ঢাকা : বুধবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • আঞ্চলিক দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে নারীরা এগিয়ে : চুমকি          তিন হাজার বিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে          সরকারের কাজ সম্পর্কে জনগণকে ধারণা দিতেই উন্নয়ন মেলা          পাবলিক পরীক্ষায় অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা : শিক্ষামন্ত্রী           সালেই বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে : মেনন          বিশ্ব ইজতেমায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে শতশত মুসুল্লি
printer
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২২:৩৯:১৬
মাতৃশক্তি দেবী মহামায়া
কাশ্মীরি দাশ কাবরী


 


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আকর্ষণীয় সাফল্য যা অভাবনীয় আরাম ও  সুবিধা মানুষকে এনে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও আজ এক বামনের মতো মনে হয় অসংখ্য জাতি, ভাষাগত গোষ্ঠী, ধর্ম ইত্যাদিতে বিভক্ত মানুষ সকল জীব ও বস্তুর মাঝে যে আধ্যাত্মিক অন্তঃস্তর রয়েছে তা বিচার করতে পারে না। মানুষের মধ্যে সংহতি হলো এক প্রকৃত অবস্থা। মত ও পথের বিভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষের আধ্যাত্মিক ঐক্যের কথা অস্বীকার করা যায় না। এই সত্যকে মেনে নিয়ে সমগ্র নর-নারীকে ধর্মের সমন্বয় ও মানবজাতির কার্যকরী ঐক্য স্থাপনের জন্যই বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসব সার্বজনীন দূর্গাপূজা।

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় পূজা ও উৎসব দূর্গাপুজা। বিশ্বের সকল শক্তির মিলিতরূপ দূর্গা। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মহাদেবী দূর্গাশক্তির বিকাশ আনুমানিক ৪র্থ-৫ম খ্রিস্টাব্দে রচিত মার্কন্ডের পুরান এবং শ্রী শ্রী চন্ডীতে, তবে সূত্রপাত হয় মহাভারত, বিষ্ণু পুরান, হরিবংসা, দেবী পুরান, ভাগবত ও বাসনপুরান, মহাভারতের বিরাটপর্বে ও ভীষ্মপর্বে দূর্গাস্তর আছে। ভীষ্মপর্বে ত্রয়োবিংশ অধ্যায়ে অর্জুন দূর্গার স্তবপাঠ করেন। বিষ্ণু পুরানের পঞ্চম অংশে যশোদা গর্ভে জন্মানোর বৃত্তান্ত আছে। শ্রী শ্রী চন্ডীতে বলা হয়েছে তিনি ভগৎপালয়িত্রী আদ্যাশক্তি ও সনাতনী। পরাকালে মহিষাসুরের অত্যাচারে রাজ্যচ্যুত দেবতারা ক্রমাকে নিয়ে বিষ্ণু ও মহাদেবের কাছে উপস্থিত হলে মহিষাসুরকে বধ করার জন্য সকল দেবতার তেজ থেকে অপূর্ব নারীমূতি নির্মিত হলো। দেবতারা তাঁকে অস্ত্র ও অলংকার দিয়ে সজ্জিত করলেন। পরে মহিষাসুরের সঙ্গে ভীষন যুদ্ধ করে তাকে শুলবিদ্ধ করলেন। এছাড়া মধু কৈভৈ, শুম্ভ-নিশুম্ভকে ও মায়া দিয়ে পরাজিত করলেন মহামায়া দূর্গা। শ্রী শ্রী চন্ডীর একাদশ অধ্যায়ে দূর্গা স্বকণ্ঠে বলেছেন-
“ইত্থং যদা যদা বাধাদান বোত্থা ভবিষ্যতি,
তদা তদাবতীর্যাহং করিষ্যাম্যরি সংক্ষয়ম”।

যখনই দানবগনের প্রাদুর্ভাবের কারণে বিঘœ উপস্থিত হবে, তখনই আমি আবির্ভূত হয়ে দেব-শত্র“ অসুরদের বিনাশ করব।
শ্রী শ্রী চন্ডীতে বর্ণিত আছে প্রাচীনকালে রাজা, সুরথ ও সমাধি বৈশ্য সর্বহারা হয়ে নিজেদের সবকিছু ত্যাগ করে বনে গমন করেন। বনের মধ্যে তারা এক মুনির নিকট যান। যার নাম মেধস্ মুনি এবং তাকে সব খুলে বলেন। মেধা ঋষি সব শ্রবন করার পর তাদেরকে বলেন যে “বিশ্ব সংসারকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জগতের পালন কর্তা বিষ্ণুর যে মহামায়া শক্তি তারই প্রভাবে এরূপ হয়। সেই মহামায়া প্রসন্না এবং বরদা হলে মানবের মুক্তি লাভ হয়। মুনিব উপদেশ পেয়ে সুরথ ও সমাধি মাটির প্রতিমা গড়ে ৩ বছর ব্যাপী কঠোর তপস্যার পর দেবী তুষ্ট হয়ে তাদের দেকা দেন এবং মনের বাঞ্চনা পূর্ন করেন। পরবর্তীতে বসন্তকালকে দূর্গাপূজার উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করে বাসন্তী পূজার প্রচলন করেন। শরৎকালে যে পূজা তা মায়ের অকাল বোধনের মাধ্যমে হয়। মায়ের অকাল বোধনের মাধ্যমে হয়। কৃত্তিবাস রামায়নে শরৎকালে দূর্গাপূজার জন্য বোধনের যে কাল বা অকাল সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। স্বয়ং প্রজাপতি ব্রক্ষার প্রদত্ত বিধি অনুসারে সীতা উদ্ধারের জন্য রাবনকে নিধন করতে ভগবান শ্রীরাম চন্দ্র লংকার সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা নির্মান করে শরৎকালে ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে দূর্গামায়ের পূজা করেন এবং মা প্রসন্ন হয়ে বর প্রদান করেন।

১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজা কংসনারায়ন প্রায় নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করে শারদীয় দূর্গাপূজা করেছিলেন। আজ থেকে প্রায় ৪৩৭ বছর আগে শরৎকালে দূর্গাপূজা করা হয়।
শরৎকালে দূর্গাপূজা করে বলে মায়ের আরেক নাম শারদা, শারদা বা শরৎ এসেছে শৃ-ধাতু থেকে। যার অর্থ বধ বা হিংসা। হিংসাত্যুক সব কিছুকে নিহত করে যিনি রক্ষাকে সমৃদ্ধ করে তোলেন তিনি অসৎনিরোধী প্রচন্ডা। কবির ভাষায় বলতে গেলে-
“দেখাও মা আবার দনুজ দলনী
অশির-নাশিনী চন্ডী রূপ,
দেখাও মা ঐ কল্যান করই
আনিতে পারে কি বিনাশ স্তুপ
শ্বেত শতদল বাসিনী নয় আজ
রক্তাম্বর ধারিনী মা,
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।

আবার দেবী দূর্গার ধ্যান মন্ত্রে তার অষ্টশক্তির কথা উল্লেখিত “উগ্রচন্ডা প্রচন্ডা চ চন্ডোগ্রো চন্ডনায়িকা চন্ডা চন্ডাবর্তী চৈব চন্ডারূপাতি চন্ডিকা। এই সবগুলোই হলো অসৎ এর বিরুদ্ধে মহাপরাক্রমী শক্তি। এখানেই মায়ের “সারদা” নামের সার্থকতা।
বাংলার ঋতুচক্র ঘুরে শরৎকালের পরেই আসে হেমন্তকাল। শস্যের উদ্ভবকাল। তারই আগমনী যেন ঘোষিত হয় এই শারদীয়া পূজায়। প্রতিমার পাশে তাই নব পত্রিকা স্থাপন করা হয় যেমন-
“রম্ভা কচী হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিশ্বদাড়িমৌ
অশোক মানকশ্চৈব ধন্যঞ্চ নব পত্রিকা”।

অর্থাৎ কলা (ব্রক্ষানী), কচু (কালিকা), হলুদ (দূর্গা), জয়ন্তী (কৌমারী), বিল্ব (শিবা), ডালিম (রক্ত দন্তিকা), অশোক (শোকর হিতা), মানকচু (চামুন্ডা) এবং ধান (রক্ষ্মী। এরা বোধনের পর আলাদাভাবে পূজিত হলেও কালক্রমে দূর্গার সঙ্গে সম্মিলিত হয়েছে। শ্বেত অপরাজিতা লতা সর্ববিজয় প্রদায়িনী দেবী মহামায়ার বিশেষ রূপ। তাই এই লতা দিয়ে নবপত্রিকাকে বেষ্টন করা হয়। লক্ষ করলে দেখা যায় যে, এই সবগুলোই জীবনীয় শস্য। যাহা আমাদের শরীরের সুস্থতা বিধানে বিশেষ কার্যকরী।
মায়ের ধ্যানমন্ত্রে উল্লেখ আছে-
“ত্রিশূলং দক্ষিণে ধ্যেয়ং খড়গং চক্রংক্রমাদধ;
তীক্ষèবানং তথা শক্তিং দক্ষিনে সন্নিবেশষেৎ
খেটকং পূর্নচাপঞ্চ পাশমংকুশমের চ
ঘন্টাং বা পরশুং বাপি বামতঃ সন্নিবেশয়েৎ”।
মায়ের দশহাতে ত্রিশূল, খড়গ, সুদর্শন চক্র, ধনুবার্ন, শক্তি খেটক, পূর্নচাপ, নাগতালা, অংকুশ ও পরশু এ ধরনের অস্ত্র দেখা যায় বলে তিনি দশ প্রহরণ ধারিত্রী।
কবি নজরুলের আগমনী কবিতায় তাহা প্রকাশ পায়-
আজ রন-রঙ্গিনী জগৎমাতার দেখ মহারন,
দশদিকে তাঁর দশহাতে বাজে দশ প্রহরণ।
পদতলে লুটে মহিষাসুর
মাহমাতা ঐ সিংহ বাহিনী জানায় আজকে বিশ্ববাসীকে
শ্বাশ্বত নহে দানব শক্তি পায়ে পিষে যায় শির পশুর।

এই শরৎকালেই বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে অনুষ্টিত হয় ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচদিনের দূর্গোৎসব। বিশমানবতার এক অপূর্ব মিলন উৎসব এই দূর্গাপূজা। তৃণে তৃণে শিশিরবিন্দু উজ্জ্বল সূর্যের কিরন, শিউলীর ঘ্রাণ আর কামের দোলায় প্রকৃতি ও দেবীর আরাধনায় মত্ত হয়ে উঠে।
মহালয়ার পিতৃপক্ষের তিলাঞ্জলি তর্পনান্তে হয় দেবীপক্ষের সূচনা। সৌর আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের নাম ‘মহালয়’ মহালয় শব্দ তেকে ‘মহালয়ার’ এর উৎপত্তি। দেবীপক্ষের বোধনমন্ত্রে মঁঙ্গলময়ী করুণাময়ীর আবাহনে দিগদিগন্ত হয় মুখরিত। ষষ্ঠী তিথিতে দূর্গার বোধন সপ্তমীতে মূতির প্রান প্রতিষ্ঠা। অষ্টমী ও নবমীতে মহাপূজা ও দশমীতে দেবীর বিসর্জন। এই পূজার বিশেষত্ব হলো সন্ধিপূজা অষ্টমী ও নবমী তিথির মিলনক্ষনে সন্ধিপূজা। এর সময়সীমা আটচল্লিশ মিনিট। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষনে রামচন্দ্র রাবনের দশটি মুন্ড ছিন্ন করেছিলেন। তাই এই সময়ে পূজার মহাত্ম্য বেশি। শুধু তাই নয় সন্ধিপূজার বলির রক্ত যেন নববর্ষের নতুন সূর্যালোকের প্রতীক। বলীর তাৎপর্য হলো পশু প্রকৃতিকে দেবীর চরনে নিবেদন। ছাগল হলো কামের প্রতীক, মেষ মোহের প্রতীক, মহিষ ক্রোধের প্রতীক, চালকুমড়া মাংসের এবং আখ মদ্যের প্রতীক এগুলো মাধ্যমে আমরা আমাদের খারাপ দিক গুলো দেবী মায়ের চরণে বলীদান করি।

“লোচনত্রয়সংযুক্তার পূর্ণেন্দুসদৃশান নাম্”
জটাজুটসমাযুক্তাম্
দেবীর মূর্তিতে বরাভয়দায়িনী, দূর্গাতিনাশিলী বিপত্তারিনীর রূপ ষ্পষ্ট হয়ে ভক্তদের কাছে, তিনি যেন একই সঙ্গেঁ ভয় ও অভয়ের প্রতীক তাই দেবী ভক্তদের কাছে শুভ ও অভিলষিত ফল প্রদায়িকা সর্বমঙ্গলা। তার প্রনাম মন্ত্রে দেখা যায়।
সর্বমঙ্গঁলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে
শরন্যে এ্যম্বকে গৌরি নরায়নি নমোহস্তুতে,
বাঙালীর সাংস্কৃতিক মানসালোকে দেবী নারায়নী, শস্যের অধিষ্ঠত্রী সমরপ্রিয়া চন্ডী হলেন গিরিরাজের আদরের কন্যা গৌরী শিবজায়া পাবতী øেহশীলামা। শুধু তাই নয় ঋগবেদে জ্যোতিঃস্বরূপিনী পুরানের দানবদলনী ‘শাকম্ভরী’ পর্নশবরী ভ্রামরী, কাত্যায়নী।

শ্রী শ্রী চন্ডীতে দেবী দূর্গার দুই রূপ বর্ণিত আছে। একদিকে মা যেমন হভালবাসার প্রতিমূতি অন্যদিকে তেমনি অমঙ্গঁলনাশিনী। মায়ের øেহভালবাসার রূপ হিসেবে একদিকে যেমন আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে তেমনি স্বৈরাচার, স্বেচ্ছাচার, সাম্প্রাদায়িকতা, অমানবিকতার বীজ যারা বপন করে সেসব অসুরকে নিধন করে মা আমাদের জীবনকে কুলুষমুক্ত করতে আসেন। সর্বোপরি মাতৃশক্তিকে সম্মান জানিয়ে পুরো নারী সমাজকে মাতৃকল্পে ঠাই দিয়ে মহাদেবীর মহিমাকে স্মরণ করে প্রার্থনা জানাই-
করোতু সা নঃ শুভহেতুরীশ্বরী
শভানি ভদ্রান্যভিহন্তু চাপদঃ
সেই মঙ্গলময়ী আমাদের পরম মঙ্গঁল বিধান ও আপদকে বিনাশ করুন।
লেখক : শিক্ষক, পণ্ডিত নিরোদলীলা গীতা বিদ্যাপীঠ

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd