ঢাকা : রোববার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • মেক্সিকোতে ভূমিকম্প : নিহত ২৪৮          রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য হয়ে গেছে, নতুন ঐক্যের দরকার নেই : নাসিম          ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল মধ্যম আয়ের দেশ হবে বাংলাদেশ : বাণিজ্যমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ব্যাপার ঐক্যবদ্ধ হতে ওআইসি’র প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান          দু-এক দিনের মধ্যে চালের দাম কমবে : বাণিজ্যমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের প্রতি আন্তরিকতার কমতি নেই : ওবায়দুল কাদের          রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ত্যাগ করলে অবৈধ বলে গণ্য হবেন : আইজিপি          রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ নৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে : রুশনারা আলী
printer
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট, ২০১৭ ২৩:৪২:০২
সাগর উপকূল দিয়ে ইয়াবা বহনে ব্যবহার হচ্ছে ২শ নৌকা
উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা


 


বর্তমানে ইয়াবা পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে বঙ্গোপসাগর। নাফ নদীর চেয়ে ব্যাপক হারে ব্যবহার হচেছ বঙ্গোপসাগরের ফিশিং ট্রলার। উখিয়া-টেকনাফ বঙ্গোপসাগর সৈকতের প্রত্যেক ঘাটেই রয়েছে কয়েকটি করে ইয়াবা বহনের ফিশিং ট্রলার, যার মালিক ইয়াবা গডফাদার। নিজস্ব ফিশিং বোটে নিরাপদে মাল বহনের সুবিধার্তে নিজেই জেলে সেজেছে। বঙ্গোপসাগর দিয়ে আসা ইয়াবার প্রত্যেক চালানেই থাকে কয়েক লক্ষ পিস, যা সুযোগ বুঝে পার্শ্ববর্তী গ্রামে অস্ত্র পাহারায় নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যায়। আবার প্রত্যেক ঘাটেই রয়েছে মাঝি বা মাস্তান যাদের দায়িত্বে মাল ওঠানামা করে, বিনিময়ে সেই বাহিনীকে দিতে হয় কয়েক লক্ষ টাকা।
বিশ্বস্থ সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ থেকে ককসবাজার পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর সৈকতের ঘাটে শুধু ইয়াবা বহনে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ২শ টি নৌকা। যে নৌকাগুলোর মালিক ইয়াবা গডফাদার। আবার প্রায় ঘাটেই রয়েছে ইয়াবা বহনের কাজে ভাড়ায় চালিত। তারা ফিশিং বোট মাঝি সেজে ঘাটে অবস্থান করলেও মাছ শিকারে যায় না, ইয়াবা বহনের কন্ট্রাক্ট পেলে জেলে সেজে মাছ শিকারের কথা বলে সাগরে যায়।
সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে একটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে ছয় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে সাড়ে পাঁচ লাখ পিসেরও বেশি ইয়াবা গায়েব করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) শহরের কস্তুরাঘাটে এ অভিযান চালায়। ডিবি পুলিশ ফিশিং ট্রলারটি তল্লাশি করে ইয়াবা, দুটি দেশী তৈরি অস্ত্র ও ৮ রাউন্ড গুলিসহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামে এক মাঝিকে আটক করে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আসা রোধকল্পে সরকার নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দেয়ার পর ইয়াবা কারবারিরা তাদের এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যেতে সাগর পথকে বেছে নিয়েছে। ইয়াবার বিশাল চালান উদ্ধার শেষে গণনায় কম দেখানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে সর্বত্র তোলপাড় ও কানাঘুষা চলছে।
সূত্র জানায়, মিয়ানমারের সিটওয়ে (আকিয়াব) থেকে ছয় লাখ পিস ইয়াবা ভর্তি করে গভীর সমুদ্র পথে মাছ ধরার ভ্যানে করে ট্রলারটি নিরাপদে চলে আসে কক্সবাজারে। জানা গেছে, ওই ট্রলারে থাকা লোকজনের মধ্যে ছিল ডিবি পুলিশের সোর্স। গোপনে সংবাদ পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশ পরিদর্শক মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে এসআই ফারুক ইসলামসহ একদল ডিবি পুলিশ ওই ট্রলারে তল্লাশি চালায়। আটক করা হয় শহরের সমিতিপাড়ার মৃত বাচা মিয়ার পুত্র ট্রলারের মাঝি আব্দুল্লাহকে। পরে তার দেয়া তথ্য মতে গোয়েন্দা পুলিশ ট্রলারের ভেতর বিশেষ কায়দায় লুকানো অবস্থা থেকে বিপুল ইয়াবা, দুটি বন্দুক ও ৮ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। তল্লাশিকালে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে যেতে না দিলেও অদূরে থেকে তারা দেখতে পেয়েছেন ইয়াবার পরিমাণ অন্তত ৫-৬ লাখ পিস হতে পারে। স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি বলেন, ৬লাখ পিস ইয়াবার মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। তারা আরও বলেন, ডিবি পুলিশের সোর্স থাকে, তাই সোর্সমানি দিতে গেলে বেশিরভাগ ইয়াবা গায়েব করতে হয়। তারা এটাও দাবি করেন যে সোর্সমানি না দিলে ভবিষ্যতে ইনফরমেশন তথা গোপন সংবাদ পাওয়া যাবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, বড় বড় ইয়াবা কারবারি (গডফাদার) সাগরপথে হাতের কাছে অবৈধ অস্ত্র রেখে অন্তত ৫-১০ লাখ পিসের কম ইয়াবার চালান নিয়ে আসে না। একদিকে অবৈধ অস্ত্র অপরদিকে ইয়াবার চালান। এত বড় ঝুঁকি নিয়ে কেউ মাত্র ৩৫ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে মিয়ানমার থেকে রওনা দেবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে সাগরের মধ্যখানে হাত বদল হতে পারে দাবি করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিদর্শক মনিরুজ্জামান  বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ট্রলারটি তল্লাশি চালিয়ে দুটি দেশী তৈরি অস্ত্র, ৮ রাউন্ড গুলি ও ৩৫হাজার ৪৭৫ পিস ইয়াবাসহ ট্রলারের মাঝিকে আটক করা হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার গোয়েন্দা পুলিশের কিছু অসৎ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ উঠেছে। এসব পুলিশ সদস্য ইয়াবা জব্দের পর আত্মসাত ও ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার ঘটনাও আছে। গোয়েন্দা পুলিশের একশ্রেণীর অসাধু কর্তার গায়েবকৃত ইয়াবা চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে আসছে গোপনে। তিন টিমে বিভক্ত ডিবি পুলিশের সদস্যদের রয়েছে একটি সিন্ডিকেট। প্রতিনিয়ত এ সিন্ডিকেট কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক, মেরিন ড্রাইভ সড়কে যানবাহনে তল্লাশি ছাড়াও সাগরপথে ইয়াবা পাচারে লোভনীয় অফার দিয়ে সোর্স নিয়োজিত রেখে উদ্ধার অভিযানে সাফল্য পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে লাখ লাখ পিস ইয়াবা গায়েব করে আসছে। পরে ইয়াবা উদ্ধার কম দেখিয়ে আসামিদের কোর্টে চালান করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গোপন সূত্রে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ঝামেলা এড়াতে গোয়েন্দা পুলিশের এ সিন্ডিকেটকে বশে এনে টেকনাফ-উখিয়ার ইয়াবা গডফাদাররা ডিবির গাড়িতে করে ইয়াবা পৌঁছে নিচ্ছে নিরাপদ গন্তব্যে । আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ডিবি পুলিশ এ ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে এমন অভিযোগ একাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার চকরিয়া থানার কনস্টেবল মোঃ এরশাদ টেকনাফের হোয়াইক্যং বিজিবি চেকপোস্টে ৮হাজার ইয়াবাসহ সস্ত্রীক ধরা পড়ে কারাগারে গেছে। ২০১৫ সালের ২০ জুন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর লালপোল এলাকায় বিলাসবহুল এলিয়ন ব্র্যান্ডের একটি প্রাইভেট কারসহ ঢাকা এসবির এএসআই মাহফুজুর রহমানকে ৬ লাখ ৮০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল। ওই সময় মাহফুজকে গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে বেরিয়ে এসেছে ১৮ পুলিশের নাম। যাদের মধ্যে কক্সবাজার ডিবিতে তৎকালীন কর্মরত এক ওসিসহ ১১ জনকে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অপরাধে বিভিন্নস্থানে বদলিও করা হয়েছে।
এর পর পুলিশের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক প্রায় দেড় বছর ধরে কক্সবাজার ডিবি পুলিশের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি ফের চালু করা হয় ডিবি পুলিশের কার্যক্রম। কিছুদিন যেতে না যেতে বর্তমান ডিবি পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা বিতর্কিত পুলিশ সদস্য মাহাফুজের পথে পা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব পুলিশ সদস্য জড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা জব্দের পর আত্মসাত ও ইয়াবা পাচারে। গায়েবকৃত এসব ইয়াবা বিক্রি করা হয় ইয়াবা গডফাদারদের কাছে। তবে ইয়াবা পাচার রোধ ও গডফাদারদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসাইন জেলা পুলিশের ওপর কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে ইয়াবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও ইয়াবা রোধে জেলা পুলিশ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে  বৈঠক করেছে। জেলা পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তারা মরণ নেশা ইয়াবার ভয়াবহ বিস্তারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ওই বৈঠকে উখিয়া, টেকনাফ ও জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
নেতৃবৃন্দ বলেন, ঢাকা শহরে গেলে কক্সবাজারের লোক বলে পরিচয় দিলে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। অনেকে ইয়াবা এলাকার লোক বলে ঠাট্টাবিদ্রƒপ করে। তখন মাথা নিচু হয়ে যায়। বৈঠকে ইয়াবার ভয়াবহ বিস্তার রোধে সবাই এক সঙ্গে কাজ করত ঐকমত্যে পৌঁছেন। বৈঠকে পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসাইন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়ে কাজ করছে পুলিশ। ইয়াবা এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। দেশকে ইয়াবামুক্ত করা না গেলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তিনি মাদক নির্মূলে জনগণের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, জনগণ যদি সোচ্চার না হয়, পুলিশের একার পক্ষে মাদক প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তিনি মাদক প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd