ঢাকা : বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১১:২১:২০আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১১:৩০:২১
রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বাড়ছে রোগ, জীবাণু ছড়ানোর শঙ্কা
কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া (কক্সবাজার)
নোংরা পানিতে গোসল করছে


 


মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে এসে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা শরণার্থীরা মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। দিন যত ঘনিয়ে আসছে কষ্টের ভার প্রকট আকার ধারণ করছে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটছে বেশিরভাগ রোহিঙ্গার। তাদের সঙ্গে থাকা শিশুদের অবস্থা আরো ব্যাপক হুমকি হয়ে পড়ছে। এদিকে রবিবার রাত থেকে শুরু হওয়া মৌসুমী বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায় নারী ও শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ দিতে না পারায় অকালে মৃত্যুর মুখে পতিত হতে পারে এই অনাথ শিশুদের জীবন।
এদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের জন্য বিশেষ ইপিআই কর্মসূচি চালু করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। গতকাল থেকে উখিয়া-টেকনাফ-নাইক্ষংছড়ি উপজেলা রেজিস্ট্রার ও আনরেজিস্ট্রার এবং রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদেও জন্য এই কর্মসূচি চালু করেছে। উখিয়া উপজেলার সবকয়টি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের ২৪টি ইপিআই বিশেষ সেন্টারে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এই কর্মসূচি। রোহিঙ্গা শিশুদের হাম, পোলিও, রুবেলা ও ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে। রোহিঙ্গা মায়েরা না খেয়ে দীর্ঘপথ হেঁটে বাংলাদেশে আসায় তাদের অবস্থাও গুরুতর। এ কারণে শিশুকে বুকের দুধ দিতে না পারায় শিশুদের অবস্থা হাড্ডিসারে পরিনত হয়েছে। হাজার হাজার শিশুর শরীর জ্বরে পুড়লেও কোলে নিয়ে বসে থাকা ছাড়া মায়েদের কিছু করা নেই। তার ওপর সবখানে পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া, আমাশয়, নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ায় শিশুদের অবস্থা আরো চরম আকার ধারণ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকলেও বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য এ সেবা নিতান্তই অপ্রতুল বলে জানা গেছে।
গতকাল সকাল থেকে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালী ও হাকিমপাড়াসহ কয়েকটি স্থায়ী ও অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে দেখা যায়, মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে দুই লাখের বেশিই শিশু, যা এবার আসা মোট শরণার্থীর ৬০ শতাংশ। এদের মধ্যে অনেক শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে। জরুরি ভিত্তিতে এসব শিশুর সাহায্যের দরকার। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া দুই লাখ রোহিঙ্গা শিশুর ঝুঁকিতে থাকার কথা জানিয়েছে।
জাতিসংঘের এ সংস্থার শিশু সুরক্ষা বিভাগের প্রধান জ্যঁ লিবি জানিয়েছেন, এরই মধ্যে ঢাকা থেকে ইউনিসেফের সহায়তার জরুরী সামগ্রী কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে ক্যাম্পগুলোয় সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা দরকার। উখিয়ার কুতুপালং রেজিস্ট্রার ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার মধ্যেও এমন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে দেখা গেছে রোহিঙ্গা নারীরা খাল-বিল ও নালার জমাটবাঁধা পরিত্যক্ত অপরিচ্ছন্ন পানিতে তাদের ব্যবহৃত কাপড়-চোপড় ও থালাবাসন পরিষ্কার করছেন। আবার একই পানিতে মলমূত্র ত্যাগ করছেন। শরণার্থী শিবিরগুলো প্রতিদিনই বড় হচ্ছে এবং সেখানে সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পানিবাহিত কোনো রোগ যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য চেষ্টা করা হলেও এত এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে বহু নারী, শিশু ও বৃদ্ধ অল্প জায়গার মধ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে ক্যাম্পের শিশুরা পানিবাহিত রোগের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার রবিউর রহমান রবি জানান, অপরিচ্ছন্ন পানি ব্যবহার করলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাছাড়া বিশুদ্ধ পানির অভাবে শিশুরা পানিবাহিত রোগে আকান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ডায়রিয়া ও আমাশায় আক্রান্ত হয়ে উখিয়া হাসপাতালে আসা প্রতিদিন অসংখ্য রোহিঙ্গা শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বালুখালী হাতির ডেরা ও তাজনিরমার খোলা এলাকায় আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, পার্শ্ববর্তী গ্রামের বসতবাড়িতে টিউবয়েল থাকলেও রোহিঙ্গাদের চাহিদা বেশি থাকার কারণে ঠিকমত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গা নারীরা খাল ও ছরার পানি দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সারছেন। এর ফলে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে হচ্ছে তাদের।
একই বস্তির আমেনা বেগম জানান, পানি ও খাবারের অভাবে তার পরিবারে চার শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এ সময় তিন বছর বয়সী শিশু আছিফাকে নিয়ে মা শরিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে জানান, তিন দিন ধরে তার মেয়ে জ্বর ও ডায়েরিয়ায় ভুগছেন। স্থানীয় বেশ কয়েকজন ওই মহিলাকে চিকিৎসার জন্য টাকা দিতে দেখা গেছে। এছাড়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নে আশ্রয় নেওয়া প্রতিটি বস্তিতেও এমন চিত্র দেখা গেছে।
এদিকে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা বাদে, সবচেয়ে বড় যে সমস্যায় ভুগছে রোহিঙ্গারা তা হল ত্রাণের অপ্রতুলতা। ইতিমধ্যে প্রায় চার লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা, তবে এদের জন্য যে পরিমান ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে তা অনেক কম। বিভিন্ন সংগঠন থেকে ত্রাণ ততপরতা চালান হলেও তা পোষাচ্ছে না। মালয়েশিয়া প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন ত্রাণ সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া তুরস্ক সরকারের পাঠানো এক হাজার টন ত্রাণ কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বিতরণ করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের দেখে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ান। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ১০ হাজার টন ত্রাণ পাঠানোর কথা রয়েছে তুরস্কর। ডেনমার্ক সরকার জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)-কে ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ডব্লিউএফপি ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর মাধ্যমে ডেনিস ত্রাণ সহায়তা শরণার্থীদের কাছে পৌঁছাবে। ইরান থেকেও খুব শিগগিরই ত্রাণ পাঠানোর কথা রয়েছে। কিন্তু এগুলো যথাযথভাবে বণ্টন না হলে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সমস্যা দূর হবে না। অনেক এইসব ত্রাণ সহয়তা লুটপাট হতে পারে বলেও শঙ্কায় রয়েছেন।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd