ঢাকা : মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর, ২০১৭ ১৩:৪৪:২৬
কেওড়ার আচারে শেফালী বিবির সাফল্য
শেখ আব্দুস সালাম, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)


 


নিজের সাহস, যোগ্যতা, আত্মনির্ভরশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম দ্বারা সমাজে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরিসহ পারিবারিকভাবে ভাগ্যের চাকা ঘুরালেন বনজীবী নারী শেফালী বিবি। অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানল মানবেতর জীবন। তার দীর্ঘ সংগ্রাম ও কৌশলের মধ্য দিয়ে বনজীবীদের কাছে নারী নেত্রী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেন। নিজের ভাগ্য উন্নয়নে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের হাল ধরেছেন। শেফালী বিবি নিজের প্রচেষ্টায় অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জন করে এলাকায় একটি রোল মডেল হয়েছেন।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বনজীবী অধ্যুষিত একটি ছোট গ্রাম দাতিনাখালী। মালঞ্চ নদীর পাড়ে এক টুকরো খাস জমির ওপর শেফালী বিবির (৪২) পরিবারের বসবাস। বংশগত পেশাজীবী বনজীবী ছবেদ আলী বছরের বার মাস সুন্দরবন থেকে মোম, মধু, মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা প্রভৃতি সম্পদ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। একমাত্র মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে ২ ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে ছোট একটি সংসার।
মুসলিম পরিবারের সদস্য হওয়াতে বাইরে বের হওয়া ও সাধারণ মানুষের সাথে চলাফেরার বিধি নিষেধ ছিল যথেষ্ট। কিন্তু মানুষ ও মানবতার জন্য কাজ করার প্রবল ইচ্ছাশক্তি চার দেয়ালের মধ্যে আটকা পড়ে যায়। কিন্তু অদম্যা সাহসী শেফালী বেগম দমবার পাত্র নয়। পরিবার ও সমাজের সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাকে আরো সাহসী ও কৌশলী হতে শেখায়।
ধীরে ধীরে বাইরের জগতে পদার্পণ ঘটতে থাকে তার। সুন্দরবনের স্থায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা ও সুন্দরবন নির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে কতিপয় প্রতিষ্ঠান দাতিনাখালী গ্রামে কাজ শুরু করলে শেফালী জীবিকার মানোন্নয়নে কতিপয় প্রতিষ্ঠান দাতিনাখালী গ্রামে কাজ শুরু করলে শেফালী বিবির এগিয়ে চলার পথ আরো বেশি মসৃণ হয়।
বিভিন্ন মিটিং, আলোচনা ও সভা সেমিনারে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গ্রামের মধ্যে হয়ে উঠে একজন টিম লিডার। সময়ের পরিক্রমায় বনজীবীদের মধ্যে সক্রিয় নারী নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। একের পর এক উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন করতে থাকে। পর্যায়ক্রমে ভাগ্যের চাকা পরিবর্তন হয়ে যায়। স্ত্রীর এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণাকারী স্বামী ছবেদ আলী বলেন, ‘আমার বউ প্রথমদিকে ঘরের বাইরে যেত না, মানুষের সামনে যেত না। প্রথম দিকে একটি এনজিওর কাজে বিমানে উঠে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল কিন্তু যায়নি। সে এখন মানুষ ও মানবতার জন্য ভালো কাজ করতে পারছে এতে আমি খুশি। সংসারের চাকা ভালোাভাবে ঘুরছে।’
চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করা শেফালী বিবি সুন্দরবন সুরক্ষা ও বনজীবীর জীবনের মান উন্নয়নের জন্য এলাকার বননির্ভর নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন দাতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠন। শতাধিক নারী সদস্য নিয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার কাজটি করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।
সংগঠনের সদস্যরা কেওড়ার চকোলেট, কেওড়ার শুকনা আচার, কেওড়ার জেলি (টক-ঝাল-মিষ্টি) ও কেওড়ার নোড়া এবং সুন্দরবনের সংগৃহীত মধু পরিশুদ্ধ করে বৈয়াম জাত করছে। মোম দিয়ে বিভিন্ন প্রকারের মোমবাতি, শোপিস শিট তৈরি করছে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে অর্গানিকভাবে প্রস্তুতকৃত এসব পণ্য আধুনিকতার ছোঁয়ায় বোয়াম/ প্যাকেটজাত করে বিক্রয় করছে। এসব পণ্য বিক্রয়ের লভ্যাংশ বিধবা ও বনজীবী নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যয় করছে।
সুন্দরবন ও বনজীবীদের নিয়ে কাজ করার শুরুতে ডাক পড়ে শেফালী বিবির। আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত বনজীবী নেতা শেফালী বিবি তার আর্থিক সফলতা সম্পর্কে বলেন, ‘এমন একদিন ছিল যে সময় মানুষ আমাদের চিনতো না, মুল্যয়ন করত না। এখন আমাদের সেই দিন পাল্টে গেছে। সমাজে আমাদের একটা জায়গা তৈরি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। নারীরা সমাজে অবহেলার পাত্র নয়, তারাও কাজ করে অর্থ উপার্জন করছে।’
ইতিমধ্যে শেফালী বিবি তার উপার্জিত অর্থ দিয় ২০ শতক জমি ক্রয় করেছেন। নিজের বসতঘর মজবুত করেছেন। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখাচ্ছেন। সংসারের অভাব ঘুচিয়েছেন।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নারীরা সঠিক ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সুউচ্চ দুষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজের সব ক্ষেত্রে পারদর্শিতা প্রদান করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মানকে সমুজ্জ্বল করতে পারবে।
প্রান্তিক জনপদের বনজীবী নারী শেফালী বিবির মতো অনেক উদ্যোগী নারী রয়েছেন, যাদের খুঁজে বের করে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করলে নারী-পুরুষ সমতা বিরাজ করবে, একই সাথে দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে আরও একধাপ, শক্তিশালী হবে দেশের অর্থনীতির চাকা।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সারা দেশ পাতার আরো খবর

Developed by orangebd