ঢাকা : বুধবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • আঞ্চলিক দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে নারীরা এগিয়ে : চুমকি          তিন হাজার বিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে          সরকারের কাজ সম্পর্কে জনগণকে ধারণা দিতেই উন্নয়ন মেলা          পাবলিক পরীক্ষায় অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা : শিক্ষামন্ত্রী           সালেই বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে : মেনন          বিশ্ব ইজতেমায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে শতশত মুসুল্লি
printer
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৮:০০:২৪
রোহিঙ্গা সমস্যা : ওবার, সেবার, আবার
করীম রেজা



নির্জলা নিরেট অসত্য বক্তব্য দিয়ে রোহিঙ্গা জাতির নিধনকল্পে পরিকল্পিত গণহত্যার বিষয়ে আকাক্সিক্ষত দীর্ঘ নীরবতার যবনিকা টানলেন অবশেষে মিয়ানমারের অং সান সু চি। এ খবরও বেশ পুরনো হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। যা পুরনো হয়নি তা হলো মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নির্মম গণহত্যা। সু চি তার কথায় দাবি করলেন যে, ৫ সেপ্টেম্বরের পরে রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রচারিত বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থার সংগৃহীত উপগ্রহ চিত্রে রাখাইনদের ঘরবাড়ি ২২ সেপ্টেম্বর তারিখেও আগুনে পুড়তে দেখা যায়। আর সু চি বললেন- রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কেন বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে দেশান্তরী হচ্ছে তার কারণ তিনি জানেন না এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন। অন্যদিকে তার সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘে তার কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন।
গত সোমবার পর্যন্ত জাতিসংঘের হিসাবে ৪ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। কয়েকদিন আগমনের প্রকোপ কম থাকলেও হঠাৎ করেই আবার তা বেড়েছে। গত সোমবার থেকে প্রায় প্রতিদিন রোহিঙ্গারা আসছে, প্রায় ৭ হাজার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ১৯৭৮ সালে তারা নিজের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। আবারো আসে ১৯৯২ সালে। বাংলাদেশ সরকারের নথিভুক্ত আছে প্রায় ৩৫ হাজার। আর নথিবিহীন প্রায় ৫ লাখ। ২০১৬ সালে আবার আসতে শুরু করে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা দশ লাখের মতো এবং দিনের পর দিন তা বাড়ছেই।
মিয়ানমার সরকার ১৯৮২ সালে আইন করে এই জনগোষ্ঠীকে স্টেটলেস বা ভূখ-হীন একটি জাতিতে পরিণত করে। যাদের কোনো দেশ নেই। রাষ্ট্র নেই, নাগরিক অধিকার নেই। মাতৃভূমিও নেই। অবাধ চলাফেরা, বিয়েশাদি, সন্তান জন্ম দেয়াও সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত, জেলখানার মতো অবরুদ্ধ জীবন। মিয়ানমার সরকার স্থানীয় রাখাইন ও মগ সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় নানা অজুহাতে নির্মম অমানবিক অত্যাচারের দ্বারা তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করে।
২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবরের ঘটনা। তথাকথিত ৯ জন সীমান্ত পুলিশ হত্যার অভিযোগ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ দিয়ে সামরিক বাহিনীর অভিযানে ঘরবাড়ি ছেড়ে কোনোরকমে জানপ্রাণ নিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে এরা প্রবেশ করে। কাঁটাতারের বেড়া গলে অথবা নৌকায়। বিজিবি চেষ্টা করে বাধা দিতে। মানবিক কারণে পরে সবাইকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়।
একই রকম ঘটনার সূত্রপাত এবার ২৫ আগস্ট। হঠাৎ করেই ‘আরসা’ নামের একটি সশস্ত্র সংগঠনের নামে একযোগে সীমান্ত চৌকিতে হামলার অজুহাতে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। জীবন বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে আগমন করে। নারী-শিশু বয়স্ক কেউ বাদ যায়নি, এদের সংখ্যা প্রায় ৬০-৭০ ভাগ। তবে পুরুষদের সংখ্যা খুব কম। অনুমান করা যায়, হয় তাদের হত্যা করা হয়েছে, বন্দি অথবা পালিয়ে পাহাড়-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। সীমান্তপথে স্থল মাইন পুঁতে রাখার কারণে পলায়নপর মানুষের অনেকেই আহত হয়েছেন। অনেককে গুলি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ হচ্ছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিতাড়নে মিয়ানমারের আছে সুপরিকল্পনা। হঠাৎ করে আরসার অভ্যুদয়, কয়েকদিন পর তাদের একতরফা অস্ত্র বিরতি, বেছে বেছে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ এবং থাইল্যান্ডের পত্রিকায় পাকিস্তানি জেনারেলের আরসা সংযোগ সবই পরিকল্পিত গণহত্যার প্রস্তুতির প্রমাণ।
তাছাড়া সু চি জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিলেন না, কেননা এই গণহত্যার কারণে তিনি ধিকৃত ও নিন্দিত।  বিশ্ববাসীর সামনে দাঁড়াবার মতো সৎ সাহস তার নেই। এক সময় যিনি নন্দিত ও কীর্তিত ছিলেন গণতন্ত্র ও নির্যাতিত মানুষের প্রতীক হিসেবে। পেয়েছেন শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারও। ক্ষমতার কাছে আত্মবিকৃত সু চি তার পিতার অঙ্গীকারকেও অবলীলায় অস্বীকার করে  বিশ্ব জনসমক্ষে তার প্রকৃত রূপ তুলে ধরেছেন। সবকিছুই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর গণহত্যার পরিকল্পনার দিকে নির্দেশ করে।
১৯৪৮ সালে রাখাইন বার্মা ইউনিয়নের একটি ডিভিশন হিসেবে মর্যাদা পায় ব্রিটিশদের পরিত্যক্ত উপমহাদেশীয় সাম্রাজ্যে। প্রাচীন ইতিহাসে দেখা যায়- রাখাইন বা আরাকান ছিল একটি স্বাধীন, সমৃদ্ধ জনপদ। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে ১৯৭৪ সালে নে উইনের সামরিক সরকার রাখাইনকে একটি স্টেটের মর্যাদা দেয়। কিন্তু জাতিগত নিধন তাই বলে থেমে থাকেনি।
মিয়ানমার সরকার ১৯৮২ সালে আইন করে এই জনগোষ্ঠীকে স্টেটলেস বা ভূখ-হীন একটি জাতিতে পরিণত করে। যাদের কোনো দেশ নেই। রাষ্ট্র নেই, নাগরিক অধিকার নেই। মাতৃভূমিও নেই। মিয়ানমার সরকার স্থানীয় রাখাইন ও মগ সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় নানা অজুহাতে নির্মম অমানবিক অত্যাচারের দ্বারা দেশত্যাগে বাধ্য করে। ঘরবাড়ি ছেড়ে কোনোরকমে জানপ্রাণ নিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে এরা প্রবেশ করছে। কাঁটাতারের বেড়া গলে অথবা নৌকায়। সাগরে ভাসছে মৃত রোহিঙ্গা মানব, শিশু-নারী; বৃদ্ধ।
বাংলাদেশের রয়েছে নিজস্ব জনঘনত্বের অত্যধিক চাপ। তার ওপর আগে থেকেই ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী এদেশে বাস করছে। ২০১৭-এর ২৫ আগস্ট আবার নতুন করে রোহিঙ্গা বিতাড়ন কার্যক্রম শুরু হয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম কয়েকদিনে ৩-৪ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও রয়েছে তাদের মধ্যে। বাংলাদেশের মতো একটি ছোট্ট দেশের পক্ষে এই চাপ সামাল দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়, বাস্তবও নয়।
জাতিসংঘের প্রতিনিধি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলেছেন, মিয়ানমার সরকার এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নিধন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। যেহেতু এরা অপর একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা চরমভাবে নির্যাতিত; তাই জঙ্গিবাদী মনোভাব পোষণ করতেই পারে। এই বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠীর সহজ রিক্রুট রোহিঙ্গারা। আশু সমাধান না হলে পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে নাজুক হবে। কেবল বাংলাদেশ নয়, উপমহাদেশ তথা সমগ্র বিশ্ব গভীর সংকটে পড়বে। তাছাড়া নেহায়েত একই সীমান্তের একটি দেশ হওয়ার সুবাদে অনৈতিক দায়ের ভুক্তভোগী হতে পারে না বাংলাদেশ। সমস্যাটি মিয়ানমারের তৈরি এবং সুরাহা তাদেরই করতে হবে।
শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল যাবৎ আরাকান বা রোসাং বা রাখাইন এলাকা মুসলিম রোহিঙ্গা, রোসাঙ্গ হিন্দু এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মাতৃভূমি। রোহিঙ্গা মুসলিম কখনই বাংলাদেশের বাসিন্দা ছিল না বা বাংলাদেশ থেকে রাখাইন রাজ্যে অভিবাসী হয়নি। এটা ঐতিহাসিক সত্য। ১৭৮৫ সালে আরাকান দখলকারী বর্মিরাই মূলত বহিরাগত। উ নু, তৎকালীন বার্মার প্রথম প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গাদের আরাকানের বাসিন্দা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে নির্বাচনের সময় তাদের ভোটাধিকারও ছিল। কিন্তু ২০১৫-তে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সেই ভোটাধিকার ছিল না। আরাকানের অধিবাসী হিসেবে ১৯৫১ সালে তারা সরকারি পরিচয় পত্রও পেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী উ বা ১৯৫৯ সালে রোহিঙ্গাদের আরাকানের জাতিগোষ্ঠী বলেই অভিহিত করেন। কিন্তু ১৯৬২-তে সামরিক সরকার সবই অস্বীকার করে। নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। রোহিঙ্গা ভাষায় রেডিও অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করা হয়। অপারেশন ড্রাগন কিং নামে রোহিঙ্গা বিতাড়ন কর্মসূচি শুরু হয়, যা আজ অবধি চলছে। আন্তর্জাতিক মহল কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এই নির্যাতন বন্ধ হবে না।
বাংলাদেশ এতদিন দ্বিপাক্ষিকভাবে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। মিয়ানমারের কৌশলের কাছে বাংলাদেশের কূটনীতি মার খেয়েছে। একদিনের জন্যও রোহিঙ্গা বিতাড়নের কৌশল থেকে মিয়ানমার পিছু হটেনি। অথচ বাংলাদেশ দিনের পর দিন রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বইছে। কোনোরকম গোয়েন্দা তথ্যই বাংলাদেশের কাছে ছিল না। থাকলে মাত্র কয়েকদিনে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ হয়তো ঠেকানো যেত। এই মানবিক এবং মানবসৃষ্ট নির্মম বিপর্যয় ঠেকানো এখন বাংলাদেশের একার পক্ষে সামাল দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব না। আশার কথা, বিশ্ববাসী আমাদের আশ্বাস দিচ্ছে যে- তারা আমাদের সাথে আছে। আমাদের বিদেশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলাগণ দেশের স্বার্থ বিবেচনা না করে কার স্বার্থে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্বহীন ব্যবস্থাপনার দ্বারা এই রকম একটি নাজুক অবস্থা ঘটতে দিলেন, আমাদের বুদ্ধিতে কুলায় না। টিভির খবরে দেখা যাচ্ছে, এখনও তারা দুই পক্ষের আলোচনার দ্বারা সমাধানের অলীক স্বপ্নের বুলি আওড়াচ্ছেন।
চীন, ভারত, রাশিয়া নীরব থেকে বাণিজ্য স্বার্থকে মানবিক মূল্যবোধের উপরে বিবেচনা করেছে। আছে ভূ-রাজনীতির নিকৃষ্ট  কূটপনা। মানুষের মূল্য তুল্য বিচারে আজ ব্যবসাবুদ্ধির কাছে ভূলুণ্ঠিত। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী-অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতদের সাথে আজ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক করেছেন। আশা করা যায়, বিশ্ববাসী এর সঠিক সমাধান খুঁজে পাবে। শেখ হাসিনার চার দফা প্রস্তাব এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে অনতিবিলম্বে রোহিঙ্গাদের মানবিক ও নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেবে মিয়ানমার সরকার।
১৯৭১ সালে এক কোটিরও অধিক বাংলাদেশি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমরা স্মরণ করতে পারি, সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত সংগঠনের জন্য বিদেশ সফর করেছিলেন। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দেখা করে প্রকৃত অবস্থার বর্ণনা দিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝাতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে এখন কমবেশি সেই রকম একটি সময়।  
বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সবদিক থেকেই মর্যাদাপূর্ণ। এমতাবস্থায় দেশে-বিদেশে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে অবশ্যই কূটনৈতিক সাফল্য সম্ভব।  রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাও ভিন্ন মাত্রায় নন্দিত ও বন্দিত হচ্ছেন, হবেন। বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা শেখ হাসিনাকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য প্রমাণের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদেরও তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠিয়ে উপমহাদেশের তথা বিশ্ব শান্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।  
লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ, email -

karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd