ঢাকা : মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১১:৩৩:৪৭আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১২:১৩:২২
ঘুরে এলাম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজরিত শান্তি নিকেতন
বদর উদ্দিন আহমদ

 

শান্তি, প্রশান্তি, শান্তি, হ্যাঁ আমি কবি গুরুর শান্তি নিকেতনের কথা বলছি। এযেনো এক শান্তির পরশ বুলানো পরম প্রশান্তির চাঁদরে মোড়ানো এলাকা। যেখানে গেলে মন, আপনা থেকেই ভালো হয়ে যায়।  মনের গভীর থেকে একের পর এক রবীন্দ্র সঙ্গীত বেরিয়ে আসবে, মনের অজান্তে। ভাল বেসে সখী নিভৃতে যতনে..। তুমি রবে নীরবে...। আমারও প্রাণে যাহা চায় তুমি তাই....। এই কথাটি মনে রেখো তোমাদের এই হাসি খেলায়.. আমি যে গান গেয়ে ছিলেম। মনে রবে কিনা রবে আমারে। যেখানে গিয়ে এই বয়সেও আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম, প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে।  
ভারতের রাস্তাঘাটগুলোতে ছেলে-মেয়ে-যুবক-যুবতীর অনেকেই বাইসাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করেন। বোলপুর থেকে শান্তি নিকেতন যেতেও সেই চিত্র। বহু কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করছেন। রাস্তার ধারের দোকান-পাটগুলো আমাদের দেশ বাংলাদেশের অলিগলি পথের মতোই। পথের ধারে হকারদের দোকানপাট। তাতে হরেক রকম পণ্যের সমাহার। এছাড়া অন্য দোকানগুলোও আমাদের দেশের সাধারণ দোকানপাটের মতো।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর পৌর শহরের খুব কাছে এক ছোট্ট শহর এই শান্তি নিকেতন। কোলকাতা থেকে ১৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয় শহরটিতে প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী, পন্ডিত, গবেষক ও বিদ্যার্থী আসেন বিশ্বকবির প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও তাঁর বাসভবন পরিদর্শনে। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানেই সৃষ্টি করেছেন তাঁর অসংখ্য কালজয়ী রচনা।
শান্তি নিকেতনে আকর্ষণীয় ঘুমঘর ভারতের কলকাতা থকে দিনে দিনে ঘুরে আসা যায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুরের শান্তি নিকেতন। তবে তারজন্য চাই বেশ সকাল সকাল রওনা হওয়া। ট্রেনে করে গেলে এমনিতে তিন ঘণ্টার পথ। শিয়ালদহ কিংবা হাওড়া স্টেশন থেকে উঠতে হয়। এই ট্রেন কলকাতা থেকে বর্ধমান হয়ে বোলপুর জংশনে নামতে হবে। সেখান থেকে রিকশা, ভ্যান কিংবা অটো যা ওখানে টুট নামে পরিচিত যে কোন একটি পরিবহনে করে যেতে হয় শান্তি নিকেতন। আমরা দলে তিনজন ছিলাম। আমি, আমার স্ত্রী নূরুন নাহার (নীরু) এবং ছেলে তন্ময়। গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা ক্যান্টনম্যান রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে মৈত্রি ট্রেন যোগে সকাল সাতটা দশ মিনিটে কোলকাতার উদ্যেশে ছেড়ে, মাঝে বাংলাদেশের দর্শনা ও ভারতের গেদে বর্ডারে ইমিগ্রেশন ও কাষ্টমস চেক করে ট্রেনটি কোলকাতার চিৎপুর ষ্টেশনে পৌছায় স্থানিয় সময় রাত ৮টায়। মৈত্রি ট্রেনে যাত্রা মোটা মোটি ভালো। যদি মাঝখানের ইমিগ্রেশন ও কাষ্টমস চেকিং ঘুরে এলাম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজরিত শান্তি নিকেতন
পদত্ত্বিটা আরো একটু সহজ হতো তা হলে এই জার্নিটা একটা আদর্শ জার্নি হতে পারতো। দর্শনা ও গেদে ইমিগ্রেশনে কথা বলে জানতে পারি হয়তো আগামি মাস(অক্টোবর-১৭) থেকে অনেক সহজ হবে এই পদত্বিগুলো। তখন হয়তো আরো উৎসাহিত হবে এই মৈত্রি জার্নিটি। কোলকাতা বেড়াতে গিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, বিড়ালার তারা মন্ডপ,ইডেন গার্ডেনসহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থান দেখে, পরের দিন সকালে শান্তি নিকেতনের উদ্যেশে ভোর পাঁচটার সময় কলকাতার ফ্রী স্কুল ষ্টীট থেকে ট্যাক্সিতে করে হাওরা ষ্টেশনের উদ্যেশে রওনা হয়ে যথাসময় ষ্টেশনে পৌছাই। কিন্তু কোন ট্রেনে করে আমরা বোলপুর ষ্টেশনে যাব তা জানা না থাকায় ষ্টেশন ম্যানেজারের সাহায্য নিয়ে টিকেট কাউন্টারে দাঁড়াই, সে টিকেট লাইনটি ছিলো সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য। অর্থাৎ যাদের বয়স ষাট বছরের বেশি তাদের জন্য এই লাইনটি। খুব সহজেই টিকেট পেয়ে গেলাম। এর পর কোন প্লাটফর্ম থেকে ট্রেনচি ছেড়ে যাবে জেনে নির্ধারিত দুই নাম্বার প্লাটফর্ম থেকে বিশ্ব দেবতা এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে বসে ঠিক তিন ঘন্টায় গন্তব্যে পৌছাই। বোলপুর ষ্টেশনে নামার সাথে সাথে এক টুটোর (অটো) চালক জিজ্ঞাসা করে আমরা শান্তি নিকেতন যাব কীনা। আমি হ্যাঁ বলার সাথে সাথে চালক বললেন, আসুন আমার টুটো আছে, আমি প্রয়োজনে আপনাদের গাইড হিসেবে পুরো শান্তি নিকেতনসহ অন্যান্য পর্যটন এলাকাগুলো ঘুড়িয়ে দেখাবো। আমরা সেই টুটো চালকের সাথে সাঁত শত রুপির বিনিময়ে ঠিক করে নিলাম শান্তি নিকেতনসহ সমস্ত এলাকা গাইড সহ দর্শনীয় স্থান গুলো ঘুড়িয়ে দেখিয়ে আবার বোলপুর ষ্টেশনে পৌছে দিলেন। আমরা ষ্টেশনে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল বেলাতে কবি গুরু ট্রেনে করে আবার কোলকাতার হাওরা ষ্টেশনে ফিরে এলাম।   
শান্তিনিকেতন অঞ্চলটি একসময় জমিদার ভুবন সিংহের নামানুসারে ভুবনডাঙা নামে পরিচিত ছিল। সিংহ পরিবার এই জায়গাটি ঠাকুর পরিবারকে উপহার দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এ জায়গার নাম দেন শান্তি নিকেতন। এখানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঠ ভবন নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার এই বিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন আর্য আশ্রমের আদর্শে প্রাকৃতিক পরিবেশে উন্মুক্ত আকাশের নিচে শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা করেন। আনন্দের সাথে শিক্ষাই শিশুদের জন্য প্রকৃত শিক্ষা এ সত্যে বিশ্বাস করতেন তিনি। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরষ্কার জয়ের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরষ্কারের সব অর্থ শান্তি নিকেতনে ব্যয় করেন। ১৯২১ সালে এখানে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫১ সালের মধ্যে বিশ্ব ভারতী ভারতের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। এন্ড্রুস, এ্যালেক্স এ্যারনসনের মতো বিশ্ব বিখ্যাত পন্ডিত শিক্ষাবিদরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। গায়ত্রী দেবী,ইন্দিরা গান্ধী,সত্যজিত রায়,আবদুল গণি খান,অমর্ত্য সেনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বরা বিশ্বভারতীর শিক্ষার্থী ছিলেন। বিশ্বভারতীর কলাভবনকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চারুকলা শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে গণ্য করা হয়।
বিজ্ঞানচর্চার জন্য শিক্ষাভবন,নৃত্য,নাট্য ও সংগীত শিক্ষার জন্য সংগীত ভবন,মানবিকের জন্য শিক্ষা ভবন, রবীন্দ্রবিষয়ক গবেষণা ও চর্চার জন্য রবীন্দ্র ভবন,গ্রামীণ পুনর্গঠনের জন্য পল্লী সংগঠন ভবন,কৃষিবিজ্ঞানের জন্য পল্লী শিক্ষা ভবন রয়েছে । এছাড়া রয়েছে বেশ কয়েকটি সংশ্লিষ্ট ইন্সটিটিউট।
যেমন,নিপ্পন ভবন,শিল্প সদন,পল্লীচর্চা কেন্দ্র,ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় সংহতি কেন্দ্র ইত্যাদি। পাঠভবন ছাড়াও এখানে আরো দুটি শিশু শ্রেণীর বিদ্যালয় রয়েছে। এ দুটি হলো মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা ও সন্তোষ পাঠশালা। মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়টির নাম শিক্ষাসূত্র। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়টির নাম উত্তর-শিক্ষা সদন। চায়না ভবন নামে রয়েছে চীনের শিল্প সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা ও শিক্ষাগ্রহণের জন্য বিশেষ কেন্দ্র।
ঘুরে এলাম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজরিত শান্তি নিকেতন
পর্যটকরা শান্তি নিকেতনে যে ভবনগুলোর প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আগে বলতে হয় উত্তরায়নের কথা। কয়েকটি ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে উত্তরায়ন কমপ্লেক্স। এই ভবনগুলোর নাম হলো উদয়ন, কোনার্ক,শ্যামলী,পুনশ্চ এবং উদিচী। সময় পেলই এই ভবনগুলোতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসে থাকতেন। তাঁর অসংখ্য কালজয়ী লেখা এখানেই সৃষ্টি হয়েছে। বিচিত্রা বা রবীন্দ্র ভবনের নকশা করেছিলেন কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এখানে রয়েছে একটি গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘর। কবির ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী,পেইন্টিং এবং তাঁর বইগুলোর বিভিন্ন সংস্করণ এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে উপাসনা গৃহ ভবনের প্রতিষ্ঠা করেন। রঙীন বেলজিয়ান কাঁচ এবং মার্বেল পাথরে চারদিক অলংকৃত এই ভবনটিতে সন্ধ্যার সময় অসংখ্য মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সন্ধ্যার আলোতে ভবনের অপূর্ব সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন পর্যটকরা। শান্তি নিকেতন গৃহ শান্তি নিকেতনের সবচেয়ে পুরানো ভবন। দেহলী একটি ছোট দোতলা বাড়ি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর সাথে এখানে বাস করতেন।
শান্তি নিকেতনে মহাশান্তির আরেকটি জায়গা রয়েছে। সেটাকে কেউ ‘ঘুম ঘর’ কেউ ‘মেডিটেশন ঘর’ বলে থাকেন। কারণ এখানে সুরের মুর্ছনায় এমন সব শিক্ষা এবং মানসিক ব্যায়াম করানো হয়- যার ফলে অনেকেই অনেক সময় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটিয়ে থাকেন। এখানে নিয়মিত মেডিটেশন করানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রতিভার দিক থেকে মেধাবী এবং উন্নত চেতনার অধিকারী হয়ে উঠে।
ছাতিমতলা হলো শান্তি নিকেতনের একটি বিখ্যাত স্থান। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে ধ্যান করতেন। এখন এখানে বিশ্বভারতীর সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় । স্নাতকদের সপ্তপর্ণী গাছের পাঁচটি পাতার গুচ্ছ উপহার দেওয়া হয় ।
শান্তি নিকেতনে সারা বছরই বিভিন্ন উত্সবের আয়োজন করা হয়। এদের মধ্যে রবীন্দ্রজয়ন্তী,বসন্ত উৎসব,বর্ষামঙ্গল,শরৎ উৎসব,নন্দনমেলা, পৌষমেলা ও মাঘমেলা বিখ্যাত। পৌষমেলার সময় বিশেষভাবে পর্যটকদের ভিড় জমে। সে সময় গ্রাম গ্রামান্তর থেকে কারুশিল্পী,বাউলশিল্পী,লোক সংগীতের গায়ক,লোকজ নৃত্যশিল্পীরা এ মেলায় আসেন। বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন শিল্প সামগ্রীর মেলা বসে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত শান্তি নিকেতনে প্রতি দিন অসংখ্য পর্যটক,পন্ডিত,গবেষক আসেন। বিশ্ব কবির স্মৃতির স্পর্শে লাভ করেন অনন্য অভিজ্ঞতা।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
পর্যটন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd