ঢাকা : বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • ডেঙ্গু এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে : কাদের          ঈদে হাসপাতালের হেল্প ডেস্ক খোলা রাখার নির্দেশ          নবম ওয়েজ বোর্ডের ওপর হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা           বন্দরসমূহের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ২৫ মার্চ, ২০১৮ ২৩:৩০:৫৬
ঢাকার প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের গোড়ার কথা
নজরুল আলম

 

গত শতাব্দীর বিশ-ত্রিশ দশকে সারা পৃথিবীর সম্মুখগামী গতিধারার সাথে উপমহাদেশেও এর সম্পর্ক যুক্ত হয়েছিল। বিশ্বসাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির সে এক যুগসন্ধিক্ষণ। মানুষের চেতনায় দিন দিন যুক্ত হতে চাইছে সমষ্টিগত ভাবনা। শোষণ বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লড়াইগুলো খুবই তীব্রতা লাভ করছে। ভারতবর্ষ তখন ব্রিটিশের উপনিবেশ। স্বাধীনতার সংগ্রামগুলো দিন দিন খুবই জঙ্গি হয়ে উঠেছে এখানে। এই স্বাধীনতার ইচ্ছা বা কামনা দিন দিন কিছু সংখ্যক দেশপ্রেমীর মনে ব্যতিক্রম চিন্তার সূচনা করল। তাদের মনে দেখা দিল ‘কার জন্য স্বাধীনতা- কেন স্বাধীনতা’ এইসব আত্মজিজ্ঞাসা। স্থির নিশ্চিতভাবেই বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রসর দর্শন চিন্তার প্রতি তারা আকৃষ্ট হয় এবং তার নির্দেশিত পথে অগ্রসর হতে চায়। এই চাওয়া একদিকে যেমন তাদেরকে কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষদের সংগঠিত করার কাজে প্রেরণ করে অন্যদিকে তাদের মধ্যে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সৃষ্টি করে, গণসাহিত্য তথা মেহনতি মানুষের অধিকার সম্পর্কিত। সাহিত্য রচনায় উদ্যোগী করে তোলে। বিশ-ত্রিশ-এর দশকে এই ধারার শুভ সূচনা হয়। চল্লিশের দশকে এর একটা ক্রম পরিণতি বা পরিশীলিত রূপ প্রকাশ পায়। ঢাকায় যথানিয়মে এই প্রভাব খুব প্রবল হয়ে দেখা দেয় চল্লিশের দশকে। ঢাকাতে এই সাহিত্যচর্চা পরিশেষে আন্দোলনের রূপলাভ করে। বিশেষত যখন প্রগতি লেখক সংঘের জন্ম হয় তখন এই আন্দোলন খুবই জোরদার হয়ে ওঠে।
 
কয়েকটি ভাগে প্রগতি লেখক সংঘের পটভূমি, ইতিহাস, ঢাকাতে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা যায়। যার মাধ্যমে ঢাকার সেই গৌরবময় সময়টিকে তুলে আনা সহজ হবে।
 
প্রগতি লেখক সংঘের পটভূমি
এ উপমহাদেশে প্রগতি লেখক সংঘ গড়ে ওঠার পেছনে যে পটভূমি কাজ করেছে তা হলো ১৯৩৩ সালের ১০ মে জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে বার্লিন স্কোয়ারে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য শিল্প সম্পর্কিত গ্রন্থাবলির নিধনকর্মে অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে রোঁমা রোঁলা, আঁরি বারবুস, গোর্কি প্রমুখের উদ্যোগে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিবেকবান প্রগতিপন্থী লেখকদের সংঘব্ধ করার উদ্দেশ্যে ১৯৩৫ সালের ২১ জুন বেলজিয়ামের ব্রাসেলস-এ গঠিত সংগঠন ‘লিগ এগেনস্ট ইম্পিরিয়ালিজম এন্ড ওয়ার’ সা¤্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী সংঘটির কার্যসূচি। ব্রাসেলস-এর এই সম্মেলনের১, অনুপ্রেরণায় ল্যাক্সি, হার্বাট রিড, ফস্টার, মুলকরাজ আনন্দ প্রভৃতি কয়েকজন ব্রিটিশ ও ভারতীয় লেখক লন্ডনে সম্মেলন করে ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ গড়ে তোলেন। শীঘ্রই ভারতবর্ষের উপকূল-এর উত্তাল ঢেউ এসে আঘাত করে। ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিল লখনৌতে ‘নিখিল ভারত প্রগতি সংঘের’ জন্ম হল আনুষ্ঠানিকভাবে। এর প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হলেন সাজ্জাদ জহির২। এরপর বাংলাতেও সংগঠনটির শাখা বিস্তৃত হয়। ১৯৩৬ সালে কলকাতার এলবার্ট হলে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ’ গঠিত হলো। প্রথম সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন ডা. নরেশ সেনগুপ্ত এবং সম্পাদক নির্বাচিত হলেন অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী।
 
সারা ভারতবর্ষের সর্বস্তরে এই সময়ে সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রবল জোয়ার। তুচ্ছ কারণে গান্ধীর নেতৃত্বাধীন অসহযোগ আন্দোলনকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহলে প্রবল হতাশা আর সেই সাথে নতুন চেতনায় সমৃদ্ধ বহু মানুষ জেল থেকে বের হয়েই নতুন ধারার গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছিল। সারাদেশের মিলগুলোতে কয়েকটি ধর্মঘট সফল হয়েছে। শ্রমিকশ্রেণী যে একটি প্রবল বেগবান শক্তি তার উপলব্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে ‘লাঙ্গল’ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকা। ইতিমধ্যেই কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’ আর ‘আমি বিদ্রোহী ভৃন্ড ভগবান বুকে এঁকে দেই পদচিহ্ন! আমি শোক তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন’ এই আত্মবিশ্বাস। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে এসে কিছু করার বিদ্রোহীভাব তরুণ মনে প্রবল শক্তির সঞ্চয় করেছে।ঢাকার আধুনিক সাহিত্যচর্চা চলছে তখন অজিত দত্ত ও বুদ্ধদেব বসুর যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্যপত্র ‘প্রগতি’র মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের প্রভাব থেকে মুক্ত সাহিত্যচর্চায় তারা ছিল ব্যাপৃত। সামন্ত চেতনার সংমিশ্রণে বুর্জোয়া মতে প্রবন্ধ, গল্প ও শিল্প সম্পর্কে বিভিন্ন লেখা তারা প্রকাশ করত। প্রগতিশীল নতুন লেখকদের বয়স্করা অপাঙক্তেয় হিসেবে গণ্য করতেন- অবশ্য নতুনদের মধ্যে সার্থক সাহিত্য প্রতিভা তখনো পর্যন্ত ঢাকায় বিকশিত হয়ে উঠেনি। এহেন অবস্থায় নতুন লেখকদের সংগঠিত করে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির জন্যে রণেশ দাশগুপ্ত এই সময় উদ্যোগী হন। তিনি তখন ‘সোনার বাংলা’ নামের একটি পত্রিকায় কাজ করতেন। নতুন ধারার এই সাহিত্যচর্চার প্রতি তার আগ্রহ ও নিষ্ঠা নবীন লেখকদের উৎসাহী করে তোলে। ইতিমধ্যেই ঢাকার দক্ষিণ মৈশ-ীতে ‘প্রগতি পাঠাগার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। মার্কসীয় দর্শনের আলোকে রচিত এই ধারার গণসাহিত্যের উপর তখনই রণেশ দাশগুপ্ত অর্জন করেছেন যথেষ্ট দক্ষতা। স্পেনের গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিক বাহিনীতে যোগ দেয়া খ্যাতনামা ব্রিটিশ সাহিত্যিক রাফল ফক্স, ক্রিস্টোফার কডওয়েল প্রমুখসহ বহু লেখকদের লেখা সে সময় আমদানি হচ্ছিল। ‘প্রগতি পাঠাগার’ নামের প্রতিষ্ঠানটিতে সপ্তাহে একদিন স্বরচিত গল্প কবিতা সহযোগে সাহিত্যসভা বসত। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত তরুণ লেখকরা যোগ দিত এতে। সভাগুলোতে লেখাগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ হতো। এই আলোচনা-সমালোচনার সংস্পর্শে এসেই সে কালের অন্যতম সেরা তরুণ গাল্পিক সোমেন চন্দ গভীরভাবে বিপ্লবী মার্কসবাদী সাহিত্য অধ্যয়ন শুরু করেন। সাথী অন্যান্য লেখকরা এই পাঠাগারের সাহিত্যসভা থেকেই নিজেদের প্রগতিশীল সাহিত্যরচনার পূর্ব প্রস্তুতিটুকু সম্পন্ন করার সুযোগ পান। প্রগতি পাঠাগারের প্রাথমিক সময়ে সর্বপ্রথম যারা সংগঠিত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে সতীশ পাকড়াশী ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ তাঁর বয়স তখন পঁয়তাল্লিশ অতিক্রম করেছে আর বয়োকনিষ্ঠ ছিলেন সোমেন চন্দ্র, তাঁর বয়স তখন মাত্র আঠারো। মোটামুটি এই পটভূমিতেই ঢাকার বুকে প্রগতি লেখক সংঘের শাখা গড়ে উঠেছিল।
 
আন্দোলনের প্রথম পর্ব
প্রগতি পাঠাগারের চর্চা অবশেষে আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। ঢাকার প্রগতি লেখক সংঘের শাখা স্থাপিত হয় ১৯৩৯ সালে। এই সময়টিকে প্রগতি পাঠাগারেই ছিল সংগঠনের কার্যক্রমের মূল কেন্দ্রভূমি। আনুষ্ঠানিকভাবে তখনো সংগঠনটি প্রকাশ করা হয়নি। অবশেষে তরুণ লেখকদের মানসিক বিকাশ একটি বিশেষ পর্যায়ে আসার পর ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সংগঠনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলো। পুরনো ঢাকার গে-ারিয়া হাই স্কুল প্রাঙ্গণে খুব জাঁকজমকের সাথে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন সেকালের মুসলমান সমাজের বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ অধ্যাপক কাজী আবদুল ওদুদ। প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হলেন রণেশ দাশগুপ্ত। প্রগতি লেখক সংঘের আন্দোলনের কারণেই লেখকরা আত্মগত ভাব সৃষ্টির স্থানে বস্তুগত ভাব প্রকাশের চেতনাকে অবলম্বন করে সাহিত্য সৃষ্টিতে অগ্রসর হন। প্রতি রোববার তাদের সাহিত্যসভা বসত। একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয় যাতে উল্লিখিত ছিল সংগঠনের উদ্দেশ্য ও কর্মসূচির একটি অনুসরণ করতে লেখকরা বাধ্য ছিরেন। যারা এই সংঘকে সমর্থন করতেন তাঁরা সকলে সবকিছু জেনেশুনেই এর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। প্রগতি লেখক সংঘ যে আদর্শ বিশ্বাস করতো সে সম্পর্কে পরবর্তীকালে শ্রী অচ্যুত গোস্বামী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন-
‘সংঘের সভ্যরা বিশ্বাস করতেন যে মানবসমাজ ক্রমশ অগ্রগতির পথে যাচ্ছে। এই অগ্রগমণের পথ হলো- অত্যাচার-উৎপীড়ন-অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। আমরা সাহিত্য শুধু বাস্তবধর্মী হলেই খুশী হতাম না। আশা করতাম তার মধ্যে ভবিষ্যৎ-এর দিকনির্দেশ থাকবে। বলাবাহুল্য এই আদর্শ অনুযায়ী সাহিত্য রচনা করা সহজ নয়। কারণ কোন বাস্তববাদী কাহিনী তার ধর্ম অনুযায়ী কোন নির্দিষ্ট বর্তমান বা নির্দিষ্ট অতীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেই সীমাকে বজায় রেখেও তার মধ্যে ভবিষ্যৎ-এর ইঙ্গিত দেয়া সহজ নয়। কাহিনীতে কোন স্থূল বক্তৃতা বা নীতি উপদেশমূলক পরিসমাপ্তি দিলে আবার তার রস বেদন ব্যাহত হয়। আবার সেই সময়ে আদর্শ অনুযায়ী সার্থক গল্প লেখা যেমন কঠিন ছিল তেমনি নতুন উৎসাহের আতিশয্যে সমালোচনাতেও আমরা নিরঙ্কুশ ছিলাম। ভদ্রতার বালাই আমাদের ছিল না। কারণ লেখার কোন খুঁত বার করতে পারলে আমরা তাকে তুলোধোনা না করে রেহাই দিতাম না।৩’
 
প্রগতি লেখক সংঘের পরবর্তী সম্পাদক নির্বাচিত হন সোমেন চন্দ্র। এই আন্দোলন প্রবীণ সাহিত্যিকদের মধ্যে একটি ভীতির ভাব সৃষ্টি করে। নতুনদের এই আন্দোলনের জোয়ারে প্রবীণদের প্রাচীন ভিত ধসে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। একবার সোমেনকে ঢাকার একজন প্রবীণ সাহিত্যিক বলেছিলেন-
‘কি হে, তোমরা নাকি একটি প্রগতি লেখকদের দল বেঁধেছ। সাহিত্যের আবর প্রগতি পশ্চাদগতি কি? সাহিত্য রসসৃষ্টি করতে পারলেই তা প্রকৃতি সাহিত্য হয়’ সোমনে সৌজন্যের সাথে উত্তর দেয়, ‘রসবোধও সকলের সমান নয়, তাতেই যতন দ্বন্দ্ব-বিরোধ। সেকালে জমিদারের প্রতাপ ঐশ্বর্য শাসন শোষণ দিয়ে পল্লীগাথা রচিত হতো, একালে পল্লীবাসী প্রজার দারিদ্র, অন্যায়, উৎপীড়নের বিরুদ্ধে স্বাধীন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস ফুটিয়ে তুলে সাহিত্য প্রাণবন্ত করে তুলতে হয়। প্রবীণ চায় জমিদারের প্রতিষ্ঠা, আর নবীন চায়- জনগণের প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা।’
 
এই বিতর্কে প্রবীণ ব্যক্তি খুবই চটে যান। সোমেনের সাথে প্রবীণের এই আলোচনা থেকেই বুঝা যায় যাত্রা শুরুর প্রাক্কালেই প্রগতি লেখক সংঘ খুবই যোগ্যতার সাথে পদক্ষেপ রাখতে পেরেছিল।১৯৩৯ সালে নিখিলবঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘প্রগতি’ নামের একটি সংকরণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ঢাকার লেখকরা এই প্রগতি পাঠ করে খুবই উৎসাহিত হয়ে ওঠেন। ঢাকা থেকে এইরকম একটি গ্রন্থ বের করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় এতে শুধু ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক সংঘের লেখরাই লেখবে। চাঁদা তোলার ব্যবস্থা করা হয় নিজেদের কাছ থেকে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪০ সালে ২০ জন লেখকের লেখা নিয়ে ১৬০ পৃষ্ঠার ‘ক্রান্তি’ নামের গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সোমেন চন্দ ছিলেন গ্রন্থটির প্রকাশক। লেখকদের মধ্যে ছিলেন রণেশ দাসগুপ্ত, সোমেন চন্দ্র, অচ্যুত গোস্বামী, কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত, সরলানন্দ সেন অন্যতম। গ্রন্থটি প্রকাশের সাথে সাথে বিরাট সাড়া পড়ে যায়। ‘ক্রান্তি’ ঢাকার বুকে যেরকম আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তেমনি কলকাতাতেও সকলের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কলকাতার অনেকেই মফস্বলের একটি শহর থেকে অখ্যাত অজ্ঞাত কিছু লেখকের হাত থেকে এমন একটি মৌলিকধর্মী উচ্চশ্রেণীর সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হতে পারে তা ভাবতে পারেনি। সকলের কাছেই এটি ছিল অভাবিত ও বিস্ময়কর। এই ‘ক্রান্তি’তে ঢাকার তরুণ লেখকরা তাদের প্রগতিশীল লেখার মাধ্যমে বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে তুলে ধরেন। এটি প্রকাশের পরপরই ঢাকার তরুণ লেখকদের সাথে কলকাতার তরুণ লেখকদের নিয়মিত যোগাযোগ সৃষ্টি হয়। কলকাতা থেকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিনয় ঘোষ ঢাকা এসেছিলেন স্থানীয় প্রগতি লেখক সংঘের আকর্ষণে। ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক সংঘের কর্মীরা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের সাথে নিজেদের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করে চলছিল। সংঘের সম্পাদক সোমন চন্দ ঢাকা রেলশ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। একসময় রেলশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। সংগঠনটির প্রথম পর্বের আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা সোমেন চন্দের মৃত্যু। ১৯৪২ সালের ৮ই মার্চ ঢাকার সূত্রাপুরে একটি ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এই সম্মেলনটিতে ফ্যাসিবাদের সমর্থক স্বদেশী গু-াদের কতিপয় সমর্থক যুবক মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আক্রমণ করে। স্বেচ্ছাসেবকদের প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়ে তারা পিছু হটে যায়। এই সময়ে রেলওয়ে কলোনী থেকে সোমেন চন্দ লাল পতাকা হাতে দীপ্ত পদভারে একটি মিছিল নিয়ে সম্মেলনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। মধ্যপথে লক্ষ্মীবাজারের কাছে তারা ফ্যাসিবাদী যুবকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। উন্মত্তের মত ফ্যাসিবাদীরা সোমেন চন্দের উপর আক্রমণ চালায়। সোমেনের চোখ দুটি উপড়ে ফেলে, সারা শরীরে ছোরার আঘাত করে এবং তার পেট চিড়ে ফেলে। সোমেন সাথে সাথে মারা যায়। এই মৃত্যুর খবর যখন সম্মেলনে পৌঁছে তখন সেখানে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল সে সম্পর্কে সমীন্দ্র কুমার হোড় পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করেছেন-
 
‘আমরা সম্মেলন আরম্ব করতে যাচ্ছি, তখন হঠাৎ খবর এলো সোমেনকে স্বদেশী ফ্যাসিস্টরা হত্যা করেছে। সেই মুহূর্তে মনের অবস্থা কেউই প্রকাশ করতে পারবে না। সবকিছু ভুলে যাওয়া এবং গোলমালে তাল পাকিয়ে যাওয়ার একটা ক্ষীণ স্মৃতিমাত্র। বেশ মনে আছে, রণেশবাবু মাইক্রোফোনে যখন ওর মৃত্যুর কথা ঘোষণা করলেন, তখন মিনিট দুই সমস্ত জনতার মধে এটা চাপা স্তব্ধতা- এ কোণে ও কোণে বেদনার নিঃশ্বদ প্রকাশ। কমরেড অজিত রায় হঠাৎ মাইকের কাছে গিয়ে চিৎকার করে বললেন- ‘আপনারা শিশিরবাবুকে আটকান’- তাকিয়ে দেখি শিশিরবাবু একটা বাঁশ হাতে করে চীৎকার করছেন। ঢাকেশ্বরী মিলের শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছিল; বঙ্কিম মুখার্জি তাঁর বজ্রনিনাদিত কণ্ঠে বলে উঠলেন- ‘আপনারা যাবেন না- বেরোবেন না- প্রতিশোধের পথ এটা নয়।’ আমার মনে হয়, বঙ্কিমবাবুর গলা এবং মাইক না থাকলে সেদিন ঢাকা শহরে কী যে ঘটে যেত বলা যায় না। সেদিন দেখেছিলাম শ্রেণীর জন্যে মমতা- শ্রেণীর নেতার জন্যে জ্বলন্ত ভালবাসা ঢাকেশ্বরী মিলের শ্রমিকদের পাগল করে তুলেছিল। বাইরের গেটে তাদের যখন আটকানো হচ্ছিল, তখন অনেকে আকুল কণ্ঠে আবেদন করছিল- ‘দয়া করে যেতে দিন- কমরেড- একবার বেরোতে দিন।’
 
সোমেনের মৃত্যু সংবাদে সবচেয়ে সেদিন বিচলিত হয়েছিলেন কিরণ শংকর সেনগুপ্ত এবং অমৃত কুমার দত্ত। আমার বেশ মনে আছে, তাঁরা দুজনেই শিশুর মত ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন।’৫সোমেন চন্দের এই নৃশংস হত্যাকা- সারা বাংলাতে প্রবল ধিক্কারের সম্মুখীন হয়। ‘ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবীদের প্রগতিশীল সংগঠনগুলি এই বর্বর হত্যাকা-ের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সভা, সমাবেশে মুখর হয়ে ওঠে তাদের ভাষা।’৬ প্রগতি লেখক সংঘের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন আরও প্রবল ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অবিভক্ত বাংলার বহু দোদুল্যমান লেখক কবি আর বিলম্ব না করে দ্রুত প্রগতি লেখক সংঘের পতাকাতলে সমবেত হন। কলকাতার প্রগতি লেখক সংঘ ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ নামে নব উদ্দীপনায় কাজ করতে থাকে। ঢাকাতেও প্রবল উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।
 
এইভাবে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের আন্দোলনের প্রথম পর্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এখানকার মাটিতে প্রগতি আন্দোলনের বীজ বুনে আলোবাতাসে তাকে অঙ্কুরিত করে তুলতে সক্ষম হয়। প্রথম পর্বের এই ধারায় সোমেনের প্রত্যক্ষ অবদান অত্যন্ত বেশি ছিল। আর তাই পরবর্তীকালেও আমরা লক্ষ্য করি সোমেনের স্মৃতিরক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা।
 
আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব
সোমেন চন্দের মৃত্যুর পর আন্দোলনের ব্যাপকতা খুবই প্রবল হয়ে ওঠে। ঢাকায় সংঘটি একটি পত্রিকা৭ প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ঢাকা কোর্ট হাউজ স্ট্রিট থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। এটির নাম ছিল ‘প্রতিরোধ’। ‘১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ‘প্রতিরোধ’ প্রকাশিত হয়েছিল।’৯ এটি ছিল উচ্চমানের সাহিত্য পত্রিকা। পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন শ্রী কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত ও অচ্যুত গোস্বামী। এদের দায়িত্ব ছিল লেখা সংগ্রহ ও সেগুলো বাছাই করা। পত্রিকার সম্পাদকীয় রচনা করতেন রণেশ দাশগুপ্ত। এই ‘প্রতিরোধ’ প্রকাশ করতে প্রগতি লেখক সংঘের কর্মকর্তাদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক মুসলিম লেখক ও প্রগতিশীল ছাত্রকর্মীর সাথে যোগাযোগ স্থাপিত হয়। এই মুসলমান ছেলেরা সাপ্তাহিক সাহিত্য সভাগুলোতে নিয়মিত আসত। এই আসা-যাওয়ার ফলেই তাদের মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত হয় এবং সামাজিক পশ্চাৎপদতা-কুসংস্কার প্রভৃতিকে অতিক্রম করে দেশের সত্যিকার মর্যাদার দাবীদার সাধারণ মেহনতি মানুষের মুক্তিকামী মানসিকতাকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এদের মধ্যে প্রথমেই যার নাম উল্লেখ করতে হয় তিনি শহীদ অধ্যাপক- নাট্যকার মুনীর চৌধুরী। এছাড়াও ছিলেন- সরদার ফজলুল করিম, সানাউল হক, সৈয়দ নুরুদ্দিন, কবীর চৌধুরী, আহমদুল কবির, খায়রুল কবির প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এই পত্রিকাটিও ‘ক্রান্তি’র মতই প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। সে সময়ের একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকা ‘অরণি’ ‘প্রতিরোধ’ সম্পর্কে লেখে-
 
‘প্রতিরোধ ঢাকা থেকে প্রকাশিত যুদ্ধকালীন সাহিত্যের একটি প্রগতিশীল পাক্ষিক পত্রিকা। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ যেগুলি এই ছোট পত্রিকাটিতে স্থান পেয়েছে তাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে সেগুলি এই সময়ের সাহিত্য। সমস্ত রচনার মধ্যেই ফ্যাসিস্ট আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করার তীব্র সুর ধ্বনিত হয়েছে, কারণ আজ মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির বড় শত্রু হচ্ছে ফ্যাসিজম। আজকের দিনে এই শ্রেণীর পত্রিকা শতশত প্রকাশিত হওয়া উচিত। যারা দেশের সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ভালবাসেন, যারা ইতিহাসের সংস্কৃতিসম্ভার ও জাতীয় ঐতিহ্য ঘৃণ্য বিজাতীয় ফ্যাসিস্টদের হাতে ধ্বংস হতে দিতে চান না, তারা প্রতিরোধের সঙ্গে সুর মেলাবেন নিশ্চয়ই।... আমরাও ‘প্রতিরোধ’কে শত্রুকে প্রতিরোধ করার এই নির্দয় সংকল্প জানাচ্ছি এবং প্রতিরোধের উন্নতি ও জনপ্রিয়তা কামনা করছি।‘১০
 
‘প্রতিরোধ’ পত্রিকা ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কখনো পাক্ষিক, মাসিক ও শেষে ত্রৈমাসিক হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৩৫০-এর মন্বন্তর শুরু হলে পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাথে সাথে কাগজের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে ‘প্রতিরোধ’ প্রকাশ একেবারেই অনিয়মিত হয়ে পড়ে। শেষের দিকে যখন মিলের কাগজ আর পাওয়া যাচ্ছিল না তখন দেশী তুলোট কাগজে কয়েক সংখ্যা প্রকাশিত হয়।
এই পত্রিকাটিতে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকরাই লেখা পত্রস্থ করতেন। যারা এতে লিখতেন তাদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, বিমল চন্দ্র ঘোষ, অরুণ মিত্র, কামাক্ষী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, বিনয় ঘোষ, সন্তোষ কুমার ঘোষ, নবেন্দু ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এই পত্রিকা প্রকাশনাকে কেন্দ্র করেই স্বনামধন্য ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসু, অধ্যাপক পরিমল রায়, পৃথ্বীশ চক্রবর্তী, অমিয় কুমার দাশগুপ্ত, অধ্যাপক অজিত গুহ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের সাথে প্রগতি লেখক সংঘের একটি নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯৪৩ সালে ‘প্রতিরোধ’ সোমেন স্মৃতি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ১৯৪৩ সালের ৮ মার্চ সোমেন চন্দের প্রথম স্মৃতিবার্ষিকী পালিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক অজিত গুহ। এই পত্রিকাটি সমসাময়িককালে সারা দেশেই যথার্থভাবে সমাদৃত হয়েছিল।
এই সময় প্রগতি লেখক সংঘ সাহিত্যচর্চার সাথে প্রগতিশীল একটি প্রকাশনা সংস্থা স্থাপন করে। এটির নাম ছিল প্রতিরোধ পাবলিশার্স। জি. ঘোষের গলিতে একটি তিনতলা বাড়ির একতলায় ছিল প্রতিরোধ পাবলিশার্স-এর অফিস, দোতলায় ছিল প্রগতি লেখক সংঘের অফিস, এখানেই সাহিত্য সভাগুলো বসত। আটটি বই সংস্থাটি থেকে প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশনা ছিল ‘ক্রান্তি’, এরপর বের হয় সোমেন চন্দের গল্প সংকলন ‘সংকেত ও অন্যান্য গল্প’, অনিল মুখার্জির রাজনৈতিক তত্ত্বমূলক বই ‘সাম্যবাদের ভূমিকা’, সরলানন্দ সেনের ‘মাওসেতুঙ’, কিরণ শংকর সেনগুপ্তের ‘নতুন আঁচড়’, অমৃতকুমার দত্তের ‘কয়েকটি পাতা’। এছাড়াও বের হয় গণসঙ্গীতের একটি সংকলন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি গল্প সংকলন।
প্রতিবছর ৮ মার্চ সোমেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অনুষ্ঠান করা হতো। বার্ষিক সম্মেলনগুলো হতো খুবই জাঁকজমকের সাথে। ১৯৪৪ সালের দিকে প্রগতি লেখক সংঘের নাম বদল করে ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’ করা হয়। গণনাট্য সংঘের শাখা হিসেবেও এই সংগঠনটি ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট হয়। এই সময় সত্যেন সেন ও সাধন দাশগুপ্ত সংগঠনের সাথে যুক্ত হন। তাঁরা উভয়েই গণসঙ্গীতের দিকটির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সত্যেন সেনের শ্রেষ্ঠ গণসঙ্গীতগুলোর অধিকাংশই এই সময় রচিত হয়। সাধন দাশগুপ্ত লোক সুরে সঙ্গীত রচনায় জোড় দিতেন। তিনি সোমেন চন্দের উপরও একটি গানে সুর দিয়েছিলেন যা বিভিন্ন কৃষক সম্মেলনে গাওয়া হতো। এদের গানগুলো ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে সুর ও প্রকাশভঙ্গির জন্য খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ বেশকিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যেখানে কলকাতা থেকেও বহু গুণীজন এসে অনুষ্ঠানগুলোকে আরও সার্থক করে তুলতে সহায়তা করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে যাঁরা এই অনুষ্ঠানগুলোতে এসে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিনয় রায়, বিনয় ঘোষ, গোপাল হালদার, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
১৯৪৮-৪৯ সাল পর্যন্ত লেখক সংঘের কার্যক্রম খুব দৃঢ় গতিতে সম্মুখবর্তী হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ৩রা ডিসেম্বর মুনীর চৌধুরী প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের সম্পাদিত নির্বাচিত হন।১১ তাঁর নেতৃত্বে এই সময় সংগঠনটি তাঁদের মুক্তবুদ্ধির মানব কল্যাণমুখী নতুনধারার এই সাহিত্য চিন্তাকে আরো শক্তিশালী করে অপেক্ষাকৃত নবীন লেখকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন যা পরবর্তীকালে ঢাকার সৃজনশীল বা প্রগতিশীল সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মকে প্রবল শক্তিশালী করে তুলেছিল।
এইভাবে আন্দোলনের প্রথম পর্বে অঙ্কুরিত বীজটি আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বে ধীরে ধীরে একটি মহীরূহে পরিণত হয়। এই মহীরুহটি বিস্তীর্ণ ডালপালাসহ আমাদের দেশের বিকাশোন্মুখ সাহিত্যধারাকে প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিস¤পন্ন সাহিত্য চিন্তা থেকে রক্ষা করে এবং ঢাকার বুকে প্রভাবশালী পদচিহ্ন অঙ্কন করে রাখে। যার ছাপ পরবর্তী সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলো থেকেও স্পর্শ পাওয়া যায়।
সংঘ বিলুপ্তির কারণ
ঢাকাতে প্রগতিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি প্রতিক্রিয়াশীল পন্থীদের একটি ক্ষীণধারাও প্রবহমান ছিল। বিশেষত ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ-এর লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব পাস হলে পরে সাংস্কৃতিক ধারায় এই সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রকাশ ঘটানোর বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ১৯৪২ সালের দিকে ঢাকায় এই ধরনের একটি সংগঠন গড়ে ওঠে, যেটির নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ।’ এটির সভাপতি ছিলেন সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান।১২ এরা ‘পাকিস্তান’ নামের একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করত। এই সাম্প্রদায়িক সংগঠনটি ঢাকার বাতাসে বিপরীত মেরুর সূচনা করে তাদের ধর্মান্ধ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠত করতে উঠেপড়ে লেগে যায়।
১৯৪৭ সালে যখন অবশেষে ‘পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল তখন প্রগতির বিরুদ্ধে এতদিন লিখে যা করতে পারেনি- তা-ই করা শুরু করল। এরা বুঝতে পেরেছিল লিখে প্রগতির ধারাকে স্তব্ধ করা যাবে না। তখন বিভিন্নভাবে গুন্ডামি ও লুটপাটের আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানের পরিচালকদের মধ্যে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব থাকার কারণে তারা প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার উপর সন্ত্রাস সৃষ্টির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ধারার উপরেও নির্যাতন শুরু করে। এরা শুধুমাত্র প্রগতিশীল সংস্কৃতির উপরেই নয়- বাংলাভাষা ও কৃষ্টির উপরেও প্রবল স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ করতে থাকে। সম্পূর্ণত বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি পঙ্গু করে দিতে তারা উদ্যোগী হয়। যথানিয়মে সে উদ্দেশ্য নিয়েই প্রগতি লেখক সংঘর উপর তাদের আক্রমণ খুবই প্রবল হয়ে উঠে। পূর্ব থেকেই ঢাকার বুকে সম্প্রদায়িক শক্তিগুলো তাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে চলছিল। মুসলিম লীগ স্থানীয় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান কথাগুলোকে ধর্মীয় উন্মাদনার প্রভাবে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। ফলত প্রগতি লেখক সংঘের শেষ সময়গুলোতে ঢাকায় ঘনঘন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগেই ছিল। শতশত হিন্দু পরিবার এ সময় জীবনের নিরাপত্তার অভাব থেকে স্বদেশ ত্যাগ করে ভারতবাসী হয়। এই পরিবারগুলোর দেশ ত্যাগের ফলে স্থানীয় প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনে যেমন শূন্যতার সৃষ্টি হয় তেমনি প্রগতি লেখক সংঘের আন্দোলনেও শূন্যতা দেখা দেয়। সাম্প্রদায়িক শক্তির গু-ারা লুটপাট অগ্নিসংযোগ প্রভৃতির মাধ্যমে সংঘের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে মুসলিম লীগ ও প্রতিক্রিয়াশীলদের পালিত গু-াবাহিনী ‘প্রতিরোধ পাবলিশার্স’ অফিসটি আক্রমণ করে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়।১৩ ফলে বহু মূল্যবান বইপুস্তকসহ অফিসটির বিরাট ক্ষতি হয়ে যায়। ১৯৪৯ সালের উপর্যুপরি এই হামলায়, পুলিশ ও আই.বি-দের উৎপাতের কারণে লেখক সংঘের প্রায় সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হয়। এরপরেও ১৯৫১ সাল পর্যন্ত কোন না কোনভাবে সংঘের কর্মীরা সোমেন চন্দের মৃত্যুদিবস পালন করে থাকে।
লেখক সংঘের সাইনবোর্ড নিয়ে কাজ করা বন্ধ হয়ে গেলেও ঢাকায় যেসব মুসলিম ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে প্রগতির বীজ বপন করা সম্ভব হয়েছিল তাদের কাজ থেমে থাকেনি। ভিন্নভাবে ভিন্ন নামে বাঙালি সংস্কৃতির উপর সব রকমের আক্রমণকে ঠেকানোর জন্যে তারা কাজ করে যায়। বায়ান্নের ভাষাআন্দোলনেও এই সংঘের কর্মীরা সক্রিয় অংশ নেয় এবং কারাদ- ভোগ করে। সেটি আবার আরেক ইতিহাস। ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রগতির জন্য অনিবার্য। আর সেই অনিবার্যতা নিয়েই এদেশের প্রগতিশীল সংস্কৃতি বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের পর আবার পরিপুষ্ট হতে থাকে।
 
ঢাকার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বর্তমানের যতটুকু গৌরব, প্রগতির পক্ষে সাহিত্য রচনার যতটুকু অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায় তার ভিত্তি রচনা করেছিল প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মীরা। সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই আজকের দিন পর্যন্ত ঢাকা তথা সারাদেশের প্রাণ প্রতিষ্ঠার কাজে প্রগতি লেখক সংঘের কর্মীরা তাদের শ্রম মেধা আপন রক্ত পানি করা উদ্যোগ সাফল্যের মুখ দেখছে। সর্বাত্মক সফলতা হয়ত আসেনি তারপরেও তাদের সেই পরিশ্রমের অনেক সার্থকতা আজকের দিনেও যথেষ্ট পরিস্ফুট হয়ে আছে। তাদের সেই প্রচেষ্টার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করছি।
১.    সম্মেলনটি ব্রাসেলসে হয়েছিল কি না সে সম্পর্কে মতদ্বৈধ আছে। রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর সম্পাদিত ‘সোমেন চন্দের গল্পগুচ্ছ’ বইটির ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন সম্মেলন ব্রাসেল্স-এ হয় কিন্তু দিলীপ মজুমদার সম্পাদিত ‘সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনা সংগ্রহ’ বইটির ‘সোমেনের মৃত্যু ও নতুন সম্ভাবনা’ প্রবন্ধে সম্পাদক উল্লেখ করেছেন সম্মেলনটি হয়েছে প্যারিসে। সম্ভবত রণেশ দাশগুপ্তের কথাটি ঠিক, কেননা তিনি প্রত্যক্ষভাবে এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন বিধায় তাঁর ভুল না হওয়াটাই স্বাভাবিক।
২.    নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের প্রথম সম্পাদক কে হয়েছেন সেটাও বিতর্কিত। রণেশ দাশগুপ্তের কথায় হয়েছিলেন সাজ্জাদ জহির কিন্তু দিলীপ মজুমদার লিখেছেন মি. এস. সাজ্জাদ।
৩.    বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে দিলীপ মজুমদার সম্পাদিত ‘সোমেন চন্দ্র ও তাঁর রচনা সংগ্রহ। (১ম খ-) বইটির পরিশিষ্টাংশে, ২৮৬ পৃষ্ঠায়।
৪.    এই বিষয়টি উল্লিখিত আছে উক্ত গ্রন্থের ২৭৩ পৃষ্ঠায়।
৫.    প্রতিরোধ যে সংখ্যা সোমেনের স্মৃতিতে উৎসর্গ করা হয়েছিল তাতে এই স্মৃতিকথাটি প্রকাশিত হয়। দিলীপ মজুমদারের সম্পাদিত বইটিতে পুরো লেখাটিই পুনঃমুদ্রিত আছে। অংশটুকু উদ্ধৃত হয়েছে উপরোল্লিখিত বইটির ৩৪৯ পৃষ্ঠা থেকে।
৬.    কিরণ শংকর সেনগুপ্ত তাঁর স্মৃতিকথায় ‘প্রথম দু’বছর সাপ্তাহিক ও মাসিকপত্র রূপে এবং পরবর্তীকালে ত্রৈমাসিক আকারে’ প্রতিরোধ প্রকাশিত হতো বলে জানিয়েছেন। সম্ভবত কোন এক সময় পাক্ষিক হিসেবেও এটি প্রকাশিত হয়েছে। যার উল্লেখ পাওয়া যায় অন্যান্যের স্মৃতিকথায়।
৭.    প্রথমে প্রতিরোধ প্রকাশিত হতো ১নং জি. ঘোষ লেন, ঢাকা থেকে। পরবর্তীকালে ২০নং কোর্ট হাউস স্ট্রিট-এ অফিস স্থানান্তরিত হয়।
৮.    অংশটুকু উদ্ধৃত হয়েছে দিলীপ মজুমদার সম্পাদিত ‘সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনা সংগ্রহ’ গ্রন্থটির ৩৭৮ পৃষ্ঠায় কিরণ শংকর সেনগুপ্তের স্মৃতিকথা থেকে।
৯.    অংশটুকু সংগ্রহ করা হয়েছে উল্লিখিত বইটির ৩৮১ পৃষ্ঠা থেকে।
১০.     মুনীর চৌধুরী যে সংগঠনটির সম্পাদক ছিলেন এক সময়, তার উল্লেখ আছে বদরুদ্দিন উমর রচিত ‘পূর্ব বাংলার ভাষার আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (১ম খ-) বইটির ১৭৫ পৃষ্ঠায়।
১১.     ড. সাইদ-উর রহমান তাঁর ‘পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ গ্রন্থে এই বিষয়টির উল্লেখ করেছেন।
১২.     জ্ঞান চক্রবর্তীর জেলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের অতীত যুগ’ গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ আছে ৮০ পৃষ্ঠায়।
    
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd