ঢাকা : শনিবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • আঞ্চলিক দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে নারীরা এগিয়ে : চুমকি          তিন হাজার বিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে          সরকারের কাজ সম্পর্কে জনগণকে ধারণা দিতেই উন্নয়ন মেলা          পাবলিক পরীক্ষায় অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা : শিক্ষামন্ত্রী           সালেই বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে : মেনন          বিশ্ব ইজতেমায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে শতশত মুসুল্লি
printer
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর, ২০১৭ ১০:৫৬:৫৮
কুমড়া ও মাসকলাই ডালের বড়ি পুষ্টিতে বাহারি
হতে পারে অর্থকরী রপ্তানি পণ্য
শেখ আব্দুস সালাম, সাতক্ষীরা


 


ভোজনরসিক বাঙালির নানা রকম খাবারের মধ্যে জনপ্রিয় একটি খাদ্য হলো বড়ি। গাঁয়ের বধূরা আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে তৈরি করেন এ সকল বড়ি সমাহার।
দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের গ্রামীণ পরিবেশের অনেক পরিবারে দেখা যায় পারিবারিক পুষ্টি খাদ্য হিসাবে বাহারি বড়ির সমাহার। বিশেষ করে গ্রামের নারীরা লোকায়ত জ্ঞান প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এ সকল বড়ি তৈরি করেন। শীতকালে গ্রামীণ ঐতিহ্যের বড় অংশ হলো এই বড়ি।
শীতকালে গ্রামের নারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন এই বড়ি তৈরিতে। মাসকলাই ডাল ও চালকুমড়া মিশিয়ে এ সুস্বাদু বড়ি তৈরি করা হয়। উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা শত শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য কয়েক মাস আগ থেকে চাহিদামতো চালকুমড়া পাকানোর ব্যবস্থা করে থাকেন।
নতুন মাসকলাই ও চালকুমড়া ঘরে আসার সাথে সাথে বড়ি তৈরির ধুম পড়ে যায়। মাসকলাই ডালকে পানিতে ৫-৬ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে ভালোভাবে হাত দিয়ে চটের ছালায় ঘষে ডালের খোসা ছাড়ানো হয়। তারপর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে মসলা বাটার শিলপাটা অথবা অন্য যে কোন উপায়ে পিষে পেষ্ট বানানো হয় এবং খুব সকালে পাকা কুমড়াকে লম্বালম্বিভাবে কেটে নারিকেল কুরানি দিয়ে কুমড়োর বিচি আলাদা করে নিতে হয়। এরপর কুমড়ার খোসা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছাড়ানোর পর মিহি করে পেষ্ট বানানো হয়।
এরপর মাসকলাইয়ের পেষ্ট ও কুমড়ার পেষ্ট একটি মসলা বাটার শিলপাটা বা পাতিলে নিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে সারা রাত রেখে দেওয়া হয়।
পরের দিন ভোর হতে পাতিলে নিয়ে মিশ্রণটি বড়ি তৈরির জন্য হাত দিয়ে ফেনাতে (নাড়াচাড়া) করতে হয়। মিশ্রণ সঠিকভাবে হয়েছে বুঝতে মাঝে মাঝে বড়ির আকৃতির করে পানির পাত্রে ছেড়ে দিতে হয়। যদি তা যদি ডুবে যায় তবে আরও ফেনাতে (নাড়াচাড়া) হয় যতক্ষণ সেটা আংশিক না ভাসে। আংশিক ভাসলে বুঝতে হবে বড়ি তৈরির উপযোগী হয়েছে। এই মিশ্রণটি হাত দিয়ে যতনে বড়ি তৈরি করে রোদে শুকিয়ে পাত্রে ঢেকে রাখা হয়। যেটা স্বাদ অক্ষুন্ন রেখে ২ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার প্রায় সকল গ্রামেই নারীরা মনের মাধুরী মিশিয়ে ডাল-কুমড়ার বড়ি তৈরি করছেন। উপজেলার তালবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ময়না রানী, আভা রানী, কল্পনা রানী ও সুনিতা রানী খুবই ব্যস্ত এই বড়ি তৈরীতে। এ প্রসংগে তারা বলেন, এটা আমাদের একটি ঐতিহ্য। প্রতি বছর শীতকালে আমরা এই বড়ি তৈরি করি। সব ধরনের মাছ ও তরকারীর সাথে এটা রান্না করে খাওয়া যায়।
উপজেলার সদরের হায়বাতপুর গ্রামের কৃষি ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি আমার এক আত্মীয়ের জন্য খুলনায় এই বড়ি নিয়ে যাই। সেখানে এক দোকানদারের সাথে আলাপকালে তিনি আমার মাধ্যমে ১০ কেজি বড়ি সংগ্রহ করেন। সেই থেকে আমি দেশের বিভিন্ন স্থানে এই বড়ি সরবরাহ করি। এটি খুবই লাভ জনক একটি ব্যবসা। ওজন কম হওয়ার কারনে অল্প খরচে বহন করা যায় ও বেশি লাভের সুযোগ আছে। সরকার সুযোগ দিলে আমি এটা বিদেশেও পাঠাতে চাই। বিদেশে অবস্থানরত বাঙালীদের জন্য এটি একটি সুখাদ্য হতে পারে, যার কারণে সরকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে।
মাসকলাই ডালের সাথে চাল কুমড়া ছাড়াও পাতাকপি, ওলকপি, বীটকপি, বেগুন, আলু, মুলা, কচু, পেঁপে প্রভৃতির মিশ্রনেও এই বড়ি তৈরী করেন উপকূলীয় অনেক নারী। গ্রামীণ নারীরা লোকায়ত পদ্ধতিতে নীরব-নিভৃতে পারিবারিকভাবে জনপ্রিয় ও সুস্বাদু খাদ্য হিসাবে বড়ি তৈরি ও সংরক্ষণ করে চলেছেন।
সময়ের পরিক্রমায় নিজেদের পরিবারের খাওয়ার জন্যই নয় বর্তমানে বাজারে চাহিদা থাকায় অনেক নারী এ পেশাকে ব্যবসা হিসাবে নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বড়ির পুষ্টিগুণ অনেক বেশি, পেটের জন্য বেশ উপকারী, রুচিসম্মতভাবে খাওয়া যায়।
সে কারণে যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তবে এটি দেশের একটি অর্থকরী পণ্যে পরিণত হওয়া সম্ভব। এতে গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী হয়ে সংসারের উন্নতিতে সহায়ক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd