ঢাকা : সোমবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হবে : স্থানীয় সরকার মন্ত্রী          রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান যে মিয়ানমারকেই করতে হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী          উচ্চ শিক্ষা বিশ্বমানে উন্নয়নে কাজ করছে সরকার : শিক্ষামন্ত্রী          একটির বেশি বাড়ি নয়, গ্রামেও বাড়ি করতে অনুমতি লাগবে          আমরা প্রমাণ করেছি, আমরা পারি : প্রধানমন্ত্রী
printer
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১০:৪১:৫৩
একমুঠো ভাত, পানি ও মাথা গোঁজার এক টুকরো ত্রিপল চায় ওরা
এম বেলাল উদ্দিন, উখিয়া (কক্সবাজার)


 


শনিবার ১৬ সেপ্টম্বর দুপুর ১২টা ছুঁই ছুঁই উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ছবুল্লাকাটা এলাকার বিশাল মাঠে রাউজান থেকে ত্রাণবাহী গাড়ি পৌঁছলো। গাড়ীতে ত্রাণ কিংবা যাত্রী মুখ্য বিষয় নয়, রোহিঙ্গা মুসলমানরা বলছে খাবার দেন, পানি দেন, টাকা দেন প্লাস্টিকের ত্রিপল (তেরপাল) দেন। গাড়ি মাঠে দাড়ানোর দশমিনিটের মধ্যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ও শিশু ত্রাণবাহী গাড়ীকে ঘিরে ফেলল। ত্রাণ নিয়ে যাওয়া সেচ্চাসেবীরা দেওয়ার আগেই রোহিঙ্গা মুসলমানরা কার আগে কে নেবে সে প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হয়। হাজারো মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অনেক সময়ের ব্যাপার হলেও রাউজান থেকে ত্রাণ নিয়ে যাওয়া এবং কক্সবাজার শহরে সাত হাজার মানুষের জন্য বাবুর্চি দিয়ে তৈরি করা চিকেন বিরানী দশ মিনিটে খালাছ। ত্রাণ নিতে গিয়ে অনেকেই ঝগড়াই লিপ্ত হতে দেখাগেছে। ত্রাণ নিতে আসা কোলে বাচ্চা নেওয়া মহিলা জাবেদা বেগম অভিযোগ করে বলেন এক হাতে বাচ্চা আরেক হাত দিয়ে ত্রাণ নিতে গিয়ে ঠেলাঠেলিতে তিনবার মাটিতে পড়েগেছি, আমি একবারও ত্রাণ নিতে পারিনি। রাউজান থেকে যাওয়া ত্রাণ দলের আলহাজ্ব আবু বক্কর,হাজী মোহাম্মদ শফি, মোসলেম, জিয়াউর রহমান, কামরুল ইসলাম বাবু, আহমদ সৈয়দ বলেন, ত্রাণ দিতে গিয়ে হিমশীম খেয়েছি, অসহায়দের চিত্র দেখে মনে হয়েছিল তারা অনেকদিনের উপবাস। এদিকে খাবার দেওয়ার সাথে সাথে অনেকেই ট্রাকের পাশেই খাবার খেতে বসে গেছে। লক্ষিপুর থেকে ত্রাণ নিয়ে আসা চিরা, চিনি, পানির বোতল সেচ্চাসেবিদের দিতে হয়নি। রোহিঙ্গা অসহায় নারী পুরুষরা ত্রাণবাহী গাড়ী থেকে নিয়ে পেলেছে। শনিবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার নারী পুরুষ খাদ্য ও পানির জন্য হাহাকার করছিল। সেদিনের খড়া রোদ্রে ত্রাণ দিতে ও নিতে আসা সকলেই যেন তীব্র তাপদাহে চটপট করছিল। ছুবল্লাকাটা এলাকায় যেখানে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে সেখানে নিজের শরীরকে তীব্ররোদ থেকে বাচাঁনোর জন্য গাছের ঢালও পাওয়া যায়নি। সরেজমিন দেখাযায় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার অসহায় রোহিঙ্গারা প্রয়োজনীয় খাদ্য বাসস্থান ও চিকিৎসা সেবা না পেয়ে কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের দুই ধারে প্রায় বিশ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থান নিয়েছে। এদিকে রাস্তার পাশে ,জমিনে ,পাহাড়ের ঢালুতে ছোট ছোট কালো পলিথিন মোড়ানো ঘরের সামনে কেউ আসলেই রোহিঙ্গারা মনে করে আমাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে এসেছে। হুমড়ি খেয়ে পড়েন নারী পুরুষ ও শিশুরা। কক্সবাজার টেকনাফ সড়কে চলাচলকৃত গাড়ী দেখলেই দৌঁড় দিয়ে গাড়ীর পাশেগিয়ে হাত দিয়ে ত্রাণ খোঁজছে। সকল রোহিঙ্গাদের চোখেমুখে যেন ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে। ‘‘৪৫ বছর বয়স্ক রোহিঙ্গা আবদুর রহমান হাটতে হাটতে বলেন আই এবার ৫শ আড়ি ধান পাই,আত্তে ঘরত ১৭রোও গরু আছিল,বেয়াজ্ঞিন রাখি ধাই আইগেজি বাংলাদেশত’’। এদিকে অনেক রোহিঙ্গা বলেন প্রয়োজনীয় আশ্রয় ও খাবার পাচ্ছেনা তারা।বিশেষ করে পানি সংকট তীব্রতর। অনেক আক্রান্ত রোহিঙ্গা রোগীরা চিকিৎসার অভাবে কাতরাচ্ছেন আশ্রয় শিবিরে।  আবার অনেকেই চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন বললেও আবার অনেক রোহিঙ্গা বলছেন তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে দেখাযায় ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে অনেকেই অভিযোগ করেন কেউ পাঁচবার পেলেও অনেকেই একবারও পাইনি। রোহিঙ্গাদের দাবী প্রসাশনের হস্তক্ষেপ ছাড়া শৃংঙখলা ফিরে আসবেনা। ত্রাণবাহী গাড়ীগুলো ঠিকমত ত্রাণ বিতরণ করতে পারছেনা হাজার হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পাশে অবস্থান নেওয়ায়। রোহিঙ্গারা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় ভিতরে ক্যাম্পগুলোতে অসহায়ভাবে পড়ে থাকা হাজারো রোহিঙ্গাদের মাঝে ঠিকমত ত্রাণ পৌচ্ছেনা।  দেখাগেছে তীব্ররোদ উপেক্ষা করে শনিবার দুপুরে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরনার্থীরা ত্রানের জন্য দৌড়াদৌড়ি করছে। বাংলার ওপারে সাজানো সংসার ফেলে আসতে হয়েছে মিয়ানমারে সৈন্যদের নির্যাতন নিপীড়নে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমানের। ঘরবাড়ী গরু ছাগল আসবাবপত্র সবকিছু রেখেই পালিয় আসা রোহিঙ্গারা এখন বেচেঁ থাকার সংগ্রামে নিয়োজিত। তারা উখিয়ার অস্থায়ী শরনার্থী শিবিরে প্লাস্টিক-ত্রিপলের নিচে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন এটিতে তারা নিজেকে কিছুটা ভাগ্যবান ভাবছেন। সরকারী বেসরকারী আর ব্যক্তি উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠা ক্যাম্পগুলো ঘুরে দেখাগেছে গাদাগাদি করে সেখানে থাকছেন রোহিঙ্গারা।যে প্লাস্টিক-ত্রিপলের ঘরের উপরের ছাউনি,তার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকার উপায় নেই! আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাই নেওয়া মিয়ানমারের ফকিরাবাজার লেমসিপাড়ার বাসিন্দা আবদুল মালেক জানান শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত তার ঘরে হাড়ি উটেনি। খেতে পায়নি তিন শিশুসহ দশ সদস্যের এই পরিবার।

মৃত্যুফাঁদ থেকে ফিরে আসাদের কেউ হারিয়েছে বাবা, কেউ মা, কেউ বোন, কেউ স্বামী। অনেক কোলের শিশুও হারিয়েছে তার জন্মদাতা মা বাবাকেও। বেড়ে উঠার শেষ অবলম্বন টুকুও এখন তাদের কাছে নেই। কি তার ভবিষ্যৎ সে নিশ্চয়তাও তাকে কেউ দিতে পারবে না। রাস্তার দু দ্বারে সারি সারি হাজারো কোলের শিশু, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা ঠাই নিয়েছে ঝোঁপ ঝাড়ের কিনারায় নোংরা কাঁদার খাদের পাড়ে। যা দেখে নিজের চোখেঁর পানি আটকানো ছিল কঠিন। হাত পেতে সড়ক কিনারায় গাড়ী থামলেই তাদের ছুটাছোটি। তাদের কারো আগ্রহ ছিল না পরনের কাপড়ের প্রতি। তারা হাহাকার করছিল এক বোতল পানি, একমুঠো ভাত আর মাথা গোঁজার ঠাইটুকুর জন্য এক টুকরো ত্রিপলের। একটা প্যাকেট কেউ গাড়ী থেকে ছুঁড়ে ফেললেই ৫/১০ জন শিশু নারী পুরুষ এক সঙ্গে ঝাপিয়ে পড়ে কুড়িয়ে নেওয়ার কতনা কষ্টের প্রতিযোগীতা তারা করছিল।

এমন দৃশ্য গুলো শনিবার উখিয়া টেকনাফ সড়কের কুতুপালং, বালু খালী, পালংখালী এলাকার শরণার্থীদের মানবেতর জীবনযাপনের। এখানে সবাই নিজ দেশ মিয়ানমার ছেঁড়ে নানা মৃত্যুফাঁদ ডিঙিয়ে প্রাণ নিয়ে ফেরা রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠি।

দুপুরে তীব্র রোধে পালংখালী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ছবুল্লাকাটা একটি ক্যাম্পে কথা হয় রোহিঙ্গা কিশোরী ইয়াছিন আরার (১২) সঙ্গে। সে বলে, বাবা মাকে হত্যা করেছে মগ সেনারা। প্রাণ  নিয়ে বড় চার বোন ও এক ভাইয়ের সঙ্গে ৮ দিন পায়ে হেটে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে এদেশে উঠেছি। খেতে পারছিনা। গতকাল থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত পেটে দিতে পারিনি কোন দানা পানি। সে বার বার চাউলের টোকেন পেতে চাচ্ছিল ত্রাণ বহরে থাকা লোকজনের কাছে। অপরজন আব্দুল আলম। পিতা আব্দুল হাকিম। মিয়ানমারের টংবাজারের বাসিন্দা। তিনি জানান, পাড়ার ১০/১২ জনের সঙ্গে পালিয়ে এসেছে এখানে। তার বাবা আব্দুল হাকিম সেদিন বেড়ার ঘরে নামাজ আদায় করছিলেন। হঠাৎ বেড়া বেধ করে একটি গুলি এসে লাগে তার বাবার গায়ে। মুর্হর্তেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। পরে দেখেন পুরো পাড়ার চারপাশে মুখোশ পরা মগ আর সেনারা ঘিরে ফেলেছে। রাতের আধারে পালিয়ে কোন রকমে প্রাণে বেঁেচছেন তিনি।

গত শুক্রবার শাহপরীর দ্বীপ হয়ে আসা কিশোর আইয়ুব খানের ডান হাতের বাহুতে গুলির ক্ষত। জিজ্ঞেস করতেই কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠেন বাড়ী ছেড়ে বের হতে দেরী করায় তার হাতে গুলি করে মগরা। ক্ষত নিয়েই শত শত মাইল হেটে সিমান্ত পেরিয়েছে সে।

চলি¬শোর্ধ্ব বয়সের রোহিঙ্গা শোয়েব। গ্রাম চৌপারাং, বুলিচং থানা, মিয়ানমার। তিনি বলেন গত ২০ দিন আগে আমাদের পুরো গ্রামের চার পাশে স্থল মাইন বিস্ফোরণ ঘটনো হয়। এতে আহত হয় ৪০ জন। মারা পড়ে ১৫ জন। ১২ শ পরিবারের মানুষ কোন রকমে পালিয়ে আসি। সিমান্ত পাড়ি দেয়ার অভিজ্ঞাতার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, মিয়ানমার সেনার তাড়া খেয়ে যখন নাফ নদী পাড় হতে যাই তখন নৌকার মাঝিরা ২০/৩০ হাজার টাকা দাবী করে। যারা দিতে পারে তারা নৌকায় উঠে। যারা পারে না তারা বাধ্য হয়ে তাড়া খেয়ে নদীতে ঝাপ দেয়। কেউ তীরে উঠতে পারে কেউ ডুবে মরে। এভাবেই বললেন তিনি।
এদিন উখিয়ার শরণার্থী ক্যামগুলোতে ত্রাণ নিয়ে যাওয়া রাউজানবাসি লাখ লাখ মানুষের এ মানবেতর দৃশ্য দেখে চেষ্টা করছিল অসহায় এ মানুষের মাঝে সাময়িক কিছু দানা পানি তুলে দেয়ার।  বিতরণ করা হয় ১ হাজার বস্তা কাপড়, দেড় লাখ টাকার শুকনো খাবার, ৭ হাজার মানুষের খাবার বিরানী, ৩ শ পিস ত্রিপলসহ ৭ লাখ টাকার ত্রাণ সামগ্রি। ফেরার পথে মানবিক এ সহায়তার উদ্যোক্তাদের মধ্য অন্যতম নোয়াপাড়ার বিশিষ্ট দুজন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান ও আহমদ সৈয়দ গাড়ীতে বসে জানালেন, তাদের যে ত্রাণ সামগ্রিটি রোহিঙ্গাদের মুখে সবচেয়ে বেশি হাঁসি ফুটিয়েছে সেটি হল এক টুকরো ত্রিপল। ত্রিপল গুলো হাতে পেয়েই নব আশ্রিতরা ছুটছিল উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের সফুল¬াকাটা পাহাড়ে বাঁশ গেঁড়ে মাথা গোঁজার একটি ঝুপড়ি ঘর বানানোর কাজে। এদিন সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। রাউজানবাসির দেয়া ত্রিপল পেয়ে অনেকেই সেই পাহাড়ে গড়ে ফেলেছেন ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। বৃষ্টির মাঝে ত্রিপলের নিচে কোন রকমে মাথা গুজিয়েছে কেউ কেউ। সবমিলিয়ে রোহিঙ্গাদের করুন অবস্থা মেনে নেওয়ার মত নয়।

ত্রাণ নিয়ে যাওয়া গাড়ী বহরে রাউজানবাসির প্রতিনিধিদলের মধ্যে ছিলেন, মসকেট হলি ডে রির্সোটের কর্ণধার আব্দুল বাসেত জাফর, দেশ টিভির চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ আলমগীর সবুজ, নোয়াপাড়ার প্রবীণ ব্যবসায়ী আলহাজ আবু বক্কর সওদাগর, ভারতেশ্বরী প¬াজা সমিতির সভাপতি হাজী মোহাম্মদ শফি, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান, ব্যবসায়ী আহমেদ সৈয়দ, কালের কন্ঠের বিপন নির্বাহী আলমগীর হায়দার, স.ম জাফর উল¬াহ, রাউজান প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মীর আসলাম, সাবেক সভাপতি জাহেদুল আলম, এম. বেলাল উদ্দিন, রাউজান প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস.এম ইউসুফ উদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক নেজাম উদ্দিন রানা, অনলাইন প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক গাজী জয়নাল আবেদীন, রাউজান নিউজ প্রকাশক কামরুল ইসলাম বাবু, ব্যবসায়ী মোসলেম উদ্দিন, তাসিফ সামির, রাশেদ, আশরাফ হোসেন আলমগীর, আব্দুর রহমান সোহেল প্রমুখ।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd