ঢাকা : রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পবিত্র আশুরা ১০ সেপ্টেম্বর          ডিএসসিসির ৩,৬৩১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা          রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর          সংলাপের জন্য ভারতকে ৫ শর্ত দিল পাকিস্তান          এরশাদের শূন্য আসনে ভোট ৫ অক্টোবর          বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই : হাছান মাহমুদ
printer
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৭:০৫:৫৭আপডেট : ২৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ১১:৩৪:৫৪
আরসা কার স্বার্থে
করীম রেজা


 


২০১২ সালে রাখাইনে সহিংস নির্যাতনের পর আরাকান রাখাইন স্যালভেশন আর্মি সংক্ষেপে ‘আরসা’র আত্মপ্রকাশ ঘটে। আরবিতে বলা হয় ‘আল ইয়াকিন’। আতা উল্লা পরিচয়ের একজন রোহিঙ্গা এই গেরিলা দলের প্রধান। জন্ম পাকিস্তানে হলেও বেড়ে ওঠা সৌদি আরবে। সামরিক সক্ষমতা তেমন নেই। পুরনো কিছু সেকেলে অস্ত্র তাদের সম্বল। আর আছে তীর-ধনুক, চাকু, লাঠি, ধারালো বাঁশ ইত্যাদি। গত বছর ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে সীমান্ত রক্ষী হত্যার দাবি করে আরসা বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর টানে।

আরসার ভূমিকা
২৫ আগস্টের আরসার হামলার পরিণতি, রোহিঙ্গার ঢল; সীমান্ত অতিক্রম করে ৬ লাখের ওপর রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। অল্প কয়েকদিনে কয়েক লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্য দেশে শরণার্থী হওয়া বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। অং সান সু চি কর্তৃক গঠিত কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর পরই আরসা এই ঘটনা ঘটায়। রোহিঙ্গাদের আগমন এখনও চলছে। প্রত্যাবাসনের খুঁটিনাটি নিয়ে যখন ঢাকা-নেপিডো আলোচনা চলছে, তখনও থেমে নেই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ। উৎকোচের বিনিময়ে মিয়ানমার সেনা সদস্যরা তাদের দেশত্যাগের সুযোগ দিচ্ছে। ২১ জানুয়ারি রোববার গণমাধ্যমে মিয়ানমার থেকে সদ্য আগত এক পরিবারের সাক্ষাৎকারে জানা গেছে এমন তথ্য।
মাঝখানে গত বছরের সেপ্টেম্বরে আরো একবার হামলা চালায় আরসা। কয়েকদিন পর একতরফা অস্ত্র বিরতিও ঘোষণা করে- যার কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। প্রত্যাবাসনের চুক্তি সইয়ের প্রাক্কালে আবারও হামলা পরিচালনা করে আরসা। বাকি সময়ে নীরব থাকলেও দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গা প্রশ্নে যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা আলোচনার সূত্রপাত হয় তখনই আরসা মাঠে নামে।
ক্রান্তিকালে হঠাৎ প্রকাশ এবং আচরণ কার স্বার্থে? রোহিঙ্গার স্বার্থে হলে লাগাতার কার্যক্রম নেই কেন?  আরসার সব ঘটনা রোহিঙ্গাদের বিপক্ষে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পক্ষেই যায়। কোনো নীল নকশা অনুযায়ী কি তারা হামলা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করছে?

আরসার সামরিক সক্ষমতা
আরসার সামরিক এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ছাড়াও সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যেও সন্দেহ আছে। হঠকারী আক্রমণের দ্বারা সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করা ছাড়া তাদের আর কোনো বিশেষ ভূমিকা দেখা যায় না। আক্রমণের পর তারা আত্মগোপন করে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরসা বা আল ইয়াকিন সংগঠনের কোনো জনপ্রিয়তা নেই। কেউ কেউ আরসা বা আতাউল্লার নাম শুনলেও অধিকাংশই তাদের বিষয়ে অজ্ঞ। কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে যোগসাজশও প্রমাণিত নয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের কথা মুখে বললেও বাস্তব ভূমিকায় তার প্রতিফলন নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিবৃতি বা ভিডিও প্রচারে তাদের অধিকাংশ কাজকর্ম সীমিত।

পেছনের কথা
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ঘটনার আগে এতদঞ্চলে পাকিস্তানের একজন উঁচু পদের সামরিক কর্মকর্তার উপস্থিতির কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আতাউল্লা পাকিস্তানের নাগরিক। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মিয়ানমার বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের স্বার্থে কাজ করেছে। শত্রুর শত্রু আমার মিত্র, এই আপ্তবাক্য বিবেচনায় ধরে রোহিঙ্গা বিতারণে আরসার আক্রমণের অজুহাত, পাকিস্তানি কর্মকর্তার সফর, গেরিলা কায়দায় আরসার হামলা এবং দীর্ঘ নীরবতা এসব একই সূত্রে গাঁথা কিনা তা সতর্কতার সঙ্গে বিচার করা দরকার। আরসার আচরণ মিয়ানমার সেনাবাহিনী শক্ত এবং যুক্তিসঙ্গত অজুহাত হিসেবে চালিয়ে আসছে।
আরসা, মিয়ানমার সেনা এবং প্রত্যাবাসন
যুক্তির খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয়, আরসা রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই গঠিত হয়েছে। কিন্তু কোনো এক সময়ে নেতৃত্বের একাংশ কিংবা পুরো নেতৃত্বই মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে কোনো আঁতাতে। আদর্শিক, নৈতিক বা ব্যক্তি স্বার্থের দ্বন্দ্ব কিংবা নেতৃত্বের স্খলনও আরসাকে সামরিক বাহিনীর ক্রীড়নকে পরিণত করে থাকতে পারে।
সম্প্রতি সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে রোহিঙ্গা হত্যার কথা। একটি গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে। সেনাপক্ষের দাবিÑ নিহতরা ছিল সন্ত্রাসী। যদিও কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। হত্যায় জড়িত সেনা সদস্যদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি। তারা কোনো শাস্তির আওতায় আসবে কিনা তাও পরিষ্কার নয়। অনেকেই অবাক হয়েছেন তবু এই স্বীকারোক্তিকে শুভবুদ্ধির সূচনা হিসেবে দেখতে আগ্রহী। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, এই গণকবর আবিষ্কারের কয়েকদিন আগেই আরসা একটি হামলার কথা স্বীকার করে। ঘটনাটি কতটা কাকতালীয় তা খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ এ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর অস্বীকার করে যাওয়ার লাগাতার প্রবণতার সঙ্গে তা একবারেই সামঞ্জস্যহীন। আবারো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আগে আগে আরসার আক্রমণ অন্য কোনো বার্তা বহন করে কিনা? পরবর্তী পর্যায়ে মিয়ানমারের সাবেক সেনাপ্রধানও দাবি করলেন- রাখাইন শান্ত রয়েছে। অথচ বিশ্ববাসী জানে, এখনও মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে প্রবেশ বন্ধ হয়নি। দেশত্যাগ নিরুৎসাহিত করায় মিয়ানমারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।
প্রত্যাবাসন নিয়ে আশঙ্কা শুরু থেকেই ছিল, আছে এবং বোধ করি থাকবে। বিদেশি রাষ্ট্রগুলো চুক্তির বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ অব্যাহত রেখেছে। এখনও মিয়ানমার জাতিসংঘের কোনো পরিদর্শক দলকে রাখাইনে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে জাতিসংঘের কোনো অঙ্গ সংস্থাকে যুক্ত করতে মিয়ানমার এখনও অনিচ্ছুক। আর বাংলাদেশ মিয়ানমারের সব আপত্তি আবদার মেনে চুক্তির শর্ত নির্ধারণ করছে। কয়েকটি দেশ বাদে পৃথিবীর জনগণ, রাষ্ট্র বাংলাদেশের পক্ষে। যা হওয়ার তা হয়েছে অর্থাৎ ১০-১২ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসেছে। সহসা তারা ফেরত যাবে তেমন দুরাশা কেউ স্বপ্নেও করে না। কয়েক দশক লাগলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তাহলে বাংলাদেশ কেন মিয়ানমারের চাপিয়ে দেয়া অন্যায্য শর্তে রাজি হয়? গভীর বৈশ্বিক কোনো পরিকল্পনার বেড়াজালে কি বাংলাদেশের মানবিকতা আটকে গেল?

শেষ কথা
প্রত্যাবাসন শুরুর আগেই যাতে জাতিসংঘ, এর অঙ্গ সংস্থা এবং মানবিক সাহায্য সংস্থা বিনা বাধায় রাখাইনে তাদের কার্যক্রম শুরু এবং মিয়ানমার সরকারের উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ বা তদারক করতে অবাধ প্রবেশাধিকার পায় তা নিশ্চিত করার দ্বারাই স্বেচ্ছায় তাদের ফিরে যাওয়া সম্ভব। সব নাগরিক অধিকার নিয়ে সসম্মানে বাস করার নিশ্চয়তা না থাকলে এই প্রত্যাবাসন আগের মতোই অকার্যকর হবে। কিছুদিন পর আবার তারা বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে বাংলাদেশেই ফিরে আসবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দফতর ন্যায্য দাবিতে অটল থাকলেই কেবল তা সত্যিকার ফলদায়ক হতে পারে। নয়তো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ, E-mail : karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd