ঢাকা : বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৩:২৩:১৫
মৌসুমে আহরণ হচ্ছে ২০ হাজার টনেরও বেশি রুপালি ইলিশ
নোয়াখালী সংবাদদাতা


 


মৌসুমে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মেঘনা, বঙ্গোপোসাগর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বামনিয়া ও মেঘনা নদী (আংশিক) থেকে ২০ হাজার টনেরও বেশি রুপালি ইলিশ আহরণ হচ্ছে। যার বাজার মূল্য দাঁড়ায় ন্যূনতম বারোশ কোটি টাকা। এ অঞ্চলের আহরিত ইলিশ চট্টগ্রাম ও ঢাকা হয়ে রফতানি হচ্ছে দেশের বাইরে। এতে জেলেদের আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি সমৃদ্ধ হচ্ছে জেলার অর্থনীতি। তবে ইলিশের মৌসুমে সমুদ্রে দস্যু তৎপরতা রুখতে পারলে ইলিশ আহরণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলে ইলিশের অর্থনীতি আরো প্রসারিত হবে বলে মনে করছেন জেলে, বোট মালিক ও আড়ত ব্যবসায়ীরা।
নোয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের গত চার বছরের এক হিসাবে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ অঞ্চল থেকে ইলিশ আহরণ হয়েছে ২০ হাজার ৭৬৯ টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৫৫৮, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২০ হাজার ৬৫ দশমিক ৭৪ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২০ হাজার ২১০ দশমিক ২৫ টন। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও ২০ হাজার টনেরও বেশি ইলিশ আহরণ হওয়ার আশা রয়েছে। জেলার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মেঘনা নদী ও বঙ্গোপোসাগরেই মূলত ইলিশ ধরা পড়ছে। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জের বামনিয়া ও মেঘনার আংশিকেও মাছ ধরা পড়ছে। এ কার্যালয়ের হিসাবে নদীতে ইঞ্জিনচালিতসহ বারোশর মতো ইলিশ ধরার নৌকা রয়েছে। নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৩১ হাজার ২১৪জন। এর মধ্যে হাতিয়ার রয়েছে ১৭ হাজার ১২০, সুবর্ণচরের ৫ হাজার ৪৩২, কোম্পানীগঞ্জের ৩ হাজার ২১৮ এবং সদর উপজেলার রয়েছে ৫ হাজার ৪৪৪ জন। এছাড়া ইলিশ মৌসুমকে ঘিরে মৌসুমি পাইকারি ব্যবসায়ী, নিয়মিত আড়তদার, ছোট ব্যবসায়ী ও নৌকার মালিক তো রয়েছেই।
জেলা মৎস্যজীবী সমিতি ও বোট মালিক সমিতির তথ্য মতে, জেলে, বোট মালিক, পাইকারী-খুচরা ও আড়ত ব্যবসায়ীসহ অন্তত ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ইলিশের ওপর নির্ভর রয়েছে এদের পরিবার-পরিজনও। এ অঞ্চলে ইলিশের মৌসুমে নিবন্ধিতসহ ২ হাজারেরও বেশি নৌকা নদী ও সাগরে ইলিশ আহরণ করছে। এর মধ্যে ইঞ্জিনচালিত প্রতিটি বড় বোর্টে (নৌকা) প্রধান মাঝিসহ অন্তত ২০ জেলে থাকে। এছাড়া ছোট ও মাঝারি বোটগুলোতে মাঝিসহ ১০ থেকে ১৫জন জেলে রয়েছে। এর বাহিরে আড়ৎ, পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ী রয়েছে অন্তত ২০০ জন। সঙ্গে রয়েছে এক হাজারেও বেশি বোট মালিক। তাদের দাবি মৌসুমে এ অঞ্চল থেকে ইলিশ মাছ আহরণ হচ্ছে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি।
সূত্র জানায়, বাংলা জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত ইলিশের মৌসুম থাকে। এর মধ্যে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে সব চেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। হাতিয়ার মেঘনা ও দক্ষিণে বঙ্গোপোসাগরে ইলিশ আহরণ হচ্ছে। অন্তত ২ হাজার খোপে (মাছের বিচরণ ক্ষেত্র) নৌকাগুলো মাছ আহরণ করছে। প্রতিদিন ছোট নৌকাগুলো ৫০-৬০ মণ ও বড় নৌকাগুলো ১০০ থেকে ৪০০ মণ পর্যন্ত মাছ শিকার করে ঘাটে ভিড়ছে। আহরিত এসব ইলিশের মোকামগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হাতিয়ার জাহাজমারা, চেয়ারম্যান ঘাট, নিঝুমদ্বীপ, লইড্ডার ঘাট, কাজীর বাজার, টাংকির ঘাট, ঘোপটাখালী, বৌবাজার, নলচিরা ঘাট, তমরদ্দী ঘাট, চেঙ্গার ঘাট, চেয়ারম্যান বাজার, বাংলাবাজার, সূর্যমুখী, বুড়ির দৌন, রহমত ঘাট, কোম্পানীগঞ্জের চরলেংটা ঘাট, মুছাপুর ঘাট ও সুবর্ণচরের সাবা চৌধুরীর ঘাট।
নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চল দেশের অন্যতম ইলিশ আহরণের ক্ষেত্র। এ অঞ্চলের ইলিশ জেলার চাহিদা মিটিয়ে চাঁদপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকা হয়ে দেশের বাহিরেও রফতানি হচ্ছে। প্রতি মৌসুমে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন ইলিশ এ অঞ্চলে আহরিত হচ্ছে। মৌসুমে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকার ইলিশ ধরা পড়ছে। এতে জেলে, বোট মালিক, পাইকারী-খুচরা ও আড়ত ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে সচ্ছল হচ্ছে। জেলার ইলিশের অর্থনীতি দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে।
মো. নিজাম উদ্দিন মিয়া বলেন, তার বাড়ি সুবর্ণচর উপজেলার চরমজিদে। ইলিশই তার জীবিন-জীবিকার হালহকিত পাল্টে দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি ৮টি ইঞ্জিনচালিত নৌকার মালিক। হাতিয়ার মেঘনায় এসব নৌকা ইলিশ আহরণে কাজ করছে। তার এসব নৌকায় ইলিশ মৌসুমে প্রধান মাঝিসহ ১২০ জন জেলে কাজ করছেন। ভালোভাবে ইলিশ ধরা পড়লে মৌসুমে এক থেকে দেড় কোটি টাকার ইলিশ বিক্রি করছেন তিনি। অতীত জীবনের চেয়ে বিগত কয়েক বছর আর্থসামাজিকভাবে তিনি নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এ ব্যবসায়ী বলেন, মৌসুমে ইলিশ বিক্রির টাকায় তিনিসহ সুন্দর ও সচ্ছল জীবন যাপন করছেন তার নৌকার প্রত্যেক জেলে। বর্তমানে সুবর্ণচরের জেলেদের মধ্যে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে হাতিয়া ঘাটে গেলে কথা হয় মাঝি আলী আকবরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ২০০০ সাল থেকে প্রায় ৫ বছর এ অঞ্চলে ইলিশ তেমন একটা ধরা পড়েনি। তিনি গত দুই মৌসুম আগে প্রায় ১ লাখ টাকার মতো ঋণি ছিলেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ইলিশ ধরা পড়ার কারণে গত মৌসুমে তিনি সকল ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হয়েছেন। চলতি মৌসুমেও বেশ ভালো ইলিশ ধরা পড়ছে। তবে ইলিশ আকারে ছোট। তারপরও যেহেতু ভালো ধরা পড়ছে, সেক্ষেত্রে এ বছর ইলিশের সঙ্গে যুক্ত সকলেই লাভবান হবেন।
হাতিয়া বোট মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ নবির উদ্দিন জানান, হাতিয়ার বর্তমান উন্নত এলাকা হচ্ছে জাহাজমারা ইউনিয়ন। শিক্ষায়, পরিবেশে ও অর্থে পুরো উপজেলার মধ্যে উন্নত এ ইউনিয়নের বাসিন্দারা। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে ইলিশ। নদীর ইলিশই এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যকে ফিরিয়ে দিয়েছে। তাদের মতে ইলিশ গভীর জলের মাছ। নির্দিষ্ট সময়ে নদীকে ড্রেজিং করা হলে যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে ইলিশ থাকবে। একই সঙ্গে নদী ভাঙন রোধ করে নিয়মিত ড্রেজিং করা হলে পুরো নোয়াখালী জেলার অর্থনৈতিক চিত্রের আমূল পরিবর্তন হবে বলেও মনে করছেন তারা।   
সমিতির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইলিশের মৌসুম এলে নদীতে এক ডজনেরও বেশি দস্যু বাহিনী সক্রিয় হয়ে পড়ে। দস্যুদের হাতে বিগত সময়ে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক জেলের মৃত্যু হয়েছে। অনেক মালিক তার বোট হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। নির্যাতনের শিকার হয়েছে শত শত জেলে। বাধ্য হয়ে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে নদী ও সাগরে মাছ ধরতে হয়েছে অনেককে। তবে চলতি মৌসুমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ তৎপর ছিল। বিশেষ করে র‌্যাব-১১ এর সহকারী পরিচালক সিনিয়র এএসপি মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। ধরা পড়েছে প্রধান প্রধান দস্যুবাহিনীর মূল হোতারা। এতে করে এ মৌসুমে নদীতে কিছুটা স্বস্তীতে মাছ ধরছে জেলেরা। এ ছাড়া কোস্টগার্ডও বেশ সহযোগিতা করেছে জেলেদের। তাঁদের মতে, নদীর ভাঙন রোধ, নিয়মিত ড্রেজিং ব্যবস্থা করলে এবং ইলিশের মৌসুমে দস্যু তৎপরতা রুখতে পারলেই এ অঞ্চলের আপামর মানুষ আর্থিকভাবে আরো সমৃদ্ধি লাভ করবে। শুধু এ অঞ্চলের মানুষ নয় ইলিশ রফতানি করে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারবে সরকারও।
নদীতে দস্যু তৎপরতা বিষয়ে র‌্যাব-১১’র সিনিয়র সহকারী পরিচালক (সিনিয়র এএসপি) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বরাবরই ইলিশ মৌসুমে র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দস্যু দমনে তৎপর ছিল। চলতি মৌসুমে র‌্যাব নদী ও সাগরে দস্যু নির্মূলে হাতিয়া ও হাতিয়ার বাহিরেও একাধিক অভিযান চালিয়েছিল। এতে পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তাঁদের সহযোগিতা করেছে। তাঁর মতে অভিযানগুলো সফল হয়েছে, একাধিক দুর্ধর্ষ বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতার ও প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র উদ্ধার করেছে তারা। যার সুফল চলতি মৌসুমে জেলে, বোট মালিক তথা ইলিশের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট সবাই ভোগ করছেন। নির্ভিগ্নে নদী ও সাগরে ইলিশসহ সব প্রকাশ আহরণে জেলেদের পাশে র‌্যাব থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
নোয়াখালী মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নাহিদ বলেন, প্রজননের সময় ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে। এ সময় সরকারিভাবে জেলেদের জন্য যে বরাদ্দ দেয়া হয় তা অপ্রতুল। আবার যা বরাদ্দ হয় তাও বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন বেহাত করে ফেলেন। যদি বরাদ্দ বাড়ানো যায় এক কথায় জেলেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় তাহলে মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ আহরণ হবে। তার মতে, বিগত দুই-তিন বছর প্রজননের সময় জেলেদের সরকারিভাবে কিছুটা সহযোগিতা করায় এ বছর ইলিশ ভালো আহরণ হচ্ছে। একই সঙ্গে চলতি মৌসুমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও তৎপরতা ছিল। ফলে জেলেরা নির্বিঘেœ মাছ ধরতে পারছে।
হাতিয়া বোট মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ নবির উদ্দিন বলেন, এ বছর ইলিশের আকার ছোট। তবে বেশ ভালো ধরা পড়ছে। এভাবে পুরো মৌসুম শেষ হলে এ অঞ্চলের অর্ধ কোটি মানুষ আর্থিকভাবে আরো সমৃদ্ধ হবে। এ ছাড়া সরকারও নানাভাবে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাবে। তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনির প্রশংসা করে বলেন, চলতি মৌসুমের মতো আগামী দিনেও ইলিশের মৌসুমে আইনÑশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকবেন।
নোয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মোতালেব হোসেন বলেন, তিনি এ জেলায় যোগদান করেছেন মাত্র কিছুদিন হলো। তবে সরেজমিনে খোঁজখবর নিয়ে দেখেছেন, শুধু নদীর আশপাশের মোকামে নয়, জেলা শহরসহ পুরো জেলার গ্রাম-গঞ্জের বাজার ইলিশে ভরে গেছে। পুরো জেলার বাজারগুলো যেন এক একটা ইলিশের মোকাম। তিনি আরো বলেন, জেলেরা একটু সচেতন হলে বা প্রজননের সময় ইলিশ ধরা বন্ধ রাখলে মৌসুমে নদীতে ইলিশের সংখ্যা বেড়ে যাবে। এতে জেলেরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
বন্ধ মৌসুমে জেলেদের জন্য বরাদ্দ অপ্রতুল এ কথা স্বীকার করে এ কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি নোয়াখালী মৎস্য প্রতিমন্ত্রী এসেছিলেন। তাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। আগামী দিনে জেলেদের জন্য বরাদ্দ আরো বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তাছাড়া ইলিশের মৌসুমকে ঘিরে দস্যু তৎপরতা রুখতে তার কার্যালয় সক্রীয় রয়েছে। এসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তাদের।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
অর্থ-বাণিজ্য পাতার আরো খবর

Developed by orangebd