ঢাকা : বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম :

  • সরকার নদীখননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী          দক্ষতা-জ্ঞান-প্রযুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী           বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে          জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়নি : সিইসি          আ.লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি : প্রধানমন্ত্রী          মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে : অর্থমন্ত্রী          রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সু চিকে জাতিসংঘের অনুরোধ
printer
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর, ২০১৭ ১৩:৩৪:৩৪
দুবলারচরে দেশ-বিদেশের পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর ঢল
আতঙ্ক হরিণ নিধনের মহোৎসবের
শেখ আব্দুস সালাম, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)


 


আজ থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত চন্দ্রিমার আলোকমালায় শোভিত নীরব চরাঞ্চল সরব হয়ে উঠবে দেশ-বিদেশের পুণ্যার্থীদের প্রার্থনা, আরাধনা ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় দুবলারচরের রাসমেলা।
সাগর প্রকৃতির অভাবনীয় সৌন্দর্যের মাঝে পুণ্যার্জন আর আনন্দ-সঞ্চার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আগে থেকেই যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করেন দেশি-বিদেশি তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থরা। পাপ মোচন করেন সমুদ্র¯œানে সূর্যোদয়ে পানিতে ফল-ফুল ভাসিয়ে। অতঃপর ঢাক, ঢোলক, কাঁসা, মন্দিরা বাজিয়ে ভজন-কীর্তনে ভরিয়ে দেন চারপাশ। বাঙালি হিন্দুদের বার মাসে তের পার্বণের একটি হলো এই রাস উৎসব।
প্রকৃতির অকৃপণ হাতের সৃষ্টি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের সীমায় এই রাসমেলায় ঢল নামে দূর-দূরান্তের তীর্থযাত্রীর। জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ বনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন রহস্য আর রোমাঞ্চ ঘেরা। এ মেলায় দর্শনার্থীরা যান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভাবনীয় রূপমঞ্জরী ভরে উপভোগ করতে। নীরব সুন্দরবন প্রতি বছরের এই উৎসবের দিনগুলোতে যেন লোকালয় হয়ে জেগে ওঠে। বনের বুক চিরে জালের মতো ছড়ানো নদীগুলোতে লঞ্চ, ট্রলার, ইঞ্জিন নৌকার অবিরাম চলে ভটভট আওয়াজ।
মোলায় দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তায় বনরক্ষীদের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশের কঠোর টহল ব্যবস্থা। এখন মাছের মৌসুম হওয়ায় সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া প্রায় ১২ হাজার জেলে অস্থায়ী ডেরা গেড়েছে দুবলার চরে। পাখির কুঞ্জন সবচেয়ে আকর্ষণীয় হরিণের অপরূপ মায়াবী চোখ ও দেহ দিয়ে মেলাতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটক ও পুণ্যার্থীদের আকৃষ্ট করে। দুবলার চরের আশেপাশে হরিণের পাল বেশি দেখা যায়। আছে অসংখ্য বানর, মদনটাক, মাছরাঙা ইত্যাদি পশুপাখি। ভাগ্য ভালো থাকলে বাঘের দেখা যেতে পারে।
সাগর উপকূলে প্রশস্ত বনভূমি। পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ব-দ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার উপকূলজুড়ে। এই মেলাকে ঘিরে প্রতি বছর হরিণ শিকারিদের তৎপরতা চলে। মেলার দুই সপ্তাহ পূর্ব থেকেই শুরু হয়েছে চোরা শিকারিদের হরিণ শিকারের তৎপরতা ও মহড়া। ইতিমধ্যে চোরা শিকারিরা বিভিন্ন ছদ্মাবেশে প্রবেশ করতে শুরু করেছে বনাঞ্চলে। অনেকে বনজীবী সেজে বন বিভাগ থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরার পারমিট নিয়ে হরিণ শিকারের ফাঁদসহ বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে ঢুকে পড়েছে বন অভ্যন্তরে।
বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন ৮টি উপজেলার শতাধিক শিকারী চক্র মেতে ওঠে মায়াবী চিত্রল হরিণ নিধনের মহোৎসবে। পরিবেশবিদদের ধারণা, সারা বছর সুন্দরবন থেকে যে পরিমাণ হরিণ শিকার হয়, রাসমেলাকে ঘিরে তার চেয়ে বেশি সংখ্যক হরিণ শিকার হয়ে থাকে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে মেলাকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মেলা উপলক্ষে রাস পূর্ণিমায় নিরাপদে যাতায়াতের জন্য তীর্থযাত্রীদের জন্য সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ ৮টি পথ নির্ধারণ করেছে। এ সকল পথে বিভাগ, পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনী যাত্রী ও দর্শনার্থীদের জান মালের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।
নাইলনের ফাঁদ, জাল পেতে, স্প্রিং বসানো ফাঁদ, বিষ টোপ, তীর বা গুলি ছুড়ে, কলার মধ্যে বঁড়শি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা ফাঁদসহ পাতার ওপর চেতনানাশক ঔষধ দিয়ে নিধন করা হয়ে থাকে বিপুল সংখ্যক হরিণ। শুধু এখানেই শেষ নয়, কোনো ফাঁদে হরিণ ধরা পড়লে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থানরত শিকারিরা ছুটে গিয়ে আটক হরিণকে লাঠিপেটা করে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে জবাই করে। এরপর চামড়া, শিংসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ পাঠিয়ে দেওয়া হয় উপযুক্ত ক্রেতাদের কাছে। মেলা উপলক্ষে দর্শনার্থী ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব চোরা শিকারিরা সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট, দুবলারচর, আলোর কোল, কটকা, কচিখালী, দুবলার চান্দেশ্বর, বগি, চরখালী, তালপট্টিসহ যে সকল এলাকায় হরিণের বেশি বিচরণ, শিকারিরা সেসব এলাকায় ফাঁদ দিয়ে শিকার করে হরিণ।
তবে এবার মেলাকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠোর। এজন্য সুন্দরবনজুড়ে বন বিভাগ, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে মেলা চলাকালীন জারি করা হয়েছে অঘোষিত রেড এলার্ট। বাতিল করা হয়েছে বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটি। এত নিরাপত্তার চাদর ভেদ করে কিভাবে এবং ঠিক কি পরিমাণ হরিণ শিকার হয় তাই-ই এখন দেখার বিষয়। হরিণ নিয়ে এমন চিত্র বলে দেয় সুন্দরবনের গহিনেও ভাল নেই অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় নিরীহ প্রাণীরা।
খুলনার কয়রা উপজেলার ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর জনপদের বহু মানুষ এক প্রকার পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছে হরিণ শিকার। সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা, পাইকগাছা, শ্যামনগর এলাকায় প্রতি কেশি হরিণের মাংস পাওয়া যায় মাত্র ৪০০-৫০০ টাকায়। কখনো কখনো তাদের তাদের দু’একজন গ্রেফতার হলেও অধিকাংশই রয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তবে বন বিভাগের চেয়ে পুলিশের হাতে মাংস উদ্ধারের ঘটনা বেশি ঘটে থাকে।
লোকালয় থেকে বহুদূরে সুন্দরবনের দক্ষিণে কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে বিচ্ছিন্ন চর দুবলার আলোর কোলের এই রাস উৎসব ধারন করে আসছে বহু বছরের ইতিহাস। ধারণা করা হয়, ১৯২৩ সালে ঠাকুর হরিচাঁদের অনুসারী হরি ভজন নামে এক হিন্দু সাধু এই মেলা শুরু করেছিলেন। এই সাধু চব্বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনে গাছের ফলমূল খেয়ে জীবন যাপন করতেন। অন্য মতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অবতার শ্রীকৃষ্ণ কোন এক পূর্ণিমা তিথিতে পাপ মোচন এবং পূর্ণ লাভে গঙ্গা¯œানের স্বপ্নাদেশ পান। সেই থেকে শুরু হয় রাসমেলার।
শত শত নৌকা, ট্রলার ও লঞ্চের সমাগমে স্থানটি সজ্জিত হয়ে ওঠে আলোর ঝলকে। সন্তানহীন ধর্মানুরাগী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা দুবলার মেলায় মানত করেন এবং মেলায় এসে মানতকারীরা আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করে থাকেন। মেলায় বাদ্য, নৃত্য, গীত ও বিবিধ প্রকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে। পশার বসে কুঠির শিল্পের দোকান ছাড়াও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, ফল-ফলাদি, মিষ্টান্ন, মনোহরি সামগ্রীর। এ মেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও আসেন ভারত, আমেরিকা, মিয়ানমারসহ আশপাশ দেশের বিদেশি পর্যটক।
মেলা বিষয়ে সাতক্ষীরা বন বিভাগের এসিএফ সৈয়েব খান বলেন, রাসমেলাকে ঘিরে বনবিভাগের তরফ থকে তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীদের কঠোর নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। মেলাকে ঘিরে সকলের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। কেউ যদি অপরাধ করে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যে কোন মূল্যে হরিণ নিধন কঠোর হস্তে দমন করা হবে। আমরা আশা করছি, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে রাসমেলা সমাপ্ত হবে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সারা দেশ পাতার আরো খবর

Developed by orangebd