ওঠেন ইতিহাসের আওরঙ্গজেব, ঈশা খাঁ, সিরাজউদ্দৌলা কিংবা বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিহাস বিনির্মাণের জন্য সার্বজনীন এই উৎসবগুলোকে বাঙালির সার্বজনীন জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল চেতনায় কাজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিষয়টি সদয় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হলো। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই মূল মন্ত্রে আমরা যদি ঈদসহ ৫টি উৎসবকে সার্বজনীন করে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে সার্বজনীন ঈদ উৎসব আমাদের জন্য অবশ্যই নতুন আকাশের নতুন চাঁদ হয়ে উঠবে। ঈদ আনন্দ হোক সবার জন্য সার্বজনীন, এই প্রত্যাশা আমাদের।
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd