ঢাকা : বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা           কারও মুখের দিকে তাকিয়ে মনোনয়ন দেয়া হবে না : প্রধানমন্ত্রী          ২২তম অধিবেশন চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          দেশের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট, ২০১৭ ২৩:০৬:৩৫
১৫ আগস্ট, আমাদের শোক
করীম রেজা


 


জগতে মানুষজন প্রাকৃতিক নিয়মেই এতিম হয়। তবে একদিনে এতিম হবার ঘটনা এ বিশ্বে বিরল হলেও অসম্ভব নয়। সম্ভব তার প্রমাণ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সহোদরা শেখ রেহানা একদিনেই পিতৃমাতৃহীন হয়েছেন। শুধু তাই নয়, হারিয়েছেন পুরো পরিবারের সব সদস্যসহ অনেক পরিজন। কনিষ্ঠ ভ্রাতা শিশু রাসেলও ঘাতকদের বুলেট থেকে রেহাই পায়নি। এই শোক বলার নয়, প্রচার বা প্রকাশেরও নয়। এ শুধু অনুভব করার। যার গেছে, সেইই বোঝে। বোঝেন শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা। আমরা শুধু বলতে পারি, পক্ষে-বিপক্ষে নানা রকম বাহাস করতে পারি। তাতে ব্যক্তিশোকের কোনও ব্যত্যয় হয় না, কমবেশিও।
তবে এ শুধু ব্যক্তি শোক নয়, জাতীয় শোকও। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শহিদ হলেন নিষ্ঠুরতম হত্যাকান্ডের দ্বারা। যার কোনও দৈশিক কারণ ছিল না। একমাত্র বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রই এই অভাবিত নারকীয় হত্যার মূল।

আমাদের দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে যাকে পেলাম, তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন বিতর্কিত ব্যক্তি এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচরদের একজন। মন্ত্রিসভার সদস্যরাও বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগেরই। জাতি দিশাহীন এক বিভ্রান্তির ঘোরে থাকল। আমাদের আরও দুর্ভাগ্য- আমরা মুখে যত বলি, লিখি তার চেয়ে একদম কম। আমাদের রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলা তারা কেউ স্মৃতিচারণ করে কিছু লেখেন না। লিখলে আমরা সাধারণ মানুষ কিছু কৌতূহল মেটাতে পারতাম। জাতির ইতিহাস সঠিকভাবে নির্মাণের জন্য ওইসব উপাদান ভবিষ্যতে ইতিহাসকারের কাজে আসতো। সম্ভব হতো নানা কথার আড়ালে লুকায়িত সত্য খুঁজে বের করা।

নভেম্বরে জেলখানায় হত্যা করা হলো জাতীয় চার নেতাকে। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের নেতৃত্ব এবং জাতির প্রতি, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁদের আনুগত্য ছিল প্রমাণিত। আগস্টে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নির্মূল করা এবং নভেম্বরে জেলখানায় চার নেতাকে হত্যা করা একই সূত্রে গাঁথা। মোশতাক এবং তার সহযোগী হত্যাকারীরা দেশকে যথাযোগ্য নেতৃত্বশূন্য রেখে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল।

১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের পর দেশবাসী প্রকৃত অর্থেই দিশা হারিয়ে ফেলে। আমরা ব্যাপক কোনো প্রতিবাদী কন্ঠ পাই না। তৎকালীন আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকে রাস্তায় পাই না। যিনি জনতাকে সঙ্গে নিয়ে সারা দেশে এই নারকীয় হত্যার প্রতিবাদ জানাবেন। একটি আধাসামরিক বাহিনী ছিল, রক্ষীবাহিনী; এই বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের শেষ প্রত্যাশা ছিল, তারা দেশের এই দুর্যোগে সহায়ক শক্তি হিসেবে সক্রিয় হবে। রক্ষীবাহিনী নিয়ে হত্যাকারীরাও আতঙ্কেই ছিল। কোনো অজ্ঞাত কারণে তারা নিষ্ক্রিয় থাকল। কিন্তু দেশবাসী দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া রাজনৈতিক নেতাকমীদের উল্লেখযোগ্য কোনও প্রতিবাদ চাক্ষুষ করল না। বাঘা (কাদের) সিদ্দিকী দেশান্তরী হলেন। তাঁর নেতৃত্বে মুজিব হত্যার প্রতিশোধ যুদ্ধে অনেকেই বীরের মতো প্রাণ দিলেন।

দেশবাসী দেখল কোথাও কেউ নেই। কিছু মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানের অনুসারী হয়ে গেল। বাংলাদেশে পাকিস্তানি ধ্যানধারণা প্রচারিত ও প্রসারিত হতে থাকল। অবস্থা এমন দাঁড়াল, মনে হল, এ দেশের নাম বুঝি একদিন বাকিস্তান, বা এই রকমের কিছু বলে পরিচিত হবে। এরপরের ইতিহাস সবারই জানা। সেই হত্যার প্রতিবাদ ও প্রতিশোধ নিতে না পারার দায় জাতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছে। বিশ্ব এখনো বাংলাদেশকে যতটুকু চেনে তার চেয়ে অনেক বেশি চেনে-জানে শেখ মুজিবকে, মুজিবের দেশকে। একজন রাষ্ট্রনায়ক তাই যথার্থই বলেন- তিনি হিমালয় দেখেননি; কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছেন।

মুজিব হত্যার পর সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কেউ ব্যাপক গবেষণা করেছেন কিনা জানা যায় না। সম্প্রতি টিভি চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে কেউ সারা অঙ্গে কালো পোশাক পরিধান করছেন, কেউ মাটিতে শয়ন করছেন। শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এতিম, তাদের ঘরবাড়ি নেই বলে প্রত্যন্ত গ্রামের এক প্রান্তিক আয়ের মানুষ সঞ্চিত অর্থ দিয়ে শেখ হাসিনাকে এক খন্ড জমি কিনে সাফকবালা দলিল করে দিয়েছেন। এ হলো স্বল্প কথায় মুজিবের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার সামান্য মানুষের অসামান্য ভালোবাসা। এই মুজিবের মৃত্যু নেই, এই মুজিব অমর, অজড়, অক্ষয়। কোনো ঘাতকের শক্তি নেই এই মুজিবকে হত্যা করে। জয় মুজিবের জয়।
লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ, সাবেক অধ্যক্ষ

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd