ঢাকা : রোববার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে : সিইসি          নির্বাচনের তারিখ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই : সিইসি          দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১০:০৭:৫৩
রোহিঙ্গাদের নিয়ে মননশীল মানবিক উপন্যাস ‘সীমান্তের ওপারে’
লেখক : সিরাজুল ইসলাম এফসিএ
বজলুর রায়হান

 

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানবপ্রেম শাশ্বত সুন্দর। বলা হয়Ñ ‘মানুষ মানুষের জন্য।’ কিন্তু এর বিপরীত ঘটনা ঘটছে মিয়ানমারে। সেখানে চলছে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে অমানবিক কর্মকা-। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে জাতিগতভাবে নিধনের ঘৃণ্য চেষ্টা চালাচ্ছে সেদেশের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা নিষ্ঠুর মিয়ানমার আর্মি। নানা গণমাধ্যমে উঠে আসছে সেদেশে বসবাসকারী বিশেষত রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমান ও হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা। ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে মিয়ানমার বাহিনী সে দেশের নিরীহ সহজ-সরল রোহিঙ্গাদের ওপর। ধর্মীয় সংঘাত সেখানে প্রবল হয়ে উঠেছে। বর্বরোচিত, জঘন্যতম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে রোহিঙ্গা শিশু-নারীসহ সকল বয়সের মানুষকে। গুলি করে হত্যা, আগুনে পুড়িয়ে নির্মম অত্যাচার চালিয়ে খুন, নারী ধর্ষণ, বাড়িঘর সহায়-সম্পদ গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করাÑ কোনো কিছুই বাদ রাখেনি মিয়ানমার বাহিনী। তাদের সহযোগী হিসেবে রয়েছে উগ্রবাদী বৌদ্ধ সম্প্রদায়, যারা অহিংসার বাণী ধারণ করে সাম্প্রতিককালে নির্মম অত্যাচার চালিয়ে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করছে। বৌদ্ধভিক্ষুদের হাতে অস্ত্র দেখে অবাক হতে হয়। ‘অহিংসা পরম ধর্ম’Ñ এ আপ্তবাক্যে বিশ্বাসীরা যখন খড়গ হাতে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর আচরণ করে তখন বিশ্ব বিবেক স্তম্ভিত হয়। রোহিঙ্গারাও মানুষ। এই সুন্দর বসুন্ধরায় তাদেরও বাঁচার অধিকার রয়েছে। কিন্তু এ কথা মানতে চায় না মিয়ানমারের স্বৈরাচার। জাতিগতভাবে রোহিঙ্গা নিধনকে তারা দৈনন্দিন কর্ম রোহিঙ্গাদের নিয়ে মননশীল মানবিক উপন্যাস ‘সীমান্তের ওপারে’
হিসেবে বেছে নিয়েছেÑ যে কারণে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর আসছে নির্যাতিত নিষ্পেষিত রোহিঙ্গারা দেশত্যাগ করছে জীবন বাঁচাতে। রোহিঙ্গারা নিজে ভূমি ছেড়ে আশ্রয় নিচ্ছে মানবিক বাংলাদেশে। দলে দলে আসছে ওরা। নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে, স্বজন-পরিজন হারিয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ঠাঁই খুঁজে ফিরছে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া মিয়ানমার বাহিনীর বর্বর হামলা সাম্প্রতিককালের জঘন্যতম ঘটনাগুলোর অন্যতম। এরকম প্রেক্ষাপটে কবি ও কথাসাহিত্যিক সিরাজুল ইসলাম এফসিএ রোহিঙ্গা জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখেছেন ‘সীমান্তের ওপারে’ উপন্যাস। রোহিঙ্গাদের নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদন, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় রোহিঙ্গাদের কীভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন-অত্যাচারসহ হত্যা করা হয়েছে তার বিশদ বিবরণ উঠে আসছে। থেমে নেই বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনস্রোত। ওরা আসছে। রাখাইন থেকে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা আসছেই। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। লেখক সিরাজুল ইসলাম এফসিএ তথ্য-উপাত্ত এবং ঘটনাপরম্পরায় ‘সীমান্তের ওপারে’ উপন্যাস অত্যন্ত আবেগ দিয়ে রচনা করেছেন।
রোহিঙ্গাদের ২ হাজার বছরের ইতিহাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাংলাদেশের অবস্থান, কফি আনান কমিশনের সুপারিশসমূহ এবং চিরন্তন প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-যন্ত্রণা, দুঃখ-বেদনা আর অসহায়ত্বের বাস্তব মর্মস্পর্শী ছবি উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন জীবন, কর্মধারা, তাদের আবেগ-অনুভূতি, মানসিকতা, সামাজিক অবস্থা, ধর্মীয় অনুশাসন; তাদের দারিদ্র্য, রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন-শোষণের কথা সহজ সরল ভাষায় উঠে এসেছে ‘সীমান্তের ওপারে’ উপন্যাসে।
এ উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র সাদ। যে তার শৈশব-কৈশোর থেকে বেড়ে উঠেছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে। কৃষক পরিবারের সন্তান সাদের কৈশোর কেটেছে নিজেদের মহিষ চরানোর কাজে। খুব সুন্দর করে বাঁশের বাঁশি বাজাতে পারে সাদ। ওর বাঁশির সুরে মুগ্ধ প্রতিবেশী গোল চেহের। সাদ ভালোবাসে গোল চেহেরকে। দুজনের ভাব-ভালোবাসার সংলাপ আবেগময় ভাষায় লেখক যেভাবে উপস্থাপন করেছেন মনে হয় যেন এগুলো কবিতা। সাদের প্রেমিকা গোল চেহের ধর্ষিত হয় মিয়ানমার আর্মির দ্বারা। এরপর নির্যাতন সইতে না পেরে অকালে ঝরে যায় গোল চেহের। অনেক মৃত্যু শোক-দুঃখ, যন্ত্রণায় দগ্ধ সাদের জীবনে এরপর আসে নুরাক্তিম। ওরা ঘর বাঁধে। সংসার বড় হয় সন্তানের কলকাকলিতে। এরপর ওদের জীবনে নেমে আসে নির্মম নির্যাতনের চূড়ান্ত আঘাত। সাদের চোখের সামনে ঘটে অবর্ণনীয় ঘটনা। ওর বসতবাড়ি আর স্ত্রী-সন্তানের আগুনে পুড়ে যাওয়ার নিষ্ঠুর ঘটনা সাদকে দেখতে হয় বনে লুকিয়ে। একমাত্র জীবিত সন্তান রাদকে নিয়ে ও পাহাড়-জঙ্গল-নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত হয়। সীমান্ত পেরিয়ে সাদ ও রাদের মানবিক আশ্রয় জোটে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এখানেও সাদের জীবনে অসংখ্য প্রশ্ন। মিয়ানমারে ফেলে আসা জন্মভিটায় আর কোনো দিন ফিরে যেতে পারবে কি সাদ এবং শরণার্থী অন্য রোহিঙ্গারা?
এ উপন্যাসের আরো এক বিশেষ চরিত্র আয়াস। যে রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে বেছে নিয়েছে সংগ্রামী জীবন। তার জীবনেও ছিল অধ্যয়নকালের সঙ্গী শকুরা। যাকে বারবার ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে নরপশুদের লালসা মিটাতে। আয়াস স্বজাতির অধিকার আদায় ও মুক্তির জন্য অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদে হাতে তুলে নিয়েছে অস্ত্র। নিয়েছে গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। মিয়ানমার আর্মি এবং বৌদ্ধ ও মগদের বিরুদ্ধে সোচ্চার, সংগ্রামী আয়াস ও তার সঙ্গীরা কি পারবে অভীষ্ট অর্জন করতে!
কবি ও কথাসাহিত্যিক সিরাজুল ইসলাম এফসিএর জন্ম ১৯৭৬ সালের ২০ আগস্ট। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তিনি ১৯৯২ সালে এসএসসি পাস করার পর লেখালেখিতে যুক্ত হন। তার প্রথম যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘ভালোবাসা’ ১৯৯৭ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়। তার প্রথম উপন্যাস ‘শিশির ভেজা পথ’ প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালের অক্টোবরে। এটি প্রকাশ করেছে সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা অমর প্রকাশনী। এ লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বিবর্ণ প্রহরে’। এ উপন্যাসটিও অমর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালের অক্টোবরে। সিরাজুল ইসলামের তৃতীয় উপন্যাস ‘হৃদয়ের গভীরে তুমি’ প্রকাশ করেছে অমর প্রকাশনী। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৮তে প্রকাশিত হয়েছে রোহিঙ্গাদের জীবন নিয়ে লেখা অসাধারণ উপন্যাস ‘সীমান্তের ওপারে’। এ উপন্যাসে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণিত হয়েছে রোহিঙ্গাদের অতীত ও বর্তমান জীবন নিয়ে মর্মস্পর্শী বেশ কিছু ঘটনা, যা পাঠক মনে নাড়া দেবে। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন, নিষ্ঠুরতা, নিষ্পেষণ-অত্যাচার-অনাচারসহ তাদের আর্তনাদের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে ‘সীমান্তের ওপারে’ উপন্যাসে। একটি তথ্যবহুল মননশীল মানবিক উপন্যাস হিসেবে একে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়।
চরিত্র চিত্রণে লেখক সিরাজুল ইসলাম এফসিএ আন্তরিকতার সঙ্গে নিবিষ্ট থেকেছেন এ উপন্যাসের পাতায় পাতায়। বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে ‘সীমান্তের ওপারে’ উপন্যাস এক অনন্য সংযোজন।
১২৮ পৃষ্ঠার উপন্যাস ‘সীমান্তের ওপারে’। এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। অমর প্রকাশনী থেকে অমর হাওলাদার বাবুল উপন্যাসটি প্রকাশ করেছেন। দাম ২৮০ টাকা এবং ১০ ইউএস ডলার।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাহিত্য-সংস্কৃতি পাতার আরো খবর

Developed by orangebd