ঢাকা : বুধবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • আঞ্চলিক দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে নারীরা এগিয়ে : চুমকি          তিন হাজার বিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে          সরকারের কাজ সম্পর্কে জনগণকে ধারণা দিতেই উন্নয়ন মেলা          পাবলিক পরীক্ষায় অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা : শিক্ষামন্ত্রী           সালেই বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে : মেনন          বিশ্ব ইজতেমায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে শতশত মুসুল্লি
printer
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট, ২০১৭ ২৩:১৩:০৯
এক ঢিলে দুই চোখ
করীম রেজা


 


গেল, সিদ্দিকুরের দুই চোখই গেল। একটিমাত্র ঢিলের আঘাতে। পুলিশের দেয়া ঢিল-তত্ত্বে ফুলের টবের টুকরোর কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। অত্যুৎসাহী কেউ একজন দইয়ের বাটি বা দইয়ের গামলা তত্ত্ব চালুর চেষ্টা করে। শুরুতেই তা মাঠে মারা যায়। ভিডিও ফুটেজে পুলিশকে টিয়ার শেল খুব কম দূরত্ব থেকে সিদ্দিকুরের উদ্দেশ্যে ছুড়তে পরিষ্কার দেখা গেছে। ডিএমপি প্রধান পরে তার বক্তব্য ঘুরিয়ে বলেছেন। দোহাই দিয়েছেন স্যাবোটাজ সম্ভাবনার। কিন্তু এখন সবাই জানে কাজটি একমাত্রই পুলিশের।
ঢাকায় চিকিৎসাধীন সময়ে সামান্য আশার আলো দেখা গিয়েছিল। কিন্তু চেন্নাইয়ে চিকিৎসকদের কথায় তা আর থাকল না। সিদ্দিকুরের দুই চোখের সঙ্গে সঙ্গে তার ভবিষ্যতও অন্ধকার হল। শুধু তার নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।

সিদ্দিকুর ঢাকায় আসেন উচ্চতর পড়াশোনা করতে। তিতুমীর কলেজে ভর্তি হন। পাশাপাশি পাঞ্জাবির ব্যবসা শুরু করেন পড়ার খরচ যোগাতে। কারণ তার পরিবার সচ্ছল নয়। শিশুকালে বাবা মারা যান। মা কিষাণির কাজ করে সংসার টিকিয়ে রাখেন। বড় ভাই উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর পড়েননি। সিদ্দিকুরের পড়া আর সংসার খরচ যোগাতে কাজকর্ম শুরু করেন।

মাদ্রাসা বোর্ডের ছাত্র সিদ্দিকুর কঠোর পরিশ্রমী। ব্যবসা, টিউশনি, কলেজে পড়ার পাশাপাশি তিনি মাদ্রাসা মাধ্যমেও পড়াশুনা চালু রাখেন। ভর্তি হন কম্পিউটার ট্রেনিং প্রতিষ্ঠানে। জীবন যুদ্ধে সিদ্দিকুর কোনোভাবেই পরাজয় মানতে রাজি নন। মা, ভাই, বোনকে আশার আলো দেখান।  বিসিএস করে ফেললেই পরিবারের সব দুঃখ-কষ্ট দূর হবে। পরিবারকে আশ্বস্ত করে, ধৈর্য ধরতে বলেন। যিনি কখনো থেমে যাননি জীবন সংগ্রামে, সেই সিদ্দিকুর আজ নিশ্চল আশাহত। দুই চোখের অন্ধকার নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় চেন্নাইয়ের হাসপাতালে।

সিদ্দিকুরের অপরাধ অনেক সহপাঠী, সমপাঠী ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে তিনি এসেছিলেন সামান্য একটি দাবির কথা জানাতে। সাতটি কলেজের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে চায়। ঢাবি কর্তৃপক্ষ যেন পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা দ্রুত করে, সেই দাবি জানাতে। অবশ্য এই রকম দাবির কথা বাংলাদেশ এর আগে শোনেনি কখনো। পরীক্ষা দেয়ার জন্য আন্দোলনে শিক্ষার্থীর মাঠে নামার ইতিহাস আমাদের সভ্যতায় নেই, আমাদের ছিল পরীক্ষা পেছানোর দাবির সংস্কৃতি।

ঢাবির অধিভুক্ত সাতটি কলেজের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার তারিখ ও সময়সূচির আন্দোলন শাহবাগ এলাকায় দানা বাঁধতেই পারেনি পুলিশের কঠোরতার জন্য। সেখানে কার্যকারণহীনভাবে এই টিয়ার শেল সরাসরি একজন ছাত্রের ওপর নিক্ষেপ গভীর কোনো অর্থ বহন করে কিনা তা বিবেচনা করা খুব জরুরি।

ছাত্রছাত্রীদের আশ্বস্ত বা নিরস্ত করতে কেউ এগিয়ে আসেননি। কলেজের কোনো অধ্যক্ষ কিংবা যে ঢাবির কাছে তাদের দাবি, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য কিংবা তাঁর কোনো প্রতিনিধিও আসেননি। যদিও অকুস্থল ছিল উপাচার্য দফতরের সন্নিকটে, পায়ে হাঁটা দূরত্বে। পরে পত্রিকার পাতায় দুজন সম্মানিত উপাচার্যের পরস্পর দোষারোপের বিত-া দেখা যায়।

সিদ্দিকুরের চোখ নষ্ট হওয়ার পেছনে দায় কার, সেই ঘটনার সত্যাসত্য নির্ণয়ে যথানিয়মে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। আর এই তদন্ত কমিটি যে সঠিক তথ্য প্রকাশ করবে না তা আগাম ভেবেই মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাহাদুর মন্তব্য করেন, দরকার হলে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন। পত্রিকান্তরে, গণমাধ্যমে নানা খবর, যুক্তি বা বাহাস প্রকাশ ও প্রচার হচ্ছে। কিন্তু তাতে সিদ্দিকুরের চোখের আলো ফিরে আসছে না বা তার পরিবারও আশায় বুক বাঁধতে পারছে না। সে সঙ্গে দেশের জণগণও।

বাংলাদেশে একটির পর একটি ঘটনা ঘটে। পূর্বের ঘটনা প্রাকৃতিক নিয়মেই চাপা পড়ে। সমসাময়িক আরেকটি ঘটনা পুলিশ বাহাদুরদের বেলায় জনমনে সন্দেহের ঘূর্ণিপাক তোলে। দুই চোখ উপড়ে নেয়া এক মুদি দোকানির খবর। পরিবার আগের রাতে এক থানায় আটককৃত ওই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেও আসে। পরদিন তাকে দুই চোখ উপড়ানো অবস্থায় হাসপাতালে পাওয়া গেল। এবার তিনি আটক হয়েছেন অন্য থানার পুলিশের দ্বারা। এই থানার পুলিশই তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। অবশ্যই মহৎ কাজ। এটা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়। থানা কীভাবে স্থানান্তরিত হল, সুস্থ মানুষ কীভাবে চোখ উপড়ানো অবস্থায় এল, থানার নিরাপদ আটক অবস্থা থেকে সে কীভাবে, কেন মুক্ত হল? পুলিশের অনেক ভালো কাজ, স্মরণে রাখলেও এ রকম দু’একখানা ঘটনা সব উজ্জ্বলতা ঢেকে দিতে যথেষ্ট বলেই মনে হয়। কবি ফরহাদ মজহারকে নিয়ে ঘটে যাওয়া বিষয়টি এখনও রহস্যময়। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী হত্যার ঘটনা প্রভৃতি বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য জনতার গোচরে আসে না। জণমনে সন্দেহের চাদর তাই সব সময়ই আন্দোলিত হয়।

জনগণ এই সরকারের প্রথম মেয়াদের শুরু থেকেই শুনে আসছে যে, বিগত সরকারের আমল থেকে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি প্রশাসনের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে বা উৎপাটিত করা হয়েছে তা আমরা পষ্টাপষ্টি জানি না। আবার খোদ শাসকদলের অভ্যন্তরেও তাদের সদর্প আগমন অব্যাহত। বর্তমানে দেশের রাজনীতি নির্বাচনোন্মুখ, এই সময়ে পুলিশ মহলের এহেন আচরণ জনমনে অশুভ সংকেতই পাঠাচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করার জন্য কেউ বা কারা এমন অভাবনীয় আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ করছে তা বিচার করা দরকার। নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে বিধি-বিধান না মেনে, কোন উদ্দেশ্যে বা কার বা কাদের ইশারায় এমন ঘটনা ঘটছে তা খতিয়ে দেখা এখনই দরকার।

জনগণ এসব অপকর্মের হোতাদের পরিচয় যেমন জানতে আগ্রহী তেমনি এদের উপযুক্ত শাস্তিও দেখতে চায়। লোক দেখানো কিছু বিভাগীয় বদলি কোনোভাবেই প্রতিবিধান হতে পারে না। জনগণ অবশ্যই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় আস্থা রাখতে চায়। তিনি আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিভাগীয় তদন্ত আসলে সঠিক হবে না। তাই তিনি নতুন করে তদন্তের আশা প্রকাশ করেছেন। আমরা বলবো, একই কাজ বার বার না করে, রাষ্ট্রের সময়, অর্থ অপচয় না করে, একবারেই সঠিক তদন্ত করা উচিত। অপরাধীর ত্বরিত এবং উপযুক্ত শাস্তিবিধান হলে অন্যরা একই রকম কাজ করতে আর সাহসী হবে না। দেশের মানুষ উন্নয়ন ও জাতির অগ্রযাত্রা নিয়ে অহেতুক সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত হবে না। এক সিদ্দিকুরের সঙ্গে পুরো পরিবার দিশাহীন হবে না। তেমনি দেশ ও দেশের জনগণও।
লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ, E-mail : karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd