ঢাকা : বুধবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • আঞ্চলিক দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে নারীরা এগিয়ে : চুমকি          তিন হাজার বিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে          সরকারের কাজ সম্পর্কে জনগণকে ধারণা দিতেই উন্নয়ন মেলা          পাবলিক পরীক্ষায় অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা : শিক্ষামন্ত্রী           সালেই বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে : মেনন          বিশ্ব ইজতেমায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে শতশত মুসুল্লি
printer
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট, ২০১৭ ২৩:২৬:৫১আপডেট : ২৭ আগস্ট, ২০১৭ ২৩:২৮:১৪
কবির দৈব
করুণাময় গোস্বামী

 

১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর রোববার বিকেলে কলকাতার এলবার্ট হলে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সমারোহে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। মানপত্র পাঠ করেন জাতীয় সংবর্ধনা সমিতির সভাপতি এস. ওয়াজেদ আলি। মানপত্রে তিনি বলেন : কবি, তোমার অসাধারণ প্রতিভার অপূর্ণ অবদানে বাঙালিকে চিরঋণী করিয়াছ। তুি তাহাদের কৃতজ্ঞতাসিক্ত সশ্রদ্ধ অভিনন্দন গ্রহণ কর।
তোমার কবিতা বিচার বিস্ময়ের ঊর্ধ্বে সে আপনার পথ রচনা করিয়া চলিয়াছে পাগলা ঝোরার জলধারার মতো। সে স্রোতধারায় বাঙালি যুগসম্ভাবনার বিচিত্র লীলা বিশ্ব দেখিয়াছে। আজ তুমি তাহাদের বিস্ময় বিমুগ্ধ কণ্ঠের অভিনন্দন লও।
বাঙলার মানস কাব্যকুঞ্জ তোমার প্রাণের রঙে সবুজ মহিমায় রাঙিয়া উঠিয়াছে। তাহার ছায়া বাঙালির পলকহারা নীল নয়নে নিবিড় স্নেহ-অঞ্জন মাখাইয়া দিয়াছে। আজ তুমি তাহাদের মুগ্ধ নয়নের নির্বাক বন্দনা গ্রহণ কর।
তুমি বাঙালির ক্ষীণকণ্ঠে তেজ দিয়াছ, মূর্ছাতুর প্রাণে অমৃত ধারা সিঞ্চন জিগীষু কণ্ঠের জয় ইঙ্গিত নত মস্তকে চয়ন করিতেছে। তাহাদের হাতের পতাকা তোমার মহিমার উদ্দেশ্যে অবনমিত হইয়াছে। জাতির এ অভিবাদনে তুমি নয়নপাত কর।কবির দৈব
তুমি বাঙলার মধুবনের শ্যাম-কোয়েলার কণ্ঠে গুলবাগিচার বুলবুলের বুলি দিয়াছ, রসালের কণ্ঠে সহকার শাখে আঙুর লতিকার বাহু বন্ধন রচনা করিয়াছ। তুমি বাঙালির শ্যামশান্ত কণ্ঠে ইরানি সাকির লাল শিরাজির আবেশ বিহ্বলতা দান করিয়াছ। আজ তোমার আসন প্রাণে, হাতের বাঁশি রাখিয়া তাহারা তোমারি সম্মুখে দাঁড়াইয়াছে। তুমি তাহাদের শ্রদ্ধা সুন্দর চিত্ত-নিবেদন গ্রহণ কর। ধুলার আসনে বসিয়া মাটির মানুষের গান গাহিয়াছ তুমি। সে গান অনাগত ভবিষ্যতের। তোমারি নয়ন সায়রে তাহার ছায়াপাত হইয়াছে। মানুষের ব্যথা-বিষে নীল হইয়াছ। সে তোমার কণ্ঠে দেখা দিয়াছে। ভবিষ্যতের ঋষি তুমি, চিরঞ্জীব মনীষী তুমি, তেমাকে আজ আমাদের সবাকার মানুষের নমস্কার।
এই মানপত্রের প্রত্যুত্তরে নজরুল একটি প্রতিভাষণ দান করেন। বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা, সঙ্গত কারণেই এস. ওয়াজেদ আলি বাঙালি জাতির প্রসঙ্গটি বারবার টেনে এনেছেন। আনা খুব স্বাভাবিকও ছিল তার পক্ষে। নজরুল তার সম,গ্র জীবন সাধনা দিয়ে তাকে রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছিলেন। সেজন্য নজরুল ইসলামকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মিলনবিন্দু ভেবে তাকে হিন্দু মুসলমানে মিলিত বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানানো হচ্ছিল। নজরুলের প্রাপ্য হিসেবে এই অনুভাবনে কোনো ত্রুটি নেই।
কিন্তু নজরুল নিজে যখন প্রতিভাষণ দিতে শুরু করলেন, তখন তিনি এক জায়গায় বললেন; বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরি অভিযান সেনাদলের তুর্য বাদকের একজন আমি এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি জানি, এই পথ যাত্রার পাকে পাকে বাঁকে বাঁকে কুটিল-ফণা ভুজঙ্গ প্রখর দর্শন শার্দুল প্রশুরাজের ভ্রুকুটি। এবং তাদের নখর দংশনের ক্ষত আজো আমার অঙ্গে অঙ্গে। তবু এই অঅমার পথ, ওই আমার গতি, এই আমার ধ্রুব। আকাশের পাখিকে, বনের ফুলকে, গানের কবিকে তারা যেন সকলের করে দেখেন। আমি এই দেশে সমাজে জন্মেছিলাম বলেই শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের সকল মানুষের। সুন্দরের ধ্যান, তার স্তবগানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম। যে কূলে, যে সমাজে যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি।
এর একটু আগে তিনি বলেছিলেন; এ কথা স্বীকার করতে আজ আমার লজ্জা নেই যে, আমি শক্তি সুন্দর রূপ-সুন্দরকে ছাড়িয়ে আজো উঠতে পারিনি। সুন্দরের ধেয়ানী দুলাল কীটসের মত আমার মন্ত্র  Beauty is truth, truth is beauty.
যথার্থ কবির মতো, বড় মাপের কবির মতো, সারা পৃথিবীর মানুষ নিয়ে ভাবেন এমন কবির মতো কথা বললেন নজরুল। সত্যি তো, কবি একটি দেশে, সমাজে ও ধর্মে জন্মগ্রহণ করেন। তার নিজের ভাষায় লেখেন। কিন্তু তিনি যদি বড় কবি হন, যদি তার ভাবনায় থাকে বৃহত্তর মানুষ তাহলে তিনি শুধু তার দেশের বা ভাষার কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকনে না। নজরুল তাই ত্রিশ বছর বয়সে জাতীয় সংবর্ধনায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, তিনি বাঙালির কবি বটে, তিনি বিশ্ব মানুষেরও কবি। তিনি বাংলায় জন্মেছেন। বাংলা ভাষায় লিখেছেন, বাঙালির জীবন সমস্যা নিয়ে। তাই বাঙালি সমাজ তাকে নিজেদের কবি ভাবছে। সে সত্যি অবশ্যি। কিন্তু তিনি ভাবছেন সব মানুষের জন্য সে কথাও স্মরণ রাখতে হবে। বাংলা ভাষায় লিখছেন বলে তিনি সব মানুষর কাছে পৌঁছছেন না, কিন্তু তার অন্তরে যে বেদনা, ভাবনায় যে বিদ্রোহ তা সব মানুষের জন্য।
আমরা বিদ্রোহী কবিতার কথা যদি ধরি তাহলে ভাবতে কষ্ট হয় না তিনি যে মাথা তুলে দাঁড়াবার আহ্বান জানালেন, বললেন : বল বীর/বল উন্নত মম শির/শির নেহারি আমারি/নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির।
সেটা বাঙালি সমাজকে নির্ভীক করে তোলার জন্য নয় শুধু, ঔপনিবেশিক শাসনের ভারে পিষ্ট জগতের সব মানুষকে জেগে ওঠার আহ্বান জানালেন তিনি। যেন কেউ নিজেকে দুর্বল মনে করে ঔপনিবেশিকতাকে স্বীকার করে না নেন। যেন ভাবেন কেউ দুর্বল নয়, কেউ অত্যাচারিত হয়ে থাকার জন্য জন্মায়নি। সবারই অধিকার আছে। শক্তি আছে মাথা তুলে দাঁড়ানোর। আর সবাই যদি একবার মাথা তুলে দাঁড়ায়, তাহলে হিমালয় নমশির হয়ে পড়বে বা কোনো বাধাই আর জনতার জয়কে ঠেকাতে পারবে না। অত্যাচারিত সমাজে বীলত্বের জাগরণ প্রয়োজন। সে সমাজ বাংলা হতে পারে, ভারতবর্ষে হতে পারে, আফ্রিকা হতে পারে। কবি বলছেন সবার জন্য। কিন্তু বাংলা ভাষায় বলছেন বলে তা বাঙালির বোধ্য হয়ে উঠছে। যদি তিরি আফ্রিকার কোনো দেশে জন্মাতেন, সে দেশের ভাষায় লিখতেন তাহলে তা সে দেশের মানুষের বোধ্য ও আদরনীয় হয়ে উঠত। বিদ্রোহীর শেষের দিকে গিয়ে তিনি যে বললেন, মহা বিদ্রোহী রুণ-ক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দ রোল/আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ/ভীম রণভূমে রহিবে না।
এখানেও কিন্তু বাংলার বা ভারতবর্ষের কথা নেই। এখানেও জগতজুড়ে যে উৎপীড়িত মানুষের ক্রন্দর রোল উঠছে, তার কথা হচ্ছে : অত্যাচারীর ভয়ঙ্করতার কথা উঠছে। এর কোনো দেশ নেই, কোনো বিশেষ মানবগোষ্ঠী এই বিদ্রোহীর লক্ষ্য নয়। ফরিয়াদ কবিতায় তিনি শুধু বাঙালির জন্য ফরিয়াদ জানাননি। তিনি বলছেন : এই ধরণীর ধূলি-মাখা তব অসহায় সন্তান/মাগো প্রতিকার উত্তর দাও আদি পিতা ভগবান।
ঈশ্বরের দান এই পৃথিবী,তা সবাই ভোগ করবে, কেউ কারো অধিকার কেড়ে নেবে না, এই হচ্ছে নজরুলের কথা। সারাবিশ্ব স্বাধীন সমাজ হবে, শোষণমুক্ত হবে, নারী তার অধিকার পাবে, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা তার অধিকার পাবে, প্রগতি হবে সমাজ নির্মাণের মূল কথা। এসবই নজরুলে আছে। তবে নজরুলকে বাংলা বা ভারতবর্ষের বাইরের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পৃক্ত করে আমরা এখনো তেমন কিছু লিখিনি। এ ব্যাপারে বাঙলায় ও নানা ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখা প্রকাশ হওয়া দরকার। নজরুলের জন্ম বাংলায়, এ তার দৈব। কিন্তু বিদ্রোহী হিসেবে তিনি বিশ্ব বিদ্রোহী, প্রগতির সংগ্রামে তিনি বিশ্ব প্রগতির স্বাপ্নিক।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাহিত্য-সংস্কৃতি পাতার আরো খবর

Developed by orangebd