ঢাকা : বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০

সংবাদ শিরোনাম :

  • এখন থেকে নিম্ন আদালতে মামলা করা যাবে          সৌদি আরব থেকে ফিরলেন ৪১২ বাংলাদেশি          যত্রতত্র কোরবানির পশুর হাট নয় : ওবায়দুল কাদের          করোনাভাইরাস সারাবিশ্বটাকে স্থবির করে দিয়েছে : হাসিনা          করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ব্যাংক ঋণের ২ হাজার কোটি টাকা সুদ মওকুফ ঘোষণা
printer
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল, ২০১৮ ১০:২৮:৪৬
কোটা সংস্কার : কাটাকুটি, কোটাকুটি
করীম রেজা

 

কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে ছাত্র এবং চাকরিপ্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত রাস্তায় নেমেছিলেন। পুলিশ বরাবরের মতোই তাদের প্রতিপক্ষরূপে নাজিল হয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের চরিত্র পাল্টে দেয়া হলো। অনেক রকম ঘটনা ঘটানো হলো। বলতে হলো অনেক কথাও। সরব হলো সংসদ। ভিসির বাসভবন ধ্বংস করা হলো। চারুকলায় হামলা করা হলো।
কোটা সংস্কারের দাবিদার আর সরকারকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হলো কৌশলে, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। কোটা সংস্কার কার স্বার্থে ছিল, এক কথায় জাতীয় স্বার্থে। চাকরি ব্যবস্থায় এক ধরনের ভারসাম্য আনা, কারো বিপক্ষে নয়। কিন্তু দৃশ্যের আড়ালের কুশীলবগণ আবারো জাতিকে অস্থিরতার কালো অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে চাইলেন। তারা কোটা আন্দোলনকারীদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিপরীতে ঠেলে দেন। অতঃপর প্রধানমন্ত্রী কোটা সংস্কারের দাবিকে বাতিলে পরিণত করলেন। বাতিল হলো কোটা ব্যবস্থা। এবার প্রতিপক্ষ হিসেবে দৃশ্যপটে আগমন ঘটল মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের অধস্তন প্রজন্ম। পরিস্থিতির পরিণতি দেখতে আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে।
কোটা নিয়ে আন্দোলন প্রসঙ্গে পণ্ডিতজনরা নানা সময়ে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। কিন্তু বিবেচনায় নিয়ে কেউ অর্থাৎ দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা এগিয়ে আসেননি। সংস্কার করার পক্ষ-বিপক্ষ, দরকার অথবা দরকার নয়, এ বিষয়ে কোনো কথাবার্তা হলো না। বলা যায়, বলতে না দিয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো হলো। আলোচনা করার অনেক সুযোগ ছিল; কিন্তু তার সদ্ব্যবহার করতে দেখা গেল না।কোটা সংস্কার : কাটাকুটি, কোটাকুটি
সংস্কার চাইছিল তারা, যাদের মধ্যে অনেকেই কদিন আগে আর পরে সরকারি চাকরি নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী হবেন বা হতেন। তারাই নানা রাষ্ট্রীয় এবং জাতীয় বিষয়ে মতামত দেবেন। তাহলে এই তরুণদের সঙ্গে কোন যুক্তিতে কোনো আলোচনা করা হলো না, তা কিন্তু অজ্ঞাত থাকল।
স্বাধীনতার চার যুগ পরও দেশের সরকারি চাকরি প্রার্থীদের নিয়োগের নীতিমালায় কোটা ব্যবস্থা যুগোপযোগী করা হয়নি। দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের নীতি-পদ্ধতি রচনাকারীদের কোনো উদ্যোগ ছিল না। জেলা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি কোটা ব্যবস্থায় ভারসাম্য বাস্তবসম্মত নয়। বরং যুগের পর যুগ এই ব্যবস্থা ভারসাম্যহীনভাবে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। আজ যখন বাংলাদেশের যুব সম্প্রদায় বাস্তবতার নিরিখে জাতীয় স্বার্থে বিষয়টি সবার গোচরে আনার চেষ্টা করল, তা আমলে নেয়া হলো না। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য ও পরামর্শ না দিয়ে তা বাতিল করার ঘোষণার দ্বারা বিতর্কিত পরিবেশ সুকৌশলে জিইয়ে রাখা হলো।  
কোটা পদ্ধতি সংস্কার না করে অপরিবর্তিত রাখলে সুবিধা রয়েছে একটি পক্ষের। এই পক্ষ অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা সরকারের অংশ। নিরাপদ চাকরিবিধির আবরণে সুরক্ষিত থাকেন। জনগণের স্বার্থ নয়, তাদের ব্যক্তি ও সামষ্টিক স্বার্থই প্রধান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, বর্তমান কোটা পদ্ধতির মাধ্যমেই মেধার ভিত্তিতে অধিকাংশ প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এই নিয়োগের পেছনে একটি বাণিজ্যের গল্প আছে। যখন কোটার ভিত্তিতে উপযুক্ত প্রার্থীর অভাব হয়, তখনই হাত দেয়া হয় মেধা তালিকায়। এই মেধা তালিকার সুযোগে কোনো অমেধাবী বিশেষ কোনো কায়দায় জায়গা করে নিতে পারে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমাদের দুর্নৈতিক বাস্তবতায় অনেক কিছুই হতে পারে।  বিপুল অর্থ, নানরকম সম্পর্কের সূত্র, তদবির এবং আরো অজানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেয়া হয় বলে নানাভাবে বলা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বেশি রাখায় আমলাদের দুর্নীতির সুবিধা। বীর মুক্তিযোদ্ধার সুবিধা নিচ্ছে নকল মুক্তিযোদ্ধারা। প্রকৃতদের দুরবস্থার কথা পত্রিকার পাতা থেকেই জানা যায়। তারপরও এই পদ্ধতি টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই আমলাগণ কোটা সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নীরব।
আন্দোলনকারীদের দাবির যৌক্তিকতা আছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার অধিকার আছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আজকে রাষ্ট্র যে আচরণ করছে, তাদের মধ্যে যারা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের দায়িত্বপূর্ণ পদে বসবেন, তখন এই অতীত অভিজ্ঞতা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মনোভাব প্রভাবিত করতেই পারে। তা যদি তখন দেশের জনগণের স্বার্থের বিপরীতে হয়, তার জন্য আজকের এই উদ্ভূত পরিস্থিতির কি কোনো দায় থাকবে না?
আন্দোলনকারীদের অধিকাংশ ছাত্র। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী। তারপরও দেখা যায়, একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠনের অংশবিশেষ ছাত্রদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। নিকট অতীতে যেমন ছিল, এবারো ছিল। এহেন আচরণ অবশ্যই রাজনৈতিক সুস্থতার পরিচয় নয়।
অবাক করার মতো বিষয়, এই ব্যাপারে আমাদের গোয়েন্দাদের তরফ থেকে কোনো তথ্য নেই। আগেও এমন ঘটেছে। ছাত্র, শিক্ষক এবং অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নিয়ে সরকারকে কোনো সতর্ক বার্তা কিংবা সুনির্দিষ্ট অথবা সম্ভাব্য তথ্য সরবরাহ করেনি গোয়েন্দারা, অতীতে আমরা তা লক্ষ করেছি। বিব্রতকর অবস্থা নিরসন করার জন্য ত্রাতা হিসেবে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীকে ভূমিকা নিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যা ষড়যন্ত্রের মতো ঘটনায়ও সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ছিল না বলেই জানা যায়।  
নিকট কিংবা দূর অতীতের ঘটনা পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমলারা জটিলতা সৃষ্টিতে পারঙ্গমতা দেখিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে বা করেছে এবং সুযোগমতো সামনেও করতে পারে। ভিআইপি লেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মর্যাদা, প্রাথমিক, মাধ্যমিক শিক্ষক ও এমপিওভুক্তি, প্রশ্ন ফাঁস, পিএসসি পরীক্ষা, সরকারি কর্মচারীদের বৈষম্যপূর্ণ বেতন ও সুবিধা বৃদ্ধি  প্রভৃতি সব বিষয়ে এক রকমের অস্থিরতা তৈরির পেছনে মূল হোতার ভূমিকা থাকলেও, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা তদন্তের খবর পাওয়া যায়নি।
বর্তমান সরকারের শুরুর দিক থেকেই পাতি নেতা থেকে আরম্ভ করে বড় বড় নেতাও বলতে চেয়েছেন, আমলা পুলিশে অনুপ্রবেশ ঘটেছে একটি বিশেষ মহলের। তারাই সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করাবার ষড়যন্ত্রে যুক্ত। যে কোনো সমস্যা সম্পর্কে ধারণা থাকলে তা সমাধান সহজতর। কিন্তু সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষে নির্বাচন যখন দোরগোড়ায় তখনো তারা পূর্ণ শক্তি নিয়ে সক্রিয় থাকে কীভাবে, কার মদদে? বিষয় সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল থাকার পরও, রাজনৈতিক দলের ভূমিকা কী, বিশাল গোয়েন্দা বাহিনী অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গোয়েন্দা বাহিনীসহ অন্যদের ভূমিকা কী?
কোটা সংস্কার দরকার অথবা দরকার নয় তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। এই দাবি নিয়ে আন্দোলন করায়ও দোষের কিছু নেই। কিন্তু এ পর্যন্ত যা ঘটে গেল তা এক কথায় অনভিপ্রেত। দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্টরা এড়াতে পারেন না। সাধারণ, শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিকে জঙ্গি-সন্ত্রাসী অবয়ব দেয়ার পরিকল্পনাকারীদের অবিলম্বে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অতীতের ঘটনাগুলো অবহেলা করা হয়েছে বলেই একই ঘটনা ঘুরেফিরে বারবার ঘটছে বা অঘটনঘটনপটুরা তা আবারো ঘটাবার দুঃসাহস করছে। এই দুঃসাহস জাতিকে উন্নয়নের পথ চলা থামিয়ে দিয়ে পেছনে টেনে ধরছে।
লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট, ই-মেইল : karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd