ঢাকা : সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ প্রকৌশলীর বিকল্প নেই : রাষ্ট্রপতি          রাজধানীর ৬৪ স্থানে বাস স্টপেজ নির্মাণ হবে : কাদের          ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৩ কোটি যুবকের কর্মসংস্থানের হবে : অর্থমন্ত্রী          দ্বীপ ও চরাঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে ইন্টারনেট           সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে : স্পিকার          রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর          বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই : হাছান মাহমুদ
printer
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল, ২০১৮ ২৩:১৯:৫৮আপডেট : ১৩ এপ্রিল, ২০১৮ ২৩:২০:০৮
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগোষ্ঠী
বজলুর রায়হান


 


মায়াময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি বান্দরবান। পাহাড়, সবুজ অরণ্য আর নানা ভাষা, জাত ও ধর্মের মানুষের বসবাসে বৈচিত্র্যময় জেলা হিসেবেও রয়েছে এর ব্যাপক পরিচিতি। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১১টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস। এর মধ্যে একমাত্র বান্দরবান জেলাতেই সব কটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যার দিকে দিয়ে চাকমারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বান্দরবানে মারমা আদিবাসীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী অন্য আদিবাসীগুলো হলো- তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো (মুরং), বম, খেয়াং, খুমী, চাকমা, পাংখোয়া, চাক ও লুসাই। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী এই ১১টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের রয়েছে আলাদা ভাষা, বর্ণমালা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও জীবনধারা। পার্বত্য জনপদের সবুজ পাহাড়ে যে ১১টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে এই ধারাবাহিকে তাদের শিক্ষা, পরিবার প্রথা, জন্ম-বিয়েসহ তাদের জীবনের বিভিন্ন দিকে তুলে ধরা হলো। আজ এই পর্বে তুলে ধরা হলো মারমাদের জীবনধারা।
মারমা সম্প্রদায় বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও
শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠী
বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি- এই তিন জেলাকে একত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম বলা হয়। আগে এগুলো মহকুমা ছিল। তখন তিন জেলার একত্রিত নাম ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম। পরবর্তীতে মহকুমাকে উন্নীত করে জেলা করা হয়। কয়েকশ বছর ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। বর্তমানে এখানে ১১টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও এরা সবাই কিন্তু একসাথে এদেশে আসেনি। পর্যায়ক্রমে ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এদের আগমন ঘটেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী আদিবাসীদের মধ্যে জনসংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো মারমা। তিন পার্বত্য জেলায় এদের বসবাস দেখা রয়েছে। তবে অধিকাংশ মারমাই বান্দরবানে বসবাস করছে।
যেভাবে মারমা নামের উৎপত্তি
‘মারমা’ শব্দটি ম্রাইমা শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। মারমারা পাশ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার (বার্মা) থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে। মিয়ানমার ভাষায় মারমা শব্দের অর্থ ম্রাইমা। কথা বলার ক্ষেত্রে মারমাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও লেখার ক্ষেত্রে তারা বার্মিজ বর্ণমালা ব্যবহার করে।
ধর্ম ও সামাজিক ব্যবস্থা
আদিবাসী মারমারা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। এরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তবে ইতিমধ্যে কেউ কেউ খ্রিস্টান কিংবা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। মারমা সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। মারমাদের একই সামাজিক প্রথায় পরিচালিত হলেও এদের ১০টি গোত্র রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- রিগো বা খ্যংসা, কক্দাইংসা, মারোসা, ক্যক্ফ্যাসা, ফ্রাংসা, থংসা, প্যালেঙসা, ওয়ইংসা, মুরিখ্যংসা, লংদুসা।  
পেশা
মারমারা প্রধানত জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। এদের ৯৯% মানুষ জুম চাষ ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। মারমা পুরুষদের চেয়ে মেয়েরা অধিক পরিশ্রমী। চাষাবাদ, পরিবার ও সংসারের কাজেও মেয়েদের দায়িত্ব বেশি। এছাড়া তারা কাপড় বুননসহ হাতের তৈরি নানা কাজ করে।
জন্ম-মৃত্যু
জন্ম, মৃত্যু, বিবাহÑ এ তিন অধ্যায়কে মারমারা তাদের সামাজিক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজসিদ্ধ (আবদ্ধ) করেছে। মারমা সমাজের বিভিন্ন গোত্র ও উপ-গোত্রের যেসব রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে কিছু কিছু ব্যতিক্রম ও কিছু তারতম্য লক্ষণীয়।
মারমাদের বিয়ের রীতি বেশ চমকপ্রদ। মারমা ছেলেমেয়েদের বিয়ের সময় হলে লাকপাইং ছোয়ে (বিয়ে) অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পাত্রপক্ষ থেকে কনে পক্ষকে প্রস্তাব দেয়ার পর উভয়পক্ষের সম্মতিতে সামাজিক রীতি অনুসারে পাত্রের পিতা-মাতা, বন্ধু-বান্ধব মিলে ১ বোতল মদ, ২৫টি সুপারি, ১ বিড়া পান, বিন্নি ভাত, মিষ্টি চিনি, আখ, ১ জোড়া নারিকেল নিয়ে কনেবাড়ি যায়। এসব উপকরণ কনের মা-বাবাকে প্রদান করে মেয়ের মতামত নেয়া হয়। পরে জ্যোতিষ ডেকে রাশিফল, বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। বিয়ের দুদিন আগে পাত্রের বাবা বা অভিভাবক বাড়িতে গৃহ দেবতার উদ্দেশে পুজার (চুংমংলে) আয়োজন করে দেবতার উদ্দেশ্যে ১টি শূকর, ৫টি মুরগি বলি দেওয়া হয়। বিয়ের দিন সেদ্ধ মোরগ, মদ তৈরি হওয়ার পূর্বে ভাত, পানি  মুলির সংমিশ্রণ ১ বোতল মদ, ১টি থামি (মেয়েদের নিম্নাংশের পরিধেয় কাপড়), ১টি বেদাই আংগি (ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাক)সহ নানা উপকরণ নিয়ে যাওয়া হয়। বিয়ের বৌদ্ধ ভিক্ষু দ্বারা পঞ্চশীল গ্রহণ, মঙ্গলসূত্র পাঠ, পিন্ড দানসহ ধর্মীয় আচার পালন করা হয়।
বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি
মারমা সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিকধারা খুবই শক্ত ভিতের ওপর। তাদের সাংস্কৃতিক উৎসবের মধ্যে বাংলা নতুন বছর উদযাপন সবচেয়ে বৃহৎ উৎসব। একে মারমা ভাষায় সাংগ্রাই পোয়ে বলা হয়। এছাড়া ওয়াছো পোয়েঃ, ওয়াগ্যোয়াই পোয়েঃ, পইংজ্রা পোয়েঃ ফানাচ (ফানুস) বাত্তি উড়ানো, জলকেলি বা মৈত্রী পানি বর্ষণ, বৌদ্ধমূর্তি স্নান, রথযাত্রা উল্লেখ্যযোগ্য। মারমাদের সংস্কৃতির মধ্যে আরো রয়েছে- থালা নৃত্য, পাখা নৃত্য, মাছ ধরা নৃত্য, পাংখুং, জাইক, কাপ্যা প্রভৃতি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মারমা সমাজে জনপ্রিয়। এদের মাতৃভাষায় রচিত বিভিন্ন গান।  
মারমারা বর্ষবরণকে প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে পালন করে থাকে। এ বর্ষবরণকে মারমা তাদের ভাষায় ‘সাংগ্রাই পোয়েঃ’ বা সাংগ্রাইং উৎসব বলা হয়। ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে এ উৎসব পালন করে মারমারা। বাংলা নববর্ষ থেকে মারমাদের সাংগ্রাই পোয়েঃ উৎসব শুরু হয়। এ উৎসব ৪ দিনব্যাপী মারমারা পালন করে থাকে। সাংগ্রাং পোয়ের প্রথম দিন ধর্মপ্রাণ মারমা সম্প্রদায় বৌদ্ধবিহার চন্দনের পানি দিয়ে ধোয়া হয়। তারপর রোমাং রাজা অথবা বৌদ্ধ ভিক্ষুর নেতৃত্বে শোভাযাত্রা সহকারে শহর প্রদক্ষিণ করে গোঁয়াইন (বুদ্ধমূর্তি) স্নান করানো মধ্যদিয়ে মূল উৎসব শুরু হয়। এসময় মারমারা অতীতের সকল দুঃখ-বেদনা, উঁচুনিচু, ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে পরস্পরের মৈত্রী সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সাংগ্রাইং পোয়ের দিনগুলোতে রাতে মারমা তরুণ-তরুণীরা, কিশোর-কিশোরীরা পিঠা উৎসবে মেতে উঠে। এ উপলক্ষে বলি খেলা, ঘিলাখেলা, খো খো খেলা, তৈলাক্ত বাঁশে আরোহণ, পিঠা বানানোসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
শেষ কথা
মারমারা অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ। গৃহে অতিথি আসাকে তারা ভাগ্যের শুভ লক্ষণ মনে করে। তারা অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় এবং বন্ধুবৎসল। পাহাড়ে জীবন যাপন করলেও তারা শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করে আধুনিক জীবন যাপনের দিকেও ঝুঁকছে। তারা এখন সমতলের বাঙালিদের মতোই পোশাক-আশাক পরছে। তাদের ছেলে-মেয়েরা এখন আধুনিক জীবন যাপনের দিকে গেলেও আপন সংস্কৃতির প্রতি তাদের পরম মমত্ববোধ রয়েছে। তাই কোনো উৎসব এলেই সকল ছেলে-মেয়ে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারায় বোনা পোশাক পরিধান করে এবং উৎসবে মেতে ওঠে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd