ঢাকা : বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • ডিএসসিসির ৩,৬৩১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা          রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর          সংলাপের জন্য ভারতকে ৫ শর্ত দিল পাকিস্তান          এরশাদের শূন্য আসনে ভোট ৫ অক্টোবর          বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই : হাছান মাহমুদ
printer
প্রকাশ : ২৫ মার্চ, ২০১৮ ২৩:১৬:২১আপডেট : ২৫ মার্চ, ২০১৮ ২৩:৩১:৪০
বিশ্ব মানবতার নেত্রী শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশের এগিয়ে চলা
বজলুর রায়হান


 


স্বাধীনতা বাঙালির মহান অর্জন। স্বাধীনতা আত্মমর্যাদা বোধের অনন্য স্মারক। এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং স্বাধীনতার মহান স্থপতি। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার যে উদাত্ত আহ্বান জানান, তাতে কোনো বাঙালি ঘরে স্থির হয়ে বসে থাকতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার প্রত্যয়দীপ্ত শপথ নেয় বাংলার মানুষ। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত হতে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। এর আগে ২৫ মার্চ কালরাতে নিরীহ-নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালির ওপর আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। হত্যা করা হয় এদেশের অসংখ্য মানুষকে। এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ এবং বর্বরতার প্রতিবাদে বাংলার ছাত্র ও যুবসমাজ, পেশাজীবী মেহনতি মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বাংলার ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হলেন, সম্ভ্রম হারালেন দুই লক্ষাধিক মা-বোন। দেশের আলোকিত সূর্য সন্তান অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমপর্ণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বাঙালি জাতি পেল লাল-সবুজ পতাকা, পেল স্বাধীন ভূখণ্ড।
মুক্তির রূপরেখা
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে) জনসমুদ্রে দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাঙালি জাতির  হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে যে ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সবচেয়ে বড় অনুঘটকের কাজ করেছে, সেটি হলো-৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেয়া সেই ভাষণ। মাত্র ১১৩৮ শব্দের একটি অলিখিত ভাষণ কীভাবে গোটা জাতিকে জাগিয়ে তুলে, স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ তার অনন্য উদাহরণ।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণের দিনটি এবার এসেছে ভিন্ন মহিমায়। ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি  অর্জন করেছে। সুদীর্ঘ আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি, কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ পৃথিবীর কোনো ভাষণের সঙ্গে তুলনা হয় না। ভাষণের বহুমাত্রিকতা ও বৈশিষ্ট্য ইতিহাসের নতুন উপাদান। আব্রাহাম লিঙ্কন, মার্টিন লুথার কিংয়ের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল লিখিত। আর বঙ্গবন্ধুরটি অলিখিত এবং তাৎক্ষণিক। মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণটি সেদিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিল মানুষ। পেয়েছিল তাদের কাক্সিক্ষত সব দিকনির্দেশনা। বারুদের মতো জ্বলে উঠেছিল দেশ।  কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর এই ভাষণকে একটি ‘মহাকাব্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, আর যিনি এই ভাষণ দিয়েছেন, তাঁকে বলেছেন ‘মহাকবি’।  আর ৭ই মার্চের এই  ভাষণ বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ উইক পত্রিকা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘রাজনৈতিক কবি’ উপাধি দিয়েছিল।
পাকিস্তানি শাসকরা ২৫ মার্চ রাতে যে হামলা চালিয়েছিল, সেটি চালানোর পরিকল্পনা ছিল ৭ মার্চে। তারা ঠিক করে রেখেছিল, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই হামলা চালাবে, বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করা হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাদের চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাই ওই ভাষণে তিনি দক্ষতার সঙ্গে  প্রতিটি শব্দ চয়ন করেছেন, যাতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেটিকে তাৎক্ষণিক স্বাধীনতার ঘোষণা বলে প্রমাণ করতে না পারে। কিন্তু কৌশলে এমনভাবে বললেন যেটি ছিল আসলে স্বাধীনতারই ঘোষণা।
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ও মুক্তিযুদ্ধ একই সূত্রে গাঁথা। বাঙালির মুক্তির সনদ। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণের মাধ্যমে পুরো জাতি অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠ ভাষণেই শুরু হয়ে যায় কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রস্তুতি। ৩০ লাখ বাঙালির বুকের তাজা রক্তে, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার যে বিজয় মুকুট পরেছে বাংলাদেশ- তার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই।

 

বস্তুত বাঙালির সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির রূপরেখা এই ঐতিহাসিক ভাষণেই রয়েছে। কোটি প্রাণের আবেগকে একজন জননায়ক কীভাবে তাঁর কণ্ঠে ধারণ করেন ৭ই মার্চের ভাষণ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত বছর ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণটিকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটিই এমওডব্লিউতে সংরক্ষিত বাংলাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক কোনো দলিল। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ৭ মার্চ বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসে ও জাতীয় জীবনে এক সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ আমাদের ইতিহাস এবং জাতীয় জীবনের এক অপরিহার্য ও অনস্বীকার্য অধ্যায়; যার আবেদন চির অম্লান।

 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় ফিরে এলেন। তিনি ফিরে দেখলেন এদেশটিতে বর্বর হায়েনারা কীভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। কীভাবে নষ্ট করা হয়েছে এদেশের মানুষ ও সম্পদ। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতার প্রশংসা করে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করে দেশকে নতুনরূপে গড়ে তুলতে আহ্বান জানালেন বঙ্গবন্ধু। তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে দেশের প্রতিটি পেশাজীবীকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাওয়ার সুচিন্তিত দিক-নির্দেশনা দিলেন।

 

দেশের মানুষ জাতির জনকের নির্দেশনামতো কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে সেনাবাহিনীর কুচক্রী ও বিপথগামী কিছু সদস্য দেশি-বিদেশি চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ঘাতকের নির্মম বুলেটে শহীদ হলেন স্বাধীনতার মহান স্থপতি। একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সংঘটিত হলো কলঙ্কজনক জেল হত্যা। জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। জাতির কাঁধে চাপল কলঙ্কের বোঝা। সেই কলঙ্ক থেকে মুক্তির লক্ষ্যে জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করলেন। সব বাধা সরিয়ে গঠন করা হলো বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলারূপে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা নিলেন। কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতার পালাবদল হলো। ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার উন্নয়নের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ায় দেশে দুর্নীতি-অনিয়ম সমান হারে বাড়তে থাকে। এরপর ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

 

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। এ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ-প্রধান শেখ হাসিনা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার ঘোষণা দেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সরকার গঠনের পর সেই ঘোষণা অনুযায়ী ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে। সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গঠিত অসংখ্য পরিকল্পনা এখন দৃশ্যমান। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক-বীমা, শিল্প-কারখানা, অবকাঠামো, সড়ক, নৌ ও বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র এখন ডিজিটালাইজড।

 

এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে। দেশকে উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারায় এগিয়ে নিতে দরকার দেশপ্রেমের। জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস উপেক্ষা করতে পারেন যিনি- কোনো লোভ অথবা মোহ যাকে স্পর্শ করে না- তিনিই তো প্রকৃত দেশপ্রেমিক।

 

স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের মানুষের গভীর মমতা ও ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন। তিনি সারাজীবন এদেশের গরিব-দুঃখী মানুষের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। ছুটে বেড়িয়েছেন বাংলার প্রতিটি জনপদে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ তাই সমার্থক। তিনিই বাংলাদেশ। তাঁর অসামান্য অবদান বাংলার মানুষ চিরকাল মনে রাখবে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা, অকুতোভয়, সাহসিকা শেখ হাসিনা আজ নানা অভিধায় ভূষিত তাঁর বিরল ভূমিকা ও অবদানের জন্য।

 

এ দেশকে বিশ্বদরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে অবদান রেখে চলেছেন সে সুবাদে তিনি অর্জন করেছেন অসংখ্য সম্মাননা-পুরস্কার ও কর্মের স্বীকৃতি। আজ তাঁকে বলা হয় ‘বিশ্বনেত্রী মমতাময়ী বঙ্গকন্যা’। তাঁকে বলা হয় ‘দেশরতœ’। তিনি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত অসংখ্য রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয়-আবাসন, খাদ্য ও চিকিৎসা দিয়ে অর্জন করেছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খেতাব। এতো সব বিশেষণ তাঁকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। মানবিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ভূমিকা পালন করছেন তা অত্যন্ত বিরল এবং অনুসরণীয়-অনুকরণীয়।
উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি পেল বাংলাদেশ
প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি)  ক্যাটাগরি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করল বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিপিডি) এই ঘোষণাসংক্রান্ত চিঠি ১৬ মার্চ (শুক্রবার) জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনের কাছে হস্তান্তর করে।
বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে বিকেলে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত মাসুদের কাছে এই চিঠি হস্তান্তর করেন সিপিডি সেক্রেটারিয়েটের প্রধান রোলান্ড মোলেরাস।

 

১৭ মার্চ (শনিবার) জাতিসংঘ স্থায়ী মিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ১৬ মার্চ সিপিডি জাতিসংঘ সদর দফতরে এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনসংক্রান্ত ঘোষণা দেয়। সে অনুযায়ী এই চিঠি হস্তান্তর করা হলো।

 

বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি আগেই পেয়েছিল। এবার জাতিসংঘের ঘোষণা এলো এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের।
স্থায়ী মিশনে আয়োজিত অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিপিডি এক্সপার্ট গ্রুপের চেয়ার প্রফেসর হোসে অ্যান্তোনিও ওকাম্পো, জাতিসংঘের এলডিসি, এলএলডিসি (ভূবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ) ও সিডস (উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপ-রাষ্ট্রসমূহ) সংক্রান্ত কার্যালয়ের উচ্চতম প্রতিনিধি আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ফেকিতামইলোয়া কাতোয়া উটইকামানু, জাতিসংঘে নিযুক্ত বেলজিয়ামের স্থায়ী প্রতিনিধি মার্ক পিস্টিন, তুরস্কের স্থায়ী প্রতিনিধি ফেরিদুন হাদী সিনিরলিওলু, ইউএনডিপির এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যুরোর পরিচালক ও জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হাওলিয়াং ঝু এবং ইউএনডিপির মানবিক উন্নয়ন রিপোর্ট অফিসের পরিচালক ড. সেলিম জাহান।
এ ছাড়া বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন ও নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের কর্মকর্তারা এবং জাতিসংঘ সদরদপ্তরে কর্মরত বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। কতিপয় এলডিসি দেশের প্রতিনিধি এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন এজেন্সির কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

 

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। ভিডিওচিত্রে উঠে আসে স্বাধীনতা অর্জনের পর ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে কীভাবে বাংলাদেশ দ্রুতগতিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মতো সফলতা দেখাতে যাচ্ছে। উঠে আসে জাতির পিতা কীভাবে সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার জন্য একতাবদ্ধ করেছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে কীভাবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হতে যাচ্ছে- সেসব উন্নয়ন পরিক্রমা।

 

একে একে তুলে ধরা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড়আয়ু বৃদ্ধি, রফতানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, রফতানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক।
উপস্থিত সুধীজনের উদ্দেশে প্রদত্ত বক্তৃতায় স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘আমাদের সকলের জন্য আজ এক ঐতিহাসিক দিন। অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনাদের জানাচ্ছি যে বাংলাদেশ এই প্রথম এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের সকল নির্ণায়ক পূর্ণ করেছে।’

 

উল্লেখ্য, এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক এ তিনটির যেকোনো দুটি অর্জনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ এ তিনটি সূচকের মানদ-েই উন্নীত হয়েছে।

 

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল (ইকোসক) এর মানদ- অনুযায়ী এক্ষেত্রে এ বছরে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১২৩০ ইউএস ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তার থেকে অনেক বেশি অর্থাৎ ১৬১০ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২.৯। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ ভাগ বা এর কম যেখানে বাংলাদেশের রয়েছে ২৪ দশমিক ৮ ভাগ।

 

‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ- যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহসী এবং অগ্রগতিশীল উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত রূপান্তর ও উল্লেখযোগ্য সামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে আমাদের দ্রুত উন্নয়নের পথে নিয়ে এসেছে।’

 

স্বল্পোন্নত দেশসমূহের জন্য ইস্তাম্বুল ঘোষণার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, ‘২০২০ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের অর্ধেক এই ক্যাটাগরি থেকে উত্তীর্ণ হবে এটিই ছিল ইস্তাম্বুল ঘোষণার একটি প্রধানতম উদ্দেশ্য যা এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়ন অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি বিনির্মাণের পরিপূরকও বটে।’
রাষ্ট্রদূত তার বক্তৃতায় আরো উল্লেখ করেন, ‘কেউ পেছনে পড়ে থাকবে না -এই প্রতিশ্রুতি ধারণ করে আমরা শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছি। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’- আমাদের জন্য শুধু একটি স্লোগানই নয়, সারা দেশের মানুষ আজ এর সুবিধা পাচ্ছেন। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আজ আমাদের হাতিয়ার।’

 

বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মর্মে রাষ্ট্রদূত মাসুদ উল্লেখ করেন।

 

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই যা আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত আকাক্সক্ষা। আজ বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.২৮ শতাংশ। আমরা এসডিজির সাথে আমাদের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে একীভূত করেছি। এসডিজি বাস্তবায়নেও আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের এলডিসি থেকে উত্তরণ এ সকল দর্শনের সাথে একই সূত্রে গাঁথা।’

 

এলডিসি ক্যাটাগরির দেশসমূহের এই উত্তরণ প্রক্রিয়া জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত সাফল্যের স্বাক্ষর বহণ করছে মর্মে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার জন্য তিনি জাতিসংঘসহ বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উত্তরণকে টেকসই করতে এবং এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়নে এই সহযোগিতার ধারা অব্যাহত থাকবে।

 

উত্তরণ প্রক্রিয়ায় থাকা স্বল্পোন্নত দেশসমূহের সাথে বাংলাদেশ তার অভিজ্ঞতা ও সর্বোত্তম কর্মপন্থা ভাগ করে নিতে সদা প্রস্তুত রয়েছে মর্মে স্থায়ী প্রতিনিধি জানান।
চিঠি হস্তান্তরের পর সিপিডি সেক্রেটারিয়েটের প্রধান রোলান্ড মোলেরাস তার বক্তব্যে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের কাঙ্খিত বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সামাজিক খাতগুলোর ব্যাপক উন্নয়ন এই উত্তরণের ক্ষেত্রে কমিটির সুপারিশ প্রদানকে সহজতর করেছে মর্মে উল্লেখ করেন।

 

সিপিডি এক্সপার্ট গ্রুপের চেয়ার প্রফেসর হোসে অ্যান্তোনিও ওকাম্পো বাংলাদেশের সাফল্যমণ্ডিত উন্নয়নের ইতিহাস রয়েছে বলে অভিমত প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের গতিশীল রফতানি খাত, মানবিক সম্পদ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের ব্যাপক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

 

জাতিসংঘের এলডিসি, এলএলডিসি ও সিডস সংক্রান্ত কার্যালয়ের উচ্চতম প্রতিনিধি আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল উটইকামানু বলেন, ‘দ্রারিদ্র্য হ্রাস ও উন্নয়নের অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে। ১৪% এর নিচে নেমে এসেছে অতি দারিদ্র্য সীমা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক বছর ধরে স্থিতিশীল রয়েছে। রূপকল্প ২০২১ নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারসমূহকে পরিচালিত করে যাচ্ছে।’

 

এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বেলজিয়ামের স্থায়ী প্রতিনিধি মার্ক পিস্টিন, তুরস্কের স্থায়ী প্রতিনিধি সিনিরলিওলু, ইউএনডিপির এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যুরোর পরিচালক ও জাসিংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হাওলিয়াং ঝু। সকল বক্তাই এই অর্জনে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারকে অভিনন্দন জানান এবং এই অর্জনের পেছনে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন।

 

বক্তারা এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে সদ্য উর্ত্তীণ দেশগুলোকে তাদের টেকসই উত্তরণ টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
‘শেখ হাসিনার জন্যই এলডিসিথেকে উত্তরণ ঘটেছে’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছেন বলেই স্থল ও সমুদ্র সীমানাবিহীন বাংলাদেশ সীমানা পেয়েছে এবং এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত অপশক্তির মদদে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- সংঘটিত হলেও মহান আল্লাহতায়ালা বাঙালি জাতির ভাগ্যোন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাকে ১৯বার হত্যার চেষ্টা হলেও তিনি বেঁচে আছেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি সুদৃঢ় করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছেন।

 

শিল্পমন্ত্রী ১৯ মার্চ রাজধানীর বিসিআইসি মিলনায়তনে শিল্প মন্ত্রণালয় আয়োজিত মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০১৮ উপলক্ষে আয়োজিত ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭উ মার্চের ভাষণের তাৎপর্য এবং উন্নয়ন অগ্রগতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

 

আমির হোসেন আমু বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় বাঙালিরা এখন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মালিক হয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এ অঞ্চলে কোনো ব্যাংক, বীমা কিংবা শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক বাঙালি ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় আজ বাঙালিরা কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শিল্পপতি, ব্যাংকার, বীমা মালিক কিংবা আমলা হতে পেরেছেন।

 

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব উল্লেখ করে শিল্পমন্ত্রী বলেন, এ ভাষণের মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালি জাতি একটি সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এ ভাষণকে অনেকবার বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা করা হলেও বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী আদর্শের কারণে তারা এটি করতে সক্ষম হয়নি। এ ভাষণে তিনটি অংশে পাকিস্তান ২৩ বছর শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনার ইতিহাস, ৭১-এর পয়লা মার্চ থেকে নির্যাতনের ঘটনাপ্রবাহ এবং ২৬ মার্চ পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা ছিল। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিম-লে এ ভাষণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন শেখ হাসিনা
বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা। সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য স্টাটিস্টিকস ইন্টারন্যাশনাল’-এর জরিপে তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন।

 

১৯ মার্চ সকালে নিজ কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হওয়ার পর এটাকে সরকারের অর্জন হিসেবে মন্তব্য করেন। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সরকারের এই অর্জন জনগণকে উৎসর্গ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের অর্জনে দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা আস্থা রেখেছে বলেই অর্জন সম্ভব হয়েছে।

 

তবে বাংলাদেশের এই অর্জন অনেক অগেই সম্ভব হতো বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রিসভার বৈঠকের শুরুতেই তিনি বলেন, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট না এলে বাংলাদেশ আরো আগেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারত।
বিশ্বের সৎ পাঁচ নেতার তালিকায় শেখ হাসিনা তৃতীয়
এর আগে গত বছর প্যারাডাইস পেপার্স আর পানামা পেপার্সের পর পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস, বিশ্বের ৫ সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিহ্নিত করে, যাদের কোনো দুর্নীতি স্পর্শ করেনি। তাদের বিদেশে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নেই, উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পদও নেই। বিশ্বের সবচেয়ে সৎ এই পাঁচ সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

গত বছর জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সৎ সরকারপ্রধান হিসেবে সারা বিশ্বের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয় স্থান অধিকার করায় জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া জানতে চান। প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটুকু বলতে পারি মাথায় (সরকারপ্রধান) পচন নেই, যদি শরীরে (সরকারের মন্ত্রী) কোথাও একটু ঘা-টা হয় তা আমরা সারিয়ে ফেলতে পারব।

 

পিপলস অ্যান্ড পলিটিকসের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। খবরে বলা হয়, বিশ্ব রাজনীতিতে যাদের সৎ ভাবা হতো, যাদের অনুকরণীয় মনে করা হতো তাদের অনেকেই কলঙ্কিত হয়েছেন পানামা পেপার্স এবং প্যারাডাইস পেপার্সে। তবে বিপরীতধর্মী প্রতিবেদন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেতৃত্বের সততার মান বিচার হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন ছিল, সরকার/রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে তিনি কি তার রাষ্ট্রের বাইরে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করেছেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তার ব্যক্তিগত সম্পদ কতটুকু বেড়েছে? তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, গোপন সম্পদ গড়েছেন কিনা? চতুর্থ প্রশ্ন সরকার/রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ আছে কিনা? আর পঞ্চম প্রশ্ন ছিল, দেশের জনগণ তার সম্পর্কে কী ভাবেন?

 

এই পাঁচটি উত্তর নিয়ে পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস ১৭৩ দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের কর্মকা- বিশ্লেষণ করেছে। এই গবেষণায় সংস্থাটি এ রকম মাত্র ১৭ সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছেন যারা শতকরা ৫০ ভাগ দুর্নীতিমুক্ত হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ১৭৩ সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সৎ সরকারপ্রধান হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। পাঁচটি প্রশ্নে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৯০। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং ৮৮ পেয়ে সৎ সরকার প্রধানদের তালিকায় দ্বিতীয় হয়েছেন আর ৮৭ নম্বর পেয়ে এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৮৫ নম্বর পেয়ে বিশ্বে চতুর্থ সৎ সরকার প্রধান বিবেচিত হয়েছেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইরনা সোলবার্গ। আর ৮১ নম্বর পেয়ে এই তালিকায় পঞ্চম স্থানে আছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি।

 

পিপলস অ্যান্ড পলিটিকসের গবেষণায় দেখা গেছে, শেখ হাসিনার বাংলাদেশের বাইরে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। সংস্থাটি গবেষণায় দেখেছে, বেতন ছাড়া শেখ হাসিনার সম্পদের স্থিতিতে কোনো সংযুক্তি নেই। শেখ হাসিনার কোনো গোপন সম্পদ নেই বলে নিশ্চিত হয়েছে পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের ৭৮ ভাগ মানুষ মনে করেন সৎ এবং ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে। তবে তার সরকারের বিরুদ্ধে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংস্থাটির গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তিতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান ও নির্দেশনা
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পরিচালিত হচ্ছে নিরলস কার্যক্রম। বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রথম দিকেই খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পুষ্টির বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে অঙ্গীকারের নির্দেশনায় বর্ণিত রয়েছে।

 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে এদেশের গণমানুষের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। তাঁর এই স্বপ্নকে উপজীব্য করেই দেশের উন্নয়নে রূপকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে বর্তমান সরকার।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১ ঘোষণা করেছে এবং তা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদাÑ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশের জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত, মানসম্পন্ন, ভেজাল ও দূষণমুক্ত নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ প্রণয়ন করেছি। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা হয়েছে। দেশে বিদ্যমান খাদ্য শৃঙ্খলার বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াকরণ পর্যন্ত নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য তৈরির প্রতিটি ধাপে যথাযথ মান নিশ্চিত করতে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

বর্তমান সরকারের নানাবিধ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। ফলে সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা জনসাধারণের মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জনসাধারণের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয় সংশি¬ষ্ট প্রতিটি পর্যায়ে চিহ্নিত সমস্যাবলি উত্তরণে সহযোগিতা করার জন্য আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

 

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য যে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতাও গড়ে তুলতে হবে। সব ক্ষেত্রে নিরাপদ খাবার নিশ্চিতকরণে সবাইকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। এজন্য কৃষকদের সচেতন ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

 

একটি সুস্থ ও সবল জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার ঘোষিত ভিশন-২০২১ এবং জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের বিষয়ে সুদৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে। দেশে নিরাপদ খাদ্য নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় যাবৎ কাজ করে আসছিল। এই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে খাদ্য শৃঙ্খল হতে ভোক্তার দোরগোড়া পর্যন্ত দূষণ ও ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের জনসাধারণের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্দেশে মাদার অব হিউম্যানিটি, বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপকার, জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুগোপযোগী, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ প্রণয়ন করে একটি বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার গোড়াপত্তন হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিপণন পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন এবং বিক্রয় সংশি¬ষ্ট কার্যক্রম সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষে ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উৎকৃষ্ট পন্থায় সবার জন্য খাবার স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সর্বোচ্চ সুরক্ষায় ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোও কর্তৃপক্ষের অন্যতম দায়িত্ব।

 

কয়েকটি স্বপ্ন এবং অর্জনের অভিযাত্রা
জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদেশের মানুষকে কয়েকটি স্বপ্ন দেখিয়েছেন; যেমন ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের ১৭টি গোল, ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালে উন্নত, সমৃদ্ধশালী, স্থিতিশীল অসাম্প্রদায়িক অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়তে এ কাজগুলো সমাধা করাই দেশপ্রেমিক নাগরিকদের অন্যতম কর্তব্য হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কিছু বৃহৎ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছেন। দেশে এখন বিদ্যুতের তেমন লোডশেডিং নেই। ২০২১ সালের মধ্যে আরো ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলা বাংলাদেশ অবশ্যই বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। পদমা নদীর ওপর গড়ে উঠছে বিশাল সেতু। স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়তে এ সেতু রাখবে ব্যাপক অবদান।

 

চির অম্লান মানবিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করার মহতী উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা নিয়েছেন- আশ্রয়হীন, খাদ্যহীন, রাষ্ট্রহীন, বঞ্চিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের আশ্রয় দিয়ে। এ দেশের মানুষ অনুরূপ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলেই রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে মানবকল্যাণের জাগরণ সৃষ্টি হবে। বিশ্ব মানবতার নেত্রী শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশের এগিয়ে চলাকে মানুষ দেখবে, সমীহ করবে; জানাবে অভিননদন।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কবি

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd