ঢাকা : বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৪:৪৫:২৯
না পারছে ঠেকাতে, না পারছে ফেরাতে; ৮ লাখ রোহিঙ্গার ভারে কাবু বাংলাদেশ
কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া (কক্সবাজার)


 


ঘুমধুম রাবার বাগানে গাছের নিচে দেখা হলো হুমরা নামের ১০ বছরের এক শিশুর সাথে। সে জানালো মংডুর উদং গ্রাম থেকে তারা গত মঙ্গলবার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে গিয়ে জানালো তাদের পাড়ায় সেনাবাহিনী গুলি করে তার পিতা ছৈয়দুল্লাহকে হত্যা করে। সেনাবাহিনীর সাথে থাকা বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা তার মা জনু বেগমকে ঘর থেকে বের করে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। সে জানালো তার ১১ বছরের ভাই নজিবুল্লাহসহ চাচা আবুল কাশেম তাদেরকে সাথে নিয়ে এসেছে। ভাই-বোন দুই এতিম শিশু এক সাথে হয়ে মা-বাবার স্মৃতি ও আদরের কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে। চাচা আবুল কাশেম জানালো, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রবৌদ্ধরা তার ভাই ও ভাবিকে গুলি করে, কুপিয়ে হত্যা করে। উপায়ান্তার না দেখে পাড়ার অন্যদের সাথে গত তিন দিন আগে জান বাঁচাতে নিজ স্ত্রী তিন ছেলে-মেয়ে ও নিহত ভাইয়ের দুই অনাথ শিশুকে নিয়ে বাংলাদেশে এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে সাথে তেমন কিছু আনতে না পারায় কোন রকমে এক মুটো খাবার ছেলেগুলোর মুখে তুলে দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে আবুল কাশেমকে।
রাখাইনের বুচিডং এলাকার লংডং গ্রাম থেকে উখিয়ার বালুখালী ঢালায় নতুন অস্থায়ী ভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরে গতকাল সোমবার এসে রাস্তার ধারে আশ্রয় নিয়েছে আনোয়ারা বেগম (৩০), সাথে তিনটি ছোট ছেলে মেয়ে। দেশ, গ্রাম, মাতৃভূমি ও জীবনের অধাঙ্গ প্রিয় স্বামী ছৈয়দ হোছনকে পিছনে ফেলে আসতে হয়েছে। এখানে এসেই যেন এসবের সুখ ভুলতে পারছে না। ৯দিন পূর্বে গ্রাম ছেড়ে আসার সময় নিজের চোখের সামনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পালিয়ে আসার পথে তার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে জানালেন আনোয়ারা। এসব স্মৃতির ছেয়ে এখন আনোয়ারার সামনে প্রধান উদ্দেশ্য কিভাবে কোথায় আশ্রয় পাবে ও ছোট ছোট তিন শিশুকে কিভাবে বাচিয়ে রাখবে। এধরনের অনেক স্বামী, ভাই, মা, বাবা, বোন সহ নিকটজন হারানো পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ভারি দীর্ঘ শ্বাসে এলাকার পরিবেশ ও কেমন যেন হয়ে উঠছে।
এধরনের পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অধিকাংশ নারি ও শিশু। এসব নারী ও শিশুসহ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের গত প্রায় ৩ সপ্তাহ ধরে চরম খাদ্য, চিকিৎসা, পানীয় জল ও স্যনিটেশনের মারাত্বক সংকটে ভোগতে হচ্ছে। পূর্ব থেকে উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থান নেওয়া শরনার্থীদের সেবাই নিয়োজিত জাতি সংঘের শরণার্থী সংস্থা, শিশু তহবিল, অভিবাসন সংস্থা সহ অসংখ্য এনজিও-আইএনজিও এর কার্যক্রম থাকলেও নতুন পালিয়ে আসা আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের এসব গুরুতর সমস্যা মোকাবেলায় তেমন কোন উদ্যেগি হতে দেখা যাচ্ছে না। ফলে এসব সংকটের কবলে পড়া রোহিঙ্গাদের মাঝে ব্যাপক আকারে মানবিক সংকট দেখা দেওয়ার আসংখ্যা রয়েছে। বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে ব্লক নেতা আবুল হোসেন বলেন, গত বছরের অক্টোবরের পর থেকে আমরা এখানে আশ্রয় নিলেও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি পরিবার কিছু মাত্র ২৫ কেজি চাল ছাড়া আর কোন ধরনের সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আমরা চরম সংকটের কবলে রয়েছি।
নিরস্ত্র বেসামরিক লোকদের উপর সেনা হস্তক্ষেপ দ্রুত বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, আমি মনে করি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের এবং মিয়ানমারের দেখা সবচেয়ে খারাপ বিপর্যয়ের একটি হতে যাচ্ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৬০টি এলাকায় অন্তত ২৭শ ঘর বাড়ি অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে  ১৫জন নিরাপত্তা কর্মী, ১৪জন আরকানিজ বৌদ্ধ, ৭জন হিন্দু ও ৭জন মুসলিম হত্যার শিকার হয়েছে। একই সাথে একশ জনের বেশী আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির সন্ত্রাসী সেনা অভিযানে মৃত্যুবরণ করেছে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্র মুসলিম সন্ত্রাসীদের মধ্যে ৪৩০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে মিয়ানমার আর্মি জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৫ আগষ্টের পর থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন স্থান দিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সে দেশের সেনাবাহিনী ও উগ্রবৌদ্ধ, অমুসলিমদের অত্যচার নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তত তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। তবে উখিয়া সদর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৩৯ কি:মিটার এলাকা জুড়ে ও পার্বত্য চট্টগ্রামের নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম জলপাই তলী, তুমব্রু পশ্চিম কুল, তুমব্রু কোনারপাড়া, বাইশপাড়ি সহ বিভিন্ন এলাকায় আরো প্রায় ৫০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে। যেগুলোর ¯্রােত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বলে স্থানীয় লোকজন দাবি করছে। এছাড়াও সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে গতকালও ব্যাপক হারে পায়ে হেঁটে, বিভিন্ন যানবাহন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে।
উখিয়া ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ গিয়াস উদ্দিন মিন্টু, উখিয়া আওয়ামী লীগ দপ্তর সম্পাদক নুরুল হক খান সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশিল সমাজের লোকজনের দাবি যে হারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে এবং তা অব্যহত রয়েছে এসব দেখে মনে হচ্ছে প্রায় ৪লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন সূত্র ও তথ্যমতে ৪/৫ লক্ষের মত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। সব মিলিয়ে ৮ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা সর্বত্রসহ পুরো কক্সবাজার জেলা, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলা শহরে এসব রোহিঙ্গারা বেশি করে অবস্থান নিচ্ছে। সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এসব রোহিঙ্গা এতদঞ্চলে নানা ধরনের গুরুতর সমস্য সৃষ্টি করে জনবিস্ফোরণ ঘটানোর আসংখ্যা করছেন স্থানীয় সচেতন লোকজন। তাদের মতে, অধিক জনসংখ্যার ভারে জজরিত বাংলাদেশের পক্ষে আরো অতিরিক্ত অতিদরিদ্র ও অনগ্রসর অঞ্চলে অতিরিক্ত ৮ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভার আদৌ সইবার ক্ষমতা বাংলাদেশের আছে কিনা।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd