ঢাকা : মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৩:১৪:৩৩
সোনার দেশ গড়তে বিন্দুমাত্র সামিল হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো : ডা. মো. লিয়াকত আলী খান


 

ডা. মো. লিয়াকত আলী খান; দেশের একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক। তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সততা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে চিকিৎসা খাতের উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। তিনি চিকিৎসক সমাজের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রতিশ্রুতিশীল একজন চিকিৎসক হিসেবে সমাদৃত। তিনি শৈশব থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে সব সময় নিয়োজিত রেখেছেন। দেশের অবহেলিত-বঞ্চিত, পীড়িত ও হতদরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবায় তিনি নিবেদিতপ্রাণ। ডা লিয়াকত আলী খান একজন সৃজনশীল মানুষ। বৃহত্তর চট্টগ্রামে চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এক মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মনে করেন- এগিয়ে যেতে হবে বহুদূর। এমন একদিন আসবে এদেশের কোনো মানুষ বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করবে না। সবার মুখে হাসি ফুটাতে হবে; এজন্য সাধ্য অনুসারে যা যা করা দরকার তার সবটুকু করে দেখাতে চান তিনি।
 
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার আলমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মেহের আলী খান ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও আদর্শ শিক্ষক, মাতা আছিয়া খাতুন সুগৃহিণী। এই গুণী চিকিৎসক চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি মাটি ও মানুষের ভালোবাসার শিকড়ের টানে যে গ্রামবাসীর ভালোবাসায় বড় হয়েছেন সেই নাগরপুরের আলমপুর (টাঙ্গাইল) এলাকার জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের তিনি প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা। তিনি পিতা মরহুম মেহের আলী খানের নামে উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। এছাড়াও নিজ গ্রামে প্রাইমারি স্কুল, মাদ্রাসা, কবরস্থান, ঈদগা মাঠ, কমিউনিটি ক্লিনিক, পোস্ট অফিসসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের তিনি এবং তার পরিবার আর্থিকভাবে সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। তিনি ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন এবং প্রাইভেট প্র্যাকটিসের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। স্বাধীনচেতা, আত্মপ্রত্যয়ী তরুণ চিকিৎসক ডা. মো. লিয়াকত আলী খান সরকারি চাকরির প্রত্যাশা না করে যুগোপযোগী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান করার সুদৃঢ় সংকল্প নেন। ১৯৯৪ সালে ব্যাংকক মাহিদুল ইউনিভার্সিটি হতে ট্রপিক্যাল মেডিসিনের উপর ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সর্বপ্রথমে তিনি চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান এলাকায় আধুনিক ডায়াগনস্টিক বেলভিউ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর বেলভিউ ইউনিট-২ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম শহরের জিইসি ও আর নিজাম রোডে তার সহযোগিদের নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের ‘রয়েল হাসপাতাল’প্রতিষ্ঠা করেন। এই হাসপাতালের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দীর্ঘদিন পরিচালনা করেছেন। আশার কথা, অল্প কিছু দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে আরো একটি আন্তর্জাতিকমানের ‘বেলভিউ হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক লিমিটেড’ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করবে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় অত্যাধুনিক ‘রয়েল ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড’-এর শুভ সূচনার প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার সকল কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে। উল্লেখ্য, এতে প্রায় ৫শ’ লোকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। রয়েল ফার্মাসিউটিক্যাল তিনি প্রায় ১০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম শহরে সীমিত আকারে শুরু করেছিলেন। আগামীতে এই প্রতিষ্ঠান বৃহৎ পরিসরে চট্টগ্রামে নবদিগন্তের সূচনা করবে।সোনার দেশ গড়তে বিন্দুমাত্র সামিল হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো : ডা. মো. লিয়াকত আলী খান
 
১৯৮৮ সালে ‘মার্শাল কম্পিউটার অ্যান্ড ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম (বিডি লিমিটেড)’ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তিনি প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন। কম্পিউটার প্রশিক্ষণে এ প্রতিষ্ঠান যুগোপযোগী ভূমিকা পালন করছে। ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষক সিটি কলেজের প্রিন্সিপাল কাউছার আলী ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের প্রিন্সিপাল হোসেন আলীকে নিয়ে তিনি এডুকেশন ফান্ড গঠন করেন। চট্টগ্রাম ন্যাশনাল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের (বর্তমান ক্যাম্পাস চান্দগাঁও) তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা। তিনি একদিন ভাবেন- আমার যদি হার্ট অ্যাটাক হয় তাহলে কি হবে? এই চট্টগ্রামে যারা বসবাস করছেন, তাদের কারো যদি হার্ট অ্যাটাক করে তাহলে কোথায় যাবেন? যারা সম্পদশালী তারা হয়তো দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারছেন। যারা অসচ্ছল বা অসহায় তাদের কি হবে? হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা করালে আরোগ্য লাভ সম্ভব। চট্টগ্রাম থেকে হার্ট অ্যাটাকের রোগী যদি ঢাকায় নিয়ে যাওয়া ব্যয় বহুল। এই অভাব দেখে তিনি তাঁর সহযোগীদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের কার্ডিওলজি হাসপাতাল করার; এই হাসপাতালটি ‘ম্যাক্স হাসপিটাল’ নামে পরিচিত। যেখানে ICU, CCU, Cathlab, NICU ডায়ালাইসিস ইত্যাদি থাকবে, সব কিছু নিয়ে এই ম্যাক্স হাসপাতালের যাত্রা শুরু হলো। ২০১৪ সালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম চট্টগ্রামে এসে ম্যাক্স হাসপাতালের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
 
ডা. লিয়াকত আলী খান চিকিৎসা ও সমাজ সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ‘নেলসন ম্যান্ডেলা শান্তি পদক ২০১৫’ অর্জন করেছেন; পরবর্তীতে মাদার তেরেসা পদক ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক পদকে সম্মানিত হয়েছেন। ডা. মো. লিয়াকত আলী খানের সহধর্মিণী গুলরুখ বানু তার জীবন সংগ্রামে উৎসাহদায়িনী। স্বামীর সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ডা. লিয়াকত আলীর ছোট্ট সাজানো সংসারে দু’পুত্র; বড় পুত্র সাজিদ সাদাত খান অঝর বিবিএ শেষ করে এমবিএ অধ্যয়নরত এবং কনিষ্ঠ পুত্র শামীম সাফখাত খান অনিম এমবিবিএস অধ্যয়নরত। সম্প্রতি টাইমওয়াচ-এর চট্টগ্রাম প্রতিনিধির কাছে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডা. লিয়াকত আলী খান ব্যক্তিগত জীবন, সাফল্য এবং চিকিৎসাসেবা বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। এখানে তা উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিপ্লব বিজয়
 
টাইমওয়াচ : শুরুতেই আপনার হাসপাতালের সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইছি।
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : আমার হাসপাতালে কার্ডিওলজি, CCU এবং Cathlab দিয়ে প্রথম যাত্রা শুরু করি। ২০১৪ সালে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এই হাসপাতালের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পর্যায়ক্রমে ICU, CCU, Cathlab, NICU ডায়ালাইসিস, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি বিভাগের কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি চালু করেছি। এই হাসপাতালে বিশেষ কার্ডিয়াক বিভাগ যেটা CRT-PCRD ঢাকার পর এখানে হয়েছে। প্রায় সময় বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ প্রফেসররা এখানে আসেন চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য এবং তারা বিনা মূল্যে আউটডোর রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেন। আমরা চেষ্টা করছি, এই হাসপাতালে যে সব রোগী ভর্তি হবেন, মৃত্যু থাকলে আমরা হয়তো বাঁচাতে পারবো না; কিন্তু চেষ্টা করবো- আমাদের কোনো ধরনের অবহেলা যেনো না হয়। সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে ম্যাক্স হাসপাতালের যাত্রা শুরু করেছি। কতটুকু সফল হতে পারবো জানি না, তবে চিকিৎসা সেবার ব্রত নিয়ে আমরা চেষ্টা করে যাবো।
 
টাইমওয়াচ : দেশে ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে অনেকে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন; এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাবের বিষয়ে অনেকে বলেন। আবার কিছুসংখ্যক যে নেই তাও নয়। সরকারি হাসপাতাল দিয়েতো পুরো চিকিৎসা সেবা মেটানো সম্ভব নয়। তাই আমরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল করেছি। ঢাকায়ও বেসরকারি হাসপাতাল আছে, চট্টগ্রামেও একটার পর একটা বেসরকারি হাসপাতাল হচ্ছে। কিছু কিছু সমস্যা থাকবে। প্রতিষ্ঠান থাকলে সমস্যাও থাকবে। আমি পুরোপুরি মনে করি না যে, নেতিবাচক কোনো কারণে এসব প্রচারণা হচ্ছে। আপনি সরোজমিনে পরিদর্শন করে দেখুন, বর্তমানে যেসকল রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রায় ৯৮ শতাংশ রোগী আমাদের চিকিৎসা সেবায় সন্তুষ্ট।সোনার দেশ গড়তে বিন্দুমাত্র সামিল হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো : ডা. মো. লিয়াকত আলী খান
 
টাইমওয়াচ : আপনার হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান বিষয়ে বলবেন কী?
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : আমার হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে বলতে চাই, যতটুকু সামর্থ্য আছে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। এ হাসপাতালে পরিবেশগতভাবে সীমিত অবকাঠামোর মধ্যে তাল মিলিয়ে চিকিৎসা সেবা চালাতে হয়, যে কারণে আমরা চেষ্টা করছি অপটিমাম সার্ভিস দিতে এবং চেষ্টা করি আইসিওতে একজন রোগী ভর্তি হলে ওই রোগীর যদি মৃত্যু না থাকে আল্লাহ তা-আলা যদি হায়াত রাখেন আমরা তার আরোগ্য লাভের চেষ্টা করবো, যেন কোনো ত্রুটি না হয়। একটি উদাহারণ দিতে চাই, জনাব মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী সাবেক মন্ত্রী মরহুম জহুর আহমেদ চৌধুরীর বড় ছেলে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সহ-সভাপতি, তিনি আইসিইউএম এর রোগী; হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এ হাসপাতালের আইসিইউ টিম রাত ৩.৩০ মিনিট পর্যন্ত তাকে ‘সিপিত আট’ দিয়ে নানা কিছু দিয়ে প্রেসার ওঠার পর আশাবাদী হয়ে উঠি এবং আল্লাহর রহমতে তাকে আমরা সুস্থ করে তুলতে সক্ষম হয়েছি। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।
 
টাইমওয়াচ : অভিযোগ রয়েছে, দেশে ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যয়বহুল; এটা আপনি কীভাবে দেখেন?
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়বহুল কেন বলে আমি জানি না। তারা কোন মানদণ্ডে বিবেচনা করছেন। দেশের গ্রামীণ মানদণ্ডে যদি বিবেচনা করে তাহলে বলবো- সত্য। আর যদি দেশের বাইরে চিকিৎসা সেবার মানদণ্ডে বিবেচনা করে তাহলে বলতে হয়Ñ ব্যয়বহুল নয়। এ কথা মোটেও সত্য নয়। একজন রোগীর সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যে সব ঔষধ লাগবে, আমার হাসপাতালেও সেই ঔষধ লাগে। আমরা চিকিৎসা ফি আর কিছু সিট ভাড়া নিয়ে থাকি অন্যান্য তেমন কোনো বেশি ফি রোগীদের কাছ থেকে এ হাসপাতাল আদায় করে না। এ হাসপাতালে যে সকল রোগী ভর্তি হন, তারা ভালো চিকিৎসা সেবা নিয়ে চলে যান। তবে এটা ঠিক, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের চিকিৎসার খরচ অনেক কম। ঢাকায় এই মানের হাসপাতালগুলোতে একটা ডেলিভারি রোগীর জন্য খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। আর আমার হাসপাতালে ব্যয় মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। যেটা সরকারি হাসপাতালে ডেলিভারি করলেও খরচ লাগে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। সুতরাং বলতে চাইÑ আমার মালিকানাধীন হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়বহুল নয়। ঢাকায় অনেক হাসপাতাল আছে যেগুলোতে চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। আমি সব সময় চিন্তা করি, চিকিৎসা খরচ কম নিয়ে রোগীদের উন্নতমানের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য যেনো রোগীরা বলতে পারেন চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতাল রোগীদের ভালো চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য একমাত্র ভরসা।
সোনার দেশ গড়তে বিন্দুমাত্র সামিল হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো : ডা. মো. লিয়াকত আলী খান
টাইমওয়াচ : সামাজিক দায়বদ্ধতায় আপনার অংশগ্রহণ সম্পর্কে বলবেন কী?
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : সামাজিক দায়বদ্ধতা বলতে আমি বুঝি প্রতিটি মানুষ সচেতন, যারা শিক্ষিত মানুষ তাদের প্রত্যেকের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। প্রতিটি মানুষ যারা স্বাবলম্বী তারা যেনো নিজেদের জন্য না ভেবে, গরিব অসহায় মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু করা উচিত। এই দায়বদ্ধতার প্রেক্ষিতে আমি এই প্রতিষ্ঠানগুলো করি। আমি ভবিষ্যতে আরো প্রতিষ্ঠান করবো ইনশাআল্লাহ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সোনার বাংলা, সোনার মানুষ, সোনার দেশে পরিণত করার জন্য বিন্দুমাত্র যদি সামিল হতে পারি তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করবো। আমরা চেষ্টা করছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করার জন্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখেছেন, আমরা যারা বিভিন্ন পেশায় আছি, তারা সোনার বাংলা বাস্তবায়নে প্রাণপণ চেষ্টা করবো। আমি হয়তো বৃহৎ পরিসরে পারবো না, যেহেতু আমি একজন চিকিৎসক। আমার অবস্থান থেকে নতুন কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি তা দ্রুত কার্যকর করবো। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সামাজিক দায়বদ্ধতা মনে করে গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন উপজেলায় ম্যাক্স হাসপাতালের উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে গ্রামের মানুষদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি। এই কার্যক্রম আমরা অব্যাহত রাখবো।
 
টাইমওয়াচ : আপনার ভবিষ্যৎ কর্ম-পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইছি।
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ রাখে চট্টগ্রামবাসীর জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবো। এই ক্যান্সার হাসপাতালে অসচ্ছল অসহায় রোগীদের যাতে চিকিৎসাসেবা দিতে পারি। প্রতিনিয়ত ক্যান্সার রোগ বেড়েই চলেছে। আমাদের কাছে যখন ক্যান্সার রোগী আসে, আমি নিজেও অসহায় হয়ে পড়ি। কোথায় এই রোগীকে পাঠাবো? চট্টগ্রামে কোনো ক্যান্সার হাসপাতাল নেই। আমার সহযোগীদের নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্যান্সার হাসপাতাল অবশ্যই করতে হবে। ক্যান্সার রোগ হলে এ দেশের মানুষ যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল তারা সিঙ্গাপুর, ভারত, ব্যাংকক যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে; ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা দেশের বাইরে করানো ব্যয়বহুল। ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা স্বল্প খরচে কীভাবে গরিব অসহায় রোগীদের দেওয়া যায় সেই লক্ষ্য নিয়ে ইনশাআল্লাহ চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবো। চট্টগ্রামের মানুষকে যেনো ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা করাতে দেশের বাইরে যেতে না হয়। ক্যান্সার হাসপাতালের জন্য দরকার উন্নতমানের মেশিন। আমি আমার সহযোগীদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি চট্টগ্রামে অবশ্যই একটা ক্যান্সার হাসপাতাল করতে হবে। এই হাসপাতালে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পারে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ওখানে যদি ক্যান্সার রোগের জন্য উন্নত মানের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় তাহলে আমরা যারা চট্টগ্রাম শহরে আছি তারা কেন পারবো না! কার্ডিওলজির ব্যাপারে আমরা এই সেক্টরটা আরো বড় পরিসরে করতে যাচ্ছি। কার্ডিয়াক চিকিৎসায় ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে যে মানদণ্ডে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় আমরাও সেই মানদণ্ডে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি। আমার হাসপাতালে আধুনিক ক্যাথলেড মেশিন আছে, আমরা আশা করছি, পূর্ণাঙ্গ কার্ডিয়াক সার্জারি হবে, ক্যাথলেড থাকবে; রোগীদের যেনো অন্য কোথাও পাঠাতে না হয় এই পরিকল্পনা আছে। আমার আরো একটি বিশেষ পরিকল্পনা আছে, বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ; এ দেশের নার্সিং সেক্টর বেশ সংকটে; কিছু দিন আগে সরকারিভাবে বেশ কিছু নার্স পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। আমার প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারিভাবে ৬০ জন নার্স পোস্টিং নিয়ে চলে গেছেন। নার্সের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তাতে ইচ্ছে আছে একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট করা, যাতে প্রতিনিয়ত ওয়ার্ল্ড ক্লাস নার্স তৈরি করতে পারি। আমি আমার সহযোগীদের নিয়ে চট্টগ্রামে একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট করবো।
সোনার দেশ গড়তে বিন্দুমাত্র সামিল হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো : ডা. মো. লিয়াকত আলী খান
টাইমওয়াচ : প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল স্বপ্ন বাস্তবায়নে যে অর্জন, এই অর্জনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন। বর্তমানে আপনার প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ লোকের কর্মসংস্থান করতে পেরেছেন?
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল স্বপ্ন বাস্তবায়নে যে অর্জন, এই ডিজিটালাইজেশন হওয়ায় বর্তমানে দেশে আন্তর্জাতিকমানের হাসপাতাল করার আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ডিজিটালাইজেশনের সুবাদে এ রোগীদের দ্রুত রোগের রিপোর্ট দিতে পারছি। বর্তমানে আমার এ প্রতিষ্ঠানে ৫শ’ ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। আমাদের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ৮শ’ ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজে নিয়োজিত আছেন। ইনশাআল্লাহ আমি আরো একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি চালু করবো। ওই প্রতিষ্ঠানে ৫শ’ থেকে ৬শ’ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করবেন। আমরা সর্বমোট ১ হাজার ৫শ’ থেকে ২ হাজার জন লোকের কর্মসংস্থান ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। আমি বলতে চাইÑ সমাজে যারা সচেতন, বিত্তবান ব্যক্তি আছেন, তারা যদি এগিয়ে আসেন তাহলে এ দেশের অর্থনৈতিক চিত্র পরিবর্তন করা সম্ভব। যারা সমাজে চিকিৎসাসেবা পেশায় আছি অল্প টাকা দিয়ে রোগী দেখি। যাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে অর্থ আছে তারা কেউ এই সেক্টরে এগিয়ে আসছেন না। এই সেক্টরে ব্যবসার দিক বিবেচনা না করে সেবার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। সবার দৈনন্দিন জীবনে চিকিৎসা দরকার। অন্যদিকে যাদের আত্মীয়-স্বজনসহ নিজের পরিবারের জন্য চিকিৎসা দরকার কেন তারা এই সেক্টরে এগিয়ে আসছে না? এখন অনেকের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। আমি যাদেরকে বলছি তারা সবাই সহযোগিতা করবেন বলেছেন। তাদের মধ্যে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, রাউজানের এমপি মহোদয় এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ.জ.ম নাসির, চট্টগ্রাম নগর উন্নয়ন চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ও চট্টগ্রাম দামপাড়া ২৮ নং ওয়ার্ডের কমিশনার গিয়াস উদ্দিন ভাই বলেছেন আপনারা সেবার জন্য যা করতে চান, আমরা সার্বিক সহযোগিতা করে যাবো। একথা শুনে আমি আমার সহকর্মীদের নিয়ে চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিকমানের ক্যান্সার হাসপাতাল করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ সফল হবো।
 
টাইমওয়াচ : চিকিৎসাসেবার জন্য আপনি সরকারের কাছে কী ধরনের সহযোগিতা আশা করেন?
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : আমি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করছি। সরকার যদি এই সেক্টরকে ব্যবসায়ী দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সেবামূলক দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখতো তাহলে আমরা এই প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে আরো একধাপ এগিয়ে যেতাম। পাশাপাশি দেশের শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারতাম।
 
টাইমওয়াচ : ডিজিটাল স্বাস্থ্য সেবায় জনসাধারণের জন্য আপনার হাসপাতাল কী ধরনের ভূমিকা পালন করছে?
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : জনসাধারণকে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সাথে আমরাও সামিল হতে চাই। আমরা ইতোমধ্যে রোগীদের এমআরআই রিপোর্টের জন্য যদি কোনো রোগীর স্বজনরা বলে যে, আমার রিপোর্টটি অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বাইরে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থেকে পরীক্ষা করে নিয়ে এসে তা আমরা কয়েক ঘন্টার মধ্যে ডেলিভারি দিতে পারি। আমরা অনেক রির্পোট অনলাইনে করে নিয়ে এসে রোগীদের সেবা দিতে পারছি। হঠাৎ যদি কোনো ব্যক্তির হার্ট অ্যাটাক হয় তাকে দ্রুত চিকিৎসা সেবা দিতে পারছি।
সোনার দেশ গড়তে বিন্দুমাত্র সামিল হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো : ডা. মো. লিয়াকত আলী খান
টাইমওয়াচ : এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ; বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময় আপনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্মৃতির কথা বলুন।
ডা. মো. লিয়াকত আলী খান : মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ যখন সংঘটিত হয়, তখন আমার বয়স ৮/৯ বছর। আমি গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল নাগরপুরে ছিলাম। আমার বাড়ির পাশে নদী দিয়ে যখন মিলিটারিরা যেতো তখন আমরা দৌড়ে যেতামÑ দেখতাম তারা কীভাবে যাচ্ছে। যুদ্ধের সময় যোগাযোগের মাধ্যম ছিল রেডিও; তখন আমরা সবাই কান পেতে শুনতাম কোথায় কত জন মিলিটারি মারা গেছে। এই খবর শুনে আমার চাচাতো ভাইদের সঙ্গে নিয়ে উল্লাস করতাম। তখন চিন্তা করতাম আমার চাচারা যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন তাঁরা বেঁচে আছেন কী-না? মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার একটি কথা মনে আছে, ১৪ ডিসেম্বর আমরা স্কুলের মাঠে খেলা করছিলাম তখন বিকাল ৪টা কী ৫টা। ওই সময় দেখি পাকিস্তানি মিলিটারিরা নদীর ধারে হেঁটে যাচ্ছে। তারা আহত অবস্থায় যাচ্ছে কেউ খোঁড়া, কেউ ল্যাংড়া। আমরা পরামর্শ করলাম যারা আহত তাদেরকে পিছন দিক থেকে আঘাত করবো। আমরা দু’টি দলে বিভক্ত হলাম। ধীরে ধীরে তাদের পেছনে পেছনে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম পেছন দিক থেকে দু’জন মিলিটারিকে আটক করবো। কাছাকাছি গেলাম। পরক্ষণে দেখি সবাই এমবুশ নিয়ে ফেলেছে। কীভাবে বুঝতে পারলো জানি না। আর আমরা সাহস করিনি। ভয়ে সবাই পালিয়ে গেলাম। এ ঘটনা আমার এখনো মনে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসতেন তাদের জন্য খাবার তৈরি করতাম। তাদেরকে পানি, মুড়ি, গুড়, চিড়া খেতে দিতাম, তাদের পাশে বসে জিজ্ঞাসা করতাম কোথায় কতজন মিলিটারি মারা গেছে, কয় জনকে ধরে ফেললেন? মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনতাম, খুব আনন্দ লাগতো। তখন রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর নাম শুনলেই আমরা লাফিয়ে উঠতাম। আমি প্রাথমিক শিক্ষার্থী ছিলাম। রেডিওতে শুনতাম ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’। আমার মনে আছে, বাঁশ লাঠি নিয়ে সবাই প্রস্তুত ছিলাম। এই অনুভূতি এখনও আমার মনে পড়ে। যখন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনি তখন গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যেতো। কী আমাদের নেতা! আমাদের বয়সটা কেন এতো কম ছিল? কেন আমরা যুদ্ধে যেতে পারলাম না। এখন খুব কষ্ট লাগে, আমার বয়স যদি বেশি হতো আমি যুদ্ধ করতে পারতাম। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এই কথাগুলো যখন কোনো বীরমুক্তিযোদ্ধা বলেন তখন নিজের কাছে খুব কষ্ট লাগে, ভাবতাম যুদ্ধের সময় বয়সটা কেন এতো কম ছিল! আমি এক মহৎ অর্জন থেকে বঞ্চিত হলাম।
তথ্য সংগ্রহে : নুরুল ইসলাম (ইরান)
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাক্ষাৎকার পাতার আরো খবর

Developed by orangebd