ঢাকা : মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর, ২০১৭ ১১:১৪:৫৪আপডেট : ২৫ অক্টোবর, ২০১৭ ১২:৪০:৫৩
রোহিঙ্গা সংকট : দায় না থাকলেও ভোগান্তি বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে
করীম রেজা, কুতুপালং ও বালুখালী থেকে ফিরে

 

বাংলাদেশের কোনো দায় না থাকলেও ভোগান্তি সর্বাংশে বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন ঘটনা ঘটছে; পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে আসছে দলে দলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ।
রোহিঙ্গা সংকট সারাবিশ্বে আলোচিত এবং ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সচেতন মানুষের মনে। তেমনি আলোড়ন তৈরি হয়েছে স্থানীয় জনগণের বিবেকে। তবে সরেজমিন অবস্থা পরিদর্শন করে বোঝা যায়, স্থানীয় জনগণের মনে নজিরবিহীন অবস্থার প্রতিক্রিয়া হিসেবে যে মানবিক সহমর্মী চেতনা রোহিঙ্গাদের প্রতি তৈরি হয়েছে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে হয় না। গত ২ অক্টোবর উখিয়া-টেকনাফের কুতুপালং এবং বালুখালী রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী শিবির সরেজমিন পরিদর্শন করে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে খুব সহজেই জনগণের সহানুভূতি পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়। দলে দলে রোহিঙ্গাদের আগমন বাংলাদেশে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতে এই সংকটের নতুন মাত্রা বাংলাদেশ সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করবে। ইতোমধ্যেই স্থানীয় মানুষের মনে রোহিঙ্গা সমস্যার মিশ্র অনুভূতি তৈরি হয়েছে। সহসাই তাদের মনোভাবে চরম কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
উখিয়া বাসস্ট্যান্ড বা বাজার থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দিকে টেম্পোতে বা বাসে করে যাওয়ার সময় রাস্তার বাম দিকে দেখা যায় ছোট ছোট টিলাগুলোতে থাক থাক করে মাটি কাটা। কোনো গাছপালা নেই, যেখানে কিছুদিন আগেও ছিল সবুজের ছড়াছড়ি। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশে এসেই রোহিঙ্গারা এই টিলাসহ নানা জায়গায় অস্থায়ী আবাস তৈরি করেছিল। পরে সেখান থেকে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে নিয়ন্ত্রিত কুতুপালং বালুখালী ক্যাম্প এলাকায়। সে জায়গাতেও এক সময় সবুজের সমারোহে সৌন্দর্যের আকর্ষণ ছিল। সেইসব এখন স্বপ্নের গল্পের মতো।
স্থানীয়দের আশঙ্কা,  এসব পাহাড়ি এলাকার যেসব জায়গায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অস্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছে অধিকাংশই বর্ষা-বৃষ্টিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়বে। প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে না। আমরা সম্প্রতি দেখলাম বন্যহাতির আক্রমণে ৪ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। যেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেই এলাকার বনাঞ্চল, পাহাড়ি টিলা স্থানীয়ভাবে বন্যহাতির চলাচলের বা বিচরণের অন্যতম স্থান ছিল। মানুষের আবাসনের কারণে বন্যহাতির চলাচল ও জীবনযাপনের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি হয়েছে। হাতির পাল যেকোনো সময় নেমে এসে আরো বড় রকমের দুর্ঘটনা তৈরি করতে পারে।
এ-তো গেল প্রাকৃতিক ভারসাম্যের কথা, স্থানীয় জনসংখ্যা রোহিঙ্গা জনসংখ্যার চাপে এমনিতেই কোণঠাসা। তুলনামূলকভাবে স্থানীয় লোকজনের চেয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক বেশি। আগে থেকেই সেখানে অনেক রোহিঙ্গার বসবাস। সরকারি-বেসরকারি নানা সূত্র থেকে জানা যায়, প্রায় ৫ লাখ। গত ২৬ আগস্ট থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আরো পাঁচ থেকে ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।রোহিঙ্গা সংকট : দায় না থাকলেও ভোগান্তি বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে
বেঁচে থাকার জন্য মানুষ অনেক কিছু করতে পারে। জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য টিকিয়ে রাখার জন্য এই রোহিঙ্গারাও অনেক কিছুই করবে, নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায়। দুর্গম পাহাড়ি পথ বেয়ে, উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে জীবন বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারসহ সহানুভূতিসম্পন্ন বেশকিছু দেশ এবং জাতিসংঘ থেকে আশ্রিত রোহিঙ্গারা নানারকম ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে তারা এই ত্রাণ সম্বলের উপরে খুব বেশিদিন নির্ভরশীল থাকবে, এমনটা মনে করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। স্থানীয় সংবাদকর্মী কায়সার হামিদ মানিক এবং আবদুল গফুর দুজনের সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে দেখা এবং তাদের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখা গেল- রোহিঙ্গাদের প্রতি মানুষের সহানুভূতির মাত্রা আগের তুলনায় কমে এসেছে।
চলাচলে গাড়ি ভাড়া বেড়েছে, জনসংখ্যার চাপের কারণে আরও যেসব সামাজিক সমস্যা তৈরি হতে পারেÑ তা শুরু হয়েছে। বাজারে জিনিসপত্রের যেমন অত্যধিক দাম তেমনি স্বল্পতা দেখা যাচ্ছে। এলাকায় বসবাস করার জন্য রোহিঙ্গারা কোনো সীমানা খুব একটা মানছে না, বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। যাদের আর্থিক সচ্ছলতা রয়েছে তারা স্থানীয় বাড়িঘরে ভাড়া নিয়ে থাকছে। ত্রাণ সহায়তার উপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য তারা কাজকর্ম করছে অথবা করতে বাধ্য হচ্ছে। স্বাভাবিক কারণেই ব্যবসায়ীরা কম খরচের শ্রমিকদের প্রতি আগ্রহী হবেন, আর এই সুযোগটাই রোহিঙ্গারা গ্রহণ করবেÑ তাতে করে স্থানীয়দের কাজের সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
বালুখালী ক্যাম্পে একজন দেখালেন একটি টিলা নির্দেশ করে যে, এখানে তিনি সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করেছিলেন। এখন সেটি গাছপালা শূন্য। রোহিঙ্গাদের আবাসনের জন্য সেই টিলার মাটি কেটে সারি সারি ঘর তৈরি করা হয়েছে। সামাজিক বনায়নের কোনো চিহ্ন সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আশপাশে এরকম প্রচুর টিলা রয়েছে যেগুলো এখন রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আবাসনরূপে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে ফসলি জমি সেখানে ধান বোনা রয়েছে তার পাশ দিয়ে চলাচলের জন্য ছোট সরু রাস্তা দিয়ে সারাদিন ত্রাণকর্মী, রোহিঙ্গা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় জনগণ সবাই চলাচল করছে। পরিবেশের বিপর্যয় নানাভাবে তৈরি হচ্ছে। চাষবাসে অসুবিধা দেখা দিয়েছে বা ভবিষ্যতে আরও বড় রকমের অসুবিধা দেখা দেবে।
কুতুপালং ও বালুখালি ক্যাম্প দেখতে গিয়ে প্রথমেই যা চোখে পড়ে- ছোট ছোট শিশু যারা পায়ে চলার পথ কিংবা অস্থায়ী পলিথিন দিয়ে তৈরি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অথবা বসে আছে। লোকজন দেখলেই তারা যান্ত্রিক ভঙ্গিতে একটি হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়ে তাদের নিজস্ব ভাষায় বলতে থাকে- আমাকে একটি টাকা দিয়ে যান না, আমাকে একটি টাকা দিয়ে যান না। আর দেখা যায় পলিথিন দিয়ে বানানো ছোট্ট ঘরের দরজাগুলোর সামনে হয় নারীরা বসে আছেন নতুবা দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা যারা হেঁটে যাচ্ছি আমাদের মতো লোকজনকে নির্বিকার আবেগহীন দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছেন। মিয়ানমার সরকারের এই অমানবিক আগ্রাসনের শিকার নারী-শিশু এরা যেন বুঝতে পারছে না এদের কি করণীয়!
পাশাপাশি এর বিপরীত চিত্র রয়েছে ক্যাম্পে; কিছুদূর পর পরই বিভিন্ন টিলাকেন্দ্রিক মসজিদ, মাদ্রাসা তৈরি হচ্ছে। যে কেউ খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবে সেখানে মাদ্রাসা-মসজিদের তুলনায় সাধারণ স্কুল বা পাঠশালা তৈরির আয়োজন একেবারেই অপ্রতুল। এটাও বোঝা যায়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যারা উন্মুলিত হয়েছে তাদের মাতৃভূমি থেকে, তাদের সামাজিক অবস্থান থেকে, তাদের দেশ থেকে তারা নিজেদের প্রণোদনায়, নিজেদের আবেগ-ইচ্ছায় এই মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় যতটা এগিয়ে না এসেছে, তার চেয়ে বেশি উৎসাহ সহায়তা উদ্দীপনা পেয়েছে স্থানীয়ভাবে ক্যাম্পে যারা এই বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছে তাদের দ্বারা।
সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে এ-ও জানা গেল, এখানে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের লোকজন এসে চেষ্টা করে তাদের মতো করে একটি সংবাদচিত্র অথবা প্রতিবেদন তৈরি করতে যাতে করে বিশেষ একটি গোষ্ঠীর মনোভাব প্রতিফলিত হয় ওই সংবাদ মাধ্যমে। এতে করে এক ধরনের গোষ্ঠীগত বা সাম্প্রদায়িক মনোভাব তৈরি হচ্ছে যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব সামাজিক পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢোকার আগে সদর রাস্তায় অর্থাৎ কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের দুপাশেই আমরা দেখতে পেলাম প্রচুর নারী-শিশু কিছুদূর পরপর বিচ্ছিন্নভাবে অথবা দলবদ্ধভাবে বসে আছে। এরা কারা- কি করছে এই খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম, সংবাদকর্মীরা যেমন বলেন, তেমনি গাড়ির চালকসহ সবাই বললেনÑ এরা হচ্ছে রোহিঙ্গা। তবে নতুন আগত নয়, অধিকাংশই পুরনো রোহিঙ্গা। রাস্তার ধারে এরা সাধারণ মানুষ যারা সহায়তা দিতে আসে তাদের অনুকম্পা প্রত্যাশায় বসে আছে।
কুতুপালং বালুখালী ক্যাম্পে প্রবেশ করার আগে মহাসড়কের এক পাশে দেখলাম একজন মহিলা কিশোরীর সঙ্গে বসে আছেন। আমরা এগিয়ে গেলাম, প্রশ্ন করে জানলাম ভদ্রমহিলা শ্বশুর এবং দেবরকে হারিয়েছেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের মেরে ফেলেছে। সঙ্গের কিশোরীটি তার ননদ। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ওই কিশোরী কিংবা ওই নারীর মুখভাবে এমন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি যা দেখে তাদের প্রতি কোনোরকম অনুভূতি, সেটা সহানুভূতি হোক আর না হোক, তৈরি হতে পারে। আমরা দেখেছি এক ধরনের নির্বিকার মরিয়া ভাব যা হয়, হবে! কি হবে সেটা নিয়ে তারা ভাবছে না। এমন একটা চরম মনোভাব তাদের চেহারায়, তাদের আবেগ আচরণে- কথাবার্তায় দেখা গেছে।
বাংলায় একটি কথা আছে- অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। অধিকাংশ রোহিঙ্গা নারী-শিশু দেখে এমনটাই মনে হওয়া খুব সহজ। পুরুষ সদস্য যারা এসেছেন তারা সংখ্যায় খুব কম, তাদের মধ্যে তরুণ যুবক নেই বললেই চলে। প্রবীণ বৃদ্ধরা সংখ্যায় অধিক হলেও তারা ধর্মকর্ম নিয়ে যতটা ব্যস্ত থাকছেন তাদের অধিকার আদায়ে কিংবা সংগঠিতভাবে তাদের বর্তমান অবস্থা মোকাবিলার জন্য কিছু করার মতো আগ্রহ-উদ্দীপনা কোনোটাই অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয়নি।  সবকিছু কারও উপর ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন এমন মনোভঙ্গি দেখা গেছে।রোহিঙ্গা সংকট : দায় না থাকলেও ভোগান্তি বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে
প্রতিদিনই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নতুন নতুন খবর পাই। বাংলাদেশে আসার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নিহত হওয়ার কারণে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার পথ পরিবর্তিত হয়েছে। এখন পাহাড়ি পথে সীমান্তের কাছে এসে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায়।
রোহিঙ্গা সংকট তৈরিতে মিয়ানমার সরকারের নিয়মতান্ত্রিক দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। একদিকে মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করছে, অন্যদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে বিতাড়নের জন্য মাইকিং করে, বল প্রয়োগ করে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে।
এই রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের তৈরি নয়- তারপরও এ সংকটের সব ঝামেলা আমাদের বহন করতে হচ্ছে।  দু-একদিন আগে আমাদের একজন মন্ত্রী বললেনÑ এই রোহিঙ্গাদের ভার বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘদিন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যে ভার বহন করছে, যে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে সেটা নিয়ে যে গভীরভাবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি- বোঝা যায় মন্ত্রী মহোদয়ের সাম্প্রতিক উচ্চারণে।
আমাদের প্রতিবেশী ভারত আমাদের বন্ধু, মিয়ানমারেরও মিত্র দেশ। আমাদের বন্ধু হিসেবে সহযোগিতা করার জন্য ভারত যতটা না আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে তার চেয়ে বেশি পাশে দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারের। আমাদের সামান্য কিছু ত্রাণ সহায়তা দিয়ে লোক দেখানো আচরণ করছে। মুখে বলছে একরকম বাস্তবে প্রতিফলন হচ্ছে একেবারেই উল্টো, ভিন্ন।
ভারত তার সীমান্ত যাতে সুরক্ষিত হয় সে জন্য কঠোর নজরদারি শুরু করেছে। কোনোক্রমেই সেখানে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে ভারত সীমান্তে ভারতের অভ্যন্তরে যে রোহিঙ্গারা রয়েছে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার জন্য সীমান্তে এনে জড়ো করেছে অর্থাৎ বাংলাদেশ এমনিতেই ১০ থেকে ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপের মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থায়  ভারত তার দেশে থাকা কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে ঠেলে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ও সুযোগের অপেক্ষায় আছে। এমন পরিস্থিতিতে বন্ধু দেশের আচরণ বিচারের সময় এসেছে।
মিয়ানমার থেকে প্রচুর পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট বিভিন্ন উপায়ে নানা পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করত। এই রোহিঙ্গা সংকটের আগে এবং এখনো। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অবস্থান করছে ১৯৭৮ সাল থেকে। নব্বইয়ের দশকে অনেক গুণ বেড়ে যায়। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে সর্বমোট তাদের সংখ্যা প্রায় ১১-১২ লাখে গিয়ে পৌঁছায়। আমরা বাংলাদেশিরা তাদের মানবিক বিবেচনায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিÑ যেমন অতীতে তেমনি বর্তমানে। তাতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি, বিষয়টি তাদের মতো করে তারা দেখেছে। যেখানে মানবিকতার আবেগ কোনো প্রভাব ফেলে না। বাংলাদেশ চেষ্টা করেছে সবসময় দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের; কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।
আজকে দুঃখের কথা, দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় যে কোনো রকম অগ্রগতি হবে না, মিয়ানমার সরকার কোনোভাবেই বাস্তবতা স্বীকার করে সৎ প্রতিবেশীর মতো, ভালো প্রতিবেশী দেশের মতো আচরণ করবে, এমনটা এই বিগত ৪০ বছরে আমরা পাইনি। এখনো পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। যদিও দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক দুভাবেই আমাদের আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। আরও বুঝা যায়, এই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি আমাদের থাকলেও আমরা এই সংকট মোকাবিলার বাস্তবভিত্তিক, কার্যকর কোনো কৌশলপত্র আজও পর্যন্ত তৈরি করিনি। তথ্য-উপাত্ত বাস্তবতা সবকিছু মিলিয়ে উপস্থাপনার মুন্সিয়ানায় আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তুলে ধরতে পারতাম। কিন্তু গত ৪০ বছরে এই ক্ষেত্রে আমাদের কোন সার্থকতা নেই। চলতি ২০১৭-এর আগস্টে রোহিঙ্গারা যখন দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করছিল তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা কিছুই করতে পারছিলেন না। এমন একটা অবস্থা তাদের কথায় আচরণে প্রতিফলিত হয়েছে আমরা দেখতে পাই।  রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা সরকারি নীতি বাস্তবায়ন করবেন- সরকার আসবে সরকার যাবে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা তাদের দায়িত্বে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকবেন। রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের অধিকতর দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা দেশের জন্য সর্বাধিক মঙ্গলজনক।রোহিঙ্গা সংকট : দায় না থাকলেও ভোগান্তি বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে
আরেকটি বিষয় স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিষ্ঠুরতার ভাবটি অত্যন্ত প্রকট। এরা একে অন্যের প্রতি অত্যন্ত নির্মম আচরণ করতে পিছপা হয় না। সামান্য বিষয়ে এরা নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি পর্যন্ত করতে পারে। আমরা রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবন-যাপনের অনেক কিছু দেখেছি, বিস্তারিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিনই  দেখতে পাই।  
একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত না হলেও ফেরার পথে সন্ধ্যাকালে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন স্থানীয়ভাবে, তিনি রাস্তার এপাশে ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা নারীদের ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার জন্য জোরালো ভাষায় আবেদন-নিবেদন আদেশ-নির্দেশ দিচ্ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে জানালেন, যৌনকর্মী হিসেবে এরা ব্যবহৃত হচ্ছে। কখনো নিজেদের সমর্থনে কখনো স্থানীয় লোকজনদের চাপের কারণে এবং এতে করে নানান রকম দুর্ঘটনা ঘটছে, এমনকি হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে।
স্থানীয়দের মাধ্যমে আরো যে বিষয়টি জানা গেল, যদিও একটি অসমর্থিত প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়- তা হলো অধিকাংশ রোহিঙ্গা যুবতি যারা দেখতে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় তাদের ভিন্ন কোনো জায়গায় আশ্রয় দিয়ে রাখা হয়েছে। কুতুপালং, বালুখালী কিংবা অন্যকোনো ক্যাম্পে তাদের রাখা হয়নি। কে বা কারা, কোথায় রেখেছে, কেন রেখেছে, কী উদ্দেশে রেখেছে- এসব বিস্তারিত জানার জন্য প্রয়োজন অনুসন্ধানী উদ্যোগ।
কয়েকটি পরিবারের থাকার স্থান সংকুলান হতে পারে অনায়াসে সেই পরিমাণ জায়গা নিয়ে মাদ্রাসা-মসজিদ এর মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হচ্ছে।  আর এসব তৈরি করার পেছনে সহায়তার আবরণে উগ্র জঙ্গিবাদী মতাদর্শের কোনো প্রভাব নেই এমন কথা বলা সম্ভব নয়, সঠিক নয়।  যেখানে আবাসন সংকটে রোহিঙ্গা জনগণ ভোগান্তির শিকারÑ সেখানে তাদের সুবিধার কথা বিবেচনা না করে এইভাবে প্রচুর জায়গা দখল করে কারা, কেন এসব প্রতিষ্ঠা করছে সে বিষয়ে আশু নজরদারি অত্যন্ত প্রয়োজন। সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে যা মনে হয় তাতে বুঝা যায়, এখানে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সব পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি অথবা রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভাবনাচিন্তাও দীর্ঘমেয়াদি। এমনকি আমাদের বাংলাদেশে যে প্রতিষ্ঠান রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ব নিয়েছে তাদের পরিকল্পনাও অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি। সবকিছু মিলিয়ে একটা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে রাখার নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলেই দেখা যাচ্ছে। জাতিসংঘ এবং মানবিক সহায়তাকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আচরণেও সমস্যার আশু সমাধানের কোনো উদ্যোগ বা বক্তব্য কোনোটাই দেখা যায় না।
অং সান সু চি আগে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না, পরে বলছেন তিনি অত্যন্ত মর্মাহত- দুঃখিত; তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এরই পাশাপাশি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধান বলছেন, এরা বাঙালি এদেরকে এদেশ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিতাড়ন করতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়া স্থানীয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং সামরিক বাহিনীর সদস্য সবাই মিলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধ্য করছে।
সবকিছু মিলিয়ে দেখলে সমগ্র ক্যাম্পের মধ্যে রোহিঙ্গা যুবকদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যাদের পাওয়া যায় তারা নেহায়েতই সংখ্যায় অল্প। এদের উপস্থিতি অত্যন্ত নগণ্য। সাধারণ মানুষের অনুসন্ধিৎসা ও জিজ্ঞাসা যে, রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতিরা কেন এই ক্যাম্পগুলোতে অনুপস্থিত? কোথায় কার স্বার্থে কেন গিয়েছে বা কোথায় তাদের রাখা হয়েছে?  এবং নিশ্চয়ই এর পেছনে ভবিষ্যৎ কোনো পরিকল্পনা রয়েছে, যে পরিকল্পনা কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য শুভকর হবে না, কল্যাণপ্রদ হবে না। 
আমরা ভুলে আছি, আমরা ভুলে গেছি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পরে যে প্রত্যাবাসন অভিমুখী পাকিস্তানি জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসেছে সামাজিক বিষফোঁড়ার মতো, তারা আজও পর্যন্ত এদেশে বহাল তবিয়তে আছে। পাকিস্তান অথবা আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য সংস্থা অথবা জাতিসংঘ কেউ তাদের বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সক্রিয় কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। নানান রকম সামাজিক সমস্যা ও চাপ তৈরি হয়েছে এবং নিত্যনতুন হচ্ছে এই পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ থাকতে দেওয়ায়। এই সঙ্গে আরও ১১-১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা তাদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা বাংলাদেশকে করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এটা কতটা মানবিকÑ বিশ্ববাসী তা বিবেচনা করছে বলে অবস্থাদৃষ্টে বোধ হয় না। তাই বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত হবে অনতিবিলম্বে কার্যকরী কৌশলপত্র প্রণয়ন করে নিরবচ্ছিন্ন, নিরলসভাবে সমগ্র বিশ্বের বন্ধুরাষ্ট্র তথা জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের নিকট প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে এই রোহিঙ্গাদের অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা, কার্যকর উপায় বের করা এবং তা বাস্তবায়ন করা।  তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে এই বাংলাদেশÑ বাংলাদেশের সঙ্গে এই অঞ্চলে, আর এই অঞ্চলের সঙ্গে বিশ্ব পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠতে পারে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd