ঢাকা : বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • জাতীয় নির্বাচন ২৩ ডিসেম্বর          নির্বাচনের তারিখ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই : সিইসি          আ.লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার বুধবার থেকে নেবেন প্রধানমন্ত্রী          দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট, ২০১৭ ২৩:১২:৩৬
বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই আসতে পারে মুক্তি
বজলুর রায়হান


 


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে স্বাধীনতা ও স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনা মুছে দেওয়ার জন্য স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের গভীর ষড়যন্ত্র কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। জাতি ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করেছে, অধিকাংশ খুনির শাস্তি কার্যকর হয়েছে এবং বাকিদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী এবং শোকের মাস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের মাধ্যমে জাতি বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদান এবং আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একটি উচ্ছৃঙ্খল গ্রুপ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যার অবিশ্বাস্য খবর রেডিওতে শোনার পর গোটা জাতির মতো বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণ শোক স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

এর অনেক পরে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং ১৯৭৫-এর খুনিদের পরাজিত করে শাস্তি দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান দেশবাসী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের রায় নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিভিন্ন সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। যার ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে।

জাতির পিতার দেখানো পথেই আসতে পারে মুক্তি
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বপ্ন নিয়ে এদেশকে পাকিস্তানিদের শোষণ-শাসন থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন সে পথেই আসতে পারে বাংলাদেশের একমাত্র মুক্তি। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন শোষণমুক্ত অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী একটি গণতান্ত্রিক সার্বভৌম রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্রে থাকবে না কোনো শ্রেণী বৈষম্য-থাকবে ধনী-গরিব। দেশের প্রতিটি মানুষ সমানভাবে ভোগ করবে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসার মতো সব মৌলিক সুযোগ-সুবিধা।

বঙ্গবন্ধুকে ঘাতকরা খুন করলেও তার সেই আদর্শ আজ প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। আর এদেশের মানুষ সে আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য জাতির জনকেরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার হাতে নির্দিধায় তুলে দিয়েছেন দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এদেশকে সন্ত্রাস-জঙ্গিমুক্ত-অসাম্প্রদায়িক অর্থনৈতিকভাবে উন্নত একটি দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে নির্লোভ ও অক্লান্তভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু ১৯৭১ ও ’৭৫-এর পরাজিত শক্তি আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সে প্রচেষ্টা থেকে এ দেশকে কিভাবে দূরে রেখে অতীতের মতো একটি সাম্প্রদায়িক-জঙ্গিবাদী-দুর্নীতি-অপশাসনের যাঁতাকলে দেশকে ফেলে পেছনের দিকে নিয়ে যাবার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। এ থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব প্রতিটি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

প্রতিটি বাঙালিকে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন। আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তিনিই তো ছিলেন বাঙালির স্বপ্ন ও বাস্তবতার সার্থক রূপকার। বার বার তাঁর সামনে এসেছে মসনদ, ক্ষমতা, অর্থবিত্তের হাতছানি। মোহ ও লোভ কখনও ছুঁতে পারেনি জাতির জনককে। নানা ষড়যন্ত্রে, কূটচালে চেষ্টা চলেছে তাঁকে সরিয়ে দিতে পথ থেকে, আন্দোলন থেকে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। শেষাবধি তাই একদল ঘৃণ্য পশু এক কালরাতে রক্তে ভাসায় জাতির জনক ও স্ত্রী, সন্তান, স্বজনদের। রক্তাক্ত করে স্বাধীনতাকে।

কিন্তু রক্তে গড়া বঙ্গবন্ধুর দেহ ঘৃণ্য পশুরা কেড়ে নিতে পারলেও নিতে পারেনি আদর্শ বঙ্গবন্ধুকে। কেননা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে চিরঞ্জীব। তাই ৪২ বছর পরও বাঙালি জাতি কৃতজ্ঞতা-শ্রদ্ধা-ভালবাসায় সিক্ত করে বঙ্গবন্ধুকে। তাঁরই রক্তে ধোয়া বাংলায় আবারও জাগে যূথবদ্ধ মানুষ। শ্রদ্ধায় স্মরণে পথে প্রান্তরে আজও ওঠে সেই সম্মিলিত রণধ্বনি- ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। এক মুজিব লোকান্তরে লক্ষ লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে।’

হাতেগোনা স্বাধীনতাবিরোধী আর তাদের দোসররা ছাড়া শোকে মুহ্যমান গোটা জাতি। রাজধানীর প্রতিটি মোড়ে, পাড়া-মহল্লায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে উড়ছে বিশাল বিশাল কালো পতাকা ও ব্যানার। প্রতিটি ব্যানার-ফেস্টুনেই বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখা বিভিন্ন স্নোগান। পলাতক খুনিদের দেশে ফেরত এনে ফাঁসির রায় কার্যকর এবং যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে অজস্র সংগঠনের পোস্টারে ছেয়ে গেছে প্রতিটি গলির দেয়াল।

এভাবেই আগস্টের প্রতিটি দিন শোকাবহ পরিবেশে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি স্মরণ করছে হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করা হচ্ছে প্রতিটি শোকের অনুষ্ঠানে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে ভুট্টো ও
কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফর করেন
একাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হেনরী কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। তার ওই সফর সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোও বাংলাদেশে তিন দিনের সফরে আসেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর ১৯ ঘন্টার সফরে বাংলাদেশে আসেন এবং গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দুই ঘন্টাব্যাপী আলাপ-আলোচনা করেন। কিসিঞ্জারের এই সফরের প্রায় নয় মাস পনের দিন পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭৪ সালের ২৪ জুন বাংলাদেশ সফর করেন।
হেনরী কিসিঞ্জারের এই সফর সম্পর্কে বিশিষ্ট মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিপস্যুজ লেখেন ‘যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র মতে কিসিঙ্গারের ঢাকা ভ্রমণের এক মাসের মধ্যে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসটি কুচক্রী মহলের যোগাযোগ ক্ষেত্রে পরিণত হয়।’

অধ্যাপক আবু সাইয়িদ-এর লেখা ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস’ গ্রন্থে এ সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও লিপস্যুজ তার ‘বাংলাদেশ- দ্য আনফিনিশ্ড রেভ্যুলিউশন’ গ্রন্থেও এই বিষয়ে লিখেছেন।
সফরের সময় গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা শেষে কিসিঞ্জার অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেন, একটি মানুষের অনুধাবন ক্ষমতা যে এতো ব্যাপক হতে পারে তা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ না হলে কখনো বুঝতে পারতেন না। জাতির জনকের কাছ থেকে এই অভিজ্ঞতা তার কাছে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ সময় একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, শেখ মুজিবের দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা যদি এমনই তাহলে আপনি ১৯৭১ সালে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন কেন? কিসিঞ্জার এর উত্তর না দিয়ে সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করলে তিন মিনিটের মধ্যেই সংবাদ সম্মেলন শেষ হয়ে যায়।
লিপস্যুজ আরো লেখেন, যারা তখন কিসিঞ্জারের পরিকল্পনার সম্পর্কে অবগত ছিলেন তাদের কাছে তার এই বক্তব্য ছিল এক ধরনের ব্যঙ্গোক্তি মাত্র। এ ছাড়াও কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যখন প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের ভাষণ দিতে যান, তখন প্রটোকল অনুযায়ী তাকে সৌজন্যমূলকভাবে ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাংলাদেশ ফরেন মিনিস্ট্রি থেকে বার বার অনুসন্ধান করা সত্ত্বেও শেখ মুজিবের ওয়াশিংটন সফর সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ব্যবস্থা পাওয়া যাচ্ছিলো না।
শেষ মুহূর্তে যখন পরিস্কার হয়ে গেলো, যাই হোক না কেনো, শেখ মুজিব ওয়াশিংটনে তাঁর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য যাবেনই তখন নিরুপায় হয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট হোয়াইট হাউসে মাত্র ১৫ মিনিটের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
তবে ব্যবস্থা ও অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত শীতল। কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে শেখ মুজিবের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ প্রদান করেননি। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে অবশ্য শেখ মুজিবের সঙ্গে তিনি দেখা করেন ও ছবি তোলেন।

লিপস্যুজ তাই বলেছেন, শেখ মুজিব সম্পর্কে কিসিঞ্জারের, বিশেষিত শব্দগুলোÑ ‘এ ম্যান অব ভাস্ট কনসেপশন’ ছিল এক ধরনের কথার কথা।
এর আগে ১৯৭৪ সালের ২৪ জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশে তিন দিনের সফরে আসেন। তার সঙ্গে সফরসঙ্গী ছিলেন সর্বমোট ১০৭ জন। এদিকে একজন বিদেশি রাষ্ট্রনায়ককে যোগ্য সম্মান প্রদর্শনের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ভুট্টোর আগমনের দিন বাংলাদেশে পাকবাহিনীর গণহত্যা ও বর্বরতার ভয়াল দিনসমূহের ছবি সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করে। এ সবকিছুই বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে সম্পর্কিত বলে অনেকে মনে করেন।

শেখ মুজিব জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধীর চেয়ে বড় নেতা
ব্রিটিশ মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা প্রয়াত লর্ড ফেনার ব্রকওয়ে একবার মন্তব্য করেছিলেন, ‘এক অর্থে, শেখ মুজিব (বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী ও ডি ভ্যালেরার চেয়ে বড় নেতা।’

এ ছাড়া অন্য আরো বড় বড় ব্যক্তি আছেন, তারাও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন- ভারতের মণিপুর ও ঝাড়খ- রাজ্যের সাবেক গভর্নর বেদ মারওয়া।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছিলেন, আমি আমার কর্মজীবনে জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধীসহ অনেক ক্যারিশমেটিক বিশ্বনেতার সঙ্গে মিশেছি। কিন্তু আমি অবশ্যই বলব যে, তার মধ্যে তিনি (শেখ মুজিব) ছিলেন সবচেয়ে বেশি ক্যারিশমেটিক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন।

নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বৈঠকের কথা স্মরণ করে মারওয়া আরো লিখেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সাধারণত রিজার্ভ ব্যক্তিত্বের মানুষ। কিন্তু এদিনের ঘটনা ছিল ব্যতিক্রম। এর আগে তাঁর মুখে এত বড় হাসি আমি কখনো দেখিনি। তিনি একজন যুবতীর মতো হাসছিলেন। দুজনের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

ফেনার ও মারওয়ার মতো বিশ্বের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালির ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। যিনি ১৯২০ সালে বিশ্বের এই অঞ্চলের পলিমাটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শেখ মুজিব, তাঁর ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব, আকাশচুম্বী ব্যক্তিত্ব, তাঁর অদম্য সাহস এবং জাতির প্রতি তাঁর নিঃশর্ত শ্রদ্ধা ও অঙ্গীকারের ব্যাপারে তারা ব্যাপক প্রশংসা করেছেন।

এদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন, একটি বিপ্লব, একটি গণঅভ্যুত্থান এবং সবার ওপরে একটি দীর্ঘ অপশাসনের হাত থেকে বাঙালি জাতির মুক্তির প্রধান স্থপতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে দেয়া তাঁর ভাষণকে একটি মহাকাব্য হিসেবে মনে করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মতো খুব কমসংখ্যক বিশ্বনেতাই এ ধরনের ভাষণ দিয়েছেন।

১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের জাতির জনককে জড়িয়ে ধরে আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখিনি। তবে আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতার দিক থেকে এই মানুষটি হিমালয়। তাই আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা পেলাম।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের খবর শোনার পর সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন এক বাঙালি সাংবাদিককে লিখেছিলেনÑ এটা তোমাদের জন্য একটি সর্বোচ্চ জাতীয় ট্রাজেডি। আমার জন্য এটা গভীর মাত্রায় ব্যক্তিগত ট্রাজেডি।

সাংবাদিক ক্রিল ডান একবার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিব একমাত্র নেতা যিনি রক্ত, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি ও জন্মগতভাবে একজন পুরোপুরি বাঙালি। তাঁর শারীরিক গঠন ছিল বিশাল। ছিল তাঁর বজ্রকণ্ঠ। তাঁর ক্যারিশমা জনগণের ওপর ম্যাজিকের মতো কাজ করতো। তাঁর সাহস ও ক্যারিশমা তাঁকে এ সময়ের একজন সুপারম্যান-এ পরিণত করেছিল।’

প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক স্যার মার্ক টালি তাঁর মধ্যে এক মহান ক্যারিসমা আবিষ্কার করেন। তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিবের বেশ কয়েকটি জনসমাবেশে আমি উপস্থিত ছিলাম। তাঁর চমৎকার কণ্ঠস্বরে জনগণ সম্মোহিত হয়ে উঠতো। সমাবেশে উপস্থিত জনগণের প্রতিক্রিয়া দেখে আমি তা উপলব্ধি করি।’
উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল মার্ক টালির।

নয়া মিসরের প্রখ্যাত সাংবাদিক হাসনাইন হেইকল (আল-আহরাম পত্রিকার সাবেক সম্পাদক এবং প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নাসেরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী) বলেন, ‘নাসের কেবল মিসর ও আরব জগতের নন। তাঁর আরব জাতীয়তাবাদ ও আরব জনগণের জন্য একটি মুক্তির বার্তা। একইভাবে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের একার নন। তিনি সব বাঙালির মুক্তির অগ্রদূত। তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাংলার সভ্যতা ও সংস্কৃতির নতুন অভ্যুদয়। মুজিব বাঙালির অতীত ও ভবিষ্যতের একজন বীর।’

উপনিবেশ বা দখলদারদের হাত থেকে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ব্যক্তিকে জাতির জনক উপাধিতে ভূষিত করা হয়। যেমন- জর্জ ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্রের, পিটার আই রাশিয়ার, সুন ইয়াট-সেন চীনের, স্যার হেনরি পার্কস অস্ট্রেলিয়ার, মিগুয়েল হিদালগো মেক্সিকোর, সাম নুজমা নামিবিয়ার, উইলিয়াম দি সিলেন্ট নেদারল্যান্ডসের, ইনার গারহার্ড নরওয়ের, জুলিয়াস নিরেরে তানজানিয়ার, জোমো কেনিয়াত্তা কেনিয়ার, কার্লোস মানেল কিউবার, মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের, ড. আহমেদ সুকর্ন ইন্দোনেশিয়ার, টেংকু আবদুল রহমান মালয়েশিয়ার, মহাত্মা গান্ধী ভারতের এবং ডন স্টিফেন সেনানায়েক শ্রীলংকার জাতির জনক। তাই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জাতির জনক।

অনেক রাষ্ট্রনায়কই বলেছেন- বাঙালিদের বিশ্বাস করা যায় না তারা তাদের জাতির পিতার হত্যাকারী।
ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা গেলেও তাঁর আদর্শকে কোনোদিন হত্যা করা যাবে না। তাই বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ে ছিলেন এবং চিরকালই থাকবেন। ’৭৫-এর খুনি চক্রের ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। ব্যক্তিকে হত্যা করা যায় কিন্তু তাঁর আদর্শ ও দর্শনকে কোনোদিন হত্যা করা যায় না। তাইতো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিরকালই আমাদের মাঝে ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। আর ষড়যন্ত্রকারীরা ইতিহাসের আস্তাকুড়েই নিক্ষিপ্ত হবে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক সরকার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে খুনীদের বিচারের পথ শুধু রুদ্ধই করেনি, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চাকরি দিয়ে তাদের পুরস্কৃতও করেছিল। কিন্তু সারাবিশ্বে এই জঘন্যতম অপরাধের জন্য বাংলাদেশিদের ধিক্কার জানানো হয়। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে নিজের দেশেই নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করায় অনেক রাষ্ট্রনায়ককেই বলতে শোনা গেছে-’বাঙালিদের বিশ্বাস করা যায় না, তারা তাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী।’

বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার করে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয়েছে। অন্য অপরাধীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন শুধু পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদেরও একদিন তাদের পূর্ববর্তী ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণতিই বরণ করতে হবে।

’৭৫-এর ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত এখনও থেমে নেই। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক সরকারকে তারা বিপাকে ফেলে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির নানামুখী ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

বাঙালি বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ এক সূত্রে গাঁথা
বাঙালি, বাংলাদেশ আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম এক সূত্রে গাঁথা ও সমার্থক।  সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামক কোনো রাষ্ট্রের জন্ম কোনোদিনই হতো না- এ সত্য আজ শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্ব মানচিত্রেও তা স্থান করে নিয়েছে। আর এ কারণেই আগস্ট মাস এলেই বাঙালি জাতি থাকে শোকে মূহ্যমান। প্রতিটি বাঙালির মনে রক্তের আখরে লেখা শোকাবহ-রক্তাক্ত আগস্ট নাড়া দিয়ে ওঠে। শ্রদ্ধা ভরে গোটা জাতি অবনত চিত্তে স্মরণ করে জাতির জনককে। যদিও বীর বাঙালির ইতিহাসে এ এক কলঙ্কিত অধ্যায়। তারপরও আগস্ট আমাদের চেতনার ধমনিতে নতুন করে সাড়া জাগায়। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাঙালি কলঙ্কমুক্ত হলেও আমাদের প্রতিটি শিরা-উপশিরা ও ধমনিতে তীব্র ঘৃণার উদ্রেক করে এ মাসে।

এ মাস নতুন করে উপলব্ধি করতে শেখায়। এ মাস প্রতিশোধের চেতনায় শানিত করে সবাইকে। কেননা এ মাসেই আমরা হারিয়েছি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কালজয়ী মহাপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

বস্তুত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ইতিহাসের বাঁক ঘোরানো এক সিংহপুরুষ। বাঙালি জাতির চরিত্র সম্পর্কে তাঁর চেয়ে বোধকরি আর কেউ জানতেন না। তবুও তিনি জীবনের বিনিময়ে সেই জাতির জন্যই রচনা করেন ইতিহাসের এক অমোঘ অধ্যায়। পৃথিবীতে কোনো জাতিই মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি। আর স্বাধীনতার জন্য এই স্বল্পতম সময়ে প্রায় ত্রিশ লাখ বাঙালির আত্মদানের ঘটনাও ইতিহাসে বিরল।

বঙ্গবন্ধুর এক তেজোদীপ্ত ভাষণেই উদ্বুদ্ধ গোটা জাতি সেই বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বভাবনেতা। কী বাল্যে, কী  কৈশোরে বা কী মত্ত যৌবনে সবখানেই ছিলেন তিনি এক কালজয়ী মহাপুরুষ। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক অবিভাজ্য সত্তা। আর সে জন্যই আগস্টের পুরো মাসজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করছেন জাতির জনকের প্রতি।
লেখক : উপদেষ্টা সম্পাদক-টাইমওয়াচ

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd